বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও কৃতিত্ব

আপডেট: December 5, 2019, 1:14 am

মো. নূরল আলম


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে প্রথমে লন্ডন গমন করেন। ড. কামাল হোসেনও তার সাথে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে ড. কামাল হোসেনসহ তিনি দিল্লি পৌঁছেন। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দিল্লির প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধু বিশাল জনসমাবেশে বাংলায় এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দেন। ১০ জানুয়ারি দুপুর ১:৪১ টায় বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিনায়ক এবং তৃতীয় বিশ্বের নিপীড়িত জনতার মুখপাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাতে তার ৪ ঘণ্টা সময় লাগে। সেদিন তিনি দশ লক্ষ জনতার উদ্দেশ্যে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বক্তৃতা করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবদান মূল্যায়ন করে বিশিষ্ট লেখক জেমস. জে. নোভাক লিখেছেন -“কঠোর পরিশ্রম বঙ্গবন্ধুর জীবনধারা গঠন করেছে। ক্লান্তিহীনভাবে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে শহর, নগর, গ্রাম-গঞ্জে ভ্রমণ করেছেন। তিনি মানুষের সাথে মিশেছেন, কথা বলেছেন এবং তাদের ঘর্মাক্ত শক্ত হাত স্পর্শ করেছেন। জনগণ থেকে দূরে থাকাকালে তিনি তার অতি মানবীয় দৃষ্টিশক্তি দিয়ে প্রত্যেকটি ঘটনায় জনগণের প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারতেন। তিনি জানতেন- জনগণ তাকে বিশ্বাস করে। কেননা তিনি তাদের কথা বুঝতে পারতেন।
তিনি ছিলেন, জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতিনিধি। এদিক দিয়ে নেতাজী সুভাষ বসুর সাথে বঙ্গবন্ধুর সাদৃশ্য রয়েছে। তবে দুজনের মধ্যে মাত্র এক বিষয়ে পার্থক্য ছিল। তা হলো সুভাষ বসু সর্বদা অভিজাত ছিলেন, অন্যদিকে মুজিব জনগণের ভাষায় কথা বলতেন। তবুও উভয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদের গভীরে প্রবেশ করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।”
বাঙালির উনিশ শতকের ঐতিহ্যে দুটি সুস্পষ্ট ধারা লক্ষ্য করা যায়। এ দুটি ধারা ছিল সমান্তরাল কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী। একদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা, নতুন জাগতিক মূল্যবোধ, উদার মানবতা সব মিলে বাংলার নব জাগরণ।
অন্যদিকে অধিকারবঞ্চিত দরিদ্র গ্রামীণ কৃষকের খণ্ড খণ্ড প্রতিবাদ, প্রতিরোধ। কিন্তু এ দুই ধারার মধ্যে সমন্বয় না ঘটায় বিপন্ন হয়ে পড়ে বাঙালির অস্তিত্ব। এ সমন্বয়ের দুরুহ কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। কৃষক বিদ্রোহের আগুনকে তিনি ছড়িয়ে দিলেন বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে। বাঙালির ওপর ঔপনিবেশিক শোষণের সার্বিক রূপ তিনি তুলে ধরলেন সবার কাছে। যে প্রতিবাদ, বিদ্রোহ আগে ছিল খণ্ড খণ্ড এবং সে কারণে বিক্ষিপ্ত, সংকীর্ণ ও অগভীর, তা জমাট বেধে জন্ম দেয় যৌথ চেতনার, রূপ নেয় গণঅভ্যুথানের। বিভাজিত ক্ষুদ্র ও সম্পর্কহীন বলয় থেকে জাতি শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নকে তুচ্ছ জ্ঞান করে একটার পর একটা স্তর অতিক্রম করে গ্লানিমুক্ত ও শোষণহীন সমাজ নির্মাণে এগিয়ে যায়। জাতীয় জীবনে এক সঙ্গে এতগুলো ধাপ অতিক্রম করা এক অসাধারণ ঘটনা। এই ঘটনাতেই জনগণকে টেনে আনলেন বঙ্গবন্ধু।
ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন ভদ্র, নম্র, স্নেহময় ও সদালাপী মানুষ। তার কোমল হৃদয়ে ছিল দুর্জয় সাহস। তাই তিনি ছিলেন সহজ, সরল। শেখ মুজিব ছিলেন মানবতাবাদী। জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে তিনি মানুষকে ভালবাসতেন। তিনি সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। শেখ মুজিবের ব্যক্তি চরিত্রে ছিল বিদ্রোহী সত্তা। তাঁর পূর্বপুরুষরা নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জীবন দিয়েছেন। তাঁর মতো বিদ্রোহী বাঙালি এ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেনি। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশে একটি উদার সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। এ রকম সমাজ গড়ার জন্য তিনি সোনার মানুষ চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আকাক্সক্ষা পূর্ণতা লাভ করেনি। বঙ্গবন্ধুর ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ভাষণ ও ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ শুনে ভারতের একজন বিচারপতি বলেছিলেন, “শেখ মুজিবুর রহমান আব্রাহাম লিংকনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস রাজনীতি এবং লেনিনের বিপ্লবী চেতনা- এ সবের এক মূর্ত প্রতীক।”
ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধে দাঁড়িয়ে অধিকারবঞ্চিত মানবতার মুক্তি ও কল্যাণের জন্য বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী ও বিপ্লবী ভূমিকা তাকে জাতীয় নেতা থেকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দান করেছে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী উইলি ব্রান্ট বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছেন, “মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদেরকে আর বিশ্বাস করা যায় না।”
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কট্টর বিরোধী তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জার বলেছেন, “শেখ মুজিবের মত তেজি ও গতিশীল নেতা আগামী ২০০ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।” লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা বঙ্গবন্ধুকে ‘বাংলার মুকুটহীন সম্রাট’ বলেছে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের কঠোর সমালোচক এন্থনী মাসকারেনহাসও তাঁর সততার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছেন, “মুজিব দেশকে নিজের সম্পদ হিসেবে মনে করতেন। তাঁর অর্থের প্রয়োজন ছিল না। তিনি ক্ষমতার পেছনে ছিলেন। তাঁর সততা ছিল প্রশ্নাতীত।” প্রকাশ্যে স্বাধীনতা ঘোষণার একমাস আগে বঙ্গবন্ধু নিউজ উইকের লরেন জেন টিনস্কে একান্তে বলেছিলেন, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। আমরা যে দেশকে জানি তা শেষ হয়ে গেছে।”
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, জনগণকে সামন্তবাদী ও সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত করে জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সে জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র নয়, তা হলো সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব আনতে হবে এ দেশের সার্বভৌত্বের স্থায়িত্বের জন্য, কোনো দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থের জন্য নয়। আজ বঙ্গবন্ধুকে সম্মান দিতে গিয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, জাতীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্যের তিনি অধিকারী ছিলেন, সেই ঐতিহ্য ইতিহাসের ফাঁকে ফাঁকে মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন পর্যায়ে এসেছে।
বঙ্গবন্ধুর মত মহান ও আদর্শবান নেতা বাংলাদেশে আবির্ভুত হয়েছিলেন। লেনিন, সুকর্নো, লুলুম্বা, হোচিমিন, জর্জ ওয়াশিংটন ও আব্রাহাম লিংকন আর আলেন্দের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম চিরকালের জন্য পৃথিবীর মানুষের মনে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে মানব প্রেমের মূর্ত প্রতীক হিসেবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তি চরিত্র একটি অখণ্ড সংগ্রামের ইতিহাস। তার রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন ও ধারাবাহিক জীবন ছিল একটি দর্শন। বাঙালি জাতি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উপলদ্ধি করে তার আত্মপরিচয়ের মূল সুর। এই পরিচয় স্পষ্ট করে তোলার আপোসহীন সংগ্রামের অগ্রনায়ক বঙ্গবন্ধু। বাঙালির হাজার বছরের লালিত আশা- আকাক্সক্ষা, বেদনা বিক্ষোভ, সর্বোপরি আবহমান বাংলার বৈশিষ্ট্যকে তিনি নিজের জীবনে আত্মস্থ করেছেন। তাঁর কন্ঠে বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
বাঙালি জাতীয়তাকে বঙ্গবন্ধু আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মননে গেঁথে দিয়েছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর নামে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে আমরা হারিয়েছি- এই মর্মান্তিক কথাটি কখনো আমাদের অন্তরে সত্য হতে পারে না। বাংলাদেশের আপামর জনমানুষের ভালবাসায় বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয় হয়ে আছেন। কালের চিরন্তন বেলায় তার নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধ তাঁকে দিয়েছে অমরত্বের গৌরব।
লেখক: প্রাক্তন চেয়ারম্যান, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড ও সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, রাজশাহী মহানগর
তথ্যসূত্র
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : সিরাজ উদ্দিন আহমেদ
বাঙালি বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু : মোনায়েম সরকার (সম্পাদিত)