প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দশটি বিশেষ উদ্যোগ || তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মনোযোগ বাড়িয়েছে

আপডেট: জুন ২৭, ২০১৯, ১:০৩ পূর্বাহ্ণ

রওনক আরা জেসমীন


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মনোযোগ বাড়িয়েছে। এসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা বড় পর্দায় দেখে-বুঝে-শুনে পড়ার সুযোগ পাওয়ায় স্কুলে তাদের উপস্থিতি ও লেখাপড়ার আগ্রহ বেড়েছে।
রাজশাহী জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসিরুদ্দীন বলেন, বর্তমানে রাজশাহীতে উপজেলাভিত্তিক মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭০৬টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়ার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষকদের ও যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে এবং কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউশন বন্ধের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখন শতভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী হয়েছে। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মানও বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও পাঠ্যসূচির মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়ন শিক্ষার মান বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যবস্থার অগ্রগতি ও শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখার জন্য ‘জাতিসংঘের সাউথ সাউথ কো-অপারেশন ভিশনারি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যা জাতির জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।”
তিনি জানান, শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে ২০১০ সালে সাতটি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুমের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১১ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘আইসিটি ফর এডুকেশন ইন সেকেন্ডারি অ্যান্ড হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এর আওতায় দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় একটি করে কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম স্থাপনের পরিকল্পনা হয়। এজন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় ল্যাপটপ, ইন্টারনেট মডেম, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও সাউন্ড সিস্টেম।
সেসময় মাল্টিমিডিয়া ক্লাশ পরিচালনায় ডিজিটাল ক্লাশরুম, ডিজিটাল কনটেন্ট, ডিজিটাল ডিভাইস ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের নানামুখী প্রকল্পও হাতে নেয় সরকার।
রাজশাহী পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরের শহীদ নাদের আলী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তাসনুভা (৮ম শ্রেণি), ঝুমুর (৯ম শ্রেণি), নুসরাত ও সাদিয়া (১০ম শ্রেণি) জানায়, মাল্টিমিডিয়া প্রজেকশনে ক্লাশ করতে তাদের খুব ভালো লাগে। বড় পর্দায় আমরা বিষয়গুলো দেখতে পাই। তাই বই পড়ে ক্লাশ করার চেয়ে প্রজেকশনের মাধ্যমে বিষয়সূচি বুঝতে সহজ হয়।
শহীদ নাদের আলী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ রুহুল আমিন জানান, ‘শিক্ষাকে সহজ, উপভোগ্য ও আনন্দময় করে তুলতে দেশের বিভিন্ন স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম গড়ে তুলেছে সরকার। প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্যবিষয় সহজ ও বোধগম্য হয়েছে। সচিত্র পদ্ধতিতে প্রজেক্টরের মাধ্যমে ভিডিও দেখানোর ফলে শিক্ষার্থীরা আকৃষ্ট হচ্ছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম, মাল্টিমিডিয়া স্কুল ও অনলাইন স্কুল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন, যা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিমুখি করে তুলছে।’
তিনি বলেন, “২০১৬ সালে আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। তখন থেকে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শতভাগ। সবাই নিজ আগ্রহ থেকেই উপস্থিত হয় ক্লাসে এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠদান এবং পাঠগ্রহণ সহজ হচ্ছে।”
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, রাজশাহী জেলায় ৩০৩টি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। ৩০৮ টি সায়েন্স ল্যাব এবং আইটি ল্যাব, ৬৮৯ টি লাইব্রেরি রয়েছে। জানা যায়, শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি ও শিক্ষার মানোন্নয়নে এবছর মে মাসে রাজশাহী মহানগরীতে ২১টি উচ্চ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি বিদ্যালয়ের নতুন একাডেমিক ভবন ও অবশিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর স্থান সম্প্রসারণ হবে। এর মধ্য দিয়ে রাজশাহী নগরীর স্কুলসমূহের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় হাসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাখলেসুর রহমান মোখলেস। তার স্বপ্ন বড় হয়ে ডাক্তার হবে। মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করবে এবং তার বাবা-মাকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করবে। পড়াশোনায় তার খুবই আগ্রহ। মোখলেসের বাবা রহুল আমিন দিনমজুর, মা গৃহিণী, কষ্টের সংসার তাদের।
হাসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুন্নাহার বলেন, এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাখলেসুর রহমান মোখলেস মেধাবী ছাত্র। পড়াশোনার প্রতি তার খুবই আগ্রহ। তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে স্কুলের সব শিক্ষক তাকে সহযোগিতা করে। সে এই স্কুল থেকে ২০১৮ সালে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। সরকারের শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচির ফলে এসব দরিদ্র শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করে ভালো ফল করতে পারছে।
তিনি বলেন, দেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্রমশঃ উন্নতি হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধারা আরও উর্ধ্বমুখী হবে বলে আমি মনে করি। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে মেয়ের ভর্তির আনুপাতিক হার ৫০ ভাগে উন্নীত হয়েছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা অর্জিত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কো পুরস্কার ‘ট্রি অব পিস’-২০১৪ লাভ করেন।’
রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার ২০১৯ সালে ৯৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লক্ষ ৮৮ হাজার ৮৪২ জন।
সূত্র আরও জানায়, রাজশাহী জেলায় ২৮৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম রয়েছে। ১১২৬ জন শিক্ষককে আইসিটি-এর উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং ৫৪৩৪ জন শিক্ষককে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন (ডিপিএড) প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে । ঝরে পড়া শিশুর হার বর্তমানে ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। মিড ডে মিল চালু আছে ১০৫৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মিড ডে মিল ঝরে পড়া শিশু রোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে ।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা খাতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করেন। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে তাঁর সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করে এবং এর আলোকে একটি আধুনিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন জাতি গঠনের মাধ্যমে ‘ভিশন ২০২১’ লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার প্রত্যয় ঘোষণা করে। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রযুক্তির সংযোজন হওয়ায় স্কুলে ভর্তির হার শতভাগে উন্নীত হয়েছে। এতে ঝরে পড়া শিশুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ, সংস্কার, কম্পিউটার ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, পাঠ্য পুস্তকের অনলাইন ভার্সন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতির বই বিতরণ, নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা, স্যানিটেশন ও ওয়াশ বক্স স্থাপনসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের সাথে সাথে তার শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনে এবং নেতৃত্ব বিকাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান, মিড ডে মিল চালুকরণ, স্টুডেন্ট কাউন্সিল গঠন, ক্লাব-স্কাউট দল গঠন, ক্ষুদে ডাক্তার দল গঠন, প্রাক্তন শিক্ষার্থী অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠন, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ড কাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট উল্লেখযোগ্য।
রাজশাহী জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসিরুদ্দীন জানান, ‘বিনামূল্যে বই বিতরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়ন, ভবন সম্প্রসারণ এবং নতুন ভবন স্থাপন ইত্যাদি কর্মসূচি শিক্ষাক্ষেত্রকে সম্প্রসারণ করেছে। এছাড়াও ডিজিটাল ল্যাব, আইটি ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় মনোযোগী করে তুলেছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুমের প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস করতে শিক্ষার্থীরা বেশ আগ্রহবোধ করছে এবং সহজে বিষয়গুলো বোধগম্য হচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ