বসন্তের রঙে রঙিন নগরী || গান-গল্প ও কবিতায় বসন্তকে বরণ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


বসন্তবরণে মঙ্গলবার নগর জুড়ে ছিলো প্রানের মেলা-সোনার দেশ

শীত যাই যাই। গরমও পড়েনি। গাছে ফুটেছে পলাশ, শিমুল আর রক্তরাঙা জবা। আর এ সময়ে এলো বসন্ত। সেই বসন্তকে উৎসব করে বরণ করে নিলো নগরবাসী। গতকাল মঙ্গলবার বসন্তের প্রথম দিনে দিনভর গান-গল্প, কবিতাপাঠ, আড্ডা ও নৃত্যে বসন্তকে বরণ করে নিলো নগরবাসী। শুধু গান, কবিতাপাঠ বা আড্ডাই নয়, ছিলো আরো নানা অনুষ্ঠান। ছিলো বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, ছিলো পিঠা উৎসব।
গতকাল সকালের সূর্যটাও মনোরম ছিলো। যেন বসন্তের প্রথম সকাল বলেই বর্ণময়। আর এরকম একটা দিনে বসন্তকে বরণ করে নিতে সকাল থেকেই সাজ সাজ রব পড়ে গেলো নগরীতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সকালেই অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। সেই শোভাযাত্রায় ছিলো ঢাক-ঢোল ও বাদ্যি। ছিলো দলবদ্ধ নাচ। এরপর অনুষ্ঠিত হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আর বিকেলে মূল আকর্ষণ ছিলো পদ্মার চর। শুধু পদ্মার চরই নয়, সব বিনোদন স্পটগুলো ছিলো লোকে লোকারণ্য। নগরীর শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান উদ্যান, জিয়া পার্ক, টি-বাঁধ, আই-বাঁধ, পদ্মা গার্ডেন, লালন শাহ মঞ্চসহ সব স্পটগুলো ছিলো নানা বয়সি মানুষের পদচারণায় মুখর। বেশিরভাগ মানুষ পড়েছিলো বাসন্তী রঙের পোশাক। নারীরা মাথায় বেঁধেছিলো ফুলের ব্যান্ড। তবে প্রেমিকা-প্রেমিকাদের সরব উপস্থিতি ছিলো লক্ষণীয়। সেখানকার খাবার দোকানগুলোতে ভিড় ছিলো উপচেপড়া। শুধু খাবার দোকানগুলোতেই নয়, বসন্তকে বরণ করে নিতে গত কয়েকদিন ধরেই ভিড় ছিলো ফুলসহ উপহারসামগ্রীর দোকানগুলোতেও।
এছাড়া বসন্তের বিকেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। নাচ, গান, আবৃত্তি ও কবিতাপাঠে ভরপুর ছিলো সেই অনুষ্ঠানগুলো।
রাজশাহী কলেজ : নানা আয়োজনে রাজশাহী কলেজে বসন্তবরণ উৎসব পালিত হয়েছে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সোয়া ১০টায় রাজশাহী কলেজের নজরুল চত্বর থেকে একটি বিশাল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় রাজশাহী কলেজে এসে শেষ হয়। কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর হবিবুর রহমানের নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন, উপাধ্যক্ষ আল ফারুক চৌধুরী, শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর জোবায়দা আয়েশা সিদ্দীকা। এছাড়া শোভাযাত্রায় কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর বসন্তবরণ উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, প্রকৃতির ছয়টি ঋতুর মধ্যে বসন্ত ঋতুরাজ। এই বসন্তকে বরণ করে নিতে নানা অনুষ্ঠান কর্মসূচি পালন করছে রাজশাহী কলেজ।
বঙ্গবন্ধু কলেজ : ‘বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে..সই গো, বসন্ত বাতাসে..[- অসাধারণ এই গানটি ফুলের গন্ধ ছাড়লেও রাজশাহী বঙ্গবন্ধু কলেজ ছড়াচ্ছে পিঠার গন্ধ। বসন্তবরণে পিঠাউৎসব করে কলেজটি উৎসবের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে সবার প্রাণে। সকালে কলেজ প্রাঙ্গণে ১১টি স্টল পসরা সাজানো হয় বিভিন্ন রঙ ও রকমের পিঠা। শুধু তাই নয়, বাহারি পিঠাগুলো সবাইকে মুগ্ধ করেছে। তেমনি মুগ্ধ করেছে স্বাদেও।
বসন্তবরণ ও পিঠা উৎসবের এবছর কলেজের ক্লাবসহ বিভিন্ন বিভাগ স্টলগুলোতে পিঠার পসরা সাজায়।
কলেজে শিক্ষার্থী আসিফ ও নাজনিন বলেন, স্টলগুলোতে পুলি পিঠা, মাংশের পিঠা, গোকুল পিঠা, খাসতা পিঠা, পাকোয়ান পিঠা, ডিম পিঠা, তালের পিঠা, বকুল পিঠা, গোলাপ পিঠা, সুইট নাগের পিঠা, হাতে কাটা সেমাই পিঠা, কলার পিঠা, স্কুল পিঠা, মাল পোয়া, ডিম পিঠা, মাছ পিঠা, নৌকা পিঠা, কড়ি পিঠা, হৃদয় হরণ পিঠা, জাইম পিঠা, পাটি শাপটা, সাত পিঠা, নকশী পিঠা, ঝিকিমিকি পিটা, গোলাপ পিঠা, বকুল পিটা, সবজি রোল, লবঙ্গ ইত্যাদি। তবে কলেজে মাত্র তিন থেকে ১৫ টাকায় এই বাহারি পিঠার স্বাদ উপভোগ করছে সবাই।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে রাজশাহী বঙ্গবন্ধু কলেজে বসন্তবরণ ও পিঠা উৎসবের উদ্বোধন করেন, অধ্যাপকা তাসলিমা খাতুন। কলেজের অধ্যক্ষ নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন, বসন্তবরণ ও পিঠা উৎসব কমিটির আহ্বায়ক শুকরিয়া ইয়াসমিন, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসহুদুর রহমান। এসময় কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্যবৃন্দসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকগণ উপস্থিত ছিলেন। মেলায় আট নম্বর স্টলে বঙ্গবন্ধু কলেজের ছয়টি ক্লাব তাদের পিঠা ঘরে পিঠা প্রদর্শন ও বিক্রয় করে। এছাড়াও ¯্নাতক (পাস) বাংলা, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, অর্থনীতি সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত, ব্যবস্থাপনা ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ভিন্ন ভিন্ন স্টলে পিঠা প্রদর্শন করা হয়। উৎসব শেষে বিচারকমন্ডলীর বিবেচনায় প্রথম স্থান অধিকার করেন নয় নম্বর স্টলে ব্যবস্থাপনা বিভাগ, দ্বিতীয় হয়েছে দুই নম্বর স্টল একাদশ শ্রেণি এবং তৃতীয় হয়েছে ১০ নম্বর স্টল ইতিহাস বিভাগ। পরে বঙ্গবন্ধু কলেজের পক্ষ থেকে নগরীর ছোটমনি নিবাস রাজশাহীতে শিশুদের সাথে এই পিঠা উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়।
বঙ্গবন্ধু কলেজের উপাধ্যক্ষ কামারুজ্জামান বলেন, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন উৎসব প্রতিবছর পালন করা হয়ে থাকে। আগামীতেও উৎসবগুলো আরো ভালোভাবে পালন করা হবে।
রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ : ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়…’ এই শিরোনামে বসন্তকে বরণ করে নিলো রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদের সদস্যরা। শোভাযাত্রা, ঢাকবাদন, নিবেদিত কবিতাপাঠ, আবৃত্তি, গান, নৃত্য ও নাটকে ভরপুর তাদের অনুষ্ঠান। বিকেল ৫টায় নগরীর আলুপট্টি বঙ্গবন্ধু চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পদ্মা সাংস্কৃতিক সংঘে গিয়ে শেষ হয়। এরপর সেখানে অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ ও আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের আবৃত্তি। অনুষ্ঠিত হয় কবিকুঞ্জের কবিদের কণ্ঠে নিবেদিত কবিতাপাঠ, শ্রীসঙ্গীতালয়ের সদস্যদের কণ্ঠে গান পরিবেশনা এবং রাজশাহী থিয়েটার ও ধ্রুপদালোকের পরিবেশনায় নাটক মঞ্চস্থ হয়।
নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি : নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’তে (এনবিআইইউ) বসন্ত বরণ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার নগরীর বিশ্ববিদ্যালয়ের আলুপট্টিস্থ বঙ্গবন্ধু চত্বরে বসন্তবরণ উৎসব ও উদ্যোক্তা মেলার আয়োজন করেন শিক্ষার্থীরা। নারীনেত্রী, কবি ও কথাসাহিত্যিক ইউনিভার্সিটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রাশেদা খালেক, উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল খালেক ও ট্রেজারার প্রফেসর অবায়দুর রহমান প্রমানিক শিক্ষার্থীদের স্টল পরিদর্শন করেন। বসন্তকে বরণ উপলক্ষে সেখানে শিক্ষার্থীরা হরেক রকমের পিঠা, সুতোর গয়না, বুটিক, বাঙালি ফ্যাশন পোশাক, হস্তশিল্প, নানা জাতের ফুলসহ বিভিন্ন স্টল দেন। দিনব্যাপি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে বসন্ত উৎসবে মেতে ছিলেন।
বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় : বসন্তকে বরণ করে নিতে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উৎসবে মেতে উঠে। ছাত্রীরা মেহেদীর আল্পনায় রাঙিয়ে তুলে নিজেদের হাত ও পিঠা-পুলিতে আপ্যায়িত করে একে অপরকে। এই বসন্ত বরণ উৎসবে শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা, প্রফেসর ড. এম. সাইদুর রহমান খান, উপাচার্য প্রফেসর ড. এম ওসমান গনি তালুকদার ও উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. নুরুল হোসেন চৌধুরী।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিনটা অন্যরকম এক আমেজ বয়ে আনল। বসন্তের চিরাচরিত আগমনী গান, পুতুল নাচ, বসন্ত মেলা ও পিঠা উৎসব তো ছিলই। ঋতুরাজের আগমনকে পূর্ণতা দিতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাথে বসন্তের প্রথম দিনটি কাটালো ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে দিন পার করল সমাজের অবহেলিত শিশুরা। জাঁকজমকভাবে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নিয়েছে ব্র্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানীর মহাখালী ক্যাম্পাসের অডিটরিয়ামে দিনব্যাপী বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস অব কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ। সকালে পতুল নাচ দিয়ে শুরু হয় বসন্ত উৎসবের।
এরপর দুপুরে হয় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিকেলে পুতুল নাচ ও সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী বসন্ত উৎসবের। এছাড়া সারাদিন বসন্ত মেলা ও পিঠা উৎসব ছিল বসন্ত বরণের অন্যতম আকর্ষণ। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত ছিল ব্র্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থী ও পথশিশুদের সঙ্গে বসন্ত উৎসবের বিভিন্ন আয়োজন উপভোগ করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য ড. আনসার আহমেদ ও কোষধ্যক্ষ এস এন কৈরী।
ইস্ট ওয়েস্ট পাবলিক স্কুল
ইস্ট ওয়েস্ট পাবলিক স্কুলের উদ্যোগে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপি বসন্ত বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইস্ট ওয়েস্ট পাবলিক স্কুলের পরিচালক মীর শফিকুল ইসলাম শফিক ও প্রধান শিক্ষক সাবিনা আক্তার সুমির সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ড. শেখ সা’দ আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ কিন্ডার গার্টেন অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান প্রমুখ।