বাজপাখির পুনর্জন্ম

আপডেট: জুলাই ৭, ২০১৭, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

গোলাম মোস্তফা অভি


সমুদ্র তটের উপর টুকরো মেঘের মতো ছায়াটা ঘুরপাক খায়। কখনো জলের ভিতর,  কখনো তটে। ছায়াটা কুন্ডলি পাকিয়ে ঘোরে। বাজপাখিটা যখন তার দীর্ঘ পাখা প্রসারিত করে ওড়ে তখন ছায়াটা সমুদ্রতটে দীর্ঘ কাড়া হয়ে পড়ে। খাঁ খাঁ রোদ্দুরে ও একাকী ওড়ে সমুদ্রের তটে সমুদ্রের নীল জলের ওপর। বেঁকে বেঁকে পাক খেয়ে উড়ে যায় জলের থেকে অনেকটা উপরে। নিচে তাকিয়ে ও সমুদ্রের ছোট এবং মাঝারি মাছের চলার গতি পরখ করে। বেশ কটি তা দেওয়ার পর ও হতাশ হয়। কোথাও ও শিকার দেখতে পায় না। সমুদ্রের নীল জলে ও মাছ খুঁজে বেড়ায়। তীক্ষèদৃষ্টি দিয়ে অতি সন্তর্পণে তাকায় নিচে, একেবারে নীল জলের গভীরে। যেখানে ঝাঁকবাঁধা মাছেরা খেলা করে। এক সাথে সাঁতরে চলে, আবার ডুব দেয় সমুদ্র অতলে। আজ বাজ পাখিটা অনেক পরিশ্রান্ত। প্রচ- রোদ একটুও বিরাম দেয়নি। এতটুকু ফুসরৎ পায়নি একটা ছোট সামুদ্রিক মাছের আশায়। ঊনচল্লিশ বছর বয়সের কোঠা অতিক্রম করেছে কদিন আগেই।
সূর্যের প্রখর তাপ আর পাখাটা ছড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ উড়ে  ও পরিশ্রান্ত। শেষে বাধ্য হয়েই বিশ্রাম নিতে হয়। তটের কাছে ছৈলা বনের আড়ালে ঝোপের আরো ভিতরে শিশুগাছটির ডালে। সেখানে বসে একবার চোখ ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখে নেয়। মাথাটা বাঁকিয়ে তাকায় কখনো সমুদ্রের নীল জলে, কখনো নিজের শরীরে। বাঁকা ঠোঁট দিয়ে বুকের নিচে খোটে। গলাটা ঘষে পালকের সাথে।  নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে নেয় প্রকৃতির চিরকালীন স্বভাব। মনে মনে ভাবে নিজের অক্ষমতার কথা। ও এখন ক্লান্ত, বয়সের ভারে নুব্জ। ধারালো ছুরির ফলার মতো ঠোঁট বাঁকা হয়ে গেছে। পাখনা আর আগের মতো সোজা করে উড়তে পাওে না। বাঁকা হয়ে বুকের সাথে মিশে যায় ডানা দুটো। নখগুলো হয়ে গেছে লম্বা আর নরম, ধার নেই আগের মতো। ভোতা কাস্তের আলের মতো  আলগা হয়ে যায় নখগুলো। কোনো কিছু ধরে সামলাতে পারে না। মাথাটা নুইয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে ভাবে অতীতের স্মৃতিগুলো। হারিয়ে যায় স্মৃতিময় সোনালি অতীতে। তখন ওর বয়স ছিল কুড়ি।  পাখায় ছিল ক্ষিপ্রতা, শরীরে ছিল প্রবল তেজ। শক্ত, বলীয়ান, ত্যাজী ছিল ডানাগুলো। সবুজ জলে ভেসে ওঠা মাছ দেখত দূর থেকেই। ক্ষিপ্র হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত সাঁতরে চলা মাছের উপর। প্রচ- গতি নিয়ে বর্শার ফলার মতো বিদ্ধ করে দিতো মাছের শরীরে ওর ধারালো ঠোঁট। সূঁচের মতো নখগুলো ঢুকিয়ে দিত মাছের শরীরে। তখন পাখনা ছিঁড়ে বুকটা ফুটো হয়ে হৃদপি-ের মধ্যে ঢুকে যেত ধারালো নখ। মাছটি ছটফট করতো দু-পায়ের ফাঁকে, বাঁচার জন্য প্রাণপনে কত রকমের চেষ্টা! কত রকমের লাফালাফি। কত ভাবে মোড়াতো মাথাটা ঘুরিয়ে। কখনো ছাড়িয়ে নিতে পারেনি নিজকে। মাছটাকে অসহায় করে পায়ের নখ আমুলে বিদ্ধ করে উড়ে উড়ে গাছের ডালে গিয়ে বসত। তারপর চলত ঠোঁটের কাজ। মাথাটা এদিকে ওদিকে ঘুরিয়ে ছুরির ফলার মতো ঠোঁট দিয়ে ঠোকর দিয়ে খেত টাটকা মাছ। বাতাসে ছড়িয়ে যেত তাজা মিষ্টি রক্তের গন্ধ। ছড়িয়ে পড়ত গাছের ডালে, পাতায়। সবুজ পাতার শিরা বেয়ে রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ত নিচে। কখনো শিকারের তৃপ্তি নিয়ে নিজকে বিজয়ী মনে হত। উল্লাসে আয়োজন করে উড়ে বেড়াত সমুদ্র তটের থেকে দূরে সমুদ্রের আরো ভিতরে, যেখানে মাছ ধরার ট্রলার চলে সরীসৃপের মতো সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে। তারপর একটু ক্লান্ত হলে জিরিয়ে নিত তটের কোনো গাছের ডালে পরম তৃপ্তিতে।
ওর সেই স্মৃতি এখন নোনা হয়ে গেছে সমুদ্রের জলের মতো। সাথের পুরুষ সঙ্গীটিও এখন নেই। একদিন ঝড়ের বিকেলে দুজনে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে বাতাসের ঝাপটায় পথ হারিয়ে ফেলে। পশ্চিমের পথ ধরে ওরা উড়ে যাচ্ছিল। সমুদ্র থেকে শাখা হয়ে বয়ে চলা পায়রা নদীটি পথে পড়ে। পায়রার কূল ঘেঁষে ওরা কোনো আশ্রয় খুঁজে পায়নি। উড়ে উড়ে পাখনায় বাতাসের ভারে ক্লান্ত। তখন পুরুষ সঙ্গীটি পায়রার ওপাড়ে ফাতরার বনের দিকে উড়াল দেয়। সে ওপাড়ে ফাতরার বনে যেতে পেরেছিল কিনা তা জানা নেই। সেই থেকে বাজপাখিটি নিঃসঙ্গÑ একা।
তারপর একা একা কেটেছে অনেক বছর। একসাথে ওড়া হয়নি কারো সাথে, শিকার নিয়ে খুনসুটি হয়নি কখনো। নিস্তব্ধ রাতে গাছের ডালে ও একা ঘুমায়। গভীর রাতে সমুদ্রের গর্জনে ভয় পেলে সঙ্গীটির কথা মনে করে অদৃশ্য কান্না করে। ভোরের বাতাসে সে নিজেকে সজীব করার চেষ্টা করে। শরীরটাকে একটু আবেগ দেওয়ার জন্য তটের জলের খুব কাছাকাছি হাঁটে। ঝাপটা দিয়ে আসা ঢেউয়ের জল পাখনায় ছুঁয়ে নেয়। রোদ উঠলেই শিকার খুঁজতে আকাশে ওড়ে।
বুভূক্ষু বাজপাখি ঘোলাটে চোখে সমুদ্রে তাকায়। তিনদিন গত হয়েছে একটা শিকারও পায়নি। চালাক উড়–ক্কু মাছ গা ভাসিয়ে শূন্যে লাফিয়ে বেড়ায়, লোভ দেখিয়ে আবার সমুদ্রে ডুব দেয়। মাছগুলো চলে যায় অনেক গভীরে। হতে পারে  সমুদ্রের নিচের শক্ত পাথরের কোল ঘেঁষে শেওলার আস্তরণের কাছে। সেখানে ওরা মন্থর গতিতে সাঁতার কাটে। বাজপাখিটির চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। কী করে মাছগুলো বাজপাখির  আসা-যাওয়া টের পায়  কেউ জানে না। হয়ত পাখির দীর্ঘ পাখনার ছায়া পড়ে নীল জলের তলে। নয়ত শরীরের কোন অঙ্গ দ্বারা বুঝে নেয় পাখির আসা যাওয়ার শব্দ। হয়ত তরঙ্গ ওদের সংকেত দেয়। না হলে একশ কুড়ি মাইল বেগে ছোঁ মারা বাজপাখির থেকে কি করে চালাক মাছগুলো নিজেদের বাঁচায়! বাজপাখিটি তাই নিতান্ত অসহায়। বুকের লম্বা হাড়টি ওর বের হয়ে গেছে। পশমগুলি তৈলাক্ত চকচকে ভাব থেকে হয়ে গেছে ধূসর এবং তামাটে। সামান্য বাতাসে বুকের পশম ছড়িয়ে যায় দুদিকে। পায়ে  জোর নেই মোটেও, বাতাসের ঝাপটা এলে ডালে বসে থাকতে  খুব কষ্ট হয়। খুব ক্লান্ত হয়ে মাথাটা বুকের একপাশে ডানার নিচে লুকিয়ে ঝিমায়। বাজপাখি আজ আরো বেশি ক্লান্ত।
ক্ষুধায় ক্লান্ত হয়ে পেট গুলিয়ে পানির মতো বমি করেছে গাছের ডালে। যে পাতা মাছের রক্তে রঞ্জিত হতো একদিন সে পাতায় ছড়িয়ে পড়ে বমন করা বিশ্রি সাদা নোনতা পানি। মাথাটা গোলায় ওর, ঢলো ঢলো হয়ে ডাল থেকে ছিটকে পড়ে যেতে চায় দেহটা। তবুও নিজেকে সামলায়। ক্লান্ত মনে নিজকে বাঁচানোর চেষ্টায় নতুন ফন্দি করে। সমুদ্রের পথ ছেড়ে ও জনপদে যাবার চিন্তা করে। গৃহস্থ ঘরের হাঁস-মুরগির ছানা মায়ের পেছনে আদুরে ভঙ্গিতে হাঁটে। ছোট পোকা মাকড় ঠোঁট দিয়ে খুঁটে খায়। সেখানে গেলে দু-একটা ছানা বাগে এনে ছোঁ মেরে উড়াল দিবে আকাশে। বেশি দূর ও যেতে পারবে না ঠিক। সামান্য উঁচু গাছের ডালে বসে নখ দিয়ে ছানাটার পেট ছিঁড়ে খাবে। এটাই ওর বাঁচার পরিকল্পনা।
অবশেষে ও বাতাসের সাথে ডানাটা মেলে ধরে। মন্থর গতিতে ডানা ঝাপটায়। পাখনা মেলতে পারে না পুরোপুরিভাবে। এভাবেই বাজপাখি  উড়ে চলে জনপদের দিকে। বিকালের ম্লান রোদের আলো ওর চোখে পড়ে। সবুজ প্রান্তরের পথ ধরে ওড়ে উত্তরে। বির্স্তীর্ন ফসলের নগ্ন ক্ষেত খাঁ খাঁ করছে বহূদূর। আরো বহুদূরে রয়েছে মানুষের বসতি। সেখানে খড়ের ঘরে গৃহস্থরা সংসার পেতেছে। হাঁস মুরগির ছানাগুলো শুভ্র উঠানের কোণে এটা ওটা খোঁটায় ব্যস্ত। উড়তে উড়তে ও এসব কল্পনা করে। সে পথ আরো দূরে। সেখানে ও শেষ পর্যন্ত উড়ে যেতে পারবে কিনা ভাবে।
হঠাৎ দেখে সমুদ্রের দিকে উড়ে যাচ্ছে একটি হেলিকপ্টার। ঠাঁ ঠাঁ শব্দে ওর বড় বিরক্ত লাগে। আকাশের বহু নিচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখার বাহনটি। মনে হলো, হেলিকপ্টারের পাখনাটি ওর পাখার উপর আঘাত করবে। গতিপথ পরিবর্তন করে বাজপাখি। বিলের মাঝে ছাড়া ভিটার পথ ধরে ও এগোয়। সেখানে বড় রেইনট্রি গাছের ডালের সাথে ধাক্কা খেয়ে নিজেকে সামলায় কোনো মতে। শরীর থেকে কয়েকটি পালক খসে গিয়ে বাতাসের সাথে পাল্টি খায়। ব্যথাতুর চোখে উড়ে যাওয়া পালকের দিকে তাকায়। তখন হেলিকপ্টারটি সমুদ্রের কাছে চলে গেছে।
হামাগুরি দেওয়ার মতো চলে বাজপাখি। অবশেষে বিলের মাঝে একটা খড়ের ঘর আর ধবধবে সাদা উঠান দেখতে পায়। বাড়িটি খোলামেলা, সাধারণ। মনে হয় নতুন কোনো সদ্য বিবাহিত দ¤পতি সেখানে ঘর বেঁধেছে। বাড়ির চারপাশে গাছপালা নেই মোটেও। তাই বাজপাখি ভরসা করতে পারে না। কখনো বাড়ির উঠানের দিকে তাকায়, আবার কখনো বিস্তীর্ণ ফসলের খালি মাঠের দিকে । তারপর ভাবে, শিকার করতে পারলে এই বিলের কোথাও বসে আয়েশ করে খাবে। এবার ও বাড়ির উপরে কয়েকটি চক্কর দিয়ে চোখ ঘুরায়। প্রথমে মা হাঁস মুরগি খোঁজে, কিন্তু সদ্য সংসার পাতা পরিবারটি হাঁস মুরগি এখনো পালন করা শুরু করেনি।
বাজপাখি আবার ওর গতিপথ পরিবর্তন করে। ডাইনের পথ ধরে আরো পূবে উড়তে শুরু করে। সামনে একটু পরপর গোল গাছের ঝোপ। আড়াল পেরিয়ে লম্বা তাল গাছের সাড়ি। উঁচু তাল গাছের মাথায় বিশ্রাম নিতে চায়। ওর ডানা ব্যথা হয়ে গেছে। পালক ছিঁড়ে টনটনে ব্যথাটা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। ও আর চলতে পারে না। ওদিকে পশ্চিমাকাশে সূর্য হেলে পড়েছে সমুদ্রের তটের দিকে। দূরে সারি সারি গাছের আড়ালে একটু পরে টুপ করে র্সূযটা লুকিয়ে যাবে দিগন্তে। তখন এই জনপদ থেকে ওর নিজের আস্তানায় যাওয়া মুশকিল হবে। তবু ও উড়ে চলে খাবারের আশায় বিরামহীন আরো ধীরে।
সামনের বাড়িটি অবস্থাস¤পন্ন গৃহস্থের, বাড়িতে সবকটি ঘর টিনের ছাউনি। কাঁচা বাড়ির চারপাশে মাটির উঁচু কান্দি। কান্দির লাগোয়া বেড়ের কুয়ায় একটি মা মুরগি সতর্ক হচ্ছে। মাথাটা উঁচু করে আকাশের দিকে বারকয়েক তাকায়। সতর্ক শব্দ পৌঁছে দেয় ছানাদের মাঝে। দূরে একটি ছানা কেঁচোর সাথে খেলা করছিল। সেখানে আর কোনো সহোদর নেই। ছানাটি একা, কখনো মুখে চি চি শব্দে ডাকে ভয়ার্ত হয়ে কেঁচোর শরীরে ঠোঁট দিয়ে ঠোকর মারে। তখন মা মুরগিটি বাজপাখির সংকেত পেয়ে ডানা মেলে দেয়। দূরের ছানাটি ডানার নিচে আসার আগেই বাজপাখি ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওর শিকার করার জোর নেই, একশ বাইশ মাইল গতি নেই ডানায় তবুও ও মনের জোরে ছোঁ মারে। দুপায়ে নরম নখের ভিতর চেপে মুরগি ছানাটি নিয়ে ও আকাশে উড়াল দেয়। না, ও আর নিচ থেকে উপরে ওঠার
শক্তি পায় না। উড়তে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে। তবুও  ওড়ে মনের শক্তিতে বাঁচার আশায়। অবশেষে  সফল হয়। তবে কোনো উঁচু ডালে বসতে পারে না। মা মুরগিটা ছানার জন্য ঝাপটায়। বাজপাখি তখন ক্ষীণ শাবকটির পেট ছিঁড়ে খেতে উদ্যত হয়। দীর্ঘ অনাহারে ওর গলা দিয়ে আহার নামে না। ছানাটা এখনো চিঁ চিঁ করে ডাকছে। ছানাটির ছোট্ট শরীর বাঁকা ঠোঁট দিয়ে কায়দা করতে পারে না । তবুও কোনো মতে ছিঁড়ে ছানাটির অর্ধমৃত দেহ গোগ্রাসে গেলে। আহারের শেষ করতে পারেনি। দুর্বল পায়ের ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ে যায় মৃত ছানাটির অর্ধাংশ। এঁটো মুখে ও নির্বাক বিক্ষত ছানাটির দিকে বুভূক্ষু তাকায়।
এবার ও আবার আকাশে ওড়ে। বিলের পথ ধরে প্রথমে ডানে তারপর গোলপাতার বনের ধারে জিরোয়। যেহেতু সেখানে ওর বসার মতো কোনো ডাল নেই তাই রাজ শাহী দরবারের বড় হাতপাখা নাড়ার গতিতে ওড়ে। প্রসারিত ডানায় ভর করে ফসলহীন মাঠে তাকায়। নির্জনা ফসলহীন প্রান্তরে কোথাও ওর সঙ্গী নেই। এই আকাশের শূন্য পথে ও একা, শুধুই একা।
সমুদ্র পাড়ে পৌঁছাতেই আঁধার ঘনিয়ে আসে। শরীরে প্রচ- তাপ অনুভব করে বাজপাখি। কখনো মনে হয় শরীর এলিয়ে দেয় ডালের উপর। দক্ষিণা সামুদ্রিক হাওয়া থেমে থেমে ওর গায়ে লাগে। শীতার্ত ভাব মনে হয, শরীর জড়োসরো হয়ে আসে। আবারও ও সঙ্গী পাখিটির নষ্টালজিয়ায় আড় চোখে তাকিয়ে ভাবে। ওর মনে হয়, এই পৃথিবীর কোনো প্রাণীর অকৃতজ্ঞ এবং অসভ্য আচরণে প্রকৃতি বিরূপ হয়। সমুদ্রের গভীর থেকে ধেয়ে আসে প্রচ- ঢেউ আর পাগলা ঘূর্ণি বাতাস। যাতে ধ্বংস হয় অন্য প্রাণীকূলের সংসার। হারায় প্রকৃতির শোভা গাছপালা। রাস্তায়, বিলের ধারে, শস্য ক্ষেতের আলে পড়ে থাকে মৃত শবের সারি। কিন্তু কোন প্রাণীর কৃতকর্মের ফল এই প্রলয়, বাজপাখি তা জানে না।
রাতটা নির্ঘুম পার করেছে বাজপাখি। ভোরের আলোতে সে সমুদ্রতটে তাকায় ক্লান্ত প্রাণে, ঘোলাটে চোখে। পেটপুরে কিছু খেয়ে জীবন ধারণ করতে হবে ওর। বাঁকা ঠোঁটে, নরম নখে কোনো শিকার ও কায়দা করতে পারে না। তবুও উদরপূর্তির সন্ধানে সমুদ্রতটে চোখ বুলায়। যদি সমুদ্র থেকে ভেসে আসা কোনো মাছ ওর চোখে পড়ে। হোক মাছটি অর্ধ পঁচা কিংবা চোখদুটো খেয়ে ফেলেছে অজ্ঞাত অন্য মাছ। তবুও বাঁচার তাগিদে নরম হয়ে যাওয়া মাছটি বাঁকা ঠোঁটে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। ভাগ্য ওর সহায় হয়নি মোটেও। চৌদ্দঘরি শেষ হয়ে দুপুরের চোখ ধাঁধানো রোদ দিগন্তে। নীল আকাশের ছায়া পড়ে সমুদ্রের পানি আরো নীল হয়েছে। সেখানে একঝাঁক মাছের উপর ও ব্যর্থ ছোঁ মেরেছে কয়েকবার। মাছ ও ধরতে পেরেছিল কিন্তু মাছেরা ওর বাঁকা ঠোঁটে আর নরম নখে আটকে যায়নি তাই জলের তলে তারা দ্বিগুণ উল্লাসে মাতে। অবশেষে সন্ধ্যা আসে। দিগন্ত রেখায় রাতের আগমনী ওর কাছে ভয়ের উদ্রেক ঘটায়। আজ রাতেই খারাপ কিছু হতে পারে ওর জন্য।হয়ত  ক্ষুধায় কাতর হয়ে পানি বমি করে ডালপালা ভাসিয়ে পা ছেড়ে দিয়ে বালুর উপর পাখা ছড়িয়ে পড়ে থাকবে। ঝোপের আড়ালে থাকা শিয়াল এসে নিয়ে যাবে অর্ধ মরা দেহটি। বুকটা ছিঁড়ে কলিজা বের করে আয়েসে খাবে। নয়ত গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাবে তটের শেষ ভাগে সমুদ্রের জলের কাছে। সেখানে ঢেউয়ের ওঠানামায় ওর শরীরও ওঠানামা করবে।