বর্ষপূতি ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লী

আপডেট: নভেম্বর ৬, ২০১৯, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

মিথুশিলাক মুরমু


আজ ৬ নভেম্বর। গোবিন্দগঞ্জ সাঁওতাল পল্লিতে পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি, সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে জ¦ালাও-পোড়াও, বর্বর হত্যাকাণ্ডের তিন বছর পূর্তি। গ্রামের সাঁওতালরা হারিয়েছে সহায়-সম্পত্তি, অর্থ-সম্পদ, প্রিয়জন, আস্থা ও বিশ^াসের মতো নৈতিকগুণ সম্পন্ন পারস্পারিক যোগাযোগ। উপলব্ধি থেকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন কাছের মানুষদের; ভালোবাসার মানুষদের। সত্যিই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে পুলিশ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রের ভূমিকায়; আদিবাসীরা নিজ ভূমে পরবাসীসদৃশ হয়েছে। তিন বছর অনেক সময় হলেও আদিবাসীদের কাছে যুগ-যুগান্তের মতোই; প্রত্যাশা থেকে প্রাপ্তির ঝুলিটি শূন্য।
অক্টোবর ২৯ তারিখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লির আমাদের অগ্রজ নেতা ফিলিমন বাস্কের সাথে ঢাকায় দেখা করি। মি. ফিলিমন বাস্কে আমার পূর্ব পরিচিত, ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে থেকে আমি তাকে জানি এবং একই জায়গায় থেকে পড়াশোনার করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেদিনও জয়পুর-মাদারপুর নিয়ে অনেক কথা হলোÑ তিনি জানালেন, ইতোমধ্যেই সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। কোনো কোনো সময় পূর্বপ্রস্তুতির সময় না দিয়েই কয়েক মুহুর্তের নোটিশে সভাতে উপস্থিত হতে বাধ্য করেছেন। তবে তিনি যে বিষয়গুলো জানাচ্ছিলেন- ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ মতানুযায়ী, আদিবাসী সাঁওতালদের পৈতৃকভিটা মাটি ফেরত দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেই নির্ভর করছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যদি দয়াপরবশ হয়ে কিংবা তাদের ন্যায্যতার বিষয়গুলো অনুধাবন এবং বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি করেন; তাহলে বিষয়টি আরো সহজ ও কম সময়ের মধ্যে বিবাদমান সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভবপর হবে। মি. ফিলিমন বাস্কের সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের প্রতি বিশ^াস ও আস্থার মাপকাঠিটি বারবার উঠানামা করতে করতে বড়ই ভঙ্গুরে পরিণত হয়েছে। সকাল বেলা এবং বিকেল বেলার কথার মধ্যে বেশ ফারাক খুঁজে পেয়েছেন। সত্যিকার অর্থে জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীর সাঁওতালসহ আদিবাসীরা এখন বড়ই অসহায় ও নিরুপায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ যদি প্রয়োজনীয়-ই হয়ে থাকে, তাহলে বোঝা যায়, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও মানবতার দৃষ্টিভঙ্গি অনুপস্থিত। তাহলে কী এদের প্রত্যাশা Justice delay is justice dined!
জয়পুর-মাদারপুর এলাকায় ৬ নভেম্বর, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর থেকে পুলিশ, আনসার ও কখনো কখনো সাদা পোশাকের পুলিশ বাহিনীর ঘোরাঘুরি চোখে পড়ে। ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে বিনা উস্কানিতে জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লির দু’জন যুবককে আনসার সদস্য আটক করে। দু’জন আদিবাসী আনসার সদস্যের সাথে নাকি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলো; এটিই ছিলো তাদের অপরাধ। আমরা জেনেছি, নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনীগুলো আদিবাসীদের নারী-পুরুষের উদ্দেশ্যে অশালীন, বিভ্রান্তমূলক এবং অসম্মানজনক বক্তব্য দিয়ে একটি গোপন স্বার্থ হাসিল করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। সেদিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুবকদ্বয়কে স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীকালে জয়পুর-মাদারপুরের লোকজন বিষয়টি টের পেলে থানা ও জেলা প্রশাসক অফিস ঘেরাও করে। আদিবাসীদের দাবি ও ন্যায়ত চাপের মুখে দু’জন যুবককে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। এ রকম অনেক ঘটনা আড়ালে-আবডালে অনেক সংঘটিত হচ্ছে যা আদিবাসীদের হৃদয়ের রক্তরক্ষণকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
নিকট সম্প্রতিতে ‘জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটির চোখে বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন (প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯) চোখে পড়েছে। কমিটির ধারাবাহিক প্রতিবেদনে গোবিন্দগঞ্জ সাঁওতাল পল্লির ঘটনাটিও গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে। বলা হয়েছেÑ‘… সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা বা তাঁদের সহযোগিতায় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক, অন্য জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর লোকজন যৌন সহিংসতাসহ ভয়ভীতি, হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় বলে যে খবর পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন। এরমধ্যে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের তিন সাঁওতাল নিহত ও ৫০ জন আহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। যে ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছে, সাঁওতালদের বাড়িঘর ও বিদ্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত ছিলেন না। যদিও টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ঘটনার ভিডিওতে এর বিপরীত দৃশ্যই দেখা গেছে… (প্রথম আলো ১৯.৯.২০১৯)। এ ঘটনায় জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটি রাষ্ট্রের করণীয় দিকগুলোও তুলে ধরেছে। কমিটির পরামর্শগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ
ক. উপরের উল্লিখিত বিস্তারিতসহ ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, অন্য জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও অন্যান্য দুর্বল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনার স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা;
খ. ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’-এর বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আইন, যেমনÑ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ রদ করার বিষয় বিবেচনা করা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হয়রানি করতে এ ধরনের আইনের প্রায়ই অপব্যবহার এবং এসব গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর সহিংসতা আইনিভাবে বৈধ বলে ধরে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়;
গ. ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, অন্য জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও অন্যান্য অরক্ষিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; তাদের অভিযোগ দেওয়ার স্বাধীন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
ঘ. সাঁওতাল সম্প্রদায় এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু ও দুর্বল গোষ্ঠীর যারা শারীরিক সহিংসতা, ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটের শিকার, তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনসহ প্রতিকারের ব্যবস্থা করা; এবং অপির্ত সম্পত্তি প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া নিশ্চিত করতে অর্পিত সম্পত্তির প্রত্যর্পণ আইন ২০০১ (আইন নম্বর ১৬) বাস্তবায়ন করা;
ঙ. অপ্রাকৃতিক আচরণকে অপরাধ গণ্য করা বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা রদ করতে হবে। রাষ্ট্র সমলিঙ্গ যৌন সম্পর্ককে এই ধারা অনুসারে নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করে থাকে;
চ. সমকামী সম্প্রদায়সহ ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, অন্য জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যান্য দুর্বল সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর সহিংসতার সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে;
ছ. দুর্বল গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের ওপর সব ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত পুলিশের সদস্যসহ অন্য সাধারণ মানুষের বিচার ও সাজার ব্যবস্থা করতে হবে।
জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লির ঘটনায় সাংবাদিক সম্মেলনে মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের ইচ্ছাকৃতভাবে দেশ থেকে বিতাড়নের চেষ্টা চলছে। এখানে রাষ্ট্রের একটা প্রচ্ছন্ন মদদ আছে। দেশে জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে প্রাকৃতিক কোনো কারণ নেই। আছে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণ।…আমরা আজ সংখ্যায় কম হওয়ার কারণে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে উদ্বাস্তু করে তুলেছি। এক সময় আমরা বিবেকের উদ্বাস্তুতে পরিণত হব (প্রথম আলো ২৮.৮.২০১৯)। ইতোপূর্বে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘জীবন ও সম্পদের ওপর যখন হুমকির সৃষ্টি হয়, তখনই মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়। সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার হারিয়েই বিভিন্ন সময় এ দেশের সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। সাধ করে কেউ দেশ ত্যাগ করে না’ (প্রথম আলো ২৭.৪.২০১৯)।
ইতোমধ্যেই পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (পিআইবি)র দাখিলকৃত চার্জশিট আইনজীবীর মাধ্যমে সাঁওতাল পল্লির অধিবাসীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সরকারের বিভিন্ন মহলের বহুমুখি চাপের মুখে সাঁওতালরা দিশেহারা হয়ে কী সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন, সেটি বুঝে উঠতে পারছেন না; নিজে থেকেই কেউ কেউ বিড় বিড় বলে থাকেন, সাঁওতালদের ঈশ^র কী বহুদূরে থাকেন, বহুদূরে …যেখানে আমাদের অসম্মানের আজাহারি, ক্রন্দন এবং অভিযোগগুলো পৌঁছায় না। পৌঁছালে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সুরাহা হবে! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘ এবং হয়তো এরপরেই মহান স্রষ্টার দরবারে সাঁওতালদের বিষয়টি উত্থিত হবে!
লেখক: সংবাদকর্মী