প্রযুক্তি প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারকে সংকুচিত করছে

আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০১৮, ১:১৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


দেশের শ্রমঘন পোশাক শিল্পে সোয়েটার প্রস্তুতকারক কারখানা আছে প্রায় ৬০০। এর মধ্যে প্রায় ৪০০টি কারখানা উৎপাদনে সক্রিয়। এসব কারখানার ৯০ শতাংশই এখন অটোমেটেড, যেখানে কম্পিউটারচালিত জ্যাকার্ড মেশিনেই প্রস্তুত হচ্ছে সোয়েটার। একই অবস্থা নির্মাণ ও আবাসন খাতেও। নির্মাণকাজে শ্রমিকের চাহিদা আগের তুলনায় কমিয়ে এনেছে স্বয়ংক্রিয় নির্মাণ প্রক্রিয়া।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনে শিল্প খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ভবিষ্যতে এটি আরো বাড়বে। যেমনÍ পোশাক শিল্প মালিকরা ভবিষ্যতে রোবট ও সিউবটের মতো যন্ত্র দিয়ে পোশাক তৈরির কথা ভাবছেন। এমনটি হলে কারখানায় শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা সংকুচিত হয়ে আসবে, কেননা তাদের স্থান দখল করবে যন্ত্র। তবে তখন এসব যন্ত্র পরিচালনায় দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা বাড়বে, যা এখন আমাদের নেই। ফলে ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।
শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কর্মীর দক্ষতা বাড়ছে না বলে জানিয়েছেন রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার জন্যই উদ্যোক্তারা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছেন। এ সক্ষমতা ধরে রাখতে যদি পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড কারখানার প্রয়োজন পড়ে, উদ্যোক্তারা তা করবেন। অটোমেশনের মাধ্যমে যদি কোনো শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ে, তাহলে অটোমেশন কেন নয়? শিল্প টিকে থাকলে সবাই টিকে থাকবে। কিন্তু প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলাম, কিন্তু তা পরিচালনায় দক্ষ কর্মী পেলাম না, এমনটা হলে বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীর অভাব এখনো বাস্তবতা। এটি কাটিয়ে উঠতে হবে।’
গত এক দশকে পোশাক শিল্প, নির্মাণ-আবাসন, চামড়াসহ বিভিন্ন শিল্প ও সেবা খাতের উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিগত স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু করেছেন। আর এ ব্যবস্থায় কমেছে শ্রমিকের ব্যবহার। এভাবেই প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। তবে নতুন কিছু খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও সৃষ্টি করছে প্রযুক্তি। কিন্তু এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে উঠছে না বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনশক্তির মধ্যে। এমন বাস্তবতার সমর্থন মিলেছে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে।
গত ৩১ মার্চ ‘বাংলাদেশ: স্কিলস ফর টুমরোস জবস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। এতে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত ও সঠিক দক্ষতার নিশ্চয়তাসাপেক্ষে প্রযুক্তি একটি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনাও নিয়ে এসেছে। এ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্বব্যাপী কাজ ও দক্ষতা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের পর অনেক পেশায় নিয়মিত কাজের বাইরে বাড়তি কিছু কাজের সৃষ্টি হয়েছে। এসব কাজে মানুষকেই সম্পৃক্ত থাকতে হয়। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি এখনো মানুষের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। কম্পিউটার কিছু কাজের ধাপ কমিয়ে আনলেও কাজের গুণগত মান উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে কর্মীর গভীর মনোযোগ প্রয়োজন এখনো। আর এ মনোনিবেশের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত দক্ষতা, যার ঘাটতি আছে বাংলাদেশের সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে স্নাতক ডিগ্রিধারী কর্মক্ষম কর্মীর মধ্যেও।
তথ্য ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশের স্নাতকদের উদ্দেশে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্নাতকদের আরো দক্ষতাসম্পন্ন হতে হবে। শিল্প ও সেবা খাতে কম্পিউটারনির্ভর নকশা তৈরিতে কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন (সিএডি) ব্যবস্থা ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কম্পিউটার নিউমেরিক্যাল কন্ট্রোল (সিএনসি) যন্ত্রের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে দক্ষ হতে হবে কর্মীদের।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রতিবেশী অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও প্রযুক্তিগত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা-সংক্রান্ত পরিবর্তন আসন্ন। আর স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবস্থার প্রয়োগ বাংলাদেশে কাজ ও দক্ষতার চাহিদায় বড় প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সমীক্ষার বরাত দিয়ে বিশ্বব্যাংক বলছে, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রভাবে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো বাংলাদেশেও প্রতি পাঁচটি কাজের তিনটি পূর্ণাঙ্গ বা আংশিকভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে, প্রযুক্তির ব্যবহার কর্মীকে স্থানচ্যুত করছে। এ পরিস্থিতি কর্মসংস্থান কমিয়ে প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলছে, এমনটা জোরালোভাবে বলার মতো গবেষণা এখনো হয়নি। তবে সোয়েটার শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে এবং শ্রমিকরাও কর্মচ্যুত হয়েছেন। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিবিপ্লব হয়েছে ধাপে ধাপে। এ ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখন প্রযুক্তি কাজের ক্ষেত্রে কর্মীকে রিপ্লেস করছে, তখন অন্যান্য কাজের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু সতর্ক হওয়ার বিষয় হলো, যখন এ ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়, তখন দক্ষতার প্রয়োজনও বেড়ে যায়। প্রযুক্তি বৃদ্ধির অনুপাতে যদি আমাদের দক্ষতার উন্নয়ন না হয়, তখন শ্রমিক কর্মচ্যুত হবে ঠিকই, কিন্তু তার জন্য বিকল্প কাজ সৃষ্টি হবে না। এ বিষয়টি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত মান বৃদ্ধির বিষয়ে নজর দিতে হবে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা