প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কদর কমেছে হালখাতার

আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০১৮, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


হালখাতা। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত একটি অধ্যায়ের নাম। পুরনো বছরের সব হিসেব-নিকেশ চুকিয়ে নতুন বছরের প্রথম দিনে নতুন খাতায় পদার্পণের দিন। ব্যবসায়িক লেনদেন হালনাগাদ করার এ রীতি হালখাতা হিসেবে পরিচিত। তাই ব্যবসায়ীদের কাছে বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার আবহমান এই রীতির জৌলুশ প্রযুক্তি ছোঁয়ায় কিছুটা কমেছে।
কয়েক বছর আগেও দেশের ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজারগুলোতে ছিল হালখাতার জমজমাট আয়োজন। এজন্য গ্রাহকদের চিঠির মাধ্যমে তার বকেয়ার বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হতো। বর্তমানে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় কম্পিউটার, টেলিফোন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও ইমেইলের কারণে সেই হালখাতার কদর কমেছে। এখন আর চিঠির মাধ্যমে বকেয়া হিসাব স্মরণ করিয়ে দিতে হয় না। এ সংক্রান্ত সব যোগাযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণ চলে গেছে ফোনে-অনলাইনে। এখন লেনদেনও হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। লালখাতা তৈরিকারক ব্যবসায়ীরা তাই উপার্জনের বিকল্প পথ খুঁজে নিচ্ছেন।
লালখাতার কদর কমলেও এখনও এর কিছুটা জৌলুশ দেখা যায় পুরান ঢাকার বাজারগুলোতে। নতুন বাংলা বছর ১৪২৫ সালকে কেন্দ্র করে ব্যস্ততা দেখা গেছে এর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে এই আয়োজন উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন ঐতিহ্যগত কারণেই তারা এখনও সেই হালখাতা উৎসব পালন করে আসছেন।
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, শ্যামবাজার, বাবুবাজার, ইসলামপুরের কাপড়ের দোকানসহ আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্য মেনেই হালখাতার আয়োজন করেন। পুরনো হিসাব-নিকাশ ঘুচিয়ে গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করানো হয় এই দিনে। সরেজমিনে দেখা গেছে, হালখাতা উপলক্ষে এসব বাজারের প্রায় সবকটি দোকান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে, সাজানো হয়েছে রঙবেরঙে। অনেকেই সোনা-রূপার পানি, আতর ও গোলাপ জল দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে নিয়েছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের অতিশয় ব্যস্ততা, ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম ও ইংরেজি মাসকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে হালখাতার গুরুত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। এরপরও নিয়ম রক্ষার জন্য তারা দোকানপাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পুরনো খাতার বদলে লাল রঙের নতুন খাতা কেনেন।
পুরান ঢাকার শ্রীকৃষ্ণ স্বর্ণালয়ের মালিক দেব কৃষ্ণ লাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাপ দাদার আমল থেকে আমরা স্বর্ণের ব্যবসা করে আসছি। তখন থেকেই বছরের শেষদিকে সবাইকে রং বেরঙের কার্ড বা চিঠির মাধ্যমে হালখাতার বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হতো। হিসাব নিকাশের পুরনো সব খাতা ক্লিয়ার করে নতুন খাতায় যাত্রা শুরু হতো। কিন্তু এখন আর আগের মতো হালখাতা করা হয় না। সবাই এখন কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। লেনদেন হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। এ পেশায় যুক্ত হয়েছে আধুনিকতা। এরপরও আমরা ঐতিহ্যগতভাবে হালখাতা চালিয়ে যাচ্ছি। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর কতটুকু গুরুত্ব থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে।’
শাঁখারীবাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল আলীম বলেন, ‘দোকানে কিছু বকেয়া হিসাব নিকাশ রয়েছে। আগের মতো এবার চিঠি দিইনি। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দাওয়াত করেছি। আশা করি সবাই আসবেন।’ ইসলামপুরের শাহী বস্ত্র বিতানের ম্যানেজার আব্দুল রশিদ বলেন, ‘হালখাতা একটি ব্যবসায়িক ঐতিহ্য। এর মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় হয়। এখন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে আমাদের সন্তানেরা। তাদের যুগে আমরা পদার্পণ করেছি। আধুনিক প্রযুক্তিতে তারা সব হিসাব নিকাশ রাখছেন।’-বাংলা ট্রিবিউন