বাঘায় গাছে ঝলমল করছে আমের কড়ি

আপডেট: March 27, 2020, 4:50 pm

আমানুল হক আমান, বাঘা


বাঘায় গাছে আমের কড়ি- সোনার দেশ

ক’দিন আগেও গাছের শাখা প্রশাখায় ঝলমল করছিল আমের মুকুল। মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা ছিল গ্রামের সবুজ প্রকৃতি। গাছের চারপাশে মৌমাছির গুনগুন যেন নিমন্ত্রণ দিচ্ছিল আমের। রাস্তার চারপাশে যতদূর চোখ যায়, কেবলই মন জুড়ায় আমগাছ। গাছজুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে সবুজ আমের কাঁচা কাঁচা কড়ি। একটি গাছও মিলবে না, যে গাছে আমের কড়ি নেই। রাজশাহীর বাঘায় গ্রামে আমের বাগানই বেশি। এ উপজেলায় আমের ব্যাপক আবাদ হয়। তবে মিষ্টিস্বাদ, গুণ ও আকারে সেরা এ উপজেলার আম।
উপজেলার আম চাষি বাদশা হোসেন জানান, আম চাষ এবং ব্যবসা উভয়ের সঙ্গেই তিনি সরাসরি যুক্ত। মূলত পাতা কেনা দিয়েই শুরু হয় আমের কেনা-বেচা। বেশি পাতাওয়ালা গাছে ফলন ভালো হবে ধরে এ পাতা কেনা-বেচা হয়। পাতা কেনা হয় স্থান, ফলনের ইতিহাস আর সম্ভাব্য পরিমাণের ওপর অনুমান করে ব্যবসায়ীরা লোকজনের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ বছর চুক্তিতে গাছ কেনেন। তারপর থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তিনি সেই গাছের মালিক। ফল হলেও তার, না হলেও তার।
গাছপ্রতি এজন্য ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় মালিককে। অবশ্য যুগ যুগ থেকে পাতা কেনার এ প্রথা চলে এলেও এখন অনেকেই ভিন্ন নীতিতে ব্যবসা করেন। আগাম পাতা কেনায় ক্ষতির শঙ্কা থাকে। তাই ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীর নিজেরাই বাগান গড়ে তুলেছেন। চাষও করছেন নিজে।
আড়ানীর আম ব্যবসায়ী নওশাদ আলী জানান, আগে আমের অন ইয়ার অফ ইয়ার থাকতো। অর্থাৎ এক বছর আম হলে অন্য বছর হতো না। কিন্তু ঋতু বৈচিত্র ও চাষ পদ্ধতি পরিবর্তনে এখন প্রতি বছরই আমের ভালো ফলন পাওয়া যায়। এজন্য সারাবছরই আম গাছের পরিচর্যা করতে হয়।
গাছের শাখে শাখে এখন দানা বেঁধেছে কড়ি (গুটি)। আর সেই গুটিতেই স্বপ্ন বাঁধতে শুরু করেছেন কৃষক। আবারও প্রহর গুণতে শুরু করেছেন স্বপ্ন সোপানের এ অভিযাত্রীরা। চলছে যত্ন। চৈত্র-বৈশাখেই ফলবতী হয়ে উঠবে গাছ। পরের জৈষ্ঠেই দেবে আম। কৃষককূলে এখন চলছে তারই প্রস্তুতি।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাছ, পাতা, মুকুল, গুটি আর আম নিয়ে বাঁধা নানান স্বপ্নের কথা। আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহীর প্রায় সব এলাকাতেই চাষ হয় এ ফলের। তবে এরমধ্যে কোন এলাকা প্রথম? জানতে চাইলে সবাই বাঘা উপজেলারই নাম নেবেন। সেই বাঘা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে গেলে যে কারোরই মনে হবে যেন আমের রাজ্যে এসে পড়েছি। এমনই একটি বাঘা উপজেলা।
এবারের আমাদের ফলন সম্পর্কে আম ব্যবসায়ী রুস্তমপুর গ্রামের নুহু আলম সরকার জানান, গত বছর আমের বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টি কম হওয়ায় প্রচন্ড খরতাপে গাছেই অনেক আম ফেটে গেছে। এবারও প্রতিটি গাছে মুকুল থেকে গুটি ধরেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলন হবে।
আড়ানী পাঁচপাড়া গ্রামের আম চাষি আবদুল মালেক জানান, বড় ধরনের কোনো প্রকৃতিক দুর্যোগ না হলে লাভের মুখ দেখবেন বাঘার আমচাষিরা। ৯০ শতাংশ আমগাছে মুকুল এসেছিল। সেই মুকুল থেকে কড়ি বাঁধতেও শুরু করেছে। বর্তমানে আমের প্রায় আড়াইশ’ জাতের মধ্যে আগাম জাতের ও মধ্যম জাতের আমগাছে গুটি এসে গেছে। দেরিতে গুটি আসবে ফজলি, আশ্বিনাসহ বেশ কয়েকটি জাতের। আমবাগানে সারাবছর কোনো কাজ থাকে না। তবে মুকুল আসার আগে থেকে গাছের আম নামানো পর্যন্ত এর পরিচর্যার অভাব হয় না। ভালো ফলনের জন্য আমচাষিরা উঠে পড়ে লাগেন। তাছাড়া বাগান ইজারা নিয়েছেন এমন ব্যবসায়ীরা আরও বেশি মনোযোগী হন পরিচর্যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লা সুলতান জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছে খুব একটা কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। তবে ছত্রাকজনিত রোগে আমের কড়ি আক্রান্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে কড়িতে (গুটি) রূপান্তর হওয়ার পর ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্রে করতে হবে। উপজেলায় চলতি মৌসুমে আম চাষ হচ্ছে ৮ হাজার ৩৬৮ হেক্টর।
বাঘায় প্রায় আড়ইশ’ জাতের আম উৎপন্ন হয়। এজাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, আম ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত, বোম্বাই, হিমসাগর, ফজলি, আম্রপলি, আশ্বিনা, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, লক্ষণভোগ, কালীভোগ, তোতাপরী, দুধসর, লকনা ও মোহনভোগ জাতের আম বেশি চাষ হয়েছে।