বহু গুনে গুনাম্বিত একজন সফল মানুষ ড. মো. আব্দুর রহমান

আপডেট: নভেম্বর ২, ২০১৯, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

খন্দকার মো. আব্দুস সামাদ


অনেক দিন আগের কথা। আমি তখন সম্ভবত আইএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ‘ভুনু’ নামের এক ব্যক্তি আমার গান শুনে, আমাকে বললেন, ‘তুমি রেডিওতে গান গাবে? আমার এক আত্মীয় আছে, নাম মুস্তাফিজুর রহমান। উনি বড় অফিসার। তোমাকে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেবে, আমার সঙ্গে যাবে। তোমাকে আমি নিয়ে যাবো।’ সত্যি সত্যি তিনি আমাকে একদিন নিয়ে গেলেন রেডিওতে। ভদ্রলোক লুঙ্গি পরা, সাদামাটা লোক। রেডিওর অভ্যর্থনা কক্ষে যথাযথ নিয়ম পালন করে নিয়ে গেলেন জনাব মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের কাছে এবং জনাব মুস্তাফিজুর রহমান (গামা) কে বললেন, ‘মামা এই ছেলেটি ভাল গান গাই। একে আপনি ভর্তি করে নিন।’
জনাব মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব বললেন, ‘বেশতো গান গাবে- একটি হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে নাও, রাস্তায় রাস্তায় গান গাইলে তোমাকে ৪ আনা, ৮ আনা ১ এক টাকা করে দেবে। তোমার গান গাওয়ার শখও মিটবে, দু’টো পয়সাও ইনকাম হবে।’ মনে কত কষ্ট পেয়েছিলাম সেইদিন। আমি ছাত্র, তিনি ভাল উপদেশ দিতে পারতেন! এই উপহাসের বাণী শুনে যিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনিও বড় কষ্ট পেয়েছিলেন। জনাব ভুনু বলেছিলেন, ‘আমার আত্মীয় হন উনি- অথচ এভাবে তোমাকে অপমান করলো, আর কোনোদিন ওর কাছে যাবো না।’
এরপর ১৯৭৫ সালে অডিশন দিয়েই গানের শিল্পী হলাম। তারপর গীতিকার হলাম। জনাব মুস্তাফিজুর রহমান সম্ভবত ওইসময় ARD ছিলেন এবং POজনাব মো. আব্দুর রহমান। মুস্তাফিজুর রহমান জনাব মো. আবদুর রহমান স্যার কে ডেকে বললেন, ‘এই ছেলেটিকে ৭ দিনের কন্ট্রাক্ট (চুক্তিপত্র) দাও।’ পরে জেনেছিলাম উনার নাম মুস্তাফিজুর রহমান (গামা)। স্বনামধন্য একজন পুরষ্কারপ্রাপ্ত গীতিকার। যিনি একসময় কটাক্ষ করেছিলেনÑ সেই তিনিই আবার আমাকে মূল্যায়ন করলেন। এটাও আমার জীবনের জন্য কম অনুপ্রেরণার নয়।
আজও সেই দিনের কথা আমার মনের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বল করছে। সেই স্মৃতি বড়ই করুণ, অমলিন। আজও হৃদয়ের নরম পাতায় ভাস্বর হয়ে আছে। এখনো আমাকে ভাবায়, কাঁদায়ও। আমার প্রাণপ্রিয় মানুষ ড. আব্দুর রহমান আমাকে ৭ দিনের চুক্তিপত্র দিয়েছিলেন। অভাবের সময় বড়ই কাজে লেগেছিল। হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ার পর ভীষণ দরিদ্রতার শিকার হলাম। আমি বড় ছেলে, লেখা পড়া শেষ হয়নি। সংসারে ভীষণ অভাব অনটন, বড় কষ্ট। ছোট ছোট সব ভাই বোন। তাদেরও লেখা পড়ার খরচ চালাতে হয়। কী করবো, একটি পান বিড়ির দোকান দিলাম। বাড়ি বাড়ি প্রচুর টিউশন শুরু করলাম। কিছুটা কষ্ট লাঘব হলো বইকি! কিন্তু অভাব অনটন থেকেই গেল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পরে অবশ্য আমার ‘ল’ চাচা খন্দকার মো. বদর উদ্দীন সংসারের হাল ধরেছিলেন। তার বদৌলতে আমার লেখাপড়া কোনো রকম শেষ করলাম। আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। তিনি পরলোকগত।
আমার মনে জনাব মুস্তাফিজুর রহমানের সেই উক্তি আমাকে সদা সর্বদায় তাড়া করে ফেরে। কী করে শিল্পী হবো। কী করে গীতিকার হবো, কী করে সঙ্গীতের মানুষ হবো। ফলে অন্য পেশায় আর যাওয়া হয়নি। হয়তো কপালে লিখাও ছিলনা। তাছাড়া যে কোনো আন্তরিক চাওয়া ‘আল্লাহ পাক রাববুল আলামিন পূরণ করেন। আমার বেলায় বুঝি তাই-ই ঘটলো। শিল্পী হলাম, গীতিকার হলাম, সুরকারও হলামÑ চাকরিও জুটলো রেডিওতে স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে। কথায় বলে না বিধির লিখন ‘যার হয়না খণ্ডন’! পরলোকগত মুস্তাফিজুর রহমানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতবাসী করুন।
মজার ঘটনা: একদিন আমি ম্যাজিস্ট্রেট পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। ফেরার পথে হঠাৎ দেখছি ফুলবাড়ী বাস স্ট্যান্ডে মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব- চিটাগাং রেডিও থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। সঙ্গে বেশ কয়েকটি ব্যাগ নিয়ে কষ্ট করছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘স্যার আমাকে কিছুটা ব্যাগ দিন। সেতো মহাখুশি। কী ব্যাপার! তুমি কোত্থেকে আসছো? আমার যা আমি বললাম। বাসে চড়লাম। পাশাপাশি সিটে বসলাম। গল্প হলো অনেক। গল্প হলো আমার প্রাণপ্রিয় স্যার জনাব ড. আবদুর রহমান স্যারের। গল্প হলো সেই ভুনু মামার। মুস্তাফিজুর রহমান বললেন, দেখ সামাদ তোমাকে একদিন বলেছিলাম না রাস্তায় রাস্তায় গান গাও। টাকা পয়সা পাবে।্ আমি বলেছিলাম বলে তুমি আজ শিল্পী হয়েছো, গীতিকারও হয়েছো। তোমার ছবিসহ লেখা বেতার বাংলায় ছাপা হয়েছে, আমি দেখলাম। আমি বললাম, জি স্যার। সারা রাস্তার খরচ, খাওয়া-দাওয়া স্যারই বহন করলেন।
এতদিনে বহু বছর পেরিয়ে গেছে। জনাব ড. আব্দুর রহমান স্যারের সাথে আর দেখাও নাই। আর কথাও হয়নি। তবে মনে মনে খুুঁজি। আল্লাহ পাকই ভাল জানেন, হঠাৎ একদিন দেখা। আমি বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্রের গেটের সামনে বসে আছি। স্যারের মুখোচ্ছবি সামনে, সাক্ষাৎ স্যার। স্যারকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলাম, সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে। সেইক্ষণে কিন্তু আমার চোখে কয়েক ফোটা জল ঝরেছিল। আবেগে আপুøত হয়ে পড়েছিলাম।
স্যার ইতোমধ্যেই রেডিওর চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বড় সুযোগ এসেছে, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। ট্রিপুল এমএ ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন। সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, ইংরেজি সাহিত্যেও তাঁর প্রচুর দখল। এমন কী সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখায় তার সাবলীল বিচরণ। একজন বিচক্ষণ গবেষক, সমালোচক, সাহিত্যিক। তিনি একজন সফল গীতিকার, সুরকারও বটে। একজন মানুষের এতো গুণ- সত্যিই অবাক করার মত। প্রকৃতঅর্থেই তিনি একজন সজ্জন, ব্যুৎপত্তিপূর্ণ- সম্পূর্ণ মানুষ। সম্মান, যশ, সুখ্যাতি তাঁর নিষ্ঠ অধ্যবসায়, সাধনা সাফল্য এনে দিয়েছে।
স্যারকে সেদিন বলেছিলাম, আমার সব মনে আছে স্যার! আমি কখনো বুলিনি আপনাকে, আপনার মধুমাখা সুন্দর চেহারাকে।
ড. আব্দুর রহমান স্যার সত্যিকার অর্থে আমার জীবনের বাতিঘর। এই মানুষটির গুনের কথা, জ্ঞানের কথা, অভিজ্ঞতার কথা বলে শেষ করার ভাষা আমার জানা নাই। একজন নির্লোভ, সৎ, সৃজনশীল, পণ্ডিত মানুষ খুব কমই দৃষ্ট হয়। তিনি সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। উন্মুক্ত বিশ্ব বিদ্যালয় ছাড়া রাজশাহী নিউ ডিগ্রী কলেজ, রাজশাহী সরকারি কলেজ ছাড়াও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন, অতি সুনামের সাথে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও তার সফলতা রয়েছে। তিনি আমেরিকা, লন্ডন, চিন, করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সাথে লেকচার প্রদান করে ভূয়ষী প্রশংসা কুড়িয়েছেন। পেয়েছেন যথার্থ সম্মান যা তাঁর জীবনকে অর্থবহ করে তুলেছে, স্বচ্ছন্দ এনে দিয়েছে। স্যারের এই লেকচার সমূহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে এবং ঠাঁই পেয়েছে বিভিন্ন বইতে। যা যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর নিজস্ব চেম্বারে।
উল্লেখ্য, স্যারের এই জ্ঞান গরিমার পরিচয় উঠে এসেছে- দেশ ছাড়াও বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। অবশ্য তাঁকে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এ গল্প তাঁর কাছেই শোনা।
কথার ফাঁকে স্যার মা জননীর কথা বললেন, আমার মায়ের দোয়াছিল। দোয়ার বরকতে আমি এই সব অর্জন করেছি। আমিও বললাম, ‘স্যার আমার মা জানও আমার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করতেন।’
স্যারের সঙ্গে যখনই দেখা করি, কথা বলি, আমার তখন মনে হয়/ মনের আকাশের মেঘ কেটে গেল। যখন তাঁর গল্প শুনি, মনে হয় যেন খোলা আকাশের নীচে নির্ঞ্ঝাট, কোলাহলমুক্ত পরিবেশে অবগাহন করছি। যতই শুনি তার মুখের বাণী- ততই মুগ্ধ হই। যতক্ষণ বসে থাকি, ততক্ষণই মনে হয় মাথার উপর একটি বিরাট ছাদ/ ঘরের জানালা দিয়ে জোসনার আলো আমার গায়ে এসে পড়ছে। মনের সকল দুঃখ ব্যথা বেদনা, প্রশমিত হচ্ছে, সেই আলোর ঝলকানিতে।
শিক্ষকতার সুবাদে দেশ বিদেশের অনেক জ্ঞানীগুনী মানুষের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে- ঘটেছে সুনিবিড় মধুময় পরিচয় যা স্যারের এক দুর্লভ জীবনের গল্পকথা, সোনাঝরা দিন। জীবনের চরম সার্থকতা একটা মানুষের এখানেই। আমি এটা দেখেছি এবং মনে প্রাণে অনুধাবন করেছি। অবশ্য স্যারের একটা মানবীয় বড় গুন যে, তিনি মনের মত মানুষ পেলে অকপটে জীবনের সমস্ত কথা নিঃসংকোচে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। এটা একটা বড় মাপের মানুষ বলেই সম্ভব! তাছাড়া তাঁর সহজ-সরলতা মানুষকে আকর্ষণ করে।
তাঁর সহধর্মীনী আমি যাঁকে সহসাই ম্যাডাম সম্বোধন করি। তিনিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক। বেশ সুনামের সাথে শিক্ষকতা করছেন। স্যারের সন্তান, সন্তানের স্ত্রীও চমৎকার মানুষ।
স্যার একজন দানশীল মানুষ। দানের হাত সবসময় প্রশস্ত থেকেছে, আজো তেমনি আছে। ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহর একটি উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্যÑ ‘যে দেশে গুনীজনের সমাদর নাই। সেই দেশে গুনীজন তৈরি হয় না।’
আমি আমার প্রাণপ্রিয় স্যারের সাথে ঘরোয়া কোনো এক বৈঠকে নয়Ñ তাঁর নিজস্ব চেম্বারে একই ফ্রেমে বাঁধা পড়লাম। মনের ভেতরে শুধু উঁকি দেয়- প্রতিদিনই স্যার কে নিয়ে কিছু বলতে চাই। অনেক কিছু বলার ছিল, বলতে চাইÑকিন্তু তা আর ভাষা খুঁজে পাই না। থেকে গেল অনেক অনুভুতি, অনেক বিরহ বেদনার কথা। আল্লাহ পাক সময় সুযোগ যদি দেন কখনো, কোনো একদিন বলবো।
লেখক : (অব. নি.শি ), গীতিকার /সুরকার সঙ্গীত প্রযোজক স্ক্রিপ্ট রাইটার, বাংলাদেশ বেতার, রাজশাহী