বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব : জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট: আগস্ট ৮, ২০১৯, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক রাশেদা খালেক


আজ ৮ আগস্ট। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ৮৯তম জন্মদিন।
বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ১৯৩০ সালে ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শেখ জহুরুল হক। মাতা হোসনে আরা বেগম। ফজিলাতুন্নেসার ডাক নাম রেনু। রেনুরা দুই বোন। কোনো ভাই নেই। দু’বছরের বড় বোনের নাম জিনাতুন্নেসা, ডাক নাম জিন্নি। পিতা জহুরুল হক লেখাপড়া শিখে যশোরে চাকরি করতেন। হঠাৎ করেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রেনু তিন বছর বয়সে বাবাকে এবং পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারান। পিতৃ-মাতৃ হারা দুই শিশু-নাতনীকে নিয়ে দাদা শেখ কাশেম দিশেহারা হয়ে পড়েন। প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারি দাদা অনেক চিন্তা ভাবনা করে বড় নাতনি জিনাতুন্নেসাকে সম্পর্কীয় এক নাতির সাথে বিবাহ দেন। আর চাচাতো ভাই শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবের সাথে রেনুর বিয়ে দিয়ে সমস্ত সম্পত্তি দুই নাতনির নামে লিখে দিয়ে অভিভাবক হিসাবে লুৎফর রহমানকে দায়িত্ব দেন। শাশুড়ি সাহেরা খাতুন পিতৃ-মাতৃহারা শিশু রেনুকে মাতৃ¯েœহে কোলে টেনে নেন। এবং নিজ সন্তানদের সাথে অত্যন্ত আদর যতেœ লালন পালন করেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী হিসাবে ফজিলাতুন্নেসা যে ধৈর্য-সহ্য-উদারতা-সাহসিকতা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অনেক জটিল পরিস্থিতিতে স্বামীর পাশে থেকে সৎ পরামর্শ দিতে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছেন তা আজ ইতিহাস সত্য। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা শেখ মুজিবকে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হতে, বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের এই অসামান্য অবদানের জন্য জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে তাঁকে স্মরণ করছে।
ছোটবেলা থেকে রেনুর লেখাপড়ার প্রতি প্রচ- আগ্রহ ছিল। গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। পরবর্তীতে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে গৃহ শিক্ষকের কাছে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, অংক এসব বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ফজিলাতুন্নেসা রেনুর আচার-ব্যবহার, চাল-চলন ছিল অত্যন্ত মার্জিত, ভদ্র, অমায়িক। রেনু ছিলেন শান্ত প্রকৃতির। ধীর-স্থির, প্রখর মেধা ও স্মরণশক্তির অধিকারি। স্বল্পবাক রেনু ছিলেন নীরব কর্মী। বাড়ির ছোট-বড় সকলের ফাই ফরমাস খাটতেন নীরবে। ছোটবেলা থেকেই তিনি অনেক ধৈর্য ও সহ্যশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। জীবনে কোন চাহিদা বা কোন মোহ ছিল না। সাদা সিধে জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন, পছন্দও করতেন। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করে এসেছেন। ছাত্র রাজনীতি করতে গিয়ে যখনই স্বামীর অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়েছে সেই অর্থের যোগান দিয়েছেন স্ত্রী রেনু তাঁর পিতৃপ্রদত্ত সম্পত্তি থেকে। বঙ্গবন্ধু জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় জেলে কাটিয়েছেন। তাঁর অবর্তমানে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করতে সহায়তা করা, আন্দোলন পরিচালনায় পরামর্শ দেয়া সহ সংসারের হাল ধরা, সন্তানদের লালন-পালন, লেখাপড়া করানো, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং পরিবারের অন্যদের দেখাশোনা, সেবাযতœ করাÑ এসবই তিনি দক্ষ হাতে সামলিয়েছেন এবং নিজ সম্পত্তি হতে খরচ করেছেন। তাই অত্যন্ত বিনয়ী, আদর্শময়ী নারী হিসাবে তিনি সকলের প্রিয় ও শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠেছিলেন।
পাঁচ সন্তানের জননী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব স্বামীর আদর্শে সন্তানদের গড়ে তুলেছেন। তিনি শুধু আত্মীয়-স্বজন নয় দলীয় নেতা কর্মীদের সুখ-দুঃখের ভাগিদার ছিলেন। নেতাকর্মীদের রোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেয়া ও তাদের পরিবারে নানা সংকটে পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দান করেছেন। এসব করতে গিয়ে অনেক সময় তাঁকে গায়ের গহনা, ঘরের আসবাপত্র ফ্রিজ, সোফাসেট পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ তিনি করেন নি। অতিথি আপ্যায়নে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। নিজ হাতে রান্না করে স্বামী-সন্তান এবং অভ্যাগতদের কাছে বসিয়ে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। প্রতিদিন নিজে রান্না করে টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার পাঠাতেন স্বামীর জন্য। অফিসে সরকারি বাবুর্চির হাতের রান্না স্বামীকে খেতে দিতেন না। পরিপাটি করে ঘরবাড়ি সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতেন। এলো মেলো অপরিচ্ছন্ন ঘরবাড়ি পছন্দ করতেন না। অবসরে বই পড়তেন। পান তাঁর অতি পছন্দের সৌখিন খাবার। মসল্লাদার পান যখন খেতেন তখন খুশ্বু ছুটতো ঘরময়। যেখানে যেতেন পানের ডালা তাঁর সাথে সাথে ঘুরতো। বাড়িতে ঘনিষ্ঠজনেরা বঙ্গবন্ধুর সাথে একান্তে দেখা করার জন্য উপরে উঠে এলে বেগম মুজিব পান সাজিয়ে এগিয়ে ধরতেন-‘নেন ভাই, পান খান’। হসিমুখে পান দিয়ে আপ্যায়নের এই সহজ সরল মধুর ভঙ্গিটি ঘনিষ্টজনদের আরো আপন করে তুলতো। বঙ্গবন্ধু নিজেও তা উপভোগ করতেন। হাসতে হাসতে বলতেন, ‘তোমার ভাবীর হাতের পান আগে খাও, তারপর কথা কও’। ধর্মপ্রাণা বেগম মুজিব নিত্য ফযরের নামায আদায় করে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। এরপর গরু বাছুর হাঁস মুরগি কবুতর ইত্যাদি পোষ্য পশু-পাখির তদারকি করতেন। কবুতরকে নিজ হাতে দানা খাওয়াতেন। এরপর ঘরে এসে চা এবং সংবাদপত্র নিয়ে বিছানায় বসতেন। এরমধ্যে ছেলে-মেয়েরা ঘুম থেকে উঠে মায়ের বিছানায় এসে বসতো, আব্বা-মায়ের সাথে গল্প করতে করতে সকলে চা খেত। এটি একটি চমৎকার ঘরোয়া সুখের ছবি। তবে এই সুখ তাঁদের ভাগ্যে রোজ রোজ ঘটতো না। কেননা বঙ্গবন্ধুকে প্রায় সময় জেলে কাটাতে হত।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দাবি পেশ করেন। পাকিস্তান শাসকেরা ৬ দফা দাবি পেশ করার অপরাধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১নং বিচ্ছিন্নতাবাদী আসামি হিসাবে ১৯৬৬ সালের ৮ মে তারিখে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে। আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের অনেক নেতাসহ প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীর বাঙালি কয়েকজন সদস্য মোট ৩৪ জনকে আসামি করে মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে জেলখানায় বন্দি করে রাখা হয়। দেড় বছরের অধিক সময় বিনা বিচারে জেলখানায় রাখার পর ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি রাতে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। কেস কোর্টে ওঠার আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেনÑ জীবিত না মৃত তার খবর কেউ জানতে পারে নি। ফজিলাতুন্নেসা মুজিব স্বামীর খবরের জন্য পাগলের মত ছুটাছুটি করেছেন, কিন্তু কোনো খবর সংগ্রহ করতে পারেন নি। ৬ মাসের অধিক সময় পর প্রথম যে দিন বিশেষ ট্রাইবুনাল শুরু হলো এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে কোর্ট বসল সে দিনইÑ বঙ্গবন্ধুকে প্রথম তাঁর পরিবার দেখতে পেল বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন। আসলে এই মিথ্যা মামলা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল পশ্চিমা শাসকদের। কিন্তু তা সম্ভব হয় নি দেশব্যাপী ছাত্র- জনতার আন্দোলনের ফলে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। ৬ দফার সাথে ছাত্রদের ১১ দফা দাবি পেশ করে আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তোলা হয়। এই মামলা পরিচালনা ও আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ফজিলাতুন্নেসা মুজিব দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। গহনা বিক্রি করে ছাত্রনেতাদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছেন।
আইয়ুব শাহীর গদি তখন টালমাটাল। গদি রক্ষার জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করে আইয়ুব খান। ৬ দফার পরিবর্তে ৮ দফা নিয়ে ঢাকায় আসে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা। তাদের সাথে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অনেক নেতা হাত মেলায় এবং ‘আপস ফরমুলা’ নিয়ে মাঠে নামে। এসময় বেগম ফজিলাতুন্নেসা শক্ত অবস্থান নেন। দৃঢ় মনোবল নিয়ে শক্ত হাতে সংগঠনের হাল ধরে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হন। ৬ দফার প্রশ্নে কোনো আপস নয়। আইয়ুব খান তখন নতুন চাল দেন। ইসলামাবাদে গোলটেবিল বৈঠক ডাকেন। বন্দিখানা থেকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ইসলামাবাদে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাবের সমর্থনে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি লাভের পক্ষে কাজ করে। কিন্তু এর বিপক্ষে ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। মাঠপর্যায়ের কর্মী এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা কর্মীরাও বেগম মুজিবের পক্ষে ছিলো। একদিন যখন উচ্চপর্যায়ের নেতারা শেখ মুজিবকে প্যারোলে নিয়ে যাওয়ার জন্য বন্দিখানায় হাজির হন তখন এয়ারপোর্টে পিআইএ বিমান প্রস্তুত, সেইসময় বেগম মুজিব কন্যা শেখ হাসিনাকে পাঠালেন শেখ মুজিবের কাছে একটা খবর পৌঁছে দিতে। শেখ হাসিনা মায়ের কথামত গিয়ে দেখলেন সেখানে প্রচ- ভিড়, ভেতরে যেতে পারছিলেন না। তাঁকে যেতে দেয়া হচ্ছিল না। গেটের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। অনেক সময় অপেক্ষা করার পর শেখমুজিবের সাথে যখন শেখ হাসিনার দেখা হলো তখন বঙ্গবন্ধু কন্যার গলা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কোনো চিঠি দিস না, তোর মা কি বলেছে বল’। শেখ হাসিনা শুধু বললেন, ‘মা এখনও প্যারোলে যেতে নিষেধ করেছে। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করেছে। মা ইন্টারভিউয়ের জন্য সময় চেয়েছেন। সময় পেলে উনি আসবেন। মা নিষেধ করেছে যেতে, আপনি কিন্তু যাবেন না’।
শুনেÑ শেখ মুজিব জানালেন ৩৪জন আসামি সহ তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে হবে, তবেই তিনি গোলটেবিল বৈঠকে বসবেন। শেখ মুজিব প্যারোলে যেতে রাজি হলেন না দেখে নেতারা ক্ষেপে গেলেন। তাদের অনেকে ৩২নং বাড়িতে এসে বেগম মুজিবকে অনেক ভয় দেখালেন। শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হবে। তিনি বিধবা হবেন। পিতৃহারা হলে তাঁর সন্তানদের কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বেগম মুজিবের এক কথাÑ ‘মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার না করলে, ৩৪জন বন্দিকে জেলে রেখে শেখ মুজিব প্যারোলে যাবেন না। বাংলার মানুষ তা চায় না’। দৃঢ়চেতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা সেদিন ধৈর্যহারা হন নি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আইয়ুব খানের পতন-সময়ের ব্যাপার মাত্র। সত্যি তাই হয়েছিলো। ১৯৬৯ এর ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেন এবং শেখ মুজিব সহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ২৪ মার্চ আইয়ুব খানের পতন হয়। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। কত বাস্তবধর্মী চিন্তাভাবনা করতেন তিনি। নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক এই নারী সে দিন যদি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল না থাকতেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় না দিতে পারতেন তবে হয়তো বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত।
১৯৭১ এর ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিবেন। জনসভায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে এসেছে তাদের নেতার কথা শুনতে। সারাটা দিন নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর ৩২নং ধানমন্ডির বাড়িতে আসছে, তাদের কথা বঙ্গবন্ধু ধৈর্য সহকারে শুনছেন। এভাবেই সময় কাটছে। জনসভায় যাওয়ার সময় হলে বঙ্গবন্ধু তৈরি হবার জন্য উপরে উঠে এলেন। ফজিলাতুন্নেসা বঙ্গবন্ধুকে শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। দরজাটা বন্ধ করে স্বামীকে মিনিট পনের চুপচাপ শুয়ে থাকতে বললেন। কন্যা শেখ হাসিনা বাবার মাথা টিপে দিচ্ছেন, শর্দি লেগেছে বলে কপালে ভিক্স মালিশ করছেন। বঙ্গবন্ধু কাঁথা গায়ে দিয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলেন। ফজিলাতুন্নেসা বেতের মোড়াটা টেনে স্বামীর পাশে বসলেন। পানদান থেকে পান নিয়ে বানাচ্ছেন আর ধীরে ধীরে বলছেনÑ ‘সমগ্র দেশের মানুষ আজ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ভাগ্য আজ তোমার উপর নির্ভর করছে। তুমি আজ একটা কথা মনে রাখবে সামনে তোমার লাঠি,পেছনে বন্দুক। তোমার মনে যে কথা আছে তুমি তাই বলবে। অনেকে অনেক কথা বলতে বলেছে। তোমার কথার ওপর দেশের অগণিত মানুষের ভাগ্য জড়িত। তাই তুমি নিজে যেভাবে বলতে চাও নিজের থেকে বলবে। তুমি যা বলবে সেটাই ঠিক হবে। দেশের মানুষ তোমাকে ভালবাসে, ভরসা করে।’
Ñবঙ্গবন্ধু তাই করেছিলেন। ৭ মার্চে তিনি কোনো লিখিত বক্তব্য দেন নি, শেখানো কথাও বলেন নি। রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতাকামী বাঙালির মাঝে তেজোদৃপ্ত কণ্ঠে হৃদয় উৎসারিত যাদুকরি ভাষায় ১৯ মিনিট বক্তব্য রেখেছিলেন। তাঁর সেই বক্তব্য মুক্তিকামী বাঙালি জাতিকে তাতিয়ে তুলেছিল, মাতিয়ে রেখেছিল। বাঙালি জাতি হয়েছিল উদ্বেলিত, উচ্ছ্বসিত, অনুপ্রাণীত। পৃথিবীর ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের ভাষণ আজ অসামান্য অসাধারণ বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের এই পরামর্শ থেকে বোঝা যায় তিনি কত বাস্তবধর্মী চিন্তা ভাবনা করতেন। দেশপ্রেমিক এই নারী ছিলেন স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোসহীন।
২৫ মার্চ কালরাতে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির উপর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং জনগণকে যুদ্ধচালিয়ে যাবার আহবান জানান। এই ঘোষণার সাথে সাথেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে ৩২নং ধানমন্ডির বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং কারাগারে বন্দি করে রাখে। সমগ্র বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধকালীন শেখ ফজিলাতুন্নেসাকে কঠিন সময় পাড়ি দিতে হয়। একদিকে স্বামীর জন্য দুঃশ্চিন্তা অন্যদিকে সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় খুঁজে বেড়ানো। এদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হন্যে হয়ে খুঁজছে মুজিব পরিবারকে ধরবার জন্য। এমন এক পর্যায়ও এসেছে যে, বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবকে এক মাসে ১৯বার বাসা বদলাতে হয়েছে। তবুও পাকিস্তান বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পান নি, ধরা পড়ে গেছেন। শেখ হাসিনা, জামাতা ড. ওয়াজেদ মিয়া, শেখ জামাল, শেখ রেহানা, শেখ রাসেল সহ বেগম মুজিবকে ধানমন্ডি ১৮নং সড়কের একটি একতলা বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়। মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল ও শেখ জামাল তখন ভারতে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস আম্মার যে মনোবল দেখেছি তা ছিল কল্পনাতীত। স্বামীকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে। দুই ছেলে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। তিন সন্তানসহ তিনি গৃহবন্দি। যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এত কিছুর পরও আম্মা মনোবল হারান নি। অসীম সাহস এবং ধৈর্য নিয়ে তিনি পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। তিনি আল্লাহকে স্মরণ করতেন, অধিকাংশ সময় তসবিহ হাতে দোয়া দরুদ পড়তেন’।
রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হিসাবে শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ছিলেন রাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি। কিন্তু তিনি নিজেকে কখনও ফার্স্ট লেডি হিসাবে দেখেন নি, মানেন নি এবং সে পর্যায়ে নিজেকে তুলে ধরার কথা ভাবেনও নি। কখনও স্বামীর সাথে দেশে-বিদেশের সফরসঙ্গী হন নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এলে তাঁকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানাবার জন্য বিশাল নৌকাকৃতির মঞ্চ তৈরি করা হয়। সারাদেশব্যাপি সে কী আনন্দ উত্তেজনা। বাংলাদেশের পরম হিতৈষী যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে, খাবার দিয়ে, চিকিৎসা দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে, মিত্রবাহিনী দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তিদানের জন্য বিশ্বজনমত গড়ে তুলেছিলেন সেই মহীয়সী নারী মানবতাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে একনজর দেখবার জন্য সম্মান জানাবার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে এসেছিল। বেগম মুজিবও এই সংবর্ধনা সভায় না গিয়ে পারেন নি।এই প্রথম তিনি মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর পাশে বসেছেন। মেয়েরা তাঁকে দামি একটি বেনারসি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের দামি ভারি কাজের শাড়ি পরতে অভ্যস্ত নন তিনি। শাড়ি সামলাতেই ব্যস্ত। তার মধ্যে পানের ডালাটি নিতে ভোলেন নি। এত লোকজনের মধ্যে পানের ডালাটি আনা ঠিক হয়নি বুঝতে পারছেন। তাই আঁচল দিয়ে বার বার ঢাকবার চেষ্টা করছেন। বঙ্গবন্ধু বিষয়টি লক্ষ্য করে নিচ ুস্বরে বললেন,‘এইডা আবার আনছো ক্যান’। শুনে বেগম মুজিব আরো বিব্রত হয়ে পানের ডালাটি আঁচল দিয়ে ঢাকতে আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মঞ্চের খুব কাছ থেকে এসব দেখে পরিবারের বিশেষ এক ঘনিষ্টজনের হাসি পেলেও অন্যরকম এক প্রশান্তিতে তাঁর মন ভরে গিয়েছিল। আসলে বেগম মুজিব চিরন্তন বাঙালি নারীর এক মাতৃরূপ।এই রূপেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ। নির্লোভ-নির্মোহ এই গৃহবধুটি সারাটি জীবন স্বামীর পাশে থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বান্তকরণে শুধু সহযোগিতা করে গেছেন।
বেগম ফজিলাতুন্নেসা বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। বই পড়তে খুব পছন্দ করতেন। প্রচুর বই কিনতেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বার্টান্ড রাসেল পড়তে ভালবাসতেন। তার কেনা বই দিয়ে ৩২নং ধানমন্ডির বাড়িতে একটি লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। স্বামী ঘন ঘন কারাগারে যান। পড়বার জন্য তাঁকে জেলখানায় বই দিয়ে আসেন। দেশের এবং দলের সব খবর জানাতেন। আবার বঙ্গবন্ধু যে নির্দেশ আদেশ দিতেন তা নেতা কর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। কারাগারে অনেক নিরলস সময় তাঁর কাটে। বেগম মুজিব তাই কারাগারে বসে বঙ্গবন্ধুকে লেখালেখি করবার পরামর্শ দেন। এবং নিজে খাতা ও কলম কিনে জেল গেটে দিয়ে আসেন। আবার যখন মুক্তি পেতেন তখন খাতাগুলি সংগ্রহ করে সযতেœ রক্ষা করতেন। লেখাগুলি বহুকষ্টে সংগ্রহ করে সম্প্রতি ২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।একটি ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অপরটি ‘কারাগারের রোজনামচা’। গ্রন্থদুটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের প্রামান্য দলিল। এর পেছনে রয়েছে শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের অসামান্য অবদান।
ইতিহাসে স্বামীর অনুগামী হিসাবে অনেক নারীর নাম আমরা জানতে পারি যেমনÑ গান্ধী পতœী কস্তুরবাই, নেহেরুর কারাসঙ্গিনী কমলা দেবী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সহধর্মিনী বাসন্তী দেবী, ম্যান্ডেলা পতœী উইনি ইত্যাদি। এঁরা সকলেই ইতিহাসে স্থান পেয়েছেনÑ স্বর্ণাক্ষরে তাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে, অথচ বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের নাম সেখানে অনুপস্থিত।
বেগম মুজিব বাঙালি জাতির মুক্তিদাতার স্ত্রীÑ যিনি আজীবন স্বামীর পাশে থেকে শুধু শক্তি ও প্রেরণাই যুগিয়ে যান নি কখনও কখনও নিজের অজান্তে ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আজীবন সুখ-দুঃখের সঙ্গী মৃত্যুকালেও তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার সময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ফজিলাতুন্নেসা মুজিবকে ঘাতকেরা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ধর্মীয় বিধান মোতাবেক ধর্মপ্রাণা এই মুসলিম মহীয়সী নারীর দাফন-কাফন-জানাজা কোনটাই ঘৃণ্য ঘাতকেরা হতে দেয়নি। আমি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের জন্মদিনে যেমন শ্রদ্ধা জানাচ্ছি তেমনি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এই প্রত্যাশা রাখছি।
লেখক: শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, চেয়ারম্যান ,ট্রাস্টি বোর্ড, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী