বলিভিয়ার লোকগল্প: আর্মাডিলোর স্বপ্ন

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৯, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

জাফর সাদেক চৌধুরী


বলিভিয়ার ঘন জঙ্গলে বাস করতো একটি অদ্ভুত আর্মাডিলো। আর্মাডিলো এক ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণি যাদের পিঠে কচ্ছপের মতো শক্ত খোলস থাকে। এরা সাধারণত মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বসবাস করে। আর্মাডিলো একা থাকতে পছন্দ করে, এজন্য তারা কখনো তাদের গর্তে অন্য আর্মাডিলোকে থাকতে দেয় না। বলিভিয়ার অদ্ভুত আর্মাডিলোটি গর্তে একা থাকতে থাকতে জঙ্গলের বিভিন্ন পশু-পাখির গান শুনত। যেমন ব্যাঙের গান, ঝিঝি পোকার গান, ক্যানারি পাখির গান, শেয়ালের গান, কোকিলের গান আরও কতো কি! অন্য পশুপাখিরা যেভাবে ডাকত সে তাদের মতো ডাকতে চাইতো। এভাবে তার মনের ভেতর পশু-পাখির সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি হলো। তার স্বপ্ন একদিন সেও অনেক বড় গায়ক হবে, অন্য পশু-পাখিরা যেভাবে সুন্দর করে গান গায় সেও সুন্দর করে গান গাইবে। একথা সত্য যে আর্মাডিলো মোটেই গায়ক শ্রেণির কোনো প্রাণি নয়। কিন্তু চেষ্টা করলেতো অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়।
নিসঃসঙ্গ আর্মাডিলো ভাবে- ইস! আমি যদি ব্যাঙের মতো সুন্দর করে ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ করতে পারতাম! যেই ভাবা সেই কাজ, আর্মাডিলো ছুটে গেল ব্যাঙের বাসায়, সেখানে বাস করত একদল কোলা ব্যাঙ। সে কোলা ব্যাঙের দলপতিকে প্রচ- বিনীতভাবে তার গান শেখার আগ্রহের কথা জানালো এবং কোলা ব্যাঙের দলপতিকে বলল, সে যেন তাকে ব্যাঙের মতো সুন্দর করে গান গাইতে শেখায়।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল ব্যাঙ দলপতি, এমন অদ্ভুত কথা সে ইহজন্মে শুনে নাই। সে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে আর্মাডিলোকে বলল, এ জগতের সবাই জানে, আর্মাডিলোরা কখনো গান গাইতে পারে না। আর ব্যাঙের মতো এতো সুন্দর গানতো কখনোই না! বোকার মতো আবদার করো না বলে সে আর্মাডিলোকে তাড়িয়ে দিল।
ব্যাঙের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে দুঃখি আর্মাডিলো ভাবল, যাই এবার ঝিঝি পোকার কাছে, তারা হয়তো তাদের ভাষায় গান শেখাতে রাজি হবে। ঝিঝি পোকা দলপতিকেও সে তার আগ্রহের কথা জানালো। ঝিঝি পোকাদের দলপতিও তাকে উপহাস করে তাড়িয়ে দিল। কিন্তু আর্মাডিলোটি দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে নতুন শিক্ষক খুঁজতে বের হলো। খুঁজতে খুঁজতে সে একদম জঙ্গল ছেড়ে শহরের ধারে এসে পড়ল। এখানে যদি কোনো শিক্ষক পাওয়া যায়, যে তাকে গান শেখাতে রাজি হবে।
দুঃখি আর্মাডিলো হামিং বার্ড, প্যারট, মার্টিন পাখির গান কত পছন্দ করত, তারা যখন গাছের ডালে বসে সুন্দর করে গান গাইত সে মুগ্ধ শ্রোতার মতো শুনত। আর মনে মনে ভাবত, একদিন সেও তাদের মতো গান গাইতে পারবে। তার স্বপ্ন কি আসলে পূরণ হবে! হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো কয়েকটি ক্যানারি পাখি অদ্ভুত সুন্দর সুরে কোরাস গাইছে। ক্যানারি পাখির সম্মোহনী সুরে সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল।
আর্মাডিলো দেখতে পেলো একজন লোক খাঁচার ভেতর কয়েকটি ক্যানারি পাখি নিয়ে বাজারে যাচ্ছে। সে লোকটিকে থামিয়ে ক্যানারি পাখিগুলোর কাছে তাকে গান শেখাবার আবেদন জনালো। কিন্তু ক্যানারি পাখিগুলোও তাকে ব্যাঙ এবং ঝিঝি পোকার মতো উপহাস করল। তারাও প্রচ- তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জানালো, জগতের সবাই জানে আর্মাডিলো গান গাইতে পারে না, এ আর নতুন কি! তোমার ভেতরেও আলাদা কোনো যোগ্যতা নেই যে তুমি পারবে। প্রচ- কষ্ট পেল দুঃখি আর্মাডিলো, কষ্টে তার চোখে পানি চলে এলো। তবু সে গান শিখবেই।
ক্যানারি পাখিগুলোকে যে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে লোকটি ছিল একজন গায়ক। সে লোকটি বুঝতে পারল এ আর্মাডিলোটি কখনো শান্তি পাবে না, যতক্ষণ সে জঙ্গলে যে সুরগুলো শুনে তা শিখতে না পারবে। এ অপ্রাপ্তি তাকে সবসময় কষ্ট দেবে। লোকটির মনে দয়া হলো, সে আর্মাডিলোকে ডেকে বলল, গান শেখার জন্য তোমাকে আমি সাহায্য করতে পারি। কিন্তু তার জন্য তোমাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে।
আর্মাডিলো এ কথায় খুশিতে ফেটে পড়ল, আনন্দে আটখানা হয়ে লোকটির কাছে ছুটে গেল। গান শেখার জন্য সে মরণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি। তখন গায়ক আর্মাডিলোকে বলল, যে গান তুমি শিখতে চাও সে গান এখন শিখতে গেলে তোমার মৃত্যুও হতে পারে, আমি চাই না তোমার মতো এতো সুন্দর একটি প্রাণি এতো অল্প বয়সে মারা যাক এবং আমি তা কিছুতেই হতে দিতে পারি না। আমি এতো সুন্দর প্রাণি পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি দেখিনি। তুমি অল্প বয়সে মারা গেলে এ পৃথিবী তোমার সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হবে।
গায়ক লোকটির এ কথায় আনন্দে আর্মাডিলোর চোখ দিয়ে পানি বেরুতে থাকল, এতো সুন্দর করে আজ পর্যন্ত কেউ তার সাথে কথা বলেনি। এ গায়ক তার লক্ষ্যকে, তার স্বপ্নকে সফল করতে পারবে, এর থেকে খুশির আর কী হতে পারে। হোক না মৃত্যু তাতে কী যায় আসে!
তারপর দুইজন অনেকক্ষণ কথা বলল। গায়ক লোকটি আর্মাডিলোকে বলল, তুমি এখন থেকে শুধু গান শুনবে এবং উপভোগ করবে। যখন তুমি অনেক বুড়ো হয়ে যাবে তখন তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে। তুমি যখন অনেক বুড়ো হবে, তখনই জানতে পারবে কত সুন্দর সুর তুমি তৈরি করতে পারবে।
তারপর আর্মাডিলো জঙ্গলে তার বাসায় ফিরে গেলো। ১৫ বছর সে গান শুনে স্বাভাবিক জীবনযাপন করল, বাকি আট-দশটা আর্মাডিলোর মতো। যখন সে অনেক বৃদ্ধ হয়ে গেল তখন পরিবারের সবার থেকে বিদায় নিয়ে গায়কের কাছে ফিরে আসল। গায়ক আর্মাডিলোকে স্বাগত জানাল এবং তার কথা শোনার জন্য ধন্যবাদ জানাল।
গায়ক বৃদ্ধ আর্মাডিলোকে বোঝাল মৃত্যুর পর কীভাবে সে সঙ্গীতে অবদান রাখতে পারবে, কত সুন্দর সুর সৃষ্টি করতে পারবে! সে জানালো আর্মাডিলোর মৃত্যুর পর সে তার পিঠের খোলস দিয়ে একটি বাদ্যযন্ত্র বানাবে এবং তা দিয়ে অনেক অপূর্ব সুর সৃষ্টি হবে, যা শুনে পুরো পৃথিবী চমকে যাবে। একথা শুনে চরম শান্তিতে বৃদ্ধ আর্মাডিলোর মৃত্যু হলো, যেন হাসতে হাসতেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো। অবশেষে আর্মাডিলো তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে বুঝি পৌঁছাল, সে নানা অপূর্ব সুর সৃষ্টি করবে।
আর্মাডিলোর মৃত্যুর পর গায়ক আর্মাডিলোর খোলস সংগ্রহ করে তার সঙ্গে অনেকগুলো তার জড়িয়ে একটি বেহালা তৈরি করল। সেই বেহালার সুর এত সুন্দর এবং চমৎকার হয় যে সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনতে থাকে। আর্মাডিলোর কথা স্মরণ করে সেই গায়ক যেখানেই যায় সেখানেই বেহালাটি বাজায়। গায়ক যখন রাস্তা দিয়ে বেহালাটি বাজাতে বাজাতে যায়, ঝিঝি পোকা আর্মাডিলোর খোলস দেখে ভাবে, আর্মাডিলো কত সুন্দর করে গান গাইছে! গায়ক যখন পুকুরের পার দিয়ে যায় ব্যাঙ ভাবে, বাহ! আর্মাডিলো কত সুন্দর গান গায়! গায়ক যখন শহরে বেহালা বাজায় আর্মাডিলোর খোলস দেখে ক্যানারি পাখিরা ভাবে আহা! আর্মাডিলো কি চমৎকার গান গাইতে পারে! এভাবে আর্মাডিলো সে দেশের একজন উল্লেখযোগ্য গায়কে রূপান্তরিত হলো। সবাই আর্মাডিলোর সুরের তারিফ করলো। (গল্পটি বলিভিয়ান লোকগল্প ‘দ্য সং অব দ্য আর্মাডিল’ অবলম্বনে রচিত)