প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দশটি বিশেষ উদ্যোগ || আশ্রয় পেয়ে মানুষ গড়ার কারিগর হতে চান রাব্বি

আপডেট: জুন ২০, ২০১৯, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

শাহিনুল ইসলাম আশিক


গোদাগাড়ীর পাকড়ী ইউনিয়নের গোপালপুর এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের নির্মিত বাড়ি-ঘর -সোনার দেশ

একচালা টিনের ঘরে আকাশ সমান স্বপ্ন মো. রাব্বি ইসলাম (১৮)এর। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চলছে তার কঠোর সাধনা। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর পাকড়ী ইউনিয়নের গোপালপুর এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তিনি। পাকড়ী মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।
রাব্বির পরিবারের ছিলো না মাথা গোঁজার ঠাঁই। এখন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ব্যারাকে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলেছে। রাব্বি এখন মানুষ গড়ার কারিগর হতে চান।
আত্মপ্রত্যয়ী রাব্বী বলেন, ‘আমার স্বপ্ন শিক্ষক হওয়া। দেশ ও জাতির সেবায় কাজ করে যেতে চাই। আশ্রয়ের কত মূল্য তা আমি বুঝি, আমার পরিবার বোঝে। আশ্রয়হীন পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী ঘর দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নবীজও বুনে দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি।’ রাব্বি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সরকারের এমন উদ্যোগের ফলে অনেক আশ্রয়হীন পরিবার মাথাগোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের একটি সূত্রমতে, জেলার চারঘাটের হলিদাগাছিতে ২৮০টি পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসন করা হয়েছে। এছাড়া বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ঠাকুরঝিতে ৫০টি ও পুঠিয়া উপজেলার কান্দ্রায় ১৫টি সহ মোট ৩৪৫টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতা বৃদ্ধির জন্য নতুন প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে তানোর উপজেলার পাঁচন্দর, পুঠিয়া উপজেলার কান্দ্রা ও ভুবনপাড়া এবং মোহনপুর উপজেলার ইসলামবাড়িতে নি:স্ব, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলো আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এছাড়া পবা উপজেলার কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে । এই এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোকে পুনর্বাসনের জন্য তৈরি করা হবে বহুতল ভবন। ইতোমধ্যেই এ ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব করা হয়েছে।
গোদাগাড়ীর পাকড়ী ইউনিয়নের গোপালপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে ১৩৪টি পরিবার বসবাস করছে। গৃহহীন এসব পরিবার আশ্রয়ণ প্রকল্পে এসে পেয়েছেন পরিচয় ও ঠিকানা। এখন তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে ঋণ নিচ্ছেন। সেই টাকায় পশু পালন করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন ।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা জানান, কর্মক্ষম পুরুষেরা মহানগরীতে বিভিন্ন পেশার সাথে জড়িত থাকেন এবং কর্মঠ নারীরা গৃহস্থালি সামলানোর পাশাপাশি হাঁস-মুরগি ও পশু পালনের কাজ করেন। কেউ কেউ কৃষি কাজও করেন। এসব পরিবারের স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কাজ করেন। দু’জনের উপার্জনে তাদের দিন ভালই চলে যায়। শুধু উপার্জনই নয়, সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন মায়েরা। সন্তানদের উন্নত শিক্ষার জন্য রাখছেন প্রাইভেট শিক্ষক।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের কোষাধ্যক্ষ নাসিরা বেগম জানালেন, এখানে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। ছুটির দিন ছাড়া সবদিনেই আসেন স্বাস্থ্যকর্মী। বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করেন তারা। তিনি বলেন, তাদের সঞ্চয়ের তেমন টাকা-পয়সা নেই। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে তারা পুকুরের মাছ চাষ করতে পারেনি। এবছর থেকে তারা সরকারের কাছ থেকে একটি পুকুর বুঝে পেয়েছেন। এলাকার বাসিন্দারা এক হয়ে মাছ ছেড়েছেন।
গোদাগাড়ী উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিসার রাইসুল ইসলাম বলেন, ‘ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর একটি পরিবারকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে পশু পালন ও কৃষি কাজ। বিশেষ করে পশু পালন প্রশিক্ষণের ফলে তারা আর্থিকভাবে দ্রুত স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।’
অন্যদিকে পুঠিয়া উপজেলার কান্দ্রা আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি সুনিল কুমার জানান, নতুন ১৫টি ঘর বরাদ্দ হয়েছে। এছাড়া আগের ১০টি মিলে ২৫টি ঘরে ২৫টি পরিবার থাকে। সরকারিভাবে এমন উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এখানে কিশোর-কিশোরীর সংখ্যাই বেশি। শিক্ষাগ্রহণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তাই পুঠিয়া বাজার এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাগ্রহণ করে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ছেলে মেয়েরা।
এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাদের মাথার গোঁজার ঠাঁই হয়েছে তারা এখন সন্তানদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। শ্রী সুনিল কুমারের মেয়ে মুসকান (১২)পুঠিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। সুনিল কুমার বলেন, ‘অভাবের সংসার। ঠাঁই ছিল না মাথা গোঁজার। বাড়ি ভাড়ার খরচা লাগতো। সংসার টানা খুব কষ্টের ছিল। এখন ঠাঁই হয়েছে। বাড়ি ভাড়ার টাকা কিছু কিছু করে জমছে, সংসারসহ সন্তানের লেখা-পড়ার কাজে লাগানো যাচ্ছে।’
সুনিল কুমার জানালেন, সন্তানকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলাই তার বড় স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের থাকার জায়গা দিয়েছেন বলেই মেয়েকে প্রতিদিন ভ্যান ভাড়া দিয়ে স্কুলে পাঠাতে পারছি। সরকার শুধু ঘর দেয়নি, বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসারও সুযোগ করে দিয়েছেন । স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত এসে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন।’
গৃহহীন সুকুমার এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে পরিবার নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন। তিনি এখন ছেলে-মেয়েকে স্কুল পাঠাচ্ছেন, দিয়েছেন প্রাইভেট। ভবিষত্যের কথা মাথায় রেখে সঞ্চয়ও করছেন। তিনি বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য মানুষের জীবনের থেমে যাওয়া চাকায় গতি এসেছে। জীবন-জীবিকার মান উন্নত হয়েছে। মানুষ বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তারা নিজেদের উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ করে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ঋণ হিসেবে ২০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে তাদের। সঞ্চয় হিসেবে প্রতিমাসে ২০০ টাকা করে সদস্যদের থেকে নেয়া হয়। যে টাকা জমা হয় দুর্দিনে কাজে লাগানোর আশায়।’ তিনি জানান, এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের মধ্যে একটি পুকুর রয়েছে। সে পুকুরের মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সেই টাকা ভাগাভাগি করে নেন তারা। যে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা তারা সরকারের স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পেয়ে থাকেন।
এছাড়া আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরেই রাজশাহী বিভাগের ১৯টি উপজেলার গৃহহীন মানুষেরা ১ হাজার ৪৩৯টি ঘর পেতে যাচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী জেলাসহ পাঁচ জেলা অর্থাৎ নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁয় এসব ঘর তৈরি করা হচ্ছে। ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ উপ-খাতের আওতায় এসব ঘর নির্মাণ হচ্ছে। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আর প্রতিটি ঘরের জন্য এক লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী জেলার চারঘাটে ১৭টি ঘরের জন্য ১৭ লাখ টাকা, গোদাগাড়ীতে ১৯৩টি ঘরের জন্য ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ও তানোরে ১৭টি ঘরের জন্য ১৭ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে। নাওগাঁ সদরে ১৭৮টি ঘর করা হবে। যার ব্যয় ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এছাড়া আত্রাইয়ে ২০টি ঘর করা হবে , যার ব্যয় ২০ লাখ টাকা।
সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে ১৪৫টি ঘরের জন্য ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, উপজেলার চৌহালী ১৩৮টি ঘরের জন্য ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, বেলকুচিতে ১৩৩টি ঘরের জন্য ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ও কাজীপুরে ১৭টি ঘরের জন্য ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। নাটোরের বড়াইগ্রামে ২২টি ঘরের জন্য ২২ লাখ টাকা, লালপুরে ২৩টি ঘরের জন্য ২৩ লাখ টাকা ও বাগাতিপাড়ায় ৮টি ঘরের জন্য ৮ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দ করা হয়।
পাবনার চাটমোহরে ১২৭টি ঘরের জন্য ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, আটঘরিয়ায় ৮৬টি ঘরের জন্য ৮৬ লাখ টাকা, ফরিদপুরে ১৮টি ঘরের জন্য ১৮ লাখ টাকা, ভাঙ্গুড়ায় ৩৪টি ঘরের জন্য ৩৪ লাখ টাকা। এছাড়া পাবনা সদরে ১১৯টি ঘরের জন্য ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা, সাথিয়ায় ১২৬টি ঘরের জন্য ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ও সুজানগর উপজেলায় ১৮টি ঘরের জন্য ১৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ সব ঘর তৈরির কাজ চলমান আছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্প সরকারের একটি বিশেষ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে ব্যাপক জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়েছে। পেয়েছে থাকার জায়গাও। দেয়া হয়েছে বিভিন্ন জিনিসপত্রও। রাজশাহীতে যেসব আশ্রয়ণ প্রকল্প আছে- সেগুলোর অবস্থা অত্যন্ত ভালো।
তিনি বলেন, এই এলাকার স্বাস্থ্যসেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্যবস্থা রয়েছে। বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। এছাড়া শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে কিশোর-কিশোরীদের স্কুলে ভর্তির জন্য অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি।