বাঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষের প্রভাব

আপডেট: মে ৪, ২০১৮, ১২:০০ অপরাহ্ণ

মো. বুরহানুল ইসলাম


পহেলা বৈশাখ নববর্ষ বাঙালির জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। বাংলা সনের আবির্ভাব না হলে বাংলা নববর্ষ পালন হত না। নতুন বছরকে বরণ করতে দেশের সর্বস্তরের মানুষ সাধ্যমত নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে অংশগ্রহণ করে। শপিংমলগুলোতে বিক্রয় হয় নববর্ষের বিশেষ পোশাক। এসময় পুরো দেশ রঙিন সাজে সেজে ওঠার প্রস্তুতি নেয়। বাংলাদেশে দুই বার বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়। জানুয়ারি ও বৈশাখে। ৩১ ডিসেম্বর ১ জানুয়ারিতে বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছেলেমেয়েরা অতি বাড়াবাড়ির জন্য শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন হয়। পহেলা বৈশাখ নববর্ষ অনুষ্ঠানে নির্মল আনন্দ ঘন পরিবেশে নানা অনুষ্ঠান মানুষ উপভোগ করে। এতে ফুটে ওঠে বাঙালির জাতীয় কৃষ্টিকালচার ও সংস্কৃতি।
আনন্দ উৎসব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে সামাজিক জীবনে জড়িয়ে আছে। সাড়ম্বরে সম্মিলিতভাবে কোনো অনুষ্ঠান করার নামই উৎসব। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বর্ষবরণ মেলায় প্রচুর লোক সমাগম হয় এতে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ অংশ নেয়। এ উৎসব হল নির্মল আনন্দদান ও সার্বজনিন। মানুষ উৎসবে অনাবিল আনন্দ ধারায় জীবনের ক্লান্তি, হতাশা দূর হয়ে উৎসবের পরশ লাভ করে। এ ধরনের উৎসব পালন প্রথা বা রীতিতে পরিণত হলেও আনন্দ ধারায় মূখ্য উদ্দেশ্য।
দেশে নববর্ষ উপলক্ষে যে সব অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা, গান বাজনা, কবিতা পাঠের আসর, শিশুদের চিত্রাঙ্গন প্রতিযোগিতা, এসেব সসকল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সবই সোহার্দের প্রতীক। নববর্ষের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সকল জাতি ধর্মের ও সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে।
দেশের শহর গ্রামের বিভিন্ন স্থানে এলাকা ভিত্তিক উৎসব। গ্রামের বৈশাখি মেলায় নাচগানের আসর, নাটক, প্রদর্শনি, শিশুদের খেলনা নিয়ে বিভিন্ন দোকানের পসরা বসে; মেলায় প্রচুর লোকের সমাবেশ হয়। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ দুঃখ বেদনা ভুলে মেলার আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। শহরে সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মেলা ও আনন্দ উৎসবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়।
মেলাকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন। শোভাযাত্রায় দেশীয় পুরাতন কৃষ্টি কালচার ফুটিয়ে তোলা হয়। এতে দেশের উপজাতিরা নিজস্ব ধারায় নিত্যগানে মেলাকে আকর্ষণীয় করে।
বছরের সূচনা দিনটিকে নববর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ইদানিং বাংলা সন তারিখের ব্যবহার হলেও ইংরেজি সন তারিখের ব্যবহার বাংলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অফিস আদালতে ব্যবহার ও গুরুত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেফশ। অফিস আদালতে চিঠির তারিখ, বছরে প্রচলিত সরকারি ছুটি বিভিন্ন অফিসে টাঙ্গানো দিন পঞ্জিকায় ইংরেজির সাথে বাংলা যুক্ত। সরাসরি বাংলা নির্ভর কোনো দিন পঞ্জিকা পাওয়া কষ্টসাধ্য। বাংলা বছর হিসেবে বৈশাখ হতে চৈত্র মাস সন তারিখ ব্যবহার খুব কম। অফিসের চিঠি লেখা হয় বাংলায় চিঠির স্মারক নম্বর তারিখ লেখা হয় ইংরেজিতে। কোনো কোনো অফিস ইংরেজির সাথে বাংলা সন তারিখ ব্যবহার করে। বাংলাদেশের সরকারিী বেসরকারী অফিস আদালতের বছর গণনা ইংরেজীর সাথে সম্পৃক্ত। যা ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসছে। ঐ নিয়মের ব্যর্তয় হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো বা ইংরেজীর পরিবর্তে বাংলা সনের মাধ্যমে সরকারি অফিসে বছর গণনা হতে পারে। বাংলা এখন আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। সরকারি বেসরকারি অফিসের বাংলা ব্যবহার ও বাংলা সনের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।
ইংরেজির জন্য বাংলা সন তারিখ ব্যবহার কোনঠাসা হয়ে আছে বললে ভুল হবে না; বাংলাদেশে ইংরেজি সনের প্রচলন থাকলেও বাংলা সন বা বাংলা বর্ষের প্রভাবও আছে এবং অদূর ভবিষ্যতে ও এর কদর আরও বৃদ্ধি পাবে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলা সনের কদর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রভাব বিস্তার করবে।
বাংলাদেশে একমাত্র ভূমি অফিসে খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলা সনের প্রচলন আছে। চৈত্র মাসে এদেশের মানুষের গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ফসল ওঠে। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মানুষের ঘরে নতুন ফসলের ইমেজ লক্ষ্য করে স¤্রাট আকবরের সময় হতে এদেশে বাংলা বর্ষের ব্যবহার হয়ে আসছে। বাংলা সনকে ফসলি সন হিসেবে ডাকা হ’ত। বাংলাদেশে নববর্ষ একাধিক বার আসে এবং গুরুত্ব সহকারে উদযাপন করা হয়। তন্মধ্যে ইংরেজি ও আরবি সনের ব্যবহার বাংলাদেশে প্রচলন থাকলেও বাংলা নববর্ষ জাকজমকপূর্ণভাবে পালন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে ইংরেজি সনের ব্যবহার সর্বত্র হলেও পহেলা জানুয়ারিকে বাংলা নববর্ষের মত ঘটা করে সরকারিভাবে পালন করা হয় না। বাংলা ভাষা-ভাষি মানুষ নববর্ষ বলতে বাংলা সনের পহেলা বৈশাখকে বুঝে।
নববর্ষ এলে গ্রাম বাংলার গাছে গাছে কচিপাতা, পাখির গান নতুন ভাবে প্রাণের সঞ্চার করে। ব্যবসায়ীগণ পুরাতন হিসেবের খাতা পরিবর্তন করে নতুন হিসেবের খাতা খুলে। দোকানে দোকানে হাল খাতার ইমেজ লক্ষ্য করার মত। গ্রামে ও শহরে বৈশাখি মেলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনে রাঙিয়ে তোলে নতুন বছর বাঙালির পহেলা বৈশাখ। কৃষকের ঘরে নতুন ফসল আশার আলোয় বুক বেঁধে মুখের দোলায় মন নেচে ওঠে। বৈশাখি মেলায় সার্কাস, লাঠি খেলা, পুতুল নাচ, রঙিন বেলুন ও রঙিন কাগজ কেটে মেলা প্রাঙ্গন সাজানো, নববর্ষের সকালে পান্তা ইলিশ এসবই বাঙালির ঐতিহ্যকে এগিয়ে তোলে। গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে নববর্ষের আগমনে খুশির জোয়ার নেমে আসে মেলায়। আয়োজন পুরাতন ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলতে মেলায় গম্ভীরা, আলকাপ গানের আসর, মেলা জুড়ে বাচ্চাদের খেলনা, ভেপু, বাঁশি, পুতুল, চুড়ি, বাদাম ও জিলাপির দোকান। নববর্ষের সূচনা লগ্নে যাকে গরু মহিষের গাড়ি ও ঘোড়ার গাড়ির র‌্যালি, নাচে গানে ভরিয়ে তোলে।
বাংলা নববর্ষে মানুষের মাঝে শুধু আনন্দের ইমেজ বহন করে না। হঠাৎ ইশান কোণে বৃষ্টি আর কাল বৈশাখি ঝড় এক নিমিষে মেলার আয়োজন গরীবের ঘড়বাড়ি একাবারে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে। তবুও নববর্ষ আমাদের বাঙালি জীবনে সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে ফিরে আসে বার বার।
বিশ্বের বাংলা ভাষা-ভাষি সবার কাছেই বাংলা ভাষা যেমন ভীষণ গৌরবের তেমনি নববর্ষের প্রভাব, গুরুত্ব ও মর্যাদা সর্বাধিক। বাংলা ভাষা জ্ঞান চর্চা ও সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এখন সমৃদ্ধ। নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন কেন্দ্রে স্বতঃস্ফূর্ত সকল মানুষের মিলন মেলা। বাংলা নববর্ষের প্রভাব ও মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব বাংলাদেশের। উৎসব আরও আছে, পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের মতো ধর্ম নিরপেক্ষ সার্বজনিন উৎসব আর দ্বিতীয়টি নেই। নববর্ষ বারবার আসবেই তার মর্যাদা নিয়ে আমাদের মাঝে।
কবিতার ভাষায় এভাবে বলা যায়-
বাংলাদেশে বর্ষ আসে
নববর্ষের গান নিয়ে
বাংলাদেশে বর্ষ আসে
কচিপাতার ঘ্রাণ নিয়ে।
বাংলাদেশে বর্ষ আসে
সকল ঋতুর প্রাণ নিয়ে
দলে দলে মেলায় আসে
বর্ষবরণ মন নিয়ে।
বেলা শেষে ঝড় আসে
মঙ্গলময় বার্তা নিয়ে।
বাংলাদেশে ঘটা করে যে ভাবে বাংলা নববর্ষ পালন করা হয়। অনুরূপ অন্য কোনো সনের নববর্ষ এদেশে পালন করা হয় না। বাংলার মানুষের মনে প্রাণে গেঁথে আছে বাংলা নববর্ষ। জাতি-ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রাণের উৎসবে মিলিত হয় এক সাথে। এটা বাঙালি জাতীয় জীবনের ঐতিহ্য। এভাবে বলা যায়-
পদ্মা মেঘনা যতদিন বয়ে যাবে
বাংলাদেশ যতদিন রবে
বাংলা নববর্ষের প্রভাব ততদিন থাকবে।
বঙালি জীবনে বাংলা নববর্ষকে অবমূল্যায়ন বা খাট করে দেখার অবকাশ নেই। কথায় আছে আপনা ঢোল আপনি পেটান। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের কদর অন্য ভাষা-ভাষির দেশ জাতি করবে না এদেশের মানুষকেই করতে হবে। যার যার তার তার। বাংলা ও বাঙালি জীবনে নববর্ষের প্রভাব আষ্টেপিষ্টে রয়েছে; তাই প্রতি বছর এদেশে নববর্ষ সরকারি বেসরকারি ভাবে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। পরিশেষে বলা যায়- বাংলা ও বাঙালির জীবনে চির জাগরুক হয়ে থাক বাংলা নববর্ষ।
লেখক: কলামিস্ট