বাংলার গৌরব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম

আপডেট: মে ১৯, ২০১৯, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

মো. সফিকুল ইসলাম


পর্ব- ৮
(আজকের পর্বের বিষয় দৈনিক সোনার দেশ-এ প্রিয় পাঠক আগে একবার পড়েছেন। বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা কুমার শরৎকুমার রায়ের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে আমার চার পর্বের লেখা ছাপা হয়েছিল গত ১২, ১৩, ২৩ ও ২৪ এপ্রিলে। সেখানে পাহাড়পুর ও মাহিসন্তোষ খননে কুমারের অবদান নিয়ে আলোচিত হয়েছে। ‘বাংলার গৌরব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ শিরোনামের লেখার ক্রম রক্ষার্থে এই লেখা উপস্থাপন আবশ্যক, তাই পুনরায় প্রকাশ, তবে, কিছুটা ভিন্নতা আছে)।
শরৎকুমারের পাহাড়পুর মহাবিহার খনন
বাঙালি জাতির লুপ্ত ইতিহাস-ঐতিহ্য খুঁজে বের করার বিষয়ে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষত বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন প্রত্নস্থল খনন করে অমূল্য প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ করে বাংলার ইতিহাস বির্নিমাণ করে। ঐতিহাসিক পাহাড়পুর প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার অন্যতম গৌরবস্তম্ভ। পাহাড়পুরের প্রত্নঐশ্বর্য বরেন্দ্রের পরম সাংস্কৃতিক সম্পদ; বাঙালি জাতির অহংকার। পাহাড়পুর ইউনেস্কো ঘোষিত ‘বিশ্ব-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’। পৃথিবীর সকল মানুষ এই গৌরবের অংশিদার। তাই, পাহাড়পুর এখন বিশ্ব-বাঙালির গর্ব। পাহাড়পুরের এই গৌরবস্তম্ভের অমর ¯্রষ্টাও কুমার শরৎকুমার রায়। পাহাড়পুর মহাবিহার খনন করে কুমার শরৎকুমার রায় বাংলার ইতিহাসে কীর্তিমান হয়ে আছেন। তিনি অর্থ দিয়ে পাহাড়পুর খনন করিয়েছেন। মাতৃভূমির লুপ্ত ইতিহাস আবার আলোয় নিয়ে এসেছেন। সৃষ্টি করেছেন অমর সভ্যতার, যে সভ্যতা বাঙালি জাতিকে বিশ^সমাজে গৌরবদীপ্ত করেছে।
কুমার শরৎকুমার রায়ের পাহাড়পুর খনন বিষয় আলোচনা হবে। তবে, বিশেষভাবে একটি ছবির কথা বলবো। এই ছবিটি প্রায় শতবর্ষ আগের। পাহাড়পুরের এই ছবি বাংলার ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তবে, আগে পাহাড়পুরের কিঞ্চিৎ পরিচয় দিতে চাই। কারণ, শরৎকুমার রায়কে চিনতে হলে পাহাড়পুরকে জানতে হবে। পাহাড়পুর ও শরৎকুমার রায় নিবিড় পরস্পর সম্পর্কিত এবং উভয়ে উভয়কে চেনাবে।
বাংলার পাল সাম্রাজ্যের স্থপতি গোপালের পুত্র ধর্মপাল অষ্টম শতকের শেষ দিকে পাহাড়পুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিহার মূলত ওই সময়ের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। প-িত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, রত্নপাল শান্তি, বৌদ্ধবুদ্ধের ন্যায় অনেক খ্যাতিমান প-িত পাহাড়পুরে ভিক্ষু (ছাত্র) হিসেবে জ্ঞান আহরণ করেছেন আবার এখানে শিক্ষকতা করেছেন। নিষ্ঠা আর জ্ঞানসাধনা দিয়ে সমাজ ও জীবনের বিকাশ ঘটিয়েছেন। দেশ-বিদেশের পুর্ণ্যার্থী ও জ্ঞান অন্বেষণকারীরা ছুটে এসে পাহাড়পুরকে আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় পরিণত করেন, বিশেষ করে তিব্বত থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ এসেছেন। পাহাড়পুর বিহারে বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সর্বজনীন শিক্ষা দেয়া হতো। নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সুদীর্ঘ চারশ বছর পাল আমলের পুরো সময়েই পাহাড়পুর-বিহার টিকে ছিল। আবার অনেক প-িত মনে করেন, বহিঃশত্রুর পাষ- আক্রমণে বিহার প্রথমে জনশূন্য হয় এবং পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শতশত বছর চাপাকান্না বুকে নিয়ে ঝোপ-জঙ্গলে পরিণত হয় বাংলার এক সময়কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই বিদ্যানিকেতনটি।
বাংলার সরকারের নির্দেশে ডাক্তার ফ্রান্সিস বুকানন হেমিল্টন পূর্বভারতে একটি জরিপ পরিচালনার (১৮০৭-১৮১২ খ্রিস্টাব্দ) অংশ হিসেবে (১৮০৭-১৮১২ খ্রিস্টাব্দ) তিনি পাহাড়পুরে এসে অনুমান করেন সেখানে অমূল্য প্রত্নসম্পদ লুকিয়ে আছে। এরপর ১৮৭৫ সালে দিনাজপুরের (পাহাড়পুর তখন দিনাজপুর জেলাধীন) তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়েস্টম্যাকেট পাহাড়পুর পরিদর্শনে আসেন। দুজনেই প্রতিবেদন প্রকাশ হলে সরকার ও সাধারণ্যের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। তাঁদের বিবরণের জের ধরেই উপমহাদেশের প্রত্নতত্ত্বের পথিকৃৎ ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের মহাপরিচালক স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ সালে পরিদর্শন করেন এবং মন্দিরের শীর্ষদেশে (তখন দেখতে পাহাড় অকৃতির) একটি ছোট আকারের খনন কাজ চালিয়েই অমূল্য প্রত্ননিদর্শনের সন্ধান পান। তবে, স্থানীয় বলিহার জমিদারের বিরোধিতা, দুর্গম জঙ্গলের বিষাক্ত সাপ ও চিতাবাঘের উপদ্রব উপেক্ষা করে খনন কাজ শুরু করতে হয় কানিংহামকে। এখানে বলা প্রয়োজন, শরৎকুমার রায়ের অর্থায়নে যখন খনন হয় পাহাড়পুর তখন রাজশাহী জেলার অধীন এবং পুরনো নথি-পত্রে পাহাড়পুরকে রাজশাহী হিসেবে দেখানো আছে। ফলে, পাহাড়পুরের সমুদয় সাস্কৃতিক সম্পদ রাজশাহীর গৌরবময় সম্পদ হিসেবেও বিবেচ্য। এ কথা বলা যেতেই পারে, এই গৌরবের গর্বিত অংশিদার রাজশাহীর মানুষও।
খননেন পূর্বেই শরৎকুমার রায়ের লেখায় পাহাড়পুরের বর্ণনা এসেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বর্ণনা দিয়ে ‘উত্তরবঙ্গের প্রত্ন-সম্পৎ’ শিরোনামে কুমার রচিত এক প্রবন্ধ ছাপা হয় কলকাতার ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় ১৩২১ বঙ্গাব্দে জৈষ্ঠ সংখ্যায়। পাহাড়পুরের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘উত্তরবঙ্গ রেলপথের জামালগঞ্জ স্টেশনের প্রায় দুই ক্রোশ পশ্চিমে পাহাড়পুর নামক একটি স্থান আছে। এইখানে প্রায় ৮০ ফুট উচ্চ জঙ্গলাকীর্ণ একটি সুবিশাল ইষ্টকময় স্তূপ আছে। এই স্তূপের সহিত গোপালের নামের সং¯্রব রহিয়াছে।’
পাহাড়পুরে এই ধ্বংসাবশেষ ১৯০৪ সালের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন বলে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয় ১৯১৯ সালে সরকারিভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। এমনই পটভূমিতে শরৎকুমার রায়ের বিশেষ দৃষ্টি নিবন্ধ হয় এই পুরাকীর্তির প্রতি। বলিহারের জমিদার ছিলেন আঞ্চলিক জমিদার, অপরদিকে শরৎকুমার রায় ছিলেন রাজশাহীর বিখ্যাত জমিদার এবং বাংলার গভর্নর ও লাট সাহেবদের নিকট তিনি ছিলেন অতি গুরুত্বপূর্ণ। শরৎকুমার রায়ের প্রভাবে টিকতে পারেনি বলিহারের জমিদার।
শরৎকুমার রায় পরম মমত্ব ও নিষ্ঠা দিয়ে যেমনি বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করেছেন তেমনিভাবে পাহাড়পুর খননও করেছেন। মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বলে বিবেচিত হয়। পাহাড়পুর মহাবিহার খনন করাও আরেকটি শ্রেষ্ঠ কাজ। আগেই বলা হয়েছে যে, কুমার শরৎকুমার রায়ের একক অর্থায়নে এবং তাঁর অভিভাবকত্বে পাহাড়পুর মহাবিহার সর্বপ্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয় ১৯২৩ সালের ১ মার্চ, চলে একটানা ৫ বছর। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এই খনন হয়। তিনিই খননের ব্যয়ভার বহন করেন, একথা আগেই বলা হয়েছে। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির পক্ষে খননেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। জানা যায়, প্রাথমিক খননেই বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতিটির শিক্ষানবীশ কিছু ছাত্র অংশ নেন। শুধু তাই নয় কুমার শরৎকুমার রায়, ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়সহ সমিতির সাথে জড়িত প্রখ্যাত নাগরিকগণও সরাসরি খননে অংশ নেন, এঁরা সকলেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ছিলেন বিশ্বমানের প-িত। বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের সাবেক পরিচালক ড মুখলেসুর রহমানের চারদশক আগে ১৯৮২ সালে প্রকাশিত এক লেখায় (Mukhlesur Rahman, `Seventy-one year of the Varendra Research Museum’ Seminar on A. K. Maitra and Archaeological Studies in Bengal 10 February through 13 February 1982, Varendra Research Museum, Rajshahi University, Rajshahi, 1982.) পাহাড়পুর খননে অংশগ্রহণকারী হিসেবে নীরদবন্ধু স্যানালের নাম উল্লেখ করেছেন। নীরদবন্ধু অব্যাহতভাবে পরপর তিন বছর খননে অংশ নিয়েছেন। হুবহু লাইনটি উল্লেখ করছি, ‘…he was associated with the excavation of Paharpur for the three successive seasons, went on tours of expioration and published a few learned papers.’ নীরদবন্ধু স্যানাল ১৯২৭-৫০ পর্যন্ত বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির কিউরেটর হিসেবে কাজ করেন। এখানে আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির তখনকার নেতৃস্থানীয়গণ খননে উপস্থিত থেকেছেন, এ প্রমাণ মিলেছে একটি ছবিতে। ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত Varandra Research Society’s Monographs, Vol.-7’ -এ অতি গুরুত্বপূর্ণ এই ছবিটি প্রকাশ হয়েছে। ছবির ক্যাপশনে Exploration Party, Varandra Research Society, Rajshahi, লেখা আছে। পুরনো নাগরিকদের নিয়ে আমরা বহু পরখ করে নিশ্চিত হয়েছি যে, এই ছবিতে ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, কুমার শরৎকুমার রায়, প্রত্নতত্ত্ববিদ রমাপ্রসাদ চন্দ, প্রত্নতত্ত্ববিদ ননী গোপাল মজুমদার রয়েছেন এবং তাঁদের আমরা পরিস্কারভাবে চিনতে সক্ষম হয়েছি। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি প্রতিষ্ঠাতা অনারারি পরিচালক ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় চাদর মোড়া অবস্থায় সর্ববামে বসা। অক্ষয়কুমারের সামনেই বসা স্যূট-কোট ও গামবোট পরিহিত কুমার শরৎকুমার রায় বসে আছেন, তাঁর সামনে দেখা যাচ্ছে ক্যামেরার স্ট্যান্ড পাতা আছে অথবা এটি সৌখিন হাত-ছড়ি। তিনি সৌখিন ফটোগ্রাফার ছিলেন। কুমার শরৎকুমার রায়ের তোলা বহু ঐতিহাসিক ছবি কলকাতার বিখ্যাত ‘সাহিত্য’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তখন ছাপা হয়েছে। শরৎকুমার রায়ের পেছনে পাথরে বসে আছেন রমাপ্রসাদ চন্দ, তিনি গামবুট পরিহিত। পেছনের দু’জনের মধ্যে গাছে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নেয়া ব্যক্তিকে চেনা যাচ্ছে না। তবে, বসে থাকা ব্যক্তিকে নিশ্চিত চেনা যাচ্ছে তিনিই প্রত্নতত্ত্ববিদ ননীগোপাল মজুমদার। তাঁর এক হাতে বড় টুপি, অপর হাতে ক্যামেরা বলে মনে হচ্ছে। এখানে বলা প্রয়োজন যে, বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির মাসিক দুইশত টাকায় প্রথম বেতনভূক্ত কিউরেটর হচ্ছেন ননীগোপাল মজুমদার, তাঁর কাজের মেয়াদ ১৯২৫-১৯২৭। এরপর তিনি Archaeological Servey of India-তে যোগ দেন এবং হরপ্পা, মহেঞ্জাদারোসহ সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন সাইট খননে অংশ নেন। ছবির মোট ছয় জনের মধ্যে বাকি দুই জনের পরিচয় এখনই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হলো না। তবে, রমাপ্রসাদ চন্দের পাশে যিনি বসা তাঁর হাতে ক্যামেরা ও সামনে খাবারের পট দেখা যাচ্ছে, তিনিই সম্ভবত নীরদবন্ধু স্যানাল। আলোচিত ছবিটি কোন্ সালের তা উল্লেখ নেই, তবে তা ১৯২৫ সালের শীত মৌসুমের সম্ভাবনাই বেশি বলে অনেকের অনুমান। মনে হচ্ছে কাজের মাঝে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ছবিটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। এই ছবি বাংলার ইতিহাস বিশেষত পাহাড়পুরের ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। পাহাড়পুর আবিষ্কার বা খননে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁরা প্রত্যেকেই একেকজন বাংলার ইতিহাসের গৌরবময় সন্তান। শরৎকুমার রায়সহ এই ছবির মানুষরাই হারিয়ে যাওয়া বাঙালি কৃষ্টি-সভ্যতায় অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘পাহাড়পুর’ পুনরায় আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করে আছেন।
পাহাড়পুর খননের প্রধান কৃতিত্ব তখনকার বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির অর্থাৎ বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের। এও স্বীকার্য যে, পাহাড়পুর উৎখনন করেছে রাজশাহী; রাজশাহীর মানুষ। কুমার শরৎকুমার রায়ের একক অর্থায়নে পাহাড়পুরসহ বিভিন্ন প্রত্নস্থল খনন হয় তা রীতিমত বিস্ময়কর। কারণ, পাহাড়পুরের মত এতবড় প্রত্নস্থল খনন করতে আধুনিককালে সরকারও হয়তো সাহসী হবে না, অথচ শরৎকুমার একাই এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন দেশপ্রেমের অসীম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে। বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রাথমিক খননকালে পাহাড়পুর থেকে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় তিনশত প্রত্নসামগ্রী লাভ করে, তা থেকে কিছু ফলকচিত্র বা টেরাকোটা মিউজিয়ামে প্রদর্শনে রয়েছে।
এখানে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। পাহাড়পুরের গৌরবময় ইতিহাস তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। বঙ্গবন্ধুর বিশেষ আগ্রহে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে তাঁর সরকার ১৯৭৩ সালে পাহাড়পুর মহাবিহার ও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদকে পুরার্কীতি হিসেবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ও অর্থসহায়তা প্রদানসহ বিশ্ব-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ইউনেস্কোর নিকট আবেদন করে, এরই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের ইউনেস্কো পাহাড়পুর ও ষাটগম্বুজ মসজিদকে বিশ্ব-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা World Cultural Heritage-এর মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে ১৯৮৫ সালে। ইউনেস্কোর ঘোষিত ঐতিহ্যবাহী স্থানের মধ্যে পাহাড়পুর ৩২২তম।
মাহিসন্তোষ খনন
নওগাঁ জেলার ধামুরহাটের মাহিসন্তোষ খননেরও নেতৃত্ব দেন কুমার শরৎকুমার রায়। সীমিত এই খননের ব্যয়ভার তিনিই বহন করেন। ১৯১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাজশাহী থেকে ট্রেনযোগে হিলি স্টেশনে নেমে গরুর গাড়ি ও হাতির পিঠে চড়ে মাহিসন্তোষের প্রত্নস্থলে পৌঁছেন খননকারী দল। এই দলে ছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, রমাপ্রসাদ চন্দ, বিমলাচরণ মৈত্রেয়, অধ্যাপক উপেন্দ্রনাথ ঘোষাল, নলিনীকান্ত অধিকারী, এস. প্রকাশ স্যানাল, দেবেন্দ্রগতি রায় প্রমুখ। ধামুইরহাট তখন পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাট মহকুমার অধীন ছিল। বালুরঘাট মহকুমা প্রশাসক মৌলভী আব্দুল আজিজ উপস্থিত থেকে খননকারী দলকে স্বাগত জানান এবং সার্বিক সহযোগিতা করেন। ২৪, ২৫ ও ২৬ এই তিন দিন খননকার্য করে ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি পাথরের উৎকীর্ণ অবতল মিহরাব উদ্ধার হয়, যা বারবাকশাহী মসজিদের। একই সময়ে ওই সময় ধ্বংসস্তূপটি থেকে ১৫০৬-১৫০৭ সালের জনৈক সুহাইলের পুত্রের নির্মিত একটি মসজিদ সম্পর্কিত তথ্য আরবি ভাষায় উৎকীর্ণ একটি পাথরের ফলক আবিষ্কৃত হয়। মিহরাব ও ফলকটি মিউজিয়ামের প্রদর্শনে রয়েছে। কোলকাতার Statesman পত্রিকার ১৯১৭, ২ জানুয়ারি সংখ্যায় ও Journal of the Calcutta Historical Society, Bengal Past and Present Vol. X111, July-Dec. 1916 NoS. 25-26-এ মাহিসন্তোষ খনন বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন রয়েছে। মাহিসন্তোষ প্রাচীন গৌড়রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল, তা মূলত বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির খননের পর প-িত ও সুধি মহলে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিনিবন্ধ হয়। মাহিসন্তোষের ইতিহাস নিয়ে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের লেখা রয়েছে। ‘প্রত্ন-খনন-বিবরণ’ শিরোনামে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধটি কলকাতার‘ সাহিত্য’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হয় ১৩২৩ বঙ্গাব্দে মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র সংখ্যায়। দীর্ঘ এই লেখায় বিভিন্ন উপ-শিরোনামে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন প্রত্নস্থল, পুরনো স্থাপনা, প্রত্ননিদর্শন, প্রাচীন রাজনীতি-ইতিহাস ও ভূগোল বিবৃত হয়েছে। ‘ইতিহাসে মাহিসন্তোষের স্থান জ্জনাম রহস্য’ উপশিরোনামের লেখায় মাহিসন্তোষের নামকরণ নিয়ে অক্ষয়কুমার বলেন, ‘ধ্বংসাবশেষমধ্যস্থ দরগাটি “মাহিসন্তোষের দরগা” নামেই সুপরিচিত। প্রকৃত নাম জ্জ“মাইসন্তোষীর দরগা”; জ্জজমিদারী কাগজে সেই নামই আছে। এখানে এক মাতা (মাই) ও তাঁহাদের কন্যা (সন্তোষী) সমাধি-নিহিত রহিয়াছেন; তাঁহারা মুসলমান-ধর্মাবলম্বিনী ছিলেন; সাধনায় সিদ্ধি লাভ করিয়া “পীর” হইয়াছিলেন।’ তবে, এই নামকরণ ও স্থানের পরিচয়ের মতের ভিন্নতা রয়েছে, তাও তিনি বিস্তৃত ব্যাখা করেছেন।
তাছাড়া, রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে খনন কার্য পরিচালনা করে অনুসন্ধান সমিতি। গোদাগাড়ীর প্রদ্যুয়েশ্বর এলাকার একটি বিরাট দিঘি সেচ করে খনন কার্য চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ করা হয়। প্রদ্যুয়েশ্বরের দিঘি সেচ ও খনন বিষয়ে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে একটি পৃথক নথি রয়েছে। এই নথিতে কুমার শরৎকুমার রায়ের তাঁর নিজ হাতে লেখা বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে এবং বিভিন্ন খরচের হিসাবও লিপিবদ্ধ আছে। চলবে… (আগামীকাল, পর্ব-৯)
লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়।