বাজ পড়ার ৩ ঘণ্টা আগেই এ বার আসবে এসএমএস অ্যালার্ট!

আপডেট: আগস্ট ২, ২০১৮, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


আর চার দিন আগে চালু হলে কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরই প্রাণ বাঁচিয়ে দিত তিলজলা রোডের বছর পঁচিশের অজয় মল্লিকের! মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব লাগোয়া এলাকায় মাথায় বাজ পড়ায় বেঘোরে প্রাণ যেত না অজয়ের। হাসপাতালে মত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হত না অজয়ের বাগদত্তা ১৯ বছরের মনীষাকে। যেমন কথা ছিল, ক’দিন পর সেইমতো বিয়েও হতে পারত দু’জনের।
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি) সূত্রের খবর, সেই প্রাণঘাতী বাজের হাত থেকে বাঁচার উপায় এ বার অনেক আগেভাগেই আমাদের হাতে এসে যাচ্ছে। অন্তত ১ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে তো বটেই। একটি বিশেষ প্রযুক্তিতে। মোবাইলে আসা এসএমএসের মাধ্যমে। অ্যান্ড্রয়েড ফোনে আবহাওয়া দফতরের প্রতি ১০ মিনিট অন্তর আপডেট হওয়া ওয়েবসাইটের দৌলতে।
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের এক শীর্ষকর্তা বলছেন, এমন দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার রাস্তা অনেকটাই খুলে যাবে তিন মাস পর। এ বার ১ থেকে ৩ ঘণ্টা আগেই জানা যাবে কোথায়, কখন, কতটা গতিবেগে পৌঁছে যাবে বজ্রগর্ভ মেঘ। জানা যাবে সেই বজ্রগর্ভ মেঘের শক্তি কতটা। বলা যাবে তার জেরে কি বজ্রপাত হবে প্রচ-, নাকি হবে মাঝারি বজ্রপাত? জানা যাবে আকাশের কতটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বিদ্যুতের ঝলকানি। শক্তিতে কতটা দড় হবে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি।
চেষ্টা চলছে, যাতে আগামী বছর বজ্রবিদ্যুতের মরশুম (মহারাষ্ট্র-সহ অনেক জায়গাতেই যা মার্চে) অন্তত ৬ ঘণ্টা আগে সেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়। বহু দূরে চাষের জমি থেকে যাতে কোনও বিপদ ছাড়াই ঘরে ফিরতে পারেন কৃষকেরা।
এখন ওয়েবসাইটে দেখানো হচ্ছে বাজের মেঘ দেশের কোথায় কোথায় জমেছিল ১০, ২০, ৩০ মিনিট আগে
প্রকল্পে ইসরো, নৌবাহিনীও
ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো), ভারতীয় নৌবাহিনী ও পুণের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মেটিরিওলজি’ (আইআইটিএম)-র সহায়তায় এ বার দেশের আপামর মানুষের জন্য এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রকের অধীনস্থ কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর।
বছরে দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার
ফি বছর ভারতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারান যত মানুষ, তার একটি বড় অংশের মানুষের মৃত্যু হয় মাথায় বা শরীরের বিভিন্ন অংশে বাজ পড়ায়। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, এ দেশে বাজ পড়ায় বছরে গড়ে মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭৫৫ জনের। সাম্প্রতিক অতীতে বাজ পড়েমৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে মহারাষ্ট্র, ওড়িশা ও কেরলে। খুব একটা পিছিয়ে নেই রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলিও। ২০১৪–র পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন মহারাষ্ট্রে, তার ২৯ শতাংশেরই মৃত্যু হয়েছে বজ্রাঘাতে। ওড়িশা আর কেরলে সেই হার যথাক্রমে ২৭ এবং ২০ শতাংশ। তালিকায় বেশ সামনের সারিতেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নাম। চার বছর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এ রাজ্যে, তার ১২ শতাংশের মৃত্যু হয়েছিল বজ্রাঘাতে। আর উত্তরপ্রদেশে সেই হার ৯ শতাংশ।

ইসরোর উপগ্রহ ‘ইনস্যাট-৩-ডি’
‘‘তাই বজ্রাঘাতে মৃত্যুর ঘটনা কমাতে আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছি আমরা। ওই পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য ভারতীয় নৌবাহিনী এবং আইআইটিএমের প্রায় ৪০টি লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর ছাড়াও ব্যবহৃত হবে ইসরোর দু’টি কৃত্রিম উপগ্রহ, ‘ইনস্যাট-৩ডি’ এবং ‘ইনস্যাট-৩ডি (আর)’। ব্যবহার করা হবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের ১৪টি রাডারকেও’’, বলছেন কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর, বিশিষ্ট আবহবিদ অসীম মিত্র।
অসীমবাবু জানাচ্ছেন, এখন আবহাওয়া দফতরের ওয়েবসাইটে (িি.িরসফ.মড়া.রহ) ১০, ২০ এবং ৩০ মিনিট আগে দেশের কোন কোন এলাকায় বজ্রগর্ভ মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল, তা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তা হলে কি আর বাজ পড়ার শব্দ শুনে আর প্রাণ বাঁচাতে এ-দিক ও-দিকে ছুটোছুটি করতে হবে না? প্রাণের ভয়ে শাঁখ বাজিয়ে আর মনে মনে জপতে হবে না ঈশ্বরের নাম? মাথা বাঁচাতে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যেতে হবে না আমাদের?
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর অসীমবাবুর কথায়, ‘‘এ বার এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ওই মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ শতাংশ কমে যাবে, এমনটা দাবি করছি না। তবে তা যে অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে, এটা নিয়ে কোনও সংশয় থাকতে পারে না।’’
প্রচেষ্টার সূত্রপাত মহারাষ্ট্রে ৩ বছর আগে
এ ব্যাপারে গত তিন বছর ধরে মহারাষ্ট্রে রীতিমতো সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন যিনি, পুণের আইআইটিএমের সেই ‘লাইটনিং অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম ডিটেকশন’ প্রকল্পের অধিকর্তা বিশিষ্ট আবহবিজ্ঞানী সুনীল ড্যান্ডিও পওয়ার বলছেন, ‘‘মহারাষ্ট্রে ফি বছরে গড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৪০০ মানুষের মৃত্যু হত বজ্রাঘাতে। কিন্তু আমাদের পদ্ধতিতে সেই সংখ্যা অনেকটাই কমানো গিয়েছে। লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর বসানো হয়েছে ভুবনেশ্বর-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আগামী দিনে ওই সেন্সরের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কারণ, এই পদ্ধতিটিকেই আমরা সারা দেশে ব্যবহার করতে চাই। ছড়িয়ে দিতে চাই।’’
বাজ, বজ্রবিদ্যুতের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য শুধু মহারাষ্ট্রেই ২০টি লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর বসিয়েছে আইআইটিএম। পওয়ার জানাচ্ছেন, কোন কোন এলাকায় বজ্রগর্ভ মেঘের সৃষ্টি হচ্ছে আর তা কোন গতিবেগে কোন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ওই সেন্সরগুলি দিয়ে ১০, ২০ এবং ৩০ মিনিট আগে তার খবরাখবর ওয়েবসাইট এবং এসএমএসের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ বার ১ থেকে ৩ ঘণ্টা আগেই বলে দেওয়া যাবে বাজ পড়তে পারে কোন কোন এলাকায়।
কী ভাবে তা সম্ভব হবে?
অমদাবাদে ইসরোর স্পেস অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের বিজ্ঞানী, ভারতের দু’টি কৃত্রিম উপগ্রহ ‘ইনস্যাট-৩ডি’ এবং ‘ইনস্যাট-৩ডি (আর)’ প্রকল্পের কর্ণধার চন্দ্র মোহন খিস্তোয়াল বলছেন, দু’টি উপায়ে। উপগ্রহগুলির মাধ্যমে বজ্রগর্ভ মেঘ কোথায় জমেছে, তা কোন দিকে কত গতিবেগে সরে যাবে, তার খোঁজখবর পাওয়া যাবে। আর মাটিতে বসানো লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর ও রাডারের মাধ্যমে জানা যাবে বিদ্যুতের ঝলকানিতে ঝলসে যেতে চলেছে কোন কোন এলাকা। আমাদের দেশের উপগ্রহগুলিতে এখনও নেই লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর। তাই বাজের পূর্বাভাস দেওয়া যাবে রাডার ও মাটিতে বসানো লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সরগুলির মাধ্যমেই।
ভূবনেশ্বরে বসানো আইআইটিএম-এর লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর
বিশিষ্ট আবহবিদ পওয়ার জানাচ্ছেন, দু’ধরনের মেঘ থেকে বাজ, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি আর বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির জন্ম হয়। এক ধরনের মেঘকে বলে ‘কনভেক্টিভ ক্লাউড’। অন্য ধরনটি হল ‘ডিপ কনভেক্টিভ ক্লাউড’। কলভেক্টিভ ক্লাউড থেকে যে বাজ পড়ে তা অতটা প্রচ- হয় না। তুলনায় কম হয় বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি আর বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পরিমাণও। কিন্তু ‘ডিপ কনভেক্টিভ ক্লাউড’ থেকে সবক’টিই হয় বেশি পরিমাণে। কৃত্রিম উপগ্রহ, রাডার আর লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সরের মাধ্যমে সেই মেঘের ওপরে নজর রেখেই এমন পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
কোন মেঘ কেমন, কোন মেঘ থেকে বাজ
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেল, দেশের বিশিষ্ট আবহবিদ মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্রের কথায়, ‘‘বজ্রবিদ্যুৎ বা বাজও তৈরি হয় দু’রকম ভাবে। একটা ‘ইনট্রা-ক্লাউড’। যে বজ্রবিদ্যুৎ মেঘের মধ্যে তৈরি হয়ে মেঘেই থেকে যায়। মাটিতে নেমে আসে না। আর একটা ধরন হল, ‘ক্লাউড টু গ্রাউন্ড লাইটনিং’। যা মেঘের ভেতর তৈরি হয়ে মাটিতে নেমে আসে। এগুলিই আমাদের পক্ষে বিপজ্জনক, প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।’’
আইআইটিএমের এক বিশিষ্ট আবহবিদের বক্তব্য, সেই মেঘগুলির গতিবেগ আর সেগুলি কোন দিকে যাচ্ছে, সেন্সর, রাডার আর উপগ্রহের মাধ্যমে তার ওপর নজরদারি চালিয়েই বলে দেওয়া সম্ভব, কোন কোন এলাকায় সেই মেঘগুলি ছড়িয়ে পড়তে চলেছে। আর তার ফলে কোন কোন এলাকায় প্রচ- বজ্রপাত বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ তুমুল বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি হতে চলেছে। এই পদ্ধতিকে বলা হয়, ‘নাউকাস্টিং’।
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেল মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র বলছেন, ‘‘ওই মেঘগুলির ওপর নজর রেখেই বজ্রবিদ্যুতের পূর্বাভাস এখন ১ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি যাতে আগামী বছর থেকে তা ৬ ঘণ্টা আগেই দেওয়া সম্ভব হয়।’’তথ্যসূত্য: আনন্দবাজার পত্রিকা