প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্মান করতে শিখুন

আপডেট: নভেম্বর ৯, ২০১৯, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

মো. ওসমান গনি


শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়। তা হলে যাঁরা শিক্ষা দান করেন, তাঁরা জাতির কী হবেন? নিশ্চয় উত্তর হবে, শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর, মানুষ গড়ার কারিগর, দেশ গড়ার কারিগর, শিক্ষা গড়ার কারিগর। কিন্তু সাদা চোখে দেখলে মনে হয়, শিক্ষকদের এসব উপমা শুধুই অন্তঃসারশূন্য। যে জাতি তাঁর শিক্ষকদের সম্মান করতে জানে না, যথাযথ মর্যাদা প্রদান করতে পারে না, ন্যায্য প্রাপ্যতা প্রদান করতে পারে না। সে জাতি পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে কি? সে জাতিই পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে মর্যাদার সাথে দাঁড়াতে পারে, যাঁরা তাঁদের শিক্ষকদের সম্মান করতে জানে, শিক্ষকদের ন্যায্য প্রাপ্যতা প্রদান করতে জানে।
গত ৫ অক্টোবর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিক্ষকেরা বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করেন। ইউনেস্কো এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে-‘তরুণ শিক্ষকেরাই পেশার ভবিষ্যত’। তরুণদের পক্ষেই শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব। প্রাচীন ধ্যান-ধারণা পরিবর্তন করে, আধুনিক শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যসূচির যুগোপযোগী পরিবর্তন করে শিক্ষার আধুনিকতা আনয়ন করতে পারলেই শিক্ষার উন্নয়ন হবে। কিšুÍ পরিতাপের বিষয় সারা বিশ্বে যখন শিক্ষকতা পেশায় তরুণদের আকর্ষণ করছে। তখন আমাদের দেশের তরুণেরা অন্যান্য পেশায় আকৃষ্ট। তার কারণও আছে আর তা হলো শিক্ষকতা পেশায় বাংলাদেশে বিশ্বের সাথে সংগতি রেখে মর্যাদা দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো হয়নি।
বিশ্বের অনেক দেশেই প্রথম মর্যাদাবান পেশা হচ্ছে শিক্ষকতা। আর্থিকভাবেও শিক্ষকেরা বেশি বেতন পান। ফলে তরুণ মেধাবীদের প্রথম পছন্দের চাকরি শিক্ষকতা। যেমন- ফিনল্যান্ডে উচ্চ শিক্ষা শেষ করা সবচেয়ে মেধাবীরা আসেন শিক্ষকতায়। সর্বোচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষক হতে হলে এক বছরের একটি কোর্স করতে হয়। সেখানে সবচেয়ে যাঁরা ভালো করেন তাঁরা সুযোগ পান প্রাথমিকে, এরপর মাধ্যমিকে, সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ব্রিটেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক এবং সোস্যাল রিসার্চের গত বছরের এক গবেষণায় দেখা যায়, চিনের ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্বাস করেন, শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এই গড় মাত্র ৩৫ শতাংশ। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, সিংগাপুর, চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ায় শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা অনেক ওপরে। আন্তর্জাতিকভাবে যে সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হয়, সেখানে এ সব দেশের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ভালো করছেন। তার প্রধান কারণ, মর্যাদা আছে বলে ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় এবং ধরে রাখাও সহজ হয় এসব দেশে।
তবে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত দেশেও তরুণদের কাছে পেশা হিসেবে শিক্ষকতা অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। এমনকি তরুণদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এ পেশা ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে। ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব টিচার্সের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়- যুক্তরাজ্যে বেশি কাজ ও কম বেতনের কারণে যাঁদের বয়স ৩৫ বছরের কম, তাঁদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষক আগামী ৫ বছরের মধ্যে শিক্ষকতা ছেড়ে দিতে পারেন। ইউনেস্কোর-২০১৯ সালের ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ৪১ শতাংশ চাকরিতে যোগ দেওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে পেশা পরিবর্তন করে।
আমাদের দেশে মর্যাদার দিক দিয়ে প্রাথমিকের শিক্ষকরা সবচেয়ে পিছিয়ে। সরকার যদিও প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দিয়েছে। তবে তাঁদের বেতনের দিক থেকে এখনো দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয় নি। পৃথিবীর সব দেশেই শিক্ষকদের স্থান সবার ওপরে অথচ আমাদের দেশের প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হলেও বেতন এক গ্রেড নিচে। বর্তমানে যাঁরা শিক্ষকতায় আসছেন তাঁরা সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। সরকারের উচিত হবে সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতদের দিকে লক্ষ্য রেখে। শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়ানো উচিত। তা হলে ভবিষ্যতে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা পরিবর্তন করবে না। আর যদি তাঁদের মর্যাদা বাড়ানো না হয়, তা হলে ভবিষ্যতে মেধাবীরা আর প্রাথমিক শিক্ষায় আসবেন না।
শিক্ষকদের নিজের যোগ্যতাও বাড়াতে হবে। শিক্ষায় বৈষম্য দূর করে এই পেশার মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। তা না হলে শিক্ষকতা পেশায় নবীনদের আগমন নিশ্চিত হবে না। একই যোগ্যতার অধিকারী অন্যান্য পেশায় কর্মরতদের চেয়ে বেতন- ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা কম হওয়ার কারণে ও শিক্ষকতা ছেড়েছেন অনেকেই। তবে যাঁরা মেধার চর্চা করতে পারবে, তাঁদেরই শিক্ষকতায় আসা উচিত। একজন শিক্ষককে তাঁর বিষয়ের আপডেট খবর রাখতে হবে। কিšুÍ সেই চিন্তা ধারার লোকের ঘাটতি রয়েছে আমাদের দেশে। কিভাবে সহজভাবে ওপরে ওঠা যায়, সেই চিন্তা বেশির ভাগ তরুণের। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষকতায় আসতে চায় না। এছাড়া মেধাবীদের শিক্ষকতায় টানতে আরেকটু সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। যাঁরা মেধার পরিশীলন করতে পারবে, তাঁদেরই শিক্ষকতায় আসা উচিত।
শিক্ষকদের বেতন এমন হওয়া উচিত যা সমাজে শিক্ষকতা পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদা তুলে ধরে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক শিক্ষকদের ১০ তম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের ১১ তম গ্রেডের একটি প্রস্তাবনা অর্থ-মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরবর্তীতে অর্থ-মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষকদের ১০ তম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের ১১ তম গ্রেডের প্রস্তাবনা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে দেয়। এর পর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা টানা চার দিন কর্ম বিরতির পর গত ২৩ অক্টোবর ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে মহাসমাবেশের ডাক দেয়।
গত ২৩ অক্টোবর রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মহাসমাবেশ সফল করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষকেরা একত্রিত হয়েছিল। কিন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পুলিশের বাঁধায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মহাসমাবেশ সফল করতে পারেনি। পুলিশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লাঠিচার্জ করে এবং শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশের মারমুখি আচরণ দেখে একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়েছিল। তখন বার বার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত কবিতার একটি পঙক্তি মনে পড়ে- ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করছে অপমান। অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান’! প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবী প্রধান শিক্ষকদের ১০তম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধাারণ করা। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা ঘোষণা করেন। কিন্ত আজ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার ১০তম গ্রেডে বেতন বাস্তবায়ন করা হয় নি।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ১১তম গ্রেডের দাবিতে অনশন শুরু করে। তখন সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জনাব মোস্তাফিজুর রহমান সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডের দাবী বাস্তবায়নের আশ্বাস প্রদান করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী শিক্ষকেরা অনশন স্থগিত করে। ২ বছর পার হওয়ার পরও সহকারী শিক্ষকদের দাবী ১১তম গ্রেডের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এছাড়া দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মোবাইল ফোনে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী voice message-এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনের বিষয়টি আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের ১০ মাস পার হয়ে গেলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন হয় নি।
আগামী ১৭ নভেম্বর থেকে ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু হবে এবং ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা হবে। এই অবস্থায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলন এক দিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎকন্ঠার সৃষ্টি করেছে। আগামী ১৩ নভেম্বরের মধ্যে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূরীকরণের আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। ১৩ নভেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সকল দাবী দাওয়া সরকার মেনে না নিলে আগামী ১৪ নভেম্বর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে শিক্ষকেরা।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের পুরোটাই হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সুযোগ্য কন্যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত দিয়ে। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের পূর্বেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সকল ন্যায্য দাবী দাওয়া মেনে নেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি কামনা করছি। যাঁরা মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে সুন্দর ও সুস্থভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
লেখক : সহকারী শিক্ষক, মচমইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাগমারা, রাজশাহী।