প্রাসঙ্গিক স্মৃতিচারণ : রাজশাহীর উন্নয়ন এবং এবারের মেয়র নির্বাচনের গুরুত্ব

আপডেট: জুলাই ৯, ২০১৮, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

ড. এএইচএম জেহাদুল করিম


বাংলাদেশের যে কয়টি বিভাগীয় শহর রয়েছে, তার মধ্যে রাজশাহীকে অনেকেই বেশ নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসাবে মনে করে থাকেন। কেননা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মত এখানে যানবাহনের ভীড় অপেক্ষাকৃত কম এবং সঙ্গত কারণেই রাজশাহীতে জনসংখ্যার চাপও সেই প্রেক্ষাপটে অনেকটাই কম। ২০১৫ সালে, বিভাগীয় শহরগুলোর উপর এক গবেষণায় যেখানে ঢাকাকে ১৪.৬ মিলিয়ন লোকের অধ্যুষিত এক নগরী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে একই সময়ে, রাজশাহীর জনসংখ্যা এক মিলিয়নেরও কম বলে উল্লেখ করা হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা উর্ধ্বগামী হবার কারণে, সমগ্র দেশেই প্রতি বছরই জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই চিত্র অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। জনসংখ্যা ঘনত্বের চাপে আমাদের বাংলাদেশ এখন বিপর্যস্ত এক দেশ বলে আমার ধারণা। সম্প্রতি আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত আমার কয়েকটি গবেষণা প্রবন্ধে, আামি এই বিষয়টি তুলে ধরেছি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের উপর এর বিরূপ প্রভাবকে সম্পর্কিত করেছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে এক সেমিনারে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে বলেছিলেন যে, ‘আমাদের দেশে যেভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে এতে এমন দিন আসতে পারে যখন দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটিতে উন্নীত হয়ে যেতে পারেÑ যা আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে গভীরভাবে ভালবাসতেন বলেই এই ধরনের শংকার কথা আমাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
যাই হোক, আজকের আলোচনা প্রসঙ্গ যেহেতু রাজশাহী, সুতরাং আমাদের আলোচনা সেদিকেই প্রবাহিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। রাজশাহীতে জনসংখ্যার চাপ অন্যান্য শহরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম হবার কারণে, কার্বন-নিঃসৃত কালো ধুয়ার অত্যাচারটাও এখানে অনেকটাই কম এবং সে কারণেই, রাজশাহী বসবাসের জন্য অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর এবং সামাজিকভাবে নিরাপদÑ সর্বোপরি পড়সভড়ৎঃধনষব। কিছুদিন আগে জর্মন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র-ছাত্রী, বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলো ঘুরে দেখতে এসেছিল এবং একজন গবেষক হিসেবে তাদের সাথে কথোপকথনের এক পর্যায়ে আমি জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে, রাজশাহীই তাদের সবচাইতে ভাল লেগেছে। এর কারণ হিসাবে তারা অল্প জনসংখ্যা এবং স্বাচ্ছন্দ জীবনের কথা উল্লেখ করেছে। আমি নিজে এবং আমাদের পরিবারের সকল সদস্যদেরই প্রিয় শহর রাজশাহী এবং একে আমরা গভীরভাবে ভালবাসি। তাই মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি গ্রহণ করে, স্বেচ্ছা-অবসর নিয়ে যখন এখানে চলে আসি, তখন আমরা রাজশাহীর জন্য মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
২০১০ সালে মালয়েশিয়ায় চলে আসবার পর, যতবার দেশে গেছি ততবারই প্রথম কয়েকটা দিন, আমরা রাজশাহীতে অবস্থান করেছি। কিসের যেন এক আকর্ষণ এবং সেই সাথে হড়ংঃধষমরধ আমাদের মাঝে এমনভাবে কাজ করে যে কিছুতেই রাজশাহী ছেড়ে থাকতে পারিনা; এই শহরের প্রতিটি মানুষ আমাদের পরিচিত এবং ভধপব ঃড় ভধপব ঢ়ৎরসধৎু মৎড়ঁঢ় এর সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির সুবাদে, জীবনের অনেকটা সময়ই রাজশাহীতে বসবাস করেছি; আমার ছেলেমেয়েরা এখানেই পড়াশুনা ও তাদের শৈশব কাটিয়েছে। বলাই বাহুল্য যে, শিক্ষা নগরী হিসাবে রাজশাহীর গুরুত্ব কখনই অস্বীকার করা যাবে না।
বলতে গেলে, উত্তরবঙ্গের প্রতি আমার একটি বিশেষ আকর্ষণের আরও একটি কারণ হলো এই যে আমার পিতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যজুয়েশন ডিগ্রি নেবার পর, তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কাস্টমস্ ও আবগরি বিভাগে চাকরি গ্রহণ করে উত্তরবঙ্গে ঢ়ড়ংঃবফ হয়েছিলেন এবং অতিমাত্রায় সৎ থাকবার কারণে, তাঁকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ফবষরপধঃব এবং অগম্য এলাকাগুলোতে বদলি করা হতো। অবশ্য শেষাবধি, তিনি কুষ্টিয়া ও রাজশাহীতে চাকরি করে গেছেন; আমি নিজেও কুষ্টিয়া কলেজের ছাত্র ছিলাম। আমার পিতা, রাজশাহীতে থাকবার সময়ে একা ছিলেন এবং তখন তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের সাথে মসজিদে নামাজ পড়তেন- এটিও তাঁর স্মৃতি। ড. শহীদুল্লাহ সাহেব তখন হেতেম খাঁ এলাকায় থাকতেন।
আজ দেশের বাইরে থেকে, দেশের কথা মনে করিÑ রাজশাহীর কথা বিশেষভাবেই মনে হয়। আমার ধারণা, আমরা চাইলে রাজশাহীকে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রদান করে এই নগরীকে বিশেষ এক অনন্য শিক্ষা নগরী হিসাবে এবং একটি সড়ফবষ পরঃু হিসাবে গড়ে তুলতে পারি। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিভাজনকে উপেক্ষা করে, রাজশাহীর উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারি। ২০১২ সালে আমি যখন রাজশাহী যাই, তখন এর ব্যতিক্রমি পরিবর্তনে আমি গর্বিত হয়েছিলাম। রাস্তাঘাটগুলো বড় হয়েছেÑ উন্নয়নের ছোঁয়ায়, প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপড়ে ফেলা হয়নি। তৎকালীন মেয়র জনাব এএইচএম. খায়রুজ্জামান লিটন সাহেবের কাছে এই উন্নয়নের জন্য আমরা তাই বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। ২০১৩ সালে যদি তিনি পুননির্বাচিত হতেন, রাজশাহীর প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন এতদিনে অনেকটাই এগিয়ে যেত। জাতীয় উন্নয়নের ডিজিটাল মডেলের সাথে সম্পৃক্ত করে তাই আমরা রাজশাহীকে একটি বিশেষ সড়ফবষ পরঃু হিসাবে রূপান্তরিত করতে চাই এবং এর উন্নয়নে আমরা সকলে এক হয়ে কাজ করতে চাই। সেই প্রেক্ষাপটে, এবারের মেয়র নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(প্রফেসর ড. এ.এইচ.এম. জেহাদুল করিম প্রায় ৪০ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। বর্তমানে ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ওংষধসরপ টহরাবৎংরঃু গধষধুংরধ (ওওটগ) এর সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের প্রফেসর।