বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা : মুক্তিসংগ্রামের এক আলোকবর্তিকা

আপডেট: আগস্ট ৮, ২০১৯, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নেপথ্যচারিণী ও প্রেরণাদায়িনী মহীয়সী। ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট ফজিলাতুন্নেছার জন্ম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। তাঁর ডাক নাম রেণু। পিতা শেখ জহুরুল হক চাকরি সূত্রে যশোর থাকায় দাদা শেখ কাশেমের ছোট সংসারে মা ও বড় বোনের স্নেহ ছায়ায় তিনি বেড়ে উঠতে থাকেন। মাত্র তিন বছর বয়সেই ফজিলাতুন্নেছা পিতৃহারা হন। তখন পিতামহ শেখ কাশেমের একান্ত আগ্রহে নিজ আত্মীয়ের মধ্যে শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ফজিলাতুন্নেছার বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখন তিনি মাতৃহারা হন। এর পর শাশুড়ি সায়েরা খাতুন তাঁকে কোলে তুলে নিলে স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারেই তিনি বড় হয়ে উঠেন।
অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের শেখ ফজিলাতুন্নেছা স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কারণে এবং খুব অল্প বয়স থেকে রাজনীতির সাথে স্বামীর গভীর সাহচর্য দেখতে পাওয়ায় একজন রাজনৈতিক সচেতন আদর্শ বাঙালি নারীর চিরায়ত রূপ ধরা পড়ে কিশোর বয়স থেকেই ফজিলাতুন্নেছার মাঝে। তাই পরবর্তী সময়ে অসম ধৈর্য্য ও সাহস নিয়ে জীবনে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেন। নিজের সুখ আর চাহিদাকে স্বামীর রাজনৈতিক আদর্শের জন্য জলাঞ্জলি দিয়ে নীরবে তিনি স্বামীর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হয়ে স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করেছেন। এমনকি ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে যখনই অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতো তখনো পিতৃসম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থ বিনা দ্বিধায় প্রেরণ করতেন। বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও সংসার জীবনের বর্ণনায় বিশেষ করে বার বার তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা ওরফে রেণুর নাম উঠে এসেছে। এ দুজন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকা-কে শুধু সমর্থনই করতেন না, বরং কষ্ট করে টাকা জমিয়ে রাজনীতি করার জন্য অর্থ সাহায্য করতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে প্রায়ই এভাবে বলতেন ‘রেণু খুবই কষ্ট করতো, কিন্তু কখনও কিছু বলতো না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখত যাতে আমার কষ্ট না হয়।’
বঙ্গমাতার স্মরণশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। আন্দোলন চলাকালীন প্রতিটি ঘটনা জেলখানায় সাক্ষাৎকারের সময় বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকেও সেই নির্দেশ জানাতেন। আত্মীয়স্বজন ও দলীয় কর্মীদের সুখ-দুঃখের সাথী ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে অনেক জটিল পরিস্থিতিতে স্বামীর পাশে থেকে সৎ পরামর্শ দিতেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর সঙ্গে অনেক গুরু ত্বপূর্ণ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে প্রায় ১২ বছর জেলে কাটান। এই সময়ে তিনি একদিকে ন্যায়ের সংগ্রামে অটল থাকতে স্বামীকে অনুপ্রাণিত করেছেন। অন্যদিকে স্বামীর রাজনৈতিক সহকর্মীদের নানাভাবে সহায়তা করে আওয়ামী লীগকে গতিশীল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা জনাব বাহাউদ্দিন চৌধুরীর ‘বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছার শাহাদাত বাষিকী’ (১ সেপ্টেম্বর ২০০৯, দৈনিক জনকণ্ঠ) লেখা খেকে উদ্ধৃত করে বলা যায় ‘তিনি ছিলেন সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী লীগ কর্মীদের স্নেহময়ী মাতা। তাঁর বাড়ি থেকে কোনো কর্মী না খেয়ে আসতে পারেনি। তিনি কাছে বসে থেকে সযতেœ তাদের খাওয়াতেন। তাঁর তেমন বিত্ত বৈভব ছিল না, কিন্তু অন্তরের মহান মহিমায় তিনি ছিলেন হৃদয়বতী ও চিত্তের ঔদার্যে অসীম।’ তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গিনি হিসেবে তাঁর জীবন থেকে রাজনীতির জ্ঞান আহরণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বাহাউদ্দিন চৌধুরী তাঁর উপরোক্ত লেখায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জেলে থাকার স্মৃতি রোমন্থণ উল্লেখ করে লেখেন ‘একজন কিশোরি বধূর বিরহ-বিধূর চিঠি তিনি আমাকে দেখাতেন। এ সব চিঠিতে ভাবী কখনও বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতি ছাড়তে বলেন নাই, বরং বারবার উৎসাহ দিয়েছেন।’
( ৫ এর পাতায় দেখুন।

মুক্তিসংগ্রামের এক আলোকবর্তিকা
(৩ এর পাতায়)
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণআন্দোলন, ৭০’র নির্বাচন ও ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধসহ স্বদেশের জন্য সংগঠিত প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছেন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রতিটি পদক্ষেপে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন তিনি এবং ছায়ার মতো অনুসরণ করেছেন স্বামীর আদর্শকে বাস্তবায়ন করার জন্য। এজন্য জীবনে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন এবং অনেক কষ্ট-দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তাঁকে। বঙ্গবন্ধু জীবনের তারুণ্য ও যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কারান্তরালে কাটিয়েছেন বছরের পর বছর। তার অবর্তমানে একদিকে যেমন সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল তাঁকে, অন্যদিকে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করা, আন্দোলন করাসহ প্রতিটি কাজে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মুসার ‘প্রেরণাদায়িনী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’ (১৩ আগস্ট, ২০০৯, দৈনিক প্রথম আলো) থেকে কিছু তথ্য উপস্থাপন করা যেতে পারে। ঢাকা সেনানিবাসে ষড়যন্ত্রের মামলা চলছে। সাল ঊনসত্তর। সারা দেশে আগুন জ্বলছে, ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’। এই শ্লোগানে রাওয়ালপিন্ডির ক্ষমতার মঞ্চ কেঁপে উঠেছে। গণঅভ্যুত্থানে বিধ্বস্ত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকলেন এবং প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তাঁকে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে যাওয়া হবে বলেন। ফেব্রুয়ারির ১৭ বা ১৮ তারিখ থেকে বিভিন্ন মহল থেকে শেখ সাহেবের কাছে প্যারোলে যাওয়ার প্রস্তাব আসতে থাকে। ঢাকায় তখন তাঁর মুক্তির দাবিতে কারফিউ ভেঙে রোজ রাতে মানুষের ঢল নামছে রাস্তায়। এরই মাঝে প্যারোলের বার্তা রটে গেল জনগণের মধ্যে। চলছে জল্পনা-কল্পনা, শেখ সাহেব কি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আইয়ুবের বৈঠকে যাবেন? ক্যান্টনমেন্টে বসে শেখ সাহেব কী ভাবছেন কেউ তা জানে না। সারা দেশের মানুষও কিছুটা বিভ্রান্ত। সেদিন মুচলেকা দিয়ে নাকি নিঃশর্ত মুক্তি সেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন একজন নারী। মুজিবের সহধর্মিনী যিনি রাজনীতি বুঝতেন না কিন্তু নিজের স্বামীকে জানতেন। বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর স্বামীর মানসিক দ্বন্দ্ব। বন্দি স্বামীকে খবর পাঠালেন, ‘হাতে বঁটি নিয়ে বসে আছি, প্যারোলে মুচলেকা দিয়ে জীবনে বত্রিশ নম্বরে আসবেন না।’ ভাবা যায় একজন অর্ধশিক্ষিত সাধারণ গৃহবধু রণচন্ডিনী মূর্তি ধারণ করে দূর থেকে সেদিন স্বামীকে শক্তি যুগিয়ে কি এক অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। আবারও প্রমাণিত হলো, নজরুলের কবিতার সেই পংক্তিমালা ‘কোনো কালে একা হয়নিক জয়ী পুরুষের তরবারি, শক্তি দিয়েছে, প্রেরণা দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।’ এই দেশের ভবিষ্যৎ ইতিহাস হয়তোবা অন্যভাবে লেখা হতো যদি শেখ মুজিব মুচলেকা দিয়ে সহবন্দিদের ক্যান্টনমেন্টে রেখে রাওয়ালপিন্ডি যেতেন।
বঙ্গমাতা যে প্রখর রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও সুদূরপ্রসারি রাজনেতিক চিন্তার আধিকারী ছিলেন তার আরো প্রমাণ পাওয়া যায় পান্না কায়সারের লেখা ‘এই আগস্ট ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’ (৩০ আগস্ট, ২০০৫, দৈনিক জনকণ্ঠ) থেকে। তিনি তাঁর এ লেখায় বলেন ‘১৯৭১ এ যখন ভুট্টো-ইয়াহিয়া ঢাকায়, তারিখটা আমার মনে নেই, শহীদুল¬াহ্ কায়সার একদিন কী এক বিশেষ প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুর বাসায় ফোন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাসায় ছিলেন না। বেগম মুজিবের সঙ্গে কি কথা বললেন জানি না। আমি পাশে বসে থেকে কী কথা হচ্ছে তা ঠিক খেয়াল করিনি। ফোনটা রেখে শহীদুল্ল¬াহ্ কায়সার ফোন করলেন জহুর হোসেন চৌধুরীকে (জহুর মামা)। শহীদুল্ল¬াহ বলছেন মামা, বেগম মুজিব সাংঘাতিক সচেতন তো। ফোনে আমাকে বললেন ভুট্টো-ইয়াহিয়া সাহেবদের ষড়যন্ত্র। কীসের আলোচনা ? ঢাকায় এসেছে ষড়যন্ত্র করতে।’
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পূর্বের ঘটনা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেন কিভাবে এ ভাষণের পেছনে বঙ্গমাতা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায় ‘৭ মার্চ ঐতিহাসিক জনসভা। ওই দিন কতো মানুষ। কতো মত, কতো কাগজ, কতো পরামর্শ। আব্বা সবই ধৈর্য সহকারে শুনেছেন। সব কাগজই গ্রহণ করেছেন। সারাটা দিন এভাবেই কেটেছে। যখন জনসভায় যাওয়ার সময় হলো তার কিছুক্ষণ পূর্বে আব্বা কাপড় পরে তৈরি হবেন। মা আব্বাকে ঘরে নিয়ে এলেন। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আব্বাকে বললেন, ১৫ মিনিট চুপচাপ শুয়ে থাকার জন্য। আমি আব্বার মাথার কাছে বসে মাথাটা টিপে দিচ্ছিলাম। মা বেতের মোড়াটা টেনে আব্বার কাছে বসলেন। হাতে পানদান, ধীরে ধীরে পান বানাচ্ছেন আর কথা বলছেন। যে কোনো বড় সভায় বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাওয়ার আগে আমার মা আব্বাকে কিছুক্ষণ একদম নিরিবিলি রাখতেন। সেদিন আব্বার একটু সর্দি ছিল। আমি গলায়, কপালে ভিক্স মালিশ করে দিলাম। কাঁথাটা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকলেন। আমার মা আব্বাকে বললেন, ‘সমগ্র দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ভাগ্য আজ তোমার ওপর নির্ভর করছে। তুমি আজ একটা কথা মনে রাখবে সামনে তোমার লাঠি পেছনে বন্দুক। তোমার মনে যে কথা আছে তুমি তাই বলবে। অনেকে অনেক কথা বলতে বলেছে। তোমার কথার ওপর সামনের অগণিত মানুষের ভাগ্য জড়িত। তাই তুমি নিজে যেভাবে যা বলতে চাও নিজের থেকে বলবে। তুমি যা বলবে সেটাই ঠিক হবে। দেশের মানুষ তোমাকে ভালোবাসে, ভরসা করে।’
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শেখ ফজিলাতুন্নেসা সর্বদা স্বামীর পাশে থেকে দেশ ও জাতির সেবা করেন এবং শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কোনো কিছুর প্রতি তাঁর মোহ ছিল না। রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়েও তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন। এমনকি তিনি সরকারি বাসভবনেও বসবাস করেননি। বেগম মুজিব কখনই ৩২ নম্বরের বাড়িটির দোতলার পূর্ব-দক্ষিণ কোণের কক্ষটি ছেড়ে আসতে রাজি হননি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হয়ে অথবা রাষ্ট্রপতির পতœী পরিচয়ে ‘ফাস্টলেডি’ হতে চাননি। বহু বছর আগে স্বামীর সঙ্গে গ্রাম্যবধুর যে লেবাসটি পরে এসেছিলেন, গণভবন বা বঙ্গভবনে এসে তা ছাড়তে চাননি। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীদার হওয়ার কোনো বাসনা ছিল না তাঁর মনে। সহজ-সরল গ্রাম্যবধু প্রধানমন্ত্রী-জায়ার শ্বাশ্বত বর্ণনা খুঁজে পাওয়া যায় প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মুসার ‘প্রেরণাদায়িনী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’ থেকে। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় এলেন, রেসকোর্স ময়দানে নির্মিত হলো ‘ইন্দিরা মঞ্চ’। জীবনে সেই প্রথম ও সেই শেষ বেগম মুজিব প্রকাশ্যে এলেন। অর্থাৎ বেগম মুজিব একবেলার জন্য ফাস্টলেডি হয়ে অন্দর থেকে বাইরে এসেছিলেন। এবিএম মুসার ভাষায় ‘পরে জেনেছি, বঙ্গবন্ধু বহু খোশামোদ করে বেগম সাহেবকে সেই মঞ্চে আনতে পেরেছিলেন। মঞ্চে তাঁকে দেখে মনে হলো, চিরকাল আটপৌরে শাড়ি-পরা বেগম মুজিব বহু আয়াসসাধ্য প্রচেষ্টায় একটি কাতান পরেছিলেন।’ তিনি আরো লিখেন ‘মঞ্চের কাছাকাছি ছিলাম তাই দেখলাম এক হাতে বারবার কাতান শাড়িটি সামলাচ্ছেন, অপর হাতে পানের বাটাটি ধরে আছেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্মানীয় মহিলাটি আঁচলের আড়ালে পানের বাটা আগলিয়ে রেখেছেন, দেখে আমারই হাসি পাচ্ছিল। অদূরে বসে শুনলাম, বঙ্গবন্ধু মৃদুস্বরে ধমকিয়ে উঠলেন, ‘এটি আবার নিয়ে আসলা ক্যান?’ বেগম মুজিবের মুখে দেখলাম অপ্রস্তুত হাসি, তারপর বাটাটি আঁচলের তলে ভালো করে ঢাকা দিতে থাকলেন। এ হচ্ছে সহজ-সরল গ্রাম্যবধু প্রধানমন্ত্রী-জায়ার চিত্ররূপ।’ দেশ ও দেশবাসীর জন্য সমগ্র জীবন তিনি আত্মত্যাগ করেছেন।
১৯৭৫ সালের কলঙ্কিত ১৫ই আগস্ট রাতে পরিবারের প্রায় সব সদস্যের সঙ্গে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছাও শাহাদাত বরণ করেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় ‘ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাকা-ের সময়েও বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী মরণকালেও সঙ্গী হয়ে রইলেন’। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার ধৈর্য, সহনশীলতা ও দেশপ্রেম যুগ যুগ ধরে বাংলার মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং দেশ গড়ার লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ করবে। কিন্তু এই মহিয়সী নারীর যথাযোগ্য স্থান বাংলার ইতিহাসে যথাযথভাবে চিত্রিত হয়নি। এবিএম মুসার ভাষায় যথার্থই বলতে হয় ‘গান্ধী-পতœী কস্তুরবাই, নেহেরুর কারাসঙ্গিনী কমলা, দেশবন্ধুর সহধর্মিণী বাসন্তী দেবী বা ম্যান্ডেলা-পতœী উইনি ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন। কিন্তু বাঙালি জাতির মুক্তিদাতার স্ত্রী শক্তিদায়িনী, প্রেরণাদায়িনী মহিলার স্থান কেন বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় থাকবে না?’ এ লেখা লেখতে গিয়ে বার বার মনে হয়েছে তার সম্পর্কে লেখালেখি ও গবেষণার বিস্তৃতি খুবই সামান্য। তাই এখনই শ্রেষ্ঠ সময় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার জীবনের নানা আলোকিত দিক আলোর পাদপীঠে নিয়ে আসা। বঙ্গমাতার জীবদ্দশায় যাঁরা তার সান্নিধ্যে এসেছিলেন, যাঁদের কাছ থেকে তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, তাঁদের অনেকেই আজ বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। তাঁরা জীবিত থাকা অবস্থাতেই বঙ্গমাতাকে নিয়ে তাঁদের যেমন বেশি বেশি লেখার দায়িত্ব রয়েছে তেমনি তাঁদের স্মৃতি ভাষ্য থেকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বঙ্গমাতা সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করে তাঁকে ইতিহাসের পাতায় স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করার দায়িত্বটিও রাষ্ট্রের।
লেখক পরিচিতিঃ অধ্যাপক, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।