ফিরে এল রহস্যময় মার্কিন বিমান

আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০১৯, ১:০২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে মার্কিন বিমান বাহিনীর অত্যন্ত গোপনীয় মহাকাশ বিমান এক্স-৩৭বি। চালকবিহীন এই বিমান পৃথিবীকে এবার ৭৮০ দিন প্রদক্ষিণ করার পর গত রোববার ফ্লোরিডার মাটি স্পর্শ করে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। শুধু তাই নয়, এক্স-৩৭বি সবচেয়ে দীর্ঘসময় মহাকাশে থাকার রেকর্ড গড়েছে।
বিমানটিকে কেন বার বার পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয়, মহাকাশ যাত্রায় কি ধরনের মালামাল বহন করে বা পৃথিবীর কক্ষে দীর্ঘ অবস্থানকালে এটি কী ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় সেটি কেউ জানে না। একমাত্র মার্কিন কর্তৃপক্ষই জানে। মার্কিন বিমান বাহিনী যেসব গোপন মিশন পরিচালনা করে এ বিমানটি তারই অংশ।
পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মহাকাশ বিমানটিকে ২০১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পঞ্চমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদী মিশনে পাঠানো হয়েছিল। মিশন শেষে গত রোববার ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টারে সফল অবতরণ করেছে। মার্কিন বিমান বাহিনীর হাতে এ ধরনের দুটি বিমান রয়েছে। যা নির্মাণ করেছে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান বোয়িং।
২০১০ সালে প্রথমবার ২৭০ দিন পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থানের জন্য এক্স-৩৭বি বিমান ডিজাইন করা হয়েছিল। আর এখন প্রায় এক দশক পরে চালকবিহীন এই বিমান পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করে ফেলেছে ২৮০০ দিনেরও বেশি। সাধারণত মার্কিন বিমান বাহিনী প্রযুক্তিগত অর্জন হিসেবে বিশেষ সব বিমান সম্পর্কে কথা বলতে দ্বিধা বোধ করে না। কিন্তু এই মিশনের বেলায় তারা একেবারেই চুপ! ফলে গুজবের ডালপালা বেড়েই চলেছে। অনেকে মনে করেন, এটি মহাকাশ থেকে বোমা ছোড়ার জন্য সেখানে পাঠানো হয়েছে, যাতে মুহূর্তের নির্দেশে পৃথিবীর কোনো বস্তুর ওপর আঘাত হানতে পারে। অনেকে আবার একে ‘কিলার স্যাটেলাইট’ বলেন, যা শত্রুর কৃত্রিম উপগ্রহকে ধ্বংস করতে বা ক্ষতি করতে পারে। কেউ ভাবেন, এটা গোয়েন্দা প্লেন, যাতে শত্রু এলাকার ওপর নজরদারি করা যায়।
যা হোক, এক্স-৩৭বি মহাকাশযান বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীর কক্ষপথে যা করছে তা রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে এবং সামান্য যা প্রকাশ পেয়েছে তা বিতর্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে।
মার্কিন বিমান বাহিনী সাম্প্রতিক এক বিবৃতি দাবী করেছে, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযানের প্রযুক্তির জন্য ‘ঝুঁকি হ্রাস, পরীক্ষা এবং পরিচালনার ধারণা’ নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যেই এই মিশন। আগের মিশনগুলোর বিবৃতিতে নেভিগেশন এবং কন্ট্রোল, থার্মাল প্রটেকশন সিস্টেম, এভায়োনিক্স, অ্যাডভান্সড প্রোপালশন সিস্টেম, রিএন্ট্রি এবং ল্যান্ডিং বিষয়গুলো ছিল।
মার্কিন এয়ারফোর্স ক্যাপাবিলিটিস ডিরেক্টর র‌্যানডি ওয়াল্ডেন বলেন, ‘এই মিশন পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মহাকাশ যানের দীর্ঘ সক্ষমতার পাশাপাশি ছোট ছোট উপগ্রহ স্থাপনে মহাকাশ গবেষণায় বিমান বাহিনীর দক্ষতা প্রমাণ করেছে।’
এদিকে হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রো ফিজিক্সের অ্যাস্ট্রোনমার জোনাথন ম্যাকডোয়েল এক টুইটে বলেছেন, ‘মার্কিন বিমান বাহিনী এক্স-৩৭বি ফ্লাইটের মাধ্যমে ছোট ছোট উপগ্রহ স্থাপন করেছে এই বিবৃতি উদ্বেগজনক, কারণ উপগ্রহ নিবন্ধন বিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই উপগ্রহগুলো মোতায়নের কথা উল্লেখ করেনি। এটিই প্রথমবার হতে পারে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া উভয়ই এই কনভেনশনের বিরোধিতা করেছে।’
পৃথিবীর বাইরে উপগ্রহ পাঠানোর ক্ষেত্রে ১৯৬২ সাল থেকে জাতিসংঘের কনভেনশন চালু রয়েছে, যেন মহাকাশে কোন দেশ কোন স্থানটির জন্য দায়বদ্ধ থাকবে, তার ওপর নজর রাখা যায়। ম্যাকডোয়েল তার গবেষণায় দেখেছেন যে, ৯০ শতাংশেরও বেশি উপগ্রহ জাতিসংঘে নিবন্ধভুক্ত রয়েছে এবং এই নিবন্ধন সাধারণত লঞ্চ করার এক বা দুই বছরের মধ্যে করা হয়। নিবন্ধনবিহীন যেসব উপগ্রহ রয়েছে তার এক তৃতীয়াংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।
ম্যাকডোয়েল বলেন, মার্কিন সরকার এই নতুন উপগ্রহগুলো এখনো নিবন্ধন করেনি এটা হতে পারে। কিন্তু এটাও হতে পারে যে নিবন্ধনবিহীন উপগ্রহগুলো নিয়ে স্বচ্ছতার বিষয় রয়েছে এবং সেগুলো গোপন রাখছে। এর স্বপক্ষে তিনি যুক্তি দেখান, ‘অতি গোপনীয় বিষয় আন্তর্জাতিক আইন এবং চুক্তিকে বোঝায় না’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর কক্ষপথটি আরো সহজ ও ব্যস্ত হয়ে উঠার সাথে সাথে মহাকাশে নিয়ন্ত্রণ সন্দেহাতীতভাবে একটি বিশাল লড়াই হিসেবে পরিণত হবে। আমাদের গ্রহের চারপাশে কেবল মহাকাশ বর্জ্য উড়ে যাওয়ার ভয়ই নয়, গোপন সামরিকীকরণের সমস্যাও রয়েছে। মার্কিন বিমান বাহিনীর মহাকাশ বিমান এক্স-৩৭বি এর পরবর্তী মিশন আগামী বছর হতে পারে এবং সেটি যে আরো বেশি দিনের জন্য হবে তা সহজেই অনুমেয়।