বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : যে নিবন্ধ পাল্টে দিয়েছিল ইতিহাস

আপডেট: December 8, 2019, 1:07 am

নিজস্ব প্রতিবেদক


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ঢাকায় অবস্থান করা বিদেশি সাংবাদিকদের অবশ্য এর আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে। এরপর আট জন সাংবাদিককে দশ দিনের একটি সফরে পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়, যাদের মধ্যে রয়েছেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাসও।
যখন তারা আবার পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান, তখন তাদের মধ্যে সাতজন সাংবাদিক পাকিস্তানি সরকারের চাহিদা অনুযায়ী রিপোর্ট করেন। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটে করাচির মর্নিং নিউজের সাংবাদিক এবং ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান সংবাদদাতা অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর ক্ষেত্রে।
ইভোন মাসকারেনহাস স্মৃতিচারণা করছেন, “আমি কখনোই আমার স্বামীর এ রকম চেহারা দেখিনি আগে। তিনি ছিলেন খ্বুই ক্ষুব্ধ, চিন্তিত, বিষণ্ন আর আবেগী।”
তিনি বলেন, “আমি যা দেখেছি, সেটা যদি আমি লিখতে না পারি, তাহলে আমি আর কখনোই অন্য কোনো কিছু লিখতে পারবো না।”
তবে পাকিস্তানে সেটা লেখা সম্ভব নয়। কারণ গণমাধ্যমের সব প্রতিবেদনই সেখানে সেন্সর করা হয়। এবং তিনি যদি সেই চেষ্টা করেন, তাকে হয়তো গুলি করেই মারা হবে।
অসুস্থ বোনকে দেখার নাম করে মাসকারেনহাস তখন লন্ডনে চলে যান। এরপর সরাসরি লন্ডন টাইমসের সম্পাদকের দপ্তরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন।
তিনি তাকে বলেন, ”আমি পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং আর্মি অফিসারদের বলতে শুনেছি যে এটাই একমাত্র সমাধান।”
হ্যারল্ড ইভান্স প্রতিবেদনটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু বলেন যে তার আগে করাচি থেকে ইভোন আর তার সন্তানদের বের করে আনতে হবে।
তারা সিদ্ধান্ত নেন তাদের প্রস্তুত করতে একটি সংকেতমূলক টেলিগ্রাম পাঠানো হবে, যেখানে লেখা হবে, “অ্যানের অপারেশন সফল হয়েছে।”
ইভোন মাসকারেনহাস বলছেন, ”পরদিন ভোর তিনটায় আমি টেলিগ্রামটি পাই। তখন আমার মনে হয়েছিল, ও ঈশ্বর, এখন আমাদের লন্ডন যেতে হবে। আমাকে সবকিছু এখানে ফেলে রেখে যেতে হবে। এটা যেন শেষকৃত্যের মতো একটা ব্যাপার ছিল।”
সন্দেহ এড়াতে পরিবার রওনা হবার আগেই অ্যান্থনি মাসকারেনহাস আবার পাকিস্তানে ফিরে যান। কিন্তু তখনকার নিয়ম অনুযায়ী, পাকিস্তানি নাগরিকরা বছরে একবার বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পেতেন। তাই পরিবার চলে যাওয়ার পর তিনি সড়ক পথে গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে আফগানিস্তানে ঢুকে পড়েন।
যেদিন লন্ডনে পুরো পরিবার আবার একত্রিত হয়, তার পরের দিন সানডে টাইমস পত্রিকায় ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল,’গণহত্যা’।
‘প্রতারণা’
এটি খুবই শক্তিশালী একটি প্রতিবেদন ছিল, কারণ মি. মাসকারেনহাস পাকিস্তানি সামরিক অফিসারদের খুবই বিশ্বস্ত ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতেন।
সামরিক ইউনিটগুলোর হত্যা আর আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার অভিযান আমি নিজে দেখেছি। বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দেয়ার পর শহর আর গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দেখেছি। আমি দেখেছি, পুরো গ্রামের ওপর শাস্তিমূলক অভিযান চালাতে।
অফিসার্স মেসে রাতের বেলায় কর্মকর্তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে তারা কতটা সাহস দেখিয়ে সারাদিন ধরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।
আপনি কতজনকে মেরেছেন? তাদের উত্তর আমার এখনও মনে আছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশকে পাকিস্তান প্রতারণা হিসাবে দেখেছে এবং অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে শত্রু এজেন্ট হিসাবে গণ্য করেছে। তার এই প্রতিবেদনের তথ্যকে তারা অস্বীকার করে একে ভারতীয় প্রোপাগান্ডা হিসাবে দাবি করেছে।
এরপর থেকে লন্ডনেই বাস করেন মি. মাসকারেনহাস ও তার পরিবার।
তবে তারপরেও সবসময়েই পাকিস্তানে যোগাযোগ রক্ষা করে এসেছেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। ১৯৭৯ সালে তিনিই প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যে পাকিস্তান পারমানবিক অস্ত্র তৈরি করছে।
১৯৮৬ সালে তিনি লন্ডনে মারা যান।
বাংলাদেশে তাকে এখনো স্মরণ করা হয় এবং তার এই নিবন্ধটি দেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা