বরেন্দ্র মিউজিয়ামের অপহৃত চেয়ার ও মুদ্রাগুলো এখন কোথায়?

আপডেট: জুলাই ৯, ২০১৯, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


বরেন্দ্র রিসার্স মিউজিয়ামের সাবেক ও সদ্য প্রয়াত পরিচালক এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর সুলতান আহমদের ব্যক্তিগত কক্ষ থেকে উদ্ধারকৃত ১৭টি অতি প্রাচীন পাঞ্চ মুদ্রা এবং ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র চেয়ার এখন কোথায়, কেউ সে তথ্য রাখেন কি? সম্ভবত না। দেশবাসী আশঙ্কিত এ জন্যে যে, সেগুলো আবার উদ্ধারকর্তাদের শুভদৃষ্টিতে রয়েছে কি না, তা-ই বা কে জানে! কারণ ‘বেড়ায় খেত খেলে’ কাকে আর দোষারোপ করা যাবে। আমরা বেড়ার ওপরও আর আস্থা ও বিশ^াস রাখতে পারছি কি? ভারী নড়বড়ে ওই বেড়া। রক্ষকই ভক্ষক। সম্প্রতি বিশ^বিদ্যালয়সহ সারা দেশে যে নৈরাজ্য আর ঘুস-দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে সুলতানসাহেব কর্তৃক গোপনে ১৭টি মুদ্রা ও একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিকের ব্যবহৃত চেয়ার নিজে ব্যবহারের লোভে ব্যক্তিগত কক্ষে এনে রাখা খুবই সামান্য ব্যাপার বলে মনে হয় কি? মূল্যবোধহীনতা, মানসিক দেউলিয়াত্বরই সাক্ষ্য বহন করে। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক চিন্তার ধারক। তার মৃত্যুপর বিভাগের সভাপতি, ডিন, বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এবং তার স্ত্রীর উপস্থিতিকে ওই কক্ষটি খোলা হয়। খুলে নগদ নয় লক্ষ টাকা, ১৭টি প্রাচীন পাঞ্চ মুদ্রা আর অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র চেয়ার পাওয়া যায়। এ সব মূল্যবান সম্পদ পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল একটি তালিকা প্রস্তুত করে সেখানে সকলেই স্বাক্ষর করেন। টাকাগুলো মিউজিয়ারের অগ্রণী ব্যাংক রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় শাখার ০২০০০০২২৮১৬২৪ নম্বর হিসেবে জমা করেন। জমা রসিদ নম্বর : ৯০৬৬০৪। একই হিসাবে ৯০৬৬৪০ তারিখ ২১ এপ্রিল ২০১৯। কিন্তু মুদ্রা ও চেয়ারটি কোথায় জমা হয়েছে তার কোনো তথ্য জানা যায়নি। অবশ্য সে তথ্য রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সাহেব ভালো দিতে পারবেন। কারণ তিনি নিজে ওই উদ্ধারকারী টিমের একজন সদস্য, উপরন্তু তারা এক বিভাগের শিক্ষক, বন্ধু ও সহকর্মী। অন্যরাও নিশ্চয়ই জানেন, তবে বলছেন না। এতো বড়ো একটি অপরাধমূলক কাজ হাতে-নাতে ধরা পড়লো আর বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থানায় মামলা বা জিডি করেছেন বলে জানা যায়নি। মৃত বন্ধুর বিরুদ্ধে জীবিত ক্ষমতাধর বন্ধু জিডি করবেন বলে মনে হয় না। শহরবাসী সে কথাই বলছে। বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হয়তো জীবিত বন্ধুর অনুরোধে কিংবা প্রভাবে এ ঘটনার সত্যাসত্য নিরুপণে একটি তদন্ত কমিটিও করেন নি। তাহলে দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মহামূল্যবান সম্পদ যিনি পরিচালকের পদ বাগিয়ে নেবেন তিনিই তখন চুরি ও আত্মসাৎ করবেন, স্বজন-বন্ধু আর প্রিয়ভাজন বলে তার কোনো দালিলিক প্রমাণ থাকবে না, সেটা কি আইন সকলের জন্যে সমান, এ কথা বিশ^াস করা যায়? এমন হতে পারে, সুলতান সাহেব প্রকৃত অপরাধী নন, তিনি চোরাই মাল অধিগ্রহণকারী? যা-ই হোন না তিনি, বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর সেটা প্রমাণের দায় পড়ে। তারা সে দায় স্বীকার না করলে, এ ভাবে আরো কতোকাল মিউজিয়ামের সম্পদ লুণ্ঠিত-অপহৃত হবে, তার হিসেব দেয়া যাবে না, যাবে শুধু অনুমান করা। সত্যি বলতে কী, এই হচ্ছে আমাদের কত্তাদের বিচার-বুদ্ধি আর পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক কত্তা তো মনে করেন, প্রফেসর সুলতান ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি। সজ্জন। ঘর খুলে পরিবারের হাতে তার জিনিসপত্র বুঝিয়ে দিতে গিয়েই তিনি কতোটা ধার্মিক তার প্রমাণ তো পাওয়া গেলো। তার পূর্বের পরিচালকদের অনেকের বিরুদ্ধে এ ভাবে অভিযোগের আঙুল উত্থিত হয়। সেগুলোরও তদন্ত দেশবাসী দাবি করে।
কুমার শরৎকুমার রায়ের ছবি মিউজিয়ামের অন্ধকার গুদামে পড়েছিলো দীর্ঘদিন। ছবিটি এঁকেছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যামিনী রায়। সেখানে রানী ভবানী স্বাক্ষরিত হস্তলিপি, তাঁর ব্যবহৃত পাখার হদিস নেই। পরিচালকেরা অমূল্য ভাস্কর্যগুলোকে মূর্তি মনে করে অযতেœ-অবহেলায় ফেলে রেখেছেন। রাজশাহীসহ দেশবাসীর শত প্রতিবাদ পরও ভাস্কর্যগুলো ফ্রান্সে পাঠানোর লক্ষ্যে মিউজিয়াম থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে নেয়া হয়। সেখানে একটি ভেঙে যায়। ভাঙা টুকরোগুলো নাকি কেজিদরে বিক্রি করেছে কত্তারা। ভাস্কর্য ফিরে আসে মিউজিয়ামে। সেগুলো যথার্থভাবে প্রতিস্থাপনও করা হয়নি। ধুলো-ময়লায় ভাস্কর্যগুলো এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রয়েছে। নিয়মিত পরিস্কার করা পর্যন্ত হয় না। অথচ এই মিউজিয়ামটি হতে পারতো উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ একটি প্রতিষ্ঠান।
আমাদের নগর পিতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও ফজলে হোসেন বাদশা এমপি তাদের নির্বাচনী বক্তব্যে অনেক বার উচ্চারণ করেছিলেন, বরেন্দ্র মিউজিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করবেন। কবে তাদের অঙ্গিকার পূরণ হবে মহানগরবাসী সেটা জানতে চায়। কেবল রাস্তা-ড্রেন আর নানা মাত্রিক প্রতিষ্ঠানই উন্নয়নের সাক্ষ্য বহন করে না। হতে পারে সেগুলো এক একটি উন্নয়নের সোপান। কিন্তু তার সঙ্গে শিক্ষা-সংস্কৃতি আর মূল্যবোধ অর্জিত জনগোষ্ঠির সম্পর্ক থাকতে হবে। আমাদের সেই জনগোষ্ঠি নেই বলে চুরি হয়, ঘুস-দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়নের সংখ্য ও পরিধি বৃদ্ধি পায়। সুলতান সাহেবের ঘরে পাঞ্চ মুদ্রা ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র চেয়ার আবিষ্কার সেই মূল্যবোধহীনতা থেকেই মিলেছে। তাদের সঙ্গে জুটেছে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, যার পরিবার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী হিসেবে পরিচিত। সে বিশ^বিদ্যালয়ের সেই কর্মচারী যাদের একসঙ্গে ৫৪৪ জন নিয়োগ পায় বিএনপি-জামাত জোট আমলে। তারাও ভাস্কর্যগুলোকে হিন্দুদের দেব-দেবী মনে করে অবহেলা-তিরস্কার করে। পরিচালক নিজেও সে ধরনের উচ্চারণ বহুবার করেছেন। একজন গবেষক এ সব নিয়ে লেখালেখি করতে গেলে তাকে পরিচালক নিরুৎসাহ করেন এবং ভাস্কর্যকে হিন্দু-বৌদ্ধদের পূজার মূর্তি হিসেবে প্রমাণের পরামর্শ দেন। সেটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে তার প্রচার ও বিক্রিও বন্ধ করে দেয়া হয়। অথচ তারা নিজেরা কোনো গবেষণা প্রকল্প করেন নি, লিখেন নি এক পাতাও। গবেষকদের পদে পদে বাধা দেয়াই ছিলো তাদের দায়িত্ব! মিউজিয়ামের গ্রন্থাগারে বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজ নামচা’ কিংবা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ দুটোর অস্তিত্ব মেলেনি। কিন্তু মিলেছে জিয়াউর রহমানের জীবনী গ্রন্থ। তাহলে এই শিক্ষিতরা কী করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ^াসী ছিলেন, ভাবতেই অবাক লাগে। সব ছদ্মবেশী রাজাকার। একজন পরিচালক তো বিএনপি-জামাতের শাসনালে শিক্ষকতার কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা পরও সরাসরি প্রফেসর পদে নিয়োগ পেয়ে ইসলামিক মূল্যবোধের সাদা প্যানেল থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সুলতান সাহেব পরিচালকের পদে নিয়োগ পান। তার ভাষা ছিলো ওই ভাস্কর্যগুলো বিধর্মীদের দেব-দেবী। ওগুলো থাকলে সেখানে নামাজ পড়া যায় না। ধর্ম পালনে অসুবিধে হলে আপনি কেনো পরিচালকের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন? অর্থের জন্যে নয়তো মুদ্রা নিজের দখলে রাখার জন্যে এবং একজন স্বনামধন্য ব্যক্তির চেয়ার নিজের দখলে নেয়ার জন্যে? আসলে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও জামাতি পুনর্বাসনের প্রকল্প নিয়েছিলেন। বহু পদে তাদের অভিষিক্ত করেছেন। নিয়োগ দিয়েছেন তারা। একটু অনুসন্ধান করলেই এই বক্তব্যের সত্যাসত্য নিশ্চিত হওয়া যাবে।
রাজশাহী মহানগরবাসীর দায়িত্ব বরেন্দ্র মিউজিয়ামটির অস্তিত্ব রক্ষার লক্ষ্যে রাজপথের সংগ্রাম গড়ে তোলা। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নিলে হয়তো তা সুচারুভাবে পরিচালিত হবে। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় আর এই প্রতিষ্ঠানের ভার বহনে সক্ষম নয়। তারা তার মর্যাদাও অনুধাবন করে না। তাই প্রতিবাদী সংগ্রামের বিকল্প নেই। কারণ জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার আজকের প্রজন্মের। লোভী-স্বার্থপর, দুর্বৃত্ত-দুর্নীতিবাজদের কাছে জাতির গৌরবময় অর্জন ভূ-লুণ্ঠিত এবং চুরি ও আত্মসাতের সুযোগ দেয়া যাবে না। কখনোই না।