বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা’ই পারেন

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০১৮, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

এম মতিউর রহমান মামুন


বেশ কিছুদিন ধরে দেশে চাকরি ক্ষেত্রে কোটাসংস্কার বা কোটাবিরোধী আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারিদের চাওয়া চাকরি ক্ষেত্রে কোটা সংস্করণ। ধরেই নিলাম তাঁদের চাওয়া বিবেচনা করে সরকার কোটা পদ্ধতি বাতিল করলো কিন্তু কিছুদিন পর যদি মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, উপজাতি, আরও যাঁরা কোটার আওতায় আছে তারা এমন আন্দোলনে আসেন তখন সরকার কী করবে? সঙ্গত কারণে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগতে পরে। তার জন্য আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি কারও কাম্য নয়। আর এমন আন্দোলন করে শেখ হাসিনার সরকারের কাছে চাওয়া পূরণ হবে বলে মনে হয় না। কেননা কোটা সংস্কার যৌক্তিক হলেও এ আন্দোলন শুরুর পর থেকেই যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের লক্ষণ দেখা যায় নি। সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ডাক, রাস্তা অবরোধ, রেল ট্র্যাক বিচ্ছিন্ন করাসহ উপাচার্যের বাড়িতে হামলা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন হতে পারে না। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারকে বে-কায়দায় ফেলার ঈঙ্গিত সুস্পষ্ট মনে করছেন সুশীল সমাজ। কেননা সিঙ্গাপুরভিত্তিক গণমাধ্যম টাইম অব এশিয়া’র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ” সিঙ্গাপুরে বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবীর, যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতা মালেক, জামায়াত নেতা রেজাউল করিম ও আইএসআইয়ের ব্রিগেডিয়ার আশফাকের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারেক রহমান ও আইএসআই-এর দুই কর্মকর্তা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চক্রান্ত করে”। খবর টা যদি সত্য হয় তাহলে তা হবে আমাদের জন্য অশনিসংকেত এবং তার সত্যতা যাচাই জরুবি তো বটেই। প্রতিবেদনে বিস্ময় প্রকাশ করে বলা হয়েছে “পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আরও আগেই বাংলাদেশে উগ্রবাদী কর্মকা-ের জন্য নারী জিহাদি রিক্রুটের পরামর্শ দিয়েছিল- যারা সব ধরনের কর্মকা-ের জন্য প্রস্তুত। এতে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রী সংস্থা ও জেএমবি নারীদের রিক্রুট করা শুরু করে”। তাতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে “ইডেন কলেজ ছাত্রী সংস্থার সভাপতি লুৎফুন্নাহার লুমাকে পরিকল্পনায় যুক্ত অন্যতম বলে উল্লেখ করে বলা হয়, সে এতটাই আগ্রাসী যে নিজের জীবন উৎসর্গ করার ঘোষণা দিয়েছে। লুমার মত সিদরাতুল মুনতাহা কাশফি, লুবনা পারভিন হানা, ফাতিমা তাহসিন, নিশাদ সুলতানা সাকি ও লুবনা একই রকম উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী বলে উল্লেখ করা হয়েছে “। এ আন্দোলনে ছাত্রী সংস্থার অন্তত ২৫ জন জিহাদি সম্পৃক্ত আছে বলে উল্লেখ করে বলা হয় তাদের মধ্যে ১০ জনই চরম উগ্রবাদী।
ভবিষ্যতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করে পুরো পরিকল্পনা জানতে নূরু, লুমা এবং টাকার জন্য পরিকল্পনায় যুক্ত হওয়া উম্মে হাবিবা ও মৌসুমী মৌকেও গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা জাতীয় স্বার্থে অতীব প্রয়োজন বলে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অন্যথায় বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি তৈরি হবে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়”। এই যদি হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়বস্তু তাহলে দেশবাসী তা গ্রহণ করবে কী করে? তাহলে কি আন্দোলনের নামে জঙ্গিবাদকে পূঁজি করে সরকার পতনের পাঁয়তারা চলছে? লক্ষণীয় বিষয় তারা দেশে থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল কখনো চায়নি। ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন জঙ্গিবাদের বিপক্ষে শক্ত আবস্থান নিলেন এবং জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেন, জঙ্গিবাদ নির্মূল শুরু হল তখনও দেখেছি এক শ্রেণির সংগঠনের ব্যানারে অভিযানের সমালোচলা করা হয়েছিল। শুধু জঙ্গিরাই মরছে কিন্তু পুলিশ মরছে না কেন? এগুলো সাজানো নাটক ইত্যাদি। হলিআর্টিসান ও শোলাকিয়াতে যখন আমাদের দেশের গর্বিত পুলিশ সদস্যরা যখন প্রাণ দিয়ে কয়েক লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলিমকে বাঁচালেন, হলিআর্টিসানের জঙ্গিদের হামলাম পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ দিলেন তাতে তাঁরা আফসোস করেন নি।
আমাদের জানা আছে, জামায়াত- বিএনপি জোট আমলে ২০০৩-০৪ সালে যাদের প্রকাশ্য মদদে দেশের উত্তরাঞ্চেলে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছিলো- তাঁরা খালেদা -নিজামী সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। খালেদা সরকার যদি তখন জঙ্গিবাদ দমন করতেন তাহলে হলিআর্টসান, শোলাকিয়ার মত হাজার ঘটনা থেকে দেশ রক্ষা পেত।
বরং খালেদা সরকারের মন্ত্রীদের প্রকাশ্য সহয়োগিতায় দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হলো, অথচ তাদের বিপক্ষে তখন কথা বলার সাহস কারো ছিল না। তৎকালীন নওগাঁর আওয়ামীলীগ নেতা ইসরাফিল আলম তাঁর নির্বাচনী এলাকায় জঙ্গিবাদের বিপক্ষে কথা বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবীরের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। আমরা জোট সরকারকে দেখেছি জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে আর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকারকে দেখছি জঙ্গিবাদ, মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। পরিস্কার বলা যেতে পারে, একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যাই পারেন জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও মাদকমুক্ত দেশ গড়তে, আর কেউ নন। এসব কাজে তাঁকে বাঁধাগ্রস্ত করা হয়েছে কিন্তু লাভ হয়নি কারণ তিনি সাধারণ মানুষের প্রয়োজন বুঝেন এবং তা করেন। বঙ্গবন্ধু পেরেছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে মুক্ত করতে, আর তাঁর কন্যাও পারবেন জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদকমুক্ত দেশ গড়তে। তাঁর উপর আমাদের সেই বিশ্বাস বা আস্থা রাখা দরকার।
জঙ্গিবাদী সমস্যা আমাদের একার নয়, সারা বিশ্বের। আমাদের দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে ২০০৩ সালে জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে। ২০০৪ সালে শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে আত্রাই বাণীনগর, মান্দা, রাজশাহীর বাগমারা, নাটোরের নলডাঙ্গায় হত্যাযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে। পরের বছর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একযোগে ৬৩ জেলায় শ’পাঁচেক বোমা ফাটিয়ে তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়।
২০০৪ সালের জঙ্গিবাদের উত্থান জামাত- বিএন,পির প্রকাশ্য মদদে তা সবার ভালো করেই জানা আছে। বংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি বলে তৎকালিন সরকার জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা ব্যাখ্যা করার নিষ্প্রয়োজন। প্রশ্ন আসে, তারা যদি জঙ্গিবাদ না চান তখন তারা দমন করলেন না কেন? খালেদা-নিজামী সরকার পুলিশি পাহারায় উত্তরবঙ্গে জঙ্গিবাদের আস্তানা প্রতিষ্ঠা করেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই । বঙ্গবন্ধু কন্যা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গিরাদ নির্মূলে বার বার তাগিদও দিয়েছেন। শেখ হাসিনা মহুমাত্রিক সন্ত্রাস মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহবান জানিয়েছিলেন। সেই লক্ষে তিনি রেডিসন হোটেলে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৭ টি দেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রধানদের সম্মেলনে সংশয় প্রকাশ করে বলেছিলেন ‘ বিশ্ব যে আজ বহুমাত্রিক সন্ত্রাসীর হুমকির সম্মুখিন তা কোনো দেশের পক্ষে এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ‘দ্য ফিউচার চ্যালেন্সস অ্যান্ড অপরচুনিটি ফর সিকিউরিটি কো-অপারেশন’Ñ এই প্রতিপাদ্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ড এবং বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের যৌথ আয়োজনের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন ‘ বিশ্ব আজ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশে দেশে উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠির উত্থান ঘটছে। এসব জঙ্গিগোষ্ঠি সাধারণ মানুষের জানমালের পাশাপাশি বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি স্বরূপ’ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সেই সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা পর আল- কায়েদা নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের নতুন শাখা খোলার ঘোষণা দিয়ে ৫৫ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছিলেন। তাতে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারতের কিছু অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছিলো। খবরটা বিশ্ব মিডিযায় প্রচারের পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে যথাযথ সতর্কতা জারি করেছিলেন। পরের দিন ৪ সেপ্টেস্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে দৈনিক প্রথম আলো’র অনলাইন ডেস্কে ‘আল-কায়েদার নিশানায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে খবরটা প্রকাশিত হলে সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের পর অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও জঙ্গিবাদ দমনে যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ২০০৯ সালে জঙ্গি দমন ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত ১৭ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় কমিটি গঠন ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিষিদ্ধ ঘোষিত সব সন্ত্রাসীদলকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা, ২০০৯ সন্ত্রাস বিরোধী আইন প্রণয়ন এবং ২০১২ সালে সন্ত্রাসবাদ বিস্তারে অর্থের জোগান বন্ধে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন। এবং পরর্বতীতে জঙ্গিবাদ বিরোধী সফল অভিযান। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ ও মাদক মুক্ত হবে বিশ্বের সব দেশের আগেই। কেননা বঙ্গবন্ধু পেরেছিলেন তাঁর কন্যাও পারবেনÑ আর কেউ নন। তাই তার প্রতি আস্থা রাখা আন্দোলনের চেয়ে ভালো ফলাফল বয়ে আনতে পার।
লেখক : রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক