বই উৎসব এবং সার্বজনিন শিক্ষা

আপডেট: জানুয়ারি ১০, ২০১৮, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ইংরেজি নববর্ষের দিন অনুষ্ঠিত হলো বই উৎসব। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে যোগ হলো আরেকটি পার্বণ। যে কোনো উৎসবে মাতুয়ারা বাঙালি জীবনে বই উৎসবটাও নতুনভাবে যোগ করলো আরেকটি আমেজ। বই উৎসবটি শুধু মাত্র শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে সীমাবদ্ধ না। এই উৎসবের বিস্তৃতি ঘটেছে স্কুল কমিটি অভিভাবক এবং গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে। বই বিতরণের জন্য ১ জানুয়ারি একটি প্রতিক্ষিত দিন হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের কাছে। এই দিনটিতে বিশেষ করে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মাঠটির দৃশ্যপট নতুন এক আমেজে মেতে উঠে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী স্কুল কমিটির সদস্য, গ্রামের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে স্কুল মাঠে, নতুন বই পাওয়ার আনন্দে মেতে ওঠে যেমন শিক্ষার্থীরাÑ আর সেই আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়ে সারা গায়ে। শুধু গ্রামে নয়, এই বই উৎসবটি সারা দেশের ছোট বড় শহরসহ মহানগরগুলি এবং রাজধানীতেও অনুষ্ঠিত হয়। তবে গ্রামের উৎসবটা চোখে পড়ার মত। অনেকটা নবান্নের প্রাপ্তির মতো শিক্ষার্থীদের বই পাওয়ার বিষয়টা। বর্তমান সরকারের এই বিতরণ উৎসবটা সার্বজনিনতা পেতে শুরু করেছে। সরকার কর্তৃক জাতীয় শিক্ষা টেক্সট বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত কারিকুলামে মুদ্রিত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য তৈরি সকল বই সরকারি বেসরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে সরবরাহ করা হয়। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত দিন ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে।
নিয়মানুসারে প্রাথমিক শিক্ষার সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্যবই সকল প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম অনুসারে শিক্ষণ পদ্ধতি একই ধরনের কিন্তু তারপরও বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটু ভিন্নতা দেখা যায়। মূলত এই ভিন্নতাটা কৌশলগত বাহ্যিক একটা আবরণ যে আবরণের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহ শিক্ষা ব্যবসার পসরা সাজিয়ে বসেছে। শিক্ষা নীতির নিয়মানুসারে যার শিক্ষার মান এক। তাই কায়দা করে উন্নত মানের শিক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উচ্চহারে শিক্ষার মূল্য নেয়া হয়। তাই প্রশ্ন জাগে, একই পাঠ্যপুস্তক, একই সিলেবাস এবং কারিকুলাম থাকা অবস্থায় কেন বাণিজ্যকরণ করে মুনাফা অর্জনের বিষয়টি সৃষ্টি হলো? সরকার দেশের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বছরের শুরুতে বই প্রদান করতে পারলেও সকল প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান মনিটরিং করতে পারে না। তাই প্রাথমিক শিক্ষাটা ব্যাবসায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা সার্বজনিন এবং বাধ্যতামূলক। সরকার দেশের সকল ৫-১২ বছর বয়সি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করতে বাধ্য। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে বাণিজ্যিকীকরণ করে মুনাফা অর্জনের পথগুলো সৃষ্টি হলো কেন? প্রাথমিক শিক্ষাটা সার্বজনিন এবং একই ধরনের হওয়ার কথা, তা না হয়ে প্রাথমিক শিক্ষাটাও বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত হয়ে গেল? এর জন্য দায়ী কারা?
দেশে এখন বাণিজ্যিকভাবে মুনাফা অর্জনের জন্য কিছু প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে- যাদের প্রধান কার্যালয় ঢাকা, টাঙ্গাইল বা দেশের অন্য কোনো জায়গায়। আর এদের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে কানাচে। এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে অসংখ্য কিন্ডারগার্ডেন বা ইসলামী ক্যাডেট নামের কিছু প্রতিষ্ঠান। বাণিজ্য করার জন্য লাভজনকভাবে গড়ে ওঠা প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিও নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। উল্লিখিত বাণিজ্যিকভাবে গড়া ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরতদের চাইতে বেশি। কম বেশি যাই হোক- সাধারণ মানুষের সাধারণ বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান ভালো। তা যদি না হয় তাহলে কেন মানুষ শিশুদের শিক্ষার গুণগত মান বেশি পাওয়ার আশায় ছুটছে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে? বাস্তবে দেখা যায়, সরকারি এবং বাণিজ্যিকভাবে গড়া ওঠা প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মরত শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষক রয়েছেন যারা এখনও ছাত্রত্ব শেষ করেনি। এরা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া, এদের অনেকেরই মৌলিক প্রশিক্ষণ নেই। অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরতদের মাঝে দেখা যায়, যারা গত ১০ বছরের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের বেশির ভাগই ¯œাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তাছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষকই সিইনএড ডিগ্রিপ্রাপ্ত। এই ডিগ্রিটা পেয়ে থাকেন শিক্ষকরা প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষণ প্রদানের পদ্ধতির ওপর দু বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে। বাণিজ্যিকভাবে গড়া ওঠা প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ কতটুকু আছে? তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না কোনো সময় এই কারণে যে, এদের প্রদান করা শিক্ষার মান প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর চেয়ে ভালো। আর ভালো বলার পেছনে কারণ একটাই অভিভাবকরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সন্তান পাঠিয়ে গুনগত শিক্ষা পাবেন না। তাই তারা অর্থ ব্যয় করে বাণিজ্যিকভাবে গড়া ওঠা প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করাচ্ছেন। দেশের অনেক কিন্ডার গার্টেন নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যে গুলোর অধিকাংশ শিক্ষকই পার্টটাইম শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। অপরদিকে, সার্বক্ষণিক চাকরি হিসাবে কাজ করছেন দেশের প্রাথমিক শিক্ষকরা। সরকার প্রাথমিক শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্য, প্রতিটি উপজেলায় এবং মহানগরীতে থানা অনুসারে ক্লাস্টার ভিত্তিক এলাকা ভাগ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তারপরও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকরা বেসরকারি বা বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছেন আর এই হেরে যাওয়ার কারণে প্রাথমিক শিক্ষাটা বিভাজিত হয়ে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়ে পড়ছে। প্রাথমিক শিক্ষার এই বিভাজনটা কি জাতির জন্য হিতকর? দেশের সাধারণ মানুষ কেন প্রাথমিক শিক্ষকরা যে গুণগত উচ্চমানের শিক্ষা প্রদান করতে পারে সেই বিষয়ের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না? এই প্রশ্নের সদুত্তরটা কী বা সরকারি শিক্ষা বিভাগের কোনো কর্তৃপক্ষ দিবে? সরকারের শিক্ষা সংক্রান্ত বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা কী বিষয়টি কোনো দিন ভেবে দেখেছেন? জনগণের নিকট থেকে সংগ্রহ করা রাজস্বের কোটি কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যয়িত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার পেছনে আর দেশের মানুষ প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগছে। তাছাড়া দিন দিন প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। গুণগত মানের বিষয়ে প্রশ্ন থাকার কারণে অভিভাবকরা মুনাফাখোরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করাচ্ছেন। প্রতি বছর জানুয়ারি মাস আসলেই সন্তানকে কোথায় ভর্তি করাবেন তা নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বিগ্নতার সৃষ্টি হয়। দেশের শিক্ষা নীতিতে বর্ণিত প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কীয় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করলে বলা যায়, এমনটি হওয়ার কথা নয়। তারপরও একটি শিশুকে নানা ধরনের ভর্তি যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। দেশের সরকারি বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিদের কতজনের সন্তান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েন। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্মরত শিক্ষকদের সন্তানরাও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েন না। এই রকম ঘটনা থেকে একটি গল্প মনে পড়ল, এক খাবার দোকানের মালিক দুপুর বেলা কর্মচারীকে ডেকে বললের, আমি খেতে যাচ্ছি তুই ক্যাশ বাক্সের দিকে খেয়াল রাখিস। এই কথার অর্থ হলো খাবার দোকানের মালিকও জানেন তার দোকানের খাবার ভালো না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মরত শিক্ষকরা যখন গুণগত মানের প্রশ্নে নিজ সন্তানকে তার বিদ্যালয়ে পড়ান নাÑ তখন কী করে সাধারণ মানুষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার ওপর আস্থা রাখবেন। দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনিন এবং গুণগতমান ভালো করার লক্ষে সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের সন্তানদের ভর্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাছাড়া সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগকারী সকল স্তরের সরকারি কর্মীদের সন্তানকেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা দরকার। দেশের শিক্ষানীতির দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার শিরোনামে বলা হয়েছে অনান্য গ্রহণযোগ্য উপায়ের সাহায্যে ছবি, রং মডেল, গল্প ছড়া কবিতার মাধ্যমে শিক্ষা দান পদ্ধতি চালু করা। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যমটি বাংলা- কথাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও বলা হয়েছে, দেশজ আবহ এর মাধ্যমে শিক্ষণ পদ্ধতির কথা। মূল বিষয়টি হচ্ছে, এদেশের সংস্কৃতির পরিম-লের প্রভাবে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতিটি পরিচালিত হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরের ভাষা হবে বাংলা এবং প্রযোজ্য বিশেষ অঞ্চলে বাংলাদেশি অদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা। এই শিক্ষা নীতির সাথে দেশে চলমান শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষা নীতিতে বলা আছে, প্রাক প্রাথমিক স্তরের পরবর্তী হবে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণি। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রাক প্রাথমিক স্তরে রয়েছে তিনটি শ্রেণি প্লে, কেজি, নার্সারি। এই বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সরকারিভাবে প্রাক প্রাথমিক স্তরের জন্য নির্ধারিত পাঠ্যবই এর বাইরে নিজেদের ইচ্ছা মাফিক পাঠ্যপুস্তক এবং সিলেবাস তৈরি করে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা এবং সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়। তাছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাক প্রাথমিক স্তরে উর্দু, আরবি ভাষা শেখানো হয়। প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার উপকরণ এবং পদ্ধতি সর্বক্ষেত্রে এক অভিন্ন হওয়া প্রয়োজন।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনিন করতে হলো বহুধাবিভক্ত শিক্ষার পাঠক্রমকে বাতিল করতে হবে। শুধু বই উৎসব সার্বজনিন হলে হবে না। সার্বজনিন প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দেশের সকল প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের এক ধরনের নিয়মনীতি চালু করা দরকার।
লেখক:- কলামিস্ট