বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে বিভিন্ন প্রতœস্থলের প্রতœনিদর্শন

আপডেট: আগস্ট ৫, ২০১৯, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

মো. সফিকুল ইসলাম


পর্ব- ১
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি দর্শনার্থীগণ আগ্রভরে জানতে চান মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠাতাদের নাম-পরিচয়ও তাঁদের জানার আগ্রহের মধ্যে আছে। এখানকার প্রতœনিদর্শন সম্পর্কে দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের ইতিবাচক কৌতুহল অনেক। মিউজিয়ামের বিপুল প্রতœনিদর্শনের পরিচয়ও তাঁরা পেতে চান। বাংলাদেশের (ভারতের অংশসহ) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতœস্থলের প্রতœনিদর্শন বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে প্রদর্শন ও সংরক্ষণে রয়েছে। এসব প্রতœস্থলগুলোর অবস্থান, আবিষ্কার, উৎখনন, প্রাপ্ত প্রতœসম্পদ ও সামগ্রিক ইতিহাস জানার প্রবল আগ্রহ আছে দর্শনার্থী ও সাধারণ মানুষের। এ নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান প্রতœস্থলের প্রতœনিদর্শন বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে রয়েছে। পাঁচ হাজার বছর আগের সিন্ধুসভ্যতার প্রায় তিনশত প্রতœনিদর্শন এখানে আছে। এতো প্রাচীন প্রতœনিদর্শন বাংলাদেশের আর কোনো মিউজিয়ামে নেই। আরও আছে, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, লালমাই-ময়নামতি, ধর্মপালগড়, পুঠিয়া, মঙ্গলকোট, মুর্শিদাবাদ, নালন্দা ইত্যাদি (নালন্দা ও সিন্ধু বৃহৎবাংলার বাইরের অংশ) স্থানের প্রতœনিদর্শন। এসব প্রতœস্থলে প্রাপ্ত প্রতœনিদর্শনের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের তথা বাঙালি জাতির আদি ইতিহাস লেখা হয়েছে। উল্লিখিত স্থানগুলোর ইতিহাস জানা হলে বাংলাদেশের ইতিহাস অনেকাংশে জানা হয়ে যায়। তাই এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না যে, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম পুরো বাংলার ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে আছে।
‘বাংলার গৌরব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ আমার ধারাবাহিক রচনা ১০ পর্বে দৈনিক সোনার দেশ-এ ছাপা হয় গত ১২ থেকে ২১ মে তারিখে। কলেবরের কথা বিবেচনা করে ওই লেখায় শুধুমাত্র প্রতœস্থলের বিস্তৃত বিবরণ উল্লেখ সম্ভব হয়নি। যেসব প্রতœস্থলের প্রতœনিদর্শন এই মিউজিয়ামে রয়েছে সেসব স্থানের পরিচয় নিয়ে পৃথকভাবে লেখার অনুরাধ করেন অনেক পাঠক ও শুভ্যার্থী। তাই, গৌরবময় ৯টি প্রতœস্থলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এই লেখায় তুলে ধরা হয়েছে। আরও বহু স্থানের প্রতœনিদর্শন মিউজিয়ামের প্রদর্শনে রয়েছে। প্রথমেই উল্লেখ করছি সিন্ধুসভ্যতা।
সিন্ধুসভ্যতা
হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতাকে সমম্বিতভাবে ‘সিন্ধুসভ্যতা’ বলা হয়। সিন্ধুসভ্যতা বা সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা মূলত নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা, ইংরেজিতে ‘ওহফঁং ঠধষষবু ঈরারষরুধঃরড়হ’ বলা হয়। সিন্ধু নদীর তীরে সভ্যতাটি প্রথম আবিষ্কার হয় বলে সিন্ধুসভ্যতা নামে পরিচিতি লাভ করে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তদানীন্তন মহাপরিচালক ব্রিটিশ প্রতœবিদ স্যার জন মার্শাল ‘সিন্ধু সভ্যতা’ নামটি প্রথম ব্যবহার করেন। প্রাগ-ঐতিহাসিককালের ভারতবাসী আধুনিক সভ্যতার যুগে পদার্পণ করে সিন্ধুসভ্যতার মধ্য দিয়ে। প্রাচীন ভারতবর্ষের অভিন্ন নাগরিক সত্তার কারণে বাংলাদেশ তথা বাঙালি সমাজ গৌরবময় সিন্ধুসভ্যতার গর্বিত উত্তরাধিকার। সিন্ধুসভ্যতা মিশর, মেসোপটেমিয়, ব্যাবিলনিয়, সুমেরিয় ইত্যাদি সভ্যতার সমসাময়িক। পাঞ্জাবের বিস্তৃত অঞ্চলে, সিন্ধু নদের অববাহিকা ধরে আরব সাগর পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ মাইল স্থানব্যাপি সিন্ধুসভ্যতা বিকাশ লাভ করে। তাম্র বা ব্রোঞ্জ যুগের এই সভ্যতা ভারতবর্ষে গড়ে ওঠে খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে। পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলার হরপ্পা (ঐধৎৎধঢ়ধ) অঞ্চলে এবং লারকানা জেলার মহেঞ্জোদারো (গড়যবহ-লড়-ফধৎড়) অঞ্চলে খননকার্য চালিয়ে সিন্ধুসভ্যতার সন্ধান পাওয়া যায়।
সিন্ধুসভ্যতা ছিল নগর কেন্দ্রিক সভ্যতা। সেখানে সংঘবদ্ধ নাগরিক জীবনের সকল সুবিধাদি বিদ্যমান ছিল। পাকা বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, শৌচাগার, শহর নির্মাণের কাঠামো, প্রাসাদ, দুর্গ, আলোকায়ন ব্যবস্থা ইত্যাদি নির্দেশ করে যে, সিন্ধুসভ্যতার মানুষ ছিল উন্নত নাগরিকবোধসম্পন্ন, মেধাবী ও বিজ্ঞানমনষ্ক। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ছিল তাঁদের জীবিকা। সিন্ধুসভ্যতা কেন্দ্রিক নগরগুলোকে পৃথিবীর প্রাচীনতম নগর হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক প-িত, কারণ এতো সুশৃংঙ্খল ও পরিকল্পিত নগরায়ন তৎকালে আর কোথাও দেখা যায়নি।
১৮৭৫ সালে প্রখ্যাত ইংরেজ প্রতœবিদ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তৎকালিন মহাপরিচালক স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম সর্বপ্রথম হরপ্পায় অপরিকল্পিতভাবে উৎখনন করে লিপিসহ গঞ্জাবিচি আবিষ্কার করেন। তবে সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খননকার্য শুরু হয় বিশ শতকের তৃতীয় দশকে। ভারতীয় প্রতœবিদ ড. ডি. আর. সাহ্নি (দয়ারাম সাহ্নি) ও ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯২২ সালে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করেন। সিন্ধুনদের পাড়ে পাকিস্তানের করাচি থেকে দুশ’ মাইল উত্তরে মহেঞ্জোদারো, যা বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় এবং আরও উত্তরে লাহোর থেকে একশ’ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ইরাবতী নদীরধারে হরপ্পা, যা পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলায়। মহেঞ্জোদারো থেকে হরপ্পা ৪০০ মাইল দূরে। এ দু’ভূখ-ের মধ্যে এখনও বহু প্রাচীন নগর-বন্দর মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ইতিহাসবিদ ও প্রতœবিদগণ ধারণা করেন। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রতœস্থানের সংখ্যা ৭০টিরও বেশি।

সিন্ধুসভ্যতার খ্যাতিমান প্রতœবিদ স্যার মর্টিমার হুইলারের (ঝরৎ গড়ৎঃরসবৎ ডযববষবৎ) মতে, সিন্ধুসভ্যতার কাল ২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ পর্যন্ত। ভারতীয় প্রতœতত্ত্ব বিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক ও ভারতীয় প্রতœবিদ্যার অন্যতম জনক স্যার জন মার্শাল খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫০ সাল থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৭৫০ সাল সিন্ধু সভ্যতার জীবনকাল বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে সিন্ধুসভ্যতার প্রতœনিদর্শনগুলো পাঁচ হাজার বছর পূর্বের। এতো প্রাচীন প্রতœনিদর্শন বাংলাদেশের আর কোনো মিউজিয়ামে নেই। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সৌজন্যে প্রাথমিক খনন যুগে সিন্ধুসভ্যতার ২৫৫টি নিদর্শন এই মিউজিয়াম প্রাপ্ত হয়। বর্তমানে প্রদর্শনে রয়েছে প্রায় একশত প্রতœদ্রব্য, বাকিগুলো সযতেœ মিউজিয়ামের সংরক্ষণে রয়েছে। সিন্ধুর প্রতœনিদর্শনগুলোর মধ্যে মৃন্ময়ের সংখ্যা সর্বাধিক।
মহাস্থানগড়
প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে সর্বপ্রাচীন মহাস্থানগড়। বগুড়া শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের কোলঘেঁষে পশ্চিম পাশে ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়। প্রাচীন করোতোয়া নদীর পশ্চিম তীরস্থ প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ মহাস্থানগড় বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অমরকীর্তি। প্রাচীর বেষ্ঠিত মূল নগরীর বাইরে ৫ মাইল পর্যন্ত প্রাচীন বহু ধ্বংসাবশেষ বর্তমানেও বিদ্যমান। মহাস্থানগড় প্রাচীন এক দুর্গনগরী। মহাস্থানগড়ে প্রাচীনকাল থেকেই নগর সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল।
মহাস্থানগড়কে ‘পু-্রুনগর’ বা ‘পু-্রুবর্ধণ’ বা ‘পু-্রু’ও বলা হয়। পু-্রু একটি প্রাচীন জাতির নাম। পু-্রু থেকে পু-্রুনগরের নামকরণ হয়েছে। পু-্রুনগরের প্রধান কেন্দ্র মহাস্থানগড়। মহাস্থানগড় ও পু-্রুনগর মূলত একই স্থান। মহাস্থানগড়ে মৌর্য আমল (খ্রিস্টপূর্ব), গুপ্ত, পাল, সেন, মুসলিম ও ব্রিটিশ শাসন যুগের প্রতœনিদর্শন রয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন শাসনযুগের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে মহাস্থানগড় ব্যবহৃত হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩য়/৪র্থ শতাব্দ থেকে খ্রিস্টিয় ১৫শ শতাব্দ পর্যন্ত পু-্রুনগর জনপদের স্থায়ীকাল সাধারণত ধরা হয়। ব্রিটিশ শাসনযুগে ফকির সম্প্রদায়ের দলপতি ফকির মজনু শাহ ক্ষণস্থায়ী আশ্রয়স্থল হিসেবে মহাস্থানগড় ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ফকির মজনু শাহের পরে রাজশাসন রহিত হয়ে মহাস্থানগড় একটি সাধারণ গ্রামে পরিণত হয়।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ডা. বুকানন্ হ্যামিল্টন ১৮০৮ সালে মহাস্থানগড় নগরীর ধ্বংসাবশেষের প্রথম বিবরণ লিখেন। পরবর্তীতে মি. হান্টার, মি. ও’ডোনেল, মি. বেভারিজ, মি. ওয়েস্ট ম্যাকট ও স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রমুখ প-িত ব্যক্তিবর্গ মহাস্থানগড়ের বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। ‘পু-্রুনগর’-এর প্রথম সনাক্ত করার একক কৃতিত্ব স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৮-৬৪৫ অব্দের মধ্যে ‘পন্ন-থ-তন্-ন’ বা পু-্রুবর্ধন অর্থাৎ মহাস্থানগড় পরিদর্শন করেন। বেলে পাথরে উৎকীর্ণ স¤্রাট অশোকের (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক) আমলের একটি ব্রাহ্মীলিপি এখানে ১৯৩১ সালে আবিষ্কৃত হয়। ভারত ও বাংলাদেশ ভ্রমণ বিষয়ক তাঁর রচিত ‘সি ইউ কি’ নামক গ্রন্থে পু-ুনগরের বর্ণনা আছে। পু-্রুনগরের আয়তন ছিল ৩০ লি. (১০ কিলোমিটার)। সেখানে ২০টি সংঘারামে বৌদ্ধ হীনযানী ও মহাযানী মতাবলম্বী ৩ হাজার শিক্ষার্থী, ১০০টি হিন্দু দেবালয় হিউয়েন সাঙ দেখতে পান বলে উল্লেখ করেন। হিউয়েন সাঙ’র বর্ণিত স্থানসমূহের নাম ও দূরত্ব এবং অবকাঠামোর বর্ণনা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম মহাস্থান ও পু-্রুনগরের অভিন্নতা প্রমাণে সক্ষম হন ১৮৭৯ সালে ।
মহাস্থানগড়ে প্রথম প্রতœতাত্ত্বিক উৎখননকার্য ড. কে. এন. দীক্ষিতের তত্ত্বাবধানে ১৯২৮-২৯ সালে শুরু হয়। মহাস্থানগড়ে পর্যায়ক্রমিক উৎখননে বহু প্রাচীন নিদর্শন অনাবৃত হয়েছে। মহাস্থানগড়ের পুরাকীর্তিসমূহের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো প্রাচীন নগরদুর্গ। এই দুর্গকে স্থানীয়ভাবে ‘গড়’ বলা হয়। মহাস্থানগড়কে ঘিরে প্রতœস্থলগুলো হলো, বৈরাগীর ভিটা, মুনীর ঘোন, গোবিন্দ ভিটা, লক্ষ্মীন্দরের মেধ, মানকালীর কু-ু, মানকালীর ভিটা, খোদার (খোদাই) পাথর ভিটা, পরশুরামের সভাবাটি ও প্রাসাদ, জীয়ৎকু-, শিলাদেবীর ঘাট, নেতাই ধোপানীর ঘাট, ভাসু বিহার, তোতারাম প-িতের ঢিবি বা বিহার গ্রাম, স্কন্ধের ধাপ ও গোপীনাথের ভিটা, মঙ্গলনাথের ঢিবি, পশ্চিম দিকের মন্দির, পূর্ব দিকের মন্দির, মঙ্গলকোট বা পদ্মাবতীর ধাপ, ওঝা ধন্বন্তরীর বাড়ি, খামার ধাপ, কাঁচের আঙ্গিনা, নরপতির ধাপ, সন্ন্যাসীর ধাপ, পাতকুয়া (এক ধরনের মঞ্চ), কাটা দুয়ার, ঘাঘরা দুয়ার, বুড়ির দরজা, শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ারের মাজার, সালামী দরওয়াজা, দোরাব শাহ তোরণ, ইত্যাদি।
প্রদর্শিত প্রতœবস্তু : বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রদর্শনে মহাস্থানগড়ের প্রতœবস্তুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, পোড়ামাটির ফলকে বোধিসত্ত্বের মস্তিষ্ক, মুকুট পরিহিত শিবের টের‌্যাকোটা ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলকে উৎকীর্ণ দু’জন পুরুষ, পোড়ামাটির ফলকে উড়ন্ত বিদ্যাধর, ভাঙ্গা মৃত্তিকার সঞ্চকী, অলঙ্কৃত ইট।
সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর)
রাজশাহী জেলার (বর্তমান নওগাঁ) বদলগাছি থানার মালঞ্চী গ্রামে সোমপুর মহাবিহার অবস্থিত। স্থানটি বা বিহারটি ‘পাহাড়পুর’ বা ‘পাহাড়পুর বিহার’ নামেই সমধিক পরিচিত। বাংলাদেশ রেলওয়ের পার্বতীপুরগামী প্রধান শাখা লাইনের জামালগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে প্রায় তিন মাইল পশ্চিমে পাহাড়পুর অবস্থিত। বাংলার পালস¤্রাট ধর্মপাল (শাসনকাল ৭৭০-৮১০ খ্রিস্টাব্দ) অষ্টম শতকের শেষ দিকে বাংলার শিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার ঘটানোর জন্য পাহাড়পুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। পাহাড়পুর বিহার ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ বিহারগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। পাহাড়পুর বিহার মূলত তৎকালীন সময়ের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। প-িত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, রতœপাল শান্তি, বৌদ্ধবুদ্ধের ন্যায় অনেক খ্যাতিমান প-িত এখানে ভিক্ষু (ছাত্র হিসেবে) হিসেবে জ্ঞান আহরণ করেছেন, আবার শিক্ষকতাও করেছেন। নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলার পাল রাজাদের সূদীর্ঘ চারশ’ বছরের শাসনকাল পর্যন্ত পাহাড়পুর মহাবিহার টিকে ছিল বলে প-িতদের ধারণা।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নির্দেশক্রমে ডা. বুকানন ফ্রান্সিস হেমিল্টন ১৮০৭ থেকে ১৮১২ সালে মধ্যে পূর্বভারত সফরের অংশ হিসেবে পাহাড়পুরে এসে অনুমান করেন সেখানে অমূল্য প্রতœসম্পদ লুকিয়ে আছে। অতঃপর দিনাজপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়েস্ট ম্যাকেট পাহাড়পুরে আসেন (পাহাড়পুর তখন দিনাজপুর জেলাধীন)। দু’জনেই লেখনির মাধ্যমে সরকার ও সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁদের বিবরণের জের ধরেই উপমহাদেশের প্রতœতত্ত্বের পথিকৃৎ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ সালে পাহাড়পুর পরিদর্শন করেন এবং দক্ষ শ্রমিক দিয়ে স্যার কানিংহাম খনন কাজ শুরু করেন। আলেকজান্ডার কানিংহামের প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই অবশেষে পাহাড়পুরে এই ধ্বংসাবশেষ ‘১৯০৪ সালের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন’ বলে এটি ১৯১৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি বা সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত হয়।
নাটোরের দিঘাপতিয়ার রাজপরিবারের সদস্য কুমার শরৎকুমার রায়ের একক অর্থায়নে পাহাড়পুর মহাবিহার সর্বপ্রথম প্রতœতাত্ত্বিক খনন শুরু হয় ১৯২৩ সালে। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতীয় প্রতœতত্ত্ব বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এই খনন শুরু হয়। খননের নেতৃত্বে দেন ভারতীয় প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের পূর্ব অঞ্চলের সুপারিনটেনডেন্ট ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ড. দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভা-ারকর। কুমার শরৎকুমার রায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রতিবছর দুই হাজার টাকা করে পাঁচ বছর ১০ হাজার টাকা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯২৩ থেকে ১৯৩৪ সন পর্যন্ত (বিরতির সময় বাদে) একটানা এগার বছর পর্যায়ক্রমিকভাবে ধ্বংসাবশেষ প্রাথমিক খননকালেই প্রধান প্রতœসম্পদ আবিষ্কার ও নির্ণয় করা হয় এবং মহাবিহার অনাবৃত হয়। প্রধান বিহারকে ঘিরেই এখানকার প্রতœসম্পদের অস্তিত্ব গণ্য করা হয়। পাহাড়পুরের প্রতœসম্পদের মধ্যে কেন্দ্রীয় প্রধান মন্দিরটি স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নিদর্শন।
অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারত যুগে পাহাড়পুরের মূল খনন কাজ সম্পন্ন হয়, তাই, এখানকার প্রতœবস্তু বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত রয়েছে। পাহাড়পুরের প্রতœনিদর্শনগুলোর মধ্যে ২৬৬টি বিভিন্ন শ্রেণির প্রতœদ্রব্য বিশেষত টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলকচিত্র বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম লাভ করে। বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম (ঠজগ) ছাড়াও কলকাতাস্থ আশুতোষ মিউজিয়াম ও ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে পাহাড়পুরের প্রতœসম্পদ সযতেœ প্রদর্শিত হচ্ছে। জাতিসংঘের ইউনেস্কো পাহাড়পুরকে বিশ্ব-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা ডড়ৎষফ ঈঁষঃঁৎধষ ঐবৎরঃধমব-এর মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে ১৯৮৫ সালে। ইউনেস্কোর ঘোষিত ঐতিহ্যবাহী স্থানের মধ্যে পাহাড়পুর ৩২২তম।
পাহাড়পুরের প্রতœসম্পদ : নলবিশিষ্ট বদনা, ছোট-বড় পাত্র, কুপি, স্বল্পগ্রীবা বিশিষ্ট গোলাকার পাত্র, প্রশস্ত মুখ বিশিষ্ট বাটি, বদনা, দীর্ঘ গলা বিশিষ্ট পাত্র, কুমারের হাতুড়ি, গোলাকার সিল, প্রশস্ত মুখ ও সমতল তলা বিশিষ্ট বাটি, কুকুর, পাখি, নারী ও পুরুষের প্রতিকৃতি এবং বিভিন্ন পশু আকৃতির খেলনা।
নালন্দা
ভারতের বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনা থেকে প্রায় ৯৫ কি. মি. দক্ষিণ-পূর্বে বিহার শরিফের নিকটে নালন্দা মহাবিহার অবস্থিত। প্রাচীনকালে বিহার রাজ্যের নাম ছিল ‘মগধ’। নালন্দা বিহারকে উপমহাদেশের প্রথম এবং বিশ্বের প্রথম আবাসিক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় অভিহিত করা হয়। এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং একই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাত। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত সম্রাট কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুসলিম শাসক মুহম্মদ বিন কাসিম কর্তৃক ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে আক্রমণের শিকার হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। গুপ্ত ও পাল আমলে এ বিদ্যাপীঠে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য চীন, জাপান, তিব্বত, সিংহল, কোরিয়া, সুমাত্রা, বার্মা, লাওস, মঙ্গোলিয়া, মধ্য এশিয়া, প্রাচ্য, দূর-প্রাচ্যসহ পৃথিবীর দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে ছিল এবং শিক্ষার্থীগণ এখানে আগমন করতেন।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আচার্য বা চ্যান্সেলরের পদে বিশ^বিশ্রুত বাঙালি প-িত শীলভদ্র ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে যোগদান করেন এবং ২০ বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন। শীলভদ্র প্রাচীন বাংলার ‘সমতট’ রাজ্যে বর্তমান কুমিল্লা জেলার শীলভদ্র চান্দিনা থানার কৈলান গ্রামে ৫২৯ সালে জন্মগ্রহণ এবং ৬৫৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ঐতিহাসিক শ্রী কৈলাসচন্দ্র সিংহ তাঁকে ‘সমগ্র বাঙালি জাতির আদি গৌরব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে শীলভদ্রের আগে তাঁর মত এতো বড়মাপের উচ্চশিক্ষিত বাঙালি প-িতের নাম জানা যায় না। শীলভদ্র আচার্য থাকাকালে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ নালন্দা বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হন। তিনি ৬৩০ থেকে ৬৪৪ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষে অবস্থান করে বহু তীর্থস্থান ও বৌদ্ধবিহার পরিভ্রমণ করেন এবং নালন্দায় ১০ বছর শিক্ষালাভ করেন। হিউয়েন সাঙ’র বর্ণনা মতে, তখন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। বিভাগের সংখ্যা ১০০। ১৫০০ শিক্ষক, ১৫০০ স্টাফ। দৈনিক ১০০ সভামঞ্চ থেকে ১০০ বক্তৃতা দেয়া হতো। অধ্যাপকের মধ্যে একমাত্র শীলভদ্র একাই ১০০ বিভাগের প্রতিটিতেই গভীর জ্ঞান রাখতেন। শীলভদ্র ছাত্রদের সত্যপথ জানতে শেখাতেন এবং বিনম্র ব্যবহার দ্বারা তাঁদের প্রাত্যহিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন।
শীলভদ্র ছাড়াও পরবর্তীতে আরও দুইজন বাঙালি প-িত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য পদ লাভ করেছিলেন। তাঁরা হলেন, শান্তিরক্ষিত ও চন্দ্রগোমিন। বাংলার আরেক গৌরবদীপ্ত সন্তান শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করও সমতট রাজ্যের মানুষ। তিনিও দশম শতাব্দীর বিশ্ববিশ্রুত বাঙালি প-িত। অতীশ দীপঙ্কর প্রথমে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদয় ব্যয় নির্বাহের জন্য গুপ্ত রাজাগণ, পরবর্তীতে পাল রাজাগণ উদার হস্তে অনুদান দিতেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের আয়তন ৩০ একর। এই আয়তনের মধ্যে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনা বিদ্যমান ছিল। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে রতœসাগর, রতœবোধি ও রতœরঞ্জক নামে নয় তলা বিশিষ্ট তিনটি বড় বড় লাইব্রেরি ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত (এ্যাফিলিয়েটেড) ছিল বহু বিহার বা মহাবিদ্যালয়। কেবল মূল ক্যাস্পাসের ভিতরে আটটি মহাবিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করেছেন হিউয়েন সাঙ। খননে প্রাপ্ত ‘শ্রীনালন্দা-মহাবিহার-আর্য-ভিক্ষু-সঙ্ঘস্য’ নামীয় সীলমোহর থেকে কলেজ বা মহাবিদ্যালয়ের পরিচয় লাভ করা যায়। সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা নালন্দা বিহারের একটি মাত্র প্রবেশপথ ছিল। বিহারে ১০টি মন্দির, ৮টি স্বতন্ত্র এলাকা ও আধ্যাত্মিক ধ্যানগৃহ এবং পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ছিল। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে ১৯১৫ সালে নালন্দা মহাবিহার খননের মাধ্যমে মূল্যবান প্রতœনিদর্শন অনাবৃত হয়।
প্রদর্শিত নালন্দার প্রতœবস্তু : দীর্ঘ মুকুট বিশিষ্ট মানব মস্তিষ্ক, শিশুসহ নারী ভাস্কর্য, বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মমত সংবলিত সিল, লিপিযুক্ত বৌদ্ধ সিল, ছোট ষাঁড় (খুব সম্ভব নন্দী)।
(শেষ পর্ব আগামীকাল)
লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়।