বদলগাছীতে নদীতে পানি আছে কিন্তু প্রাণ নেই

আপডেট: জুন ৪, ২০১৮, ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

এমদাদুল হক দুলু, বদলগাছী


বদলগাছীর ছোট যমুনা-সোনার দেশ

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদীতে পানি আছে কিন্তু প্রাণ নেই। এক সময় এই উপজেলা খাল-বিল, পুকুর ও নদী নালায় ছিল পরিপূর্ণ। উপজেলার চতুর দিকে বনজঙ্গল দেখে মনে হতো যেন সৌন্দর্য্যরে এক অপরূপ লিলা ভূমি। এখন নেই কোন প্রাকৃতিক অপরুপ লিলা ভূমির আগের সেই বনজঙ্গল। নেই কোন খালবিল। আছে শুধু পুকুর ও নদী নালা। সেটাও প্রাণ হীন। শুষ্ক মৌসুমে পুকুরে ভূ-গর্ভ থেকে সেচের মাধ্যমে ফিরাতে হয় প্রান।
আর নদীর দিকে তাকালে মনে হয় এক কালে নদী ছিল। এখন ধুধু বালুচর একটি মরা খাল। চলতি মৌসুমে ঘন ঘন ভারি বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে নদীতে কিছু পানি জমে থাকলেও তা দেখে নদীর মতো মনে হয় না। নদীতে পানি ধীরে ধীরে প্রবাহিত হলেও স্্েরাতের কোনো গতিবেগ নেই। ঘোলাটে পানি। নদীতে জোয়ার আসলে নদীর দুপাশে যখন ঝর ঝর করে ঝরনা নামে তখন নদীর পানি টলটলে পরিস্কার থাকে। নদীর প্রবাহিত ¯্রােতোর গতি বৃদ্ধি পায় এতে নদীতে পানি কম থাকলেও প্রান থাকে। কিন্তু বর্তমান নদীর যা অবস্থা ¯্রােতের কোন গতি নেই। ঘোলাটে পানি যা দেখলে মনে হবে এটা নদী নয় শুধুই পানি নিষ্কাশনের খাল। এক কালে ছোট যমুনা নদী যৌবন জোয়ারে ছিল একাবারে পরিপূর্ণ। সারি সারি পাল তোলা নৌকা চলাচল করতো এ নদীতে। দূর থেকে ভেসে আসতো মাঝি মাল্লার ভাটিয়ালী ভাওয়াইয়া গানের সুর।
এই ছোট যমুনা নদীর সঙ্গে বদলগাছী উপজেলার নাম করণের ইতি কথা যেন একই সুত্রে গাঁথা। উপজেলাল নাম করণের সূত্র মোতাবেক জানা যায়, প্রাচীন কালে দেশে সামজিক অবস্থান সৃষ্টির আদি অন্তে মূদ্রা ব্যবস্থা প্রচলনের পূর্বে মানুষ যখন সভ্য সমাজে ফিরে আসে। নিজের প্রয়োজনে একজন আরেক জনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে । এ সময় মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় অভাব অনটন চাহিদা পুরণে দেশে বিনিময় প্রথা বা দ্রব্য বদলা বদলীর নিয়ম চালু করা হয়। সে সময় এই এলাকার অধিবাসীরা দ্রব্য বদলা বদলীর অন্যতম স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিল ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম পাশের স্থান বর্তমান বদলগাছীকে। নদী পথে ও সড়ক পথে দূর দূরান্ত থেকে সহজেই এই স্থানে যোগাযোগ করা যেত। সে আমলে এই এলাকায় জুজুবি (বড়ই) নামের এক প্রকার গাছ পাওয়া যেত। গাছ গুলি ৫-৬ ফুট লম্বা হত। নদীর পাশের ঝোপঝাড়ে জমির ধারে এ ছাড়া যত্রতত্র প্রকৃতিগত ভাবে এ গাছ জন্ম নিত এবং প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। এ গাছের রস থেকে তৈরি হত চিনি। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী বদলা বদলি করে চিনি সংগ্রহের জন্য আসত এখানে। এভাবে বদলা বদলির প্রথা থেকে বদল ও জুজুবি নামক গাছের নামনুসারে গাছী শব্দের সৃষ্টি। এক কথায় বলা হত বদলগাছী। বদলগাছীর কথা বললেই মানুষ সহজেই বুঝে নিত বদলা বদলির স্থান। দিনে দিনে এই স্থান বদলগাছী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে এবং গড়ে উঠে এখানে হাটবাজার। তৎকালিন সময়ের প্রচলিত প্রথায় কালক্রমে এই উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে বদলগাছী। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে এ দেশে তথা ভারত বর্ষ ইংরেজদের পদানত হলে উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বদলগাছী তৎকালীন দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতিহাস অনুসারে ১৮০৭ সালে বদলগাছী থানা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৮২১ সালে বদলগাছী থানা তৎকালীন বগুড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৯৭ সালে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। এ সময় বদলগাছী থানা নওগাঁ মহকুমার অধীন একটি বর্ধিষ্ণু থানা হিসেবে পরিগণিত হয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ১৯৮৩ সালে ৭ নভেম্বর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে বদলগাছী থানা আপগ্রেডেড উপজেলা হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়। এজন্য ছোট যমুনা নদীর সঙ্গে এই উপজেলার নামকরণের ইতিকথা যেন একই সুত্রে গাঁথা। এখন সেই নদীর ভারসাম্য নেই। শুষ্ক মৌসুমে সাফল্যের সঙ্গে বোরা ধান চাষ হচ্ছে নদীর বুকে। দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর অস্তিত্ব। শুধু মাত্র ভরা মৌসুমে নদীতে থাকে প্রাণ। তা দু এক মাসের মধ্যেই হারিয়ে যায়। এসময় নদীতে কিছু পানি থাকলেও প্রাণ থাকে না। নদীর গতি যেন স্থির হয়ে যায়। দেখে মনে হয় শুধুই পানি নিষ্কাশনের খাল।