বাঘায় মৃত গোলাপি জীবিত || সেই উদ্ধারকৃত লাশ দোলেনার: দাবি স্বামী সুরুজের

আপডেট: জুন ১৩, ২০১৯, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

বাঘা প্রতিনিধি


গোলাপি বেগম-সোনার দেশ

রাজশাহীর বাঘায় ভূট্টা খেত থেকে উদ্ধারকৃত লাশ দাফনের একদিন পর জীবিত পাওয়া গেছে গোলাপি বেগমকে। সে বর্তমানে থানা হেফাজতে রয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ১০টার দিকে আড়ানী রেল স্টেশন থেকে তাকে জীবিত উদ্ধার করে প্রথমে আড়ানী ইউনিয়ন পরিষদে আনা হয়। পরে চেয়ারম্যান থানায় তাকে প্রেরণ করেন। তবে চারঘাট উপজেলার চারাবটতলা এলাকার সুরজ মিয়া নামের এক যুবক ছবি দেখে দাবি করছেন এ লাশ তার স্ত্রী দোলেনা বেগমের। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন প্রকৃত নিহত নারীটি কে?
জানা যায়, ১০ জুন সন্ধ্যায় বাঘা থানার পুলিশ চকবাউসা গ্রামের ভূট্টা খেত থেকে মুখে পোড়া লুব্রিকেন্ট (মবিল) মাখানো অজ্ঞাত (৪৫) এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরের দিন ১১ জুন ওই লাশের পরিচয় মেলে। সে উপজেলার আড়ানী পৌরসভার পাঁচপাড়া গ্রামের বাকপ্রতিবন্ধী মনির হোসেনের স্ত্রী গোলাপি বেগম।
গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় আড়ানী রেল স্টেশন থেকে গোলাপি বেগমকে জীবিত উদ্ধার করে আড়ানী ইউনিয়ন পরিষদে আনা হয়। সেখানে গোলাপি বেগমের মামা শাকিব হোসেন, শাশুড়ি মরিয়ম বেগম, ভাসুর মাজদার রহমান, জা সাজেদা বেগমের উপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে আসল গোলাপি বেগমকে সনাক্ত করা হয়। তার কাছে থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নামের মিল রয়েছে। পরে চেয়ারম্যান গোলাপি বেগমসহ উভয় পরিবারকে থানায় পাঠিয়ে দেন।
এ বিষয়ে গোলাপি বেগম বলেন, ঈদের আগে বুধবার (২৯ মে) রুস্তমপুর হাটে ৪২ হাজার টাকায় একটি গরু বিক্রি করি। এ টাকা নেয়ার জন্য শ^শুর বাড়ির লোকজন চাপ দিতে থাকে। আমি নিরূপায় হয়ে পরের দিন বিদ্যুৎ বিল দেয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাজশাহীর এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাই। আমি ৬ বছরের সন্তান মারুফ হোসেন ও পেটের ৫ মাসের সন্তানের কথা ভেবে বুধবার সকালে রাজশাহী থেকে থেকে মহানন্দা ট্রেনে আড়ানী স্টেশনে আসি। এ সময় স্থানীয় কিছু মানুষ আমাকে চিনতে পেরে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসে। সেখান থেকে থানায় আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন এলাকাবাসীর প্রশ্ন ওই অজ্ঞাত নারীর লাশটি কার? এরমধ্যে দুপুর দেড়টার দিকে চারঘাট উপজেলার চারাবটতলা এলাকার সুরজ মিয়া নামের এক যুবক ছবি দেখে দাবি করছেন এ লাশ তার স্ত্রী দোলেনা বেগমের।
লাশের দাবিদার দোলেনা বেগমের স্বামী সুরুজ মিয়া বলেন, ৯ জুন কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। তারপর থেকে বিভিন্নস্থানে খোঁজ খবর করে পায়নি। এক মাধ্যমে জানতে পারি বাঘা থানায় একটি লাশ পাওয়া গেছে এবং দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পরে পুলিশের কাছে ছবি দেখে চিনতে পারি এবং এ লাশ আমার স্ত্রী দোলেনার।
গোলাপি বেগমের ভাসুর মাজদার রহমান বলেন, গোলাপি বেগম বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্নস্থানে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে আমি বাদি হয়ে ১ জুন বাঘা থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করি। তার মুখে মবিল মাখানোর কারণে সঠিকভাবে লাশ চিনতে পারি নি।
আড়ানী পৌর নারী কাউন্সিলর ও পাঁচপাড়া গ্রামের মর্জিনা বেগম বলেন, প্রায় ৪ মাস আগে গোলাপি বেগম ৬ বছরের পুত্র সন্তান মারুফ হোসেনকে রেখে এক যুবকের সঙ্গে ঘর ছেড়ে চলে যায়। গোলাপি বেগমের স্বামী বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় পরে আমি ও স্থানীয় আ’লীগের নেতারা পুনরায় তাকে বুঝিয়ে স্বামীর বাড়িতে আনা হয়। পরে শুনি সে আবার চলে গেছে। আবারও ফিরে এসেছে।
গোলাপি বেগমের শ^শুর বিচ্ছাদ আলী বলেন, আমার ছেলে বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় গোলাপি নিজের ইচ্ছা মতো চলাফেরা করে। আমরা প্রতিবাদ করলে আমাদের বিভিন্ন কথা শুনিয়ে দেয়। ফলে আমরা দেখেও না দেখার ভান করে চলি। এরমধ্যে আমার ছেলে ও নাতীকে রেখে চলে গিয়েছিল। ১২ দিন পর তাকে জীবিত পাওয়া গেছে। তবে চকবাউসা গ্রামের লালু প্রামানিকের ভূট্টা খেতে যে লাশ পাওয়া যায়, সেটা অন্য কারো।
আড়ানী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রভাষক রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, গোলাপি বেগমসহ উভয় পক্ষ আমার কাছে আসলে, তাদেরকে থানায় প্রেরণ করেছি। তবে আত্মীয় স্বজনের কাছে জেনে এবং তার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে মনে হয়েছে, সে আসল গোলাপি।
লাশের দাবিদার সুরুজ মিয়ার শ^শুর এসাহাক বলেন, বিয়ের পর থেকে জামাই মেয়ে আমার বাড়িতে আছে। তাদের মধ্যে কোন অমিল চোখে পড়ে নি। তবে সংসার করতে গেলে মাঝেমধ্যে দু-একটি কথা হয়। ৯ জুন থেকে মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করা হচ্ছিল। পরে জানতে পারি বাঘা এলাকায় একটি লাশ পাওয়া গেছে। পরে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছবি দেখে চিনতে পারি এ লাশ আমার মেয়ে দোলেনার।
এ বিষয়ে বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মহসীন আলী জানান, উদ্ধারকৃত লাশটি ভুলভাবে তার আত্মীয়রা সনাক্ত করেন। ময়না তদন্ত শেষে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দাফন করা হয়। এ বিষয়ে গোলাপির মামা শাকিব হোসেন বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। তবে উদ্ধারকৃত লাশের মুখ পোড়া মবিল দেয়া ছিল। এছাড়া লাশের পাশে থেকে একটি কালো বোরখা, এক জোড়া স্যান্ডেল, একটি গুলের কৌটা পাওয়া যায়। লাশের গলা ওড়না দিয়ে পেঁচানো ছিল। এখন গোলাপি বেগম থানা হেফাজতে রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হবে। তবে দুপুরে চারঘাট উপজেলার চারাবটতলা এলাকার সুরজ মিয়া নামের এক যুবক ছবি দেখে দাবি করছেন এ লাশ তার স্ত্রী দোলেনা বেগমের।
তবে এ বিষয়ে ধারনা করা হচ্ছে অন্য জায়গায় তাকে হত্যা করে চকবাউসা গ্রামের লালু প্রামানিকের ভূট্টা খেতে লাশ ফেলে রাখা হয়। তবে এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ