বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে কিউবি

আপডেট: জুলাই ২, ২০১৮, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


গ্রাহক ধরে রাখার ব্যর্থতায় ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য পায়নি ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কিউবি। অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার টানাপড়েন কিউবির আর্থিক ভিত আরো দুর্বল করেছে। লং টার্ম ইভল্যুশনের (এলটিই) জন্য বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও জোগান আসছে না। এসব কারণে এরই মধ্যে জনবল কমিয়ে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রধান কার্যালয়ও গুলশান থেকে মিরপুরে স্থানান্তর করেছে। এখন বাংলালায়নে গ্রাহক স্থানান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসাই গুটিয়ে নিচ্ছে কিউবি।
ব্যবসা বন্ধের অংশ হিসেবে কিউবি গ্রাহক স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করলেও তা করছে গ্রাহক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই। ছয় বছরের বেশি সময় ধরে ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান কিউবির সেবা ব্যবহার করছেন রাজধানীর গুলশানের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন। সম্প্রতি সেবাদাতা এ প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া এসএমএসে জানতে পারেন এখন থেকে তিনি বাংলালায়নের গ্রাহক। ওই এসএমএসে তার নতুন বাংলালায়ন অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যও দেয়া হয়। অথচ সংযোগ পরিবর্তন-সংক্রান্ত কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি তার কাছ থেকে। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকেও গ্রাহক স্থানান্তরে কোনো ধরনের অনুমতি নেয়নি ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান দুটি।
জানা গেছে, নিজেদের মধ্যে গত মাসে সম্পাদিত এক চুক্তির ভিত্তিতে গ্রাহক হস্তান্তরের এ কার্যক্রম শুরু করেছে কিউবি ও বাংলালায়ন। চুক্তির আওতায় কিউবির গ্রাহকদের পর্যায়ক্রমে বাংলালায়নের সেবার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। রাজস্ব ভাগাভাগির ভিত্তিতে নিজেদের গ্রাহককে বাংলালায়নের কাছে হস্তান্তর করছে কিউবি। এরই মধ্যে কিউবির অনেক গ্রাহকই বাংলালায়নে স্থানান্তরের বার্তা পেয়েছেন।
বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহুরুল হক এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, এমনিতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া নিজেদের গ্রাহক অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ নেই। এছাড়া এমন হস্তান্তর হতে পারে দুটি প্রতিষ্ঠান একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে। অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হলে গ্রাহকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই কিউবি তাদের গ্রাহক স্থানান্তর করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, দ্রুতগতির তারবিহীন ইন্টারনেট সেবা দিতে ২০০৮ সালে ব্রডব্যান্ড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস (বিডব্লিউএ) লাইসেন্স পায় কিউবি। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নিলামের মাধ্যমে ২১৫ কোটি টাকায় এ লাইসেন্স নেয় প্রতিষ্ঠানটি। ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সের নিলামের ক্ষেত্রে এ দর বিশ্বের সর্বোচ্চ। উচ্চমূল্যে লাইসেন্স নেয়ার পর ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়ে কিউবি।
উচ্চমূল্যের লাইসেন্স, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও গ্রাহক ধরে রাখতে ব্যর্থতার কারণে ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য পায়নি ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে ২০১৩ সালে এলটিই প্রযুক্তি সেবা চালু করে কিউবি। কিন্তু এলটিইর জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও তার জোগান পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি তাতে। এসব উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় এরই মধ্যে জনবল কমিয়ে আনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় গুলশান থেকে ছোট পরিসরে মিরপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও এমন সম্ভাবনা নেই বলে দাবি করেন কিউবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফয়সাল হায়দার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এরই মধ্যে বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জে স্বল্প পরিসরে এলটিই সেবার কার্যক্রম চালু করেছে কিউবি। সেবার বিস্তৃতিতে নতুন করে বিনিয়োগেরও চেষ্টা চলছে। তবে পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় গ্রাহকসংখ্যা কমে আসায় অনেক জায়গায় সেবাটি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এসব গ্রাহককে হস্তান্তরে বাংলালায়নের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। গ্রাহকের অনুমতি সাপেক্ষে বাংলালায়ন তাদের সেবা দেবে।
বাংলালায়ন সূত্র বলছে, কিউবি সেবাটি বন্ধ করে দিচ্ছে। তারা তাদের গ্রাহকদের বাংলালায়নের কাছে হস্তান্তর করছে। কিউবি এরই মধ্যে গ্রাহকদের কয়েকটি নোটিফিকেশন দিয়েছে। আর এসব গ্রাহককে তাদের বর্তমান প্যাকেজের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন প্যাকেজ অফার করছে বাংলালায়ন।
জানতে চাইলে বাংলালায়নের চিফ মার্কেটিং অফিসার জিএম ফারুক খান বলেন, আমরা তাদের গ্রাহকদের সম্ভাব্য গ্রাহক হিসেবে ধরছি। শুধু তাদের সাহায্য নিয়ে নোটিফিকেশন দিচ্ছি। চেষ্টা করছি আরো ভালো প্যাকেজ দিয়ে তাদের বাংলালায়নের সেবার আওতায় আনতে।
গ্রাহক কমে যাওয়ায় সরকারের পাওনাও নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না কিউবি। লাইসেন্স ও তরঙ্গ বরাদ্দ ফি এবং আয় ভাগাভাগির অংশ হিসেবে অজের ওয়্যারলেস ব্রডব্যান্ড বাংলাদেশ লিমিটেডের (কিউবি) কাছে সরকারের পাওনা প্রায় ৩৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তরঙ্গ বরাদ্দ ফি বাবদ ১৩ কোটি ২৫ লাখ, বিলম্ব ফি বাবদ ১৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ও মূল্য সংযোজন কর বাবদ পাওনা রয়েছে ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক অজের হোল্ডিংসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কিউবির ব্যবসা রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও উগান্ডায়। টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জের সাবেক প্রধান নির্বাহী সঞ্জীব আহুজা অজেরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও অংশীদার। অজের হোল্ডিংসের সঙ্গে যৌথভাবে টেলিপোর্ট বাংলাদেশ ও আমরা রিসোর্সেস ২০০৮ সালে গঠন করে অজের ওয়্যারলেস ব্রডব্যান্ড বাংলাদেশ লিমিটেড। ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিক অজের হোল্ডিংসই কিউবির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে।
বিটিআরসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ধারাবাহিকভাবে গ্রাহক হারাতে শুরু করে ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তিনির্ভর সেবাটি। ২০১০ সালে কিউবির মোট গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৬৬৬। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ হাজার ৮৩৬ ও ২০১২ সালে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৯। চলতি বছরের মে মাস শেষে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা ৫০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা