ফারাক্কা দিবস আজ || ভারতের সঙ্গে চুক্তির দ্বিগুন পানি এখন পদ্মায় || শুকনো মৌসুমে এবার ভরা পদ্মা: আগাম বন্যার পূর্বাভাস

আপডেট: মে ১৬, ২০১৯, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী


বহু বছর পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানিতে থৈ থৈ অবস্থা-সোনার দেশ

আজ ১৬ মে ফারাক্কা দিবস। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তির ২২ বছরপূর্তি। প্রতিবছর এই সময়ে শুকনো মৌসুমে পাকশী পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টসহ পদ্মা নদীতে তীব্র পানি সংকট থাকলেও এবার অস্বাভাবিকভাবে পদ্মা নদীতে পানি বেড়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চল পানি বিভাগের পরিমাপক বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই পানি বৃদ্ধি ঈশ্বরদীসহ উত্তর জনপদে আগাম বন্যার পূর্বাভাসেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা গতকাল বুধবার পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫৮ মিটার পরিমাপ করা হয়েছে যা বছরের এই সময়ে এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
প্রতিবছর এই সময়ে ‘পদ্মা শুকিয়ে খাল’ কিংবা ‘চুক্তি অনুযায়ী পানি মিলছেনা’-শিরোনামে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে রিপোর্ট হলেও এবারের পদ্মার চিত্রটা অন্যরকম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর এই সময়ে পদ্মায় পানির প্রবাহ থাকার কথা সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার এবং সর্বনিম্ন ১৫ হাজার কিউসেক। অথচ এখন পদ্মায় পানির প্রবাহ রয়েছে প্রায় ৮০ হাজার কিউসেক। গতকাল বুধবার ৭৯ হাজার কিউসেক পানি পাওয়া গেছে পাকশী পদ্মায়, যা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি পানি প্রবাহের রেকর্ড। এর আগে গত শনিবার (১১ মে) দুপুরে ৭৪ হাজার ১৫০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়া গেছে পাকশী পদ্মায়। গত একমাসের হিসাব অনুযায়ী এই শুকনো মওসুমে যেখানে চুক্তির সম পরিমান ৩৫ হাজার কিউসেক পানিই পাওয়া যেতনা, সেখানে পাকশীর পদ্মা নদীতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে এবছর শুস্ক মৌসুমেই ৫০ থেকে ৮০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানির পরিমাপ ওঠানামা করছে। উত্তরাঞ্চল পানি বিভাগের পরিমাপক ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী কেএম জহুরুল হক জানান, এবছরই প্রথম খরা মৌসুমে পদ্মা নদীতে প্রায় দ্বিগুনেরও বেশি পরিমান পানি পাওয়া যাচ্ছে। তবে অতিমাত্রা ও অস্বাভাবিকভাবে পদ্মা নদীতে এই পানি বৃদ্ধিকে তিনি আগাম বন্যার পূর্বাভাস বলেও মন্তব্য করেছেন।
পানি চুক্তির এত বছর পদ্মা নদীতে চুক্তির পানি দিয়ে চাহিদার অর্ধেকই পূরণ হতো না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পদ্মাসহ সকল শাখা নদী এখন মৃতপ্রায়। ফলে বছরের পর বছর ধরে হুমকীর মুখে পড়ে আছে পদ্মার দুই পাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র। সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় পাশ হয়েছে স্থলসীমান্ত চুক্তি বিল। এ নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছেন এ অঞ্চলের মানুষ। এখন গঙ্গা পানি চুক্তি রিভিউ করে তা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষক ও পরিবেশবিদরা। তবে পাউবো’র দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন এবছর উজানে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় পদ্মা নদীতে পানি বেড়েছে।
সংশ্লি¬¬¬ষ্ট সুত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে মরুময়তার হাত থেকে রক্ষার জন্য ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০ বছরের পানি চুক্তি হয়। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড় ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হায়দ্রাবাদ হাউজে ঐতিহাসিক ৩০ শালা পানি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশকে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দেওয়ার কথা ছিল।
দু’দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দু’একবার বাদে বেশিরভাগ সময়ই বাংলাদেশ পানি পেয়েছে কম। পানির অভাবে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতুর নিচে জেগে ওঠে বিশাল চর। পানি শূণ্যতার কারণে চাষাবাদসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মরুময়তা দেখা দেয়। পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি কমতে কমতে পদ্মা অনেকটা খালের আকার ধারণ করে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১৫টি পিলারের মধ্যে দশটি পিলারের নিচে পানি পাওয়া যেতনা। পদ্মার শাখা উপশাখা নদীগুলোর অবস্থা দাঁড়ায় মরনদশায়। এ অবস্থার বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমিশনের (জেআরসি) ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের দাবি চুক্তি অনুযায়ী এবছর বেশি পানি পাচ্ছে বাংলাদেশ। এই সময়ে পাকশী পদ্মা নদীতে যেখানে ৩৫ হাজার কিউসেকের বেশি পানির প্রবাহ থাকার কথা নয় সেখানে সর্বশেষ গতকাল বুধবার পদ্মায় পানির প্রবাহ ছিল ৭৯ হাজার কিউসেক।
দেশের বৃহত্তম ভেড়ামারা গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের আওতায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার একর জমিতে সেচ সরবরাহ করার কথা থাকলেও পানির অভাবে গত বছর মাত্র ১’লাখ ১৬ হাজার একর জমিতে সেচ সরবরাহ করা হয়েছিল। পানি বৃদ্ধির কারণে এবছর এই প্রকল্প সচল আছে এবং স্বাভাবিকভাবেই চলছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।
নদী গবেষক ও বিশ্লেষক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, এবছর ব্যাতিক্রমী হলেও বেশিরভাগ সময়ই চুক্তি অনুযায়ী পানি পাওয়া যায়নি। শুকনো মৌসুমে ঈশ্বরদীর পাকশী হার্ডিঞ্জ সেতুর উজান ও ভাটিতে পদ্মার পানির স্তুর নেমে যাওয়ায় এ অঞ্চলে দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট। এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা পরিণত হয়েছে ছোট নদীতে। মৃত্যু ঘন্টা বেজেছে এই অঞ্চলের সুতা নদী, কমলা নদী, ইছামতি নদী ও পদ্মা ছাড়াও আরও অন্তত ১৭টি নদীর।
তিনি আরো বলেন, চুক্তি হয়েছিল সেই ২২ বছর আগে। এর মধ্যে জলবায়ুর পরিবর্তন হয়েছে, পানির চাহিদা বেড়েছে, অনেক কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। তাই পদ্মাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ও এ অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে গঙ্গা পানি চুক্তি রিভিউ করতে হবে। তাহলে আমরা পদ্মাপাড়ের মানুষ স্বস্তি পাবো।
পরিবেশবিদ ও সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর শাহনেওয়াজ সালাম বলেন, পদ্মায় পানি স্বল্পতায় মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পদ্মা সংশ্লিষ্ট এলাকা। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলটা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র আজ হুমকীর মুখে। এসব থেকে রক্ষা পেতে আমার মনে হয় নতুন করে গঙ্গা পানি চুক্তি হওয়া দরকার।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় পরিমাপ বিভাগ পাবনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী কেএম জহুরুল হক গতকাল বুধবার এসব বিষয়ে বলেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দেওয়ার কথা। সে অনুযায়ী বর্তমানে আমরা বেশি পানি পাচ্ছি। তিনি জানান, গত ২০১৬ সালে পদ্মায় এই সময়ে পানি পাওয়া গিয়েছিল ১৫ হাজার ৩০০ কিউসেক, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে পানির প্রবাহ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল কিন্তু এবছর পদ্মায় পানি প্রবাহ দ্বিগুন হওয়া দেখে আমরাও অবাক হয়েছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ