বাংলাদেশি ডেনিমের জয়যাত্রা

আপডেট: নভেম্বর ৬, ২০১৭, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ডেনিম পণ্যের জন্য বাংলাদেশ এখন ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মার্কেটে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান বিভাগের ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বাংলাদেশ ৬০৩.১৪ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের ডেনিম পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয় রফতানি করেছে। ২০১৬ সালের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ৫৭০.৮১ মিলিয়ন ইউরোর। এ হিসেবে ডেনিম পণ্যে রফতানি আয় বেড়েছে ৫.৬৭ শতাংশ। গত বছর ইইউ দেশগুলোয় এক দশমিক ২৯ বিলিয়ন ইউরোর ডেনিম রফতানি করে বাংলাদেশ।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসেবে ডেনিম পণ্য রফতানিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তুরস্ক। তারা এ পর্যন্ত রফতানি করেছে ৫৫১.১৪ মিলিয়ন ডলারের ডেনিম। গত বছরের তুলনায় দেশটির প্রবৃদ্ধি ৫.২৮ শতাংশ। একই সময়ে, পোশাক রফতানিতে শীর্ষে থাকা চিনের আয় গত বছরের তুলনায় সাত দশমিক ৭৭ শতাংশ কমেছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত তাদের রফতানি আয় ২৪০.৭৮ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৬১ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি ও জুলাইয়ের মধ্যে ডেনিম পণ্য রফতানি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ ৩৯২ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার বাংলাদেশের আয়ের পরিমাণ বেড়েছে ৬.৬১ শতাংশ। তবে মার্কিন বাজারে শীর্ষ রফতানিকারক চীনের এবার রফতানি ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ কমেছে। তাদের এবারের রফতানি আয় ৮৮৫ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার। যা গত বছরে ছিল ৯১৩ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপারেল মার্কেটে বাংলাদেশের যেসব ডেনিম বেশি যাচ্ছে সেগুলো হলো– ব্লু ডেনিম ট্রাউজার্স ডব্লিউজি, ব্লু ডেনিম ট্রাউজার্স এমবি, ব্লু ডেনিম স্কার্ট, ব্লু ডেনিম জ্যাকেট, ব্লু ডেনিম স্যুট টাইপের কোট এমবি, প্লে স্যুট ও সানস্যুট।
স্কয়ার ডেনিমের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) সাঈদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এই সময়ে আমরা ডেনিম প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে ডেনিম ফ্যাব্রিক্সের প্রচুর অর্ডার পাচ্ছি। চীন এসব ডেনিম ফ্যাব্রিক্স রফতানি করা থেকে সরে আসায় আমরা এ অর্ডার পাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের প্রতিমাসে ডেনিম ফ্যাব্রিক্স উৎপাদন ক্ষমতা এক দশমিক ৫ মিলিয়ন গজ। চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় আগামী মাস থেকে তা তিন মিলিয়নে নিয়ে যাওয়া হবে। ’
এনভয় টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম মুর্শেদি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি ডেনিম ইন্ডাস্ট্রির প্রসারের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের ডেনিম পণ্যের চাহিদা বিশ্বে দিন দিন বেড়েই চলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। কারণ, ডেনিমের কাঁচামালের জন্য আমরা এখনও অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের এসব কাঁচামাল এখনও আমদানি করতে হচ্ছে। ’
তবে এই ইন্ডাস্ট্রিকে আরও উদ্ভাবনী হতে বলে মনে করেন মুর্শেদি। তিনি বলেন, ‘ডিজাইনে যত বৈচিত্র্য আসবে, আমাদের পণ্য তত বেশি দাম পাবে। বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের ডিজাইন উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে অধিক মনোযোগী হতে হবে।’ সালাম মুর্শেদি আরও বলেন, ‘বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে ডিজাইনে ক্ষেত্রে আরও ভ্যারিয়েশন আনত হবে পাশাপাশি আমাদের প্রোডাক্টগুলোর দাম বাড়াতে হবে।’
ইন্ডাস্ট্রি সূত্র অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বিশ্বে প্রায় দুই বিলিয়ন ইউনিট ডেনিম জিনস বিক্রি হয়েছে। ২০২১ সালে বিক্রি দুই বিলিয়ন ইউনিট অতিক্রম করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন নতুন উদ্ভাবন ও সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দিয়ে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে পারে। এসব কাজ ঠিকমতো করতে পারলে বাংলাদেশ খুব সহজেই ডেনিম পণ্যের উৎসস্থলে পরিণত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একই সময়ে ব্যবসার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যেমন বন্দরে জট দূর করা বা গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ইত্যাদি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।’
এ খাতের যত চ্যালেঞ্জ : ডেনিমের কাপড় তৈরি করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাজ চলাকালে লোডশেডিং হলে ডেনিম কাপড়ের মান নিয়ন্ত্রণ কষ্টকর। এছাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে নতুন করে বিনিয়োগ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আরগন ডেনিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনওয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ডেনিম ট্রাউজার্সের অনেক অর্ডার রয়েছে। কিন্তু ক্রেতারা যে মানের কাপড় চায় তা অনেক সময় প্রত্যাশা অনুযায়ী দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের আমাদের লোকবল কম।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে আমাদের অবশ্যই কাপড়ে নতুনত্ব আনতে হবে। ’
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) হিসেবে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৩২টি ডেনিম মিল রয়েছে। এগুলোর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪৪২ মিলিয়ন মিটার। এসব মিলে কাজ করেন ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক। আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে আরও ১০টি নতুন ডেনিম মিল কোম্পানি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।