বাগমারায় সরকারী জমি দখল ও কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি

আপডেট: নভেম্বর ১৩, ২০১৭, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

মো. আবদুল কুদ্দুস


বাংলাদেশের শহর থেকে শুরু করে গ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কথিত নেতা কর্মী কর্তৃক সরকারি নদী দখল, খাল দখল, জমি দখল এখন নিত্যদিনের সংবাদ। দখলবাজদের উৎপাতে সাধারণ মানুষ এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। দখলবাজরা দখল করছে। এমন খবর পেলে দেশের গণমাধ্যম ও বিবেকবানরা এসব দখলদারিত্বের কড়া প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এই প্রতিবাদের মাধ্যমে এসব সমস্যার কিছুটা সমাধান হচ্ছে। আবার কিছু সমস্যা আঁড়ালেই থেকে যাচ্ছে। কেননা নানা অদৃশ্য কারণে স্থানীয় সাংসদ/জনপ্রতিনিধির কাছে এসব সমস্যার কোন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না বলে এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা অভিযোগ করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারাই এসব দখলবাজির সাথে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট করে কৃষক শ্রমিকের মুক্তি, জলাভূমি সংরক্ষণ ও জাতীয় উন্নয়নে কৃষিবিপ্লবের কথা উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি বিষয়ে বলা হয়েছে যে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিককে-এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা”। ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন নিশ্চিত করবে…”। ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে, “নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করিবার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশের কথা বলা হয়েছে।” অন্যদিকে ১৮ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নসহ ‘জলাভূমি সংরক্ষণ’ […] ও নিরাপত্তা বিধান করবে।”
সংবিধানে এতোসব নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি ৯ নভেম্বর, ২০১৭ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার একটি প্রতিবেদন থেকে জানতে পারলাম আমার জন্মভূমি বাগমারার সূর্যপাড়ার পার্শ্ববর্তী গড়িয়াবান্দা ও গোয়ালপাড়া বিল, যে মাটিতে উৎপাদিত পণ্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে আমি নিজেও বড় হয়েছিÑ সেই ঊর্বর ভূমি আজ পতিত জমি হিসেবে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকবার উপক্রম হয়েছে। কেননা, দখলবাজির কারণে এবারের বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণের দরুন সৃষ্ট জলজট নিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা সেখানে নেই। পত্রিকার প্রতিবেদন মোতাবেক আমার গ্রাম সুর্যপাড়ার নিকটবর্তী বিল গড়িয়াবান্দা (কাগজ কলমে গুঁড়িয়া নামে পরিচিত) ও গোয়ালপাড়া বিলের পায় ৯৩৩ হেক্টর জমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। প্রতিবছর এই বিল দুটি থেকে বরো মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার টন শুধু আলু উৎপাদিত হয়ে থাকে। অথচ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং মাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আসালাম আলী আসকান ও তাঁর কর্মীদের নিয়ে এই বিল দুটির প্রাণ ভবানীগঞ্জ হতে আত্রাই পর্যন্ত প্রবাহিত খাল এক সময়ের প্রমত্তা তুলসী গঙ্গা নদী কাঁঠালবাড়ী ও হায়াতপুর এলাকায় পুরোটাই দখল করে পুকুর নির্মাণ করায় বর্ষার পানি এখন আর নিষ্কাশনের কোন সুব্যবস্থা নেই। সে কারণে প্রতি বছর বিল দুটিতে বরো ফসলের চাষাবাদ অক্টোবরের মাঝামাঝিতে শুরু হয়ে নভেম্বরের মাঝামাঝির মধ্যে শেষ হলেও এবারে সেই গড়িয়াবান্দা ও গোয়ালপাড়ার বিলে এখন কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও বুকসমান পানি। এতে ওই এলাকার অর্থাৎ সূর্যপাড়া, পিদ্দপাড়া, গোয়ালপাড়া, বৈলসিংহ, কিসমত বিহানালী, অনন্তপাড়া, পয়েশঘোষ, কামারবাড়ী ও কাঁঠালবাড়ী এলাকার খেটে খাওয়া মেহনতি কৃষক শ্রমিকের জীবন আজ বিপাকের মুখে পড়েছে। এসব গ্রামের মানুষ তাদের সারা বছরের আয়ের প্রায় অর্ধেক আয় করে থাকে বিল দুটি হতে উৎপাদিত আলু, পেঁয়াজ, রসুন, সাকসবজিসহ অন্যান্য ক্ষেত খামার থেকে।
আমার জন্মভূমির খেটে খাওয়া নিরীহ মেহনতি মানুষের অধিকারের দাবি নিয়ে আজ আমি দেশের সরকার, সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা এবং স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নিকট আকুল আবেদন করছি, অনুগ্রহ করে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ১০ নম্বর মাড়িয়া ইউনিয়নের উপর্যুক্ত এলাকার কৃষকদের জমি বাঁচান, তাঁদের জীবন বাঁচান। ভবানীগঞ্জ হতে মাড়িয়া ইউনিয়নের অনন্তপাড়া, গোয়ালপাড়া, কাঁঠালবাড়ী, হায়াতপুর ও শিকদারী গ্রামের পাশ দিয়ে আত্রাই পর্যন্ত প্রবাহিত খালটি (জনশ্রুতি মোতাবেক সাবেক তুলসী গঙ্গা নদী) দখলবাজদের হাত থেকে উদ্ধার করে সঠিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে ওই এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে সোনালী ফসল সুষ্ঠুভাবে তোলার সুযোগ করে দিন।
প্রিয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় মাঠ প্রশাসনের অন্যান্য কর্তাব্যক্তি। আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, সূর্যপাড়া, পিদ্দপাড়া, বৈলসিংহ, গোয়ালপাড়ার ওই ভূমির কৃষকের ঘরে অসংখ্য গুণি মানুষ জন্মেছেন। ওই এলাকার অগণিত কৃষক প্রতিবছর হাজার হাজার টন খাদ্যশৎস্য উৎপাদন করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। মাস্টার আব্দুর রহিম, মাস্টার মহির উদ্দিন, আহম্মাদ আলী মোল্লা মেম্বার, বিশিষ্ট সমাজ সেবক বয়েন উদ্দিন মোল্লা, সমাজ সেবক বাঘা কাদের, অধ্যক্ষ আফসার আলী, লেখক লোকমান আলী, ইয়াছিন আলী চেয়াম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সেকেন্দার আলী মাস্টার, জনহিতৈষী আজিমুদ্দন সরদারের মতো অসংখ্য গুণিজন এই এলাকার জন্মেছেন। তাঁরা সকলেই বাংলাদেশের মানুষের সেবা করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। এই এলাকার মানুষও অন্যদের মতো ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে শক্রমুক্ত করেছেন। তাঁদের বর্তমান প্রজন্মের সন্তানরা আজ দেশের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজসেবার শীর্ষস্থানে রয়েছেন। তাঁদের সবাই ওই বিল দুটির জমি থেকে উৎপাদিত ফসলের খাদ্য খেয়ে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সবার রক্তেই মিশে আছে ওই জমিতে ফলা ফসলের নির্যাস। ওই এলাকার অসংখ্য শ্রমিক আজ সূদুর বিদেশে গিয়ে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করছেন। সুতরাং বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে এই এলকার মানুষ ও মাটির অবদান কম নয়।
মাড়িয়া ইউনিয়নের ওই এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব কোনো করুণা নয়! এটি তাদের সাংবিধানিক অধিকার। তাদের মুক্তি না হলে, ওই এলাকার মানুষের মাঝে কৃষিবিপ্লব তৈরি হবে না। ওই এলাকার জলাভূমি দখলবাজদের হাত থেকে উদ্ধার করা না হলে, মানুষ হিসেবে আমাদের মাথা নত হয়ে যাবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবমাননা করা হবে। দেশের মেহনতি মানুষের প্রতি অবিচার করা হবে। লাখো শহিদের আত্মা শান্তি পাবে না। বাংলাদেশের একটি অংশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন থেমে যাবে। ওই এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্য সংকট দেখা দিবে। তাই আসুন, মানুষের অধিকার আদায়ে আমরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করি। একতাবদ্ধ হই। সমবেতভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে সুখি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ি।
লেখক: শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ ও সহকারী প্রক্টর, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী
ংযুধসড়ষঁরঃং@মসধরষ.পড়স