বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বিপ্লব

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০১৭, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বিপ্লব ঘটে গেছে। অর্থমন্ত্রী সোমবার সংসদে জানিয়েছেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন এখন ৮৪৪ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়। গ্রাহক ৫ কোটি ২৬ লাখ, যা বাংলাদেশের মোট জনগেষ্ঠীর এক তৃতীয়াংশ।
সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের পক্ষে এক প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য জানান খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান মোবাইল ব্যাংকিং চালু করেন। এরপর অবিশ্বাস্য গতিতে এটা জনপ্রিয় হয়। দাবি করা হয় বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক বেশি।
সংসদে দেয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), যা মোবাইল ব্যাংকিং নামে পরিচিতি পেয়েছে, তার মাধ্যমে দিনে গড়ে ৪৯ লাখ ৫ হাজারটি লেনদেন হয়। এতে গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হওয়া অর্থের পরিমাণ ৮৪৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বর্তমানে এমএফএস সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৭টি। এজেন্ট সংখ্যা ৭ লাখ ৪৬ হাজার এবং গ্রাহক ৫ কোটি ২৬ লাখ। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক এখন বাংলাদেশের মোট জনগেষ্ঠীর এক তৃতীয়াংশ।
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং চালু হয় ২০১০ সালে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২৮টি ব্যাংক অনুমোদন নেয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স নিলেও চালু করে ১৭টি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক ছিল ৩ কোটি ১২ লাখ। আর প্রতিদিন গড়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হতো প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। মাত্র দেড় বছরে গ্রাহক এবং টাকা লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৮০ ভাগ বেড়েছে।
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি বোঝার জন্য আরো একটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে যে, এর প্রবৃদ্ধি হঠাৎ করে নয়। শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে এটা দ্রুত জনপ্রিয় হয়। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক ছিল ৩ কোটি। কিন্তু মাত্র একমাসে নভেম্বরে গ্রাহক ১২ লাখ বেড়ে দাড়ায় ৩ কোটি ১২ লাখ, যা তখন ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ। গত তিন বছরে  গ্রাহক বাড়ার হার হলো শতকরা ৫২৪ ভাগ।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা হলো, এই অ্যাকাউন্ট করতে আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হয় না। মোবাইল ফোন থাকলেই যে কেউ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন আর টাকা লেনদেন করতে পারেন বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকে। তাঁকে ব্যাংকের শাখায় যেতে হয় না। মোবাইল ফোনের কল রিচার্জ বা ‘ফ্লেক্সিলোড’ যারা করেন মূলত তারই এখন মোবাইল ফোন ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট। তাদের কাছে ন্যাশনাল আইডি কার্ড জমা দিলে তারাই অ্যাকাউন্ট খুলে দেন। মোবাইল ফোন নম্বরটিই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নম্বর। থাকে একটি পাসওয়ার্ড। এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে পারেন তিনি।
নগদ টাকা তুলতে মাঝখানে থাকেন একজন এজেন্ট। তাঁরা মূলত ছোট ব্যবসায়ী, যাঁরা নিজের দোকান-ঘরেই লাইসেন্স নিয়ে থাকেন ব্যাংকের কাছ থেকে। অর্থাৎ মোবাইল ব্যাংকিং মানুষের সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে, কমিয়েছে ভোগান্তি। এ কারণেই এ পদ্ধতি এত দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। একজন মুদি দোকানদার জামাল হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘টাকা লেনেদেন ছাড়াও মোবাইলে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে যে টাকা থাকে, সেই টাকা জরুরি প্রয়োজনে যে কোনো এজেন্টের মাধ্যমে ক্যাশ করা যায়। এছাড়া টাকা লেনদেন করা মুহূর্তের ব্যাপার। শুধুমাত্র এজন্টরা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন কেটে নেন। ব্যাংকের মাধ্যমে এটা করা অনেক ঝামেলার ব্যাপার। আর আমার সময়ও বেঁচে যায়।’’
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তরিকুল ইসলাম সজীব ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাংকিয়ের কারণে এখন আমার অ্যাকাউন্ট থেকে নানা ধরনের ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে পারি। কেনাকাটা করতে পারি। এভাবে কেনাকাটা করলে এখন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ শতকরা ১০ টাকা পর্যন্ত ‘ডিসকাউন্ট’ পাওয়া যায়।’’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাকিং সহজ এবং এর নেটওয়ার্ক অনেক বিস্তৃত। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের এজেন্ট আছে আর মোবাইল ফোনের নেওয়ার্কও দেশজুড়ে বিস্তৃত। প্রচলিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ঝামেলাপূর্ণ হওয়ায় এই মোবাইল ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মানুষ সহজে দ্রুত টাকা পাঠাতে চায় এবং দ্রুত তুলতে চায়।’’
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সাধারণ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সব সুবিধা নেই। এটা প্রধানত টাকা লেনদেনের কাজ করে। ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো না কোনো ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে দেশের বিপূল জনগোষ্ঠীর যারা সরাসরি ব্যাংকিংয়ের আওতায় আগে আসেননি, তারাও এর মাধ্যমে ‘ব্যাংকিং সিস্টেম’-এ আসলেন। এতে অর্থনীতি বিশেষ করে ‘ইনক্লুসিভ’ অর্থনীতি লাভবান হচ্ছে। বিরাট এক জনগোষ্ঠিকে বিকল্প এক ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা যাচ্ছে।’’
তবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ‘মানি লন্ডারিং’সহ জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ ওঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক লেনদেন ও অ্যাকাউন্ট খোলায় কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করেছে। দিনে এখন ১০ হাজার টাকার বেশি লেনদেন করা যায় না। তাছাড়া একবারে পাঁচ হাজার টাকার বেশি লেনদেন করলে গ্রাহকের ছবি লাগে। অ্যাকাউন্ট খুলতে লাগে জাতীয় পরিচয়পত্র।
খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘‘জঙ্গি অর্থায়ন হতেই পারে। সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ‘মনিটরিং’ চালু করেছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকগুলোকে দায়বদ্ধ করেছে। টাকা লেনদেনের সর্বোচ্চ সিলিং বেধে দিয়েছে। ৫-১০ হাজার টাকায় এখন আর কী জঙ্গি অর্থায়ন হবে! মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এখনো বড় ধরনের কোনো অনিয়ম বা অঘটন ঘটেনি।’’
প্রসঙ্গত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সেবাগুলোর মধ্যে অর্থ স্থানান্তর (পিটুপি), নগদ জমা (ক্যাশ ইন) এবং নগদ উত্তোলন (ক্যাশ আউট) সবচেয়ে জনপ্রিয়। মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস ব্যবহার করে বেতন-ভাতা প্রদান, ইউটিলিটি বিল পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। বাড়ছে কেনাকাটাও।- ডয়চে ভেলে