বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

বাবাসহ অন্য শহিদ ঘাতকদের বিচার চাই : প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

আপডেট: December 9, 2019, 1:31 am

মিজারুল শেখ


মুক্তিযুদ্ধ চলছে, আমি তখন ছোট। ১৭ নভেম্বরের রাত। বাড়ির পার্শে¦ বাবা অজ্ঞাত একজনের সাথে কী যেন আলোচনা করছিলেন। বাবা আমাকে দেখে সেখান থেকে সরে যেতে বললেন। কিছু বুঝতে না পারলেও তাদের কথা বার্তায় বুঝলাম অ্যাকশন, অপারেশন নিয়ে কথা হচ্ছিল। এরপর বাবা কোথায় যেন চলে গেলেন। ১৮ নভেম্বর মধ্যরাতে মুক্তিযোদ্ধারা রাজশাহী জেলার পবা থানার দুয়ারী বাগধানী ব্রিজে অপারেশন চালালো। অপারেশন শেষে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে শেল্টার নিলেন। পবা থানার নওহাটায় থাকা পাকিস্তান বাহিনীর দোসর রাজাকার সুজা ও তোতা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জানতে পেরে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে খবর দেয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা খুব ভোরে দোসরদের নিয়ে মোহনপুর থানার মুগরইল গ্রামে অভিযান চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী আখ্যা দিয়ে বাবাসহ ষোল জনকে এক দড়িতে পিঠমোড়া করে বেঁধে অছির খার ফাঁকা বাড়ির আঙিনায় বসিয়ে রাখলো। আর গ্রামের আরো কিছু লোককে ধরা হয়েছিল। পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রামের ওই লোকদের খাসি, মুরগি ধরে আনতে বললো। গ্রামের মানুষ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গ্রাম থেকে পালিয়ে গেল। বাবা কৌশলে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ধরা পড়ে গেলেন। বাবাসহ ষোলজনকে বেঁধে রেখে পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসররা ঘরে ঘরে আগুন দিতে থাকল। এরপর সৈন্যরা বাবাসহ ষোলজনকে ঘটিহার পুকুরপাড়ের উত্তরে এবং মুগরইল গ্রামের পশ্চিম-দক্ষিণে আধা কিলোমিটার দূরে রাস্তার ধারে ( স্থানটি মোহনপুর থানার মধ্যে) জড় করে নির্বিচার গুলি করে করল। ষোল জনের মধ্যে মাত্র এতজনই প্রাণে বাঁচেনÑ ছৈমুদ্দিন শেখ। তার পায়ের বাহুতে গুলি লাগে কিন্তু সে মরার মত অন্য লাশের সাথে চুপ করে ছিলেন। প্রতিবন্ধী ভিকেরি গ্রামের ময়েজ উদ্দিনকে আর্মিরা ধরেছিল কিন্তু সে প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক হওয়ায় তাকে ছেড়ে দিয়েছিল। ময়েজ উদ্দিন আখের জমিতে লুকিয়ে হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনিই দৌড়ে এসে নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর গ্রামবাসীদের জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসররা চলে যাওয়ার পর আমি দৌড়ে ঘটিহারে গিয়ে বাবা বশির উদ্দিনের মৃত দেহ খুঁজতে থাকলাম। চারটি মৃতদেহের নিচে চাপা পড়ে থাকা বাবার মৃতদেহ খুঁজে পেলাম। বাবার গাঁয়ে থাকা চাদর খুলে নিলাম। পুরো চাদরে জমাট রক্তের দাগ। গুলিতে বাবার মাথার খুলি উড়ে গেছে। মাথা থেকে বেরিয়ে যাওয়া মগজ কুড়িয়ে বাবার মাথায় রাখলাম। দূরে ইদ্রিস আলীর কলিজা ও বৈদ্যনাথের ভুরি পড়ে থাকতে দেখলাম। বিভৎস সেই দৃশ্য। অন্যরাও তাদের স্বজনদের মৃতদেহ খুঁজতে থাকল। সারাদিন পুকুর পাড়েই লাশ পড়ে ছিল। দাফন করার মত গ্রামে কোনো লোক ছিল না। পরে লোক ডেকে লাশ সৎকারের উদ্যোগ নেয়া হয়। মধ্যরাতে গ্রামের লোকজনের সহযোগিতায় বাবার মৃতদেহ কাফন গোসল ছাড়াই মইয়ে বহন করে নিয়ে বাড়ির পাশে দাফন করলাম। ফুফুর পরা সাদা শাড়ি বাবার লাশের ওপর বিছিয়ে দেয়া হয়। পরের দিন মা সোনাভাং আমাকেসহ দুই ভাই, দুই বোনকে নিয়ে পবার বায়ায় ছোট ফুফুর বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিলেন। এখানেই আমরা বছর পাঁচেক ছিলাম। তখন আমি মাত্র ৯ বছরের শিশু।
আমরা তিন ভাই, দুই বোন। শুরু হল অন্য এক সংগ্রাম। মা ভিক্ষা করে আমাদের খাবার জোটাতে থাকলেন। আমি ভিক্ষা করে, দোকান থেকে বিস্কুট চেয়ে চেয়ে খেয়ে ক্ষুধা মেটাতে থাকলাম। মা রাস্তায় ফেলে দেওয়া শাকসবজি তুলে নিয়ে গিয়ে লবণ মিশিয়ে আমাদের খাওয়াতে থাকলেন।
দেশ স্বাধীন হল। সাহায্য হিসেবে পাওয়া টিন বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে বাবা ও অন্যান্য শহিদদের নামে মিলাদ দিলাম। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা ২ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মা আমাদের নিয়ে ভারতে চলে যান। ওখানে রহিম মন্ডলের বাসার বারান্দায় আশ্রয় নেয়। মুর্শিদাবাদ জেলার রানীনগর থানা সদরেই আমাদের পূর্ব পুরুষদের বাস ছিল। ওই দুই হাজার টাকা দিয়ে ৫ কাঠা জমি কিনে সেখানেই বাসা তৈরি করা হয়। যদিও সেই জমি পুরো টাকা পরিশোধ না করায় রেজিস্ট্রি হয়েছিল না।
তবে গ্রামের লোকজন আমাদেরকে সহযোগিতা দিতে থাকল। কিছুদিন পর এখানেও সমস্যা দেখা দিলে ভালো লাগলো না। ১৯৮৫ সালে আমি বাংলাদেশে চলে আসি। তখন আমি তরুণ। বায়ায় ছোট ফুফুর বাড়িতে উঠলাম। তারপর থেকে আর ভারতে ফিরে যায় নি। ভাইবোনেরা সবাই ভারতে থেকে যায়।
২০০৮ সালে একদিন টেলিভিশনের খবরে জানলাম একাত্তরের ঘাতকদের বিচার হবে। মামলা করার সিদ্ধান্ত নিলাম কিন্তু সহযোগিতার বদলে ভয়-হুমকি-লোভ দেখানো হল। সবকিছু উপেক্ষা করে মামলা করলাম। আসামীরা গ্রেফতার হলো। পরে আসামীরা জামিনে বেরিয়ে এসে হুমকি দিতে থাকলো। নিরাপত্তার অভাবে গ্রাম ছেড়ে রাজশাহী শহরে চলে এলাম। এক ঘনিষ্ঠজনের সহযোগিতায় বাসা ভাড়া নিই এবং জীবিকার জন্য রিক্সা চালাতে থাকলাম। মিডিয়া কর্মী সুমন সহযোগিতা দিলেন। টেলিভিশনে আমার মামলা করার খবর প্রচার হলে সারাদেশে হৈচৈ পড়ল। রাজশাহী শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘাতকদের বিচার চেয়ে মানববন্ধন হল। সংবাদপত্রে সে খবর ছাপা হল। আমার মামলাটিই বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা। সারাদেশ নড়ে উঠল। আমাকে নিয়ে চলতে থাকল নানা আলোচনা। হুমকি-ধামকির সাথে মামলা তুলে নেয়ার জন্য লোভ দেখানো হল কিন্তু আমি অনড় থাকলাম, এখনও অনড় আছি। একদিন অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে তার দেওয়া ওষুধ খেয়ে সুস্থ হবো কি আরো অসুস্থ হয়ে পড়লাম। সমাজকর্মী ওয়ালিউর রহমান বাবু আমাকে কায়সার মেমোরিয়াল ক্লিনিকে নিয়ে গেলে এখানকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিনাস্বার্থে, বিনা অর্থে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে আমাকে সুস্থ করে তুললেন। আমার বাবাসহ পনেরজনের হত্যায় জড়িত ঘাতক দাউদ আলী, নূর আলম গ্রেপ্তার হল। সারা দেশ তোলপাড় হতে থাকল। শহিদের অন্য স্বজনরাও মামলা করলেন। একসময় তদন্ত টিম এলো। ঘাতক দাউদ আলী, নূর আলম অপরাধ স্বীকার করল। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু কতিপয় লোকজনের ষড়যন্ত্রে মামলাটি ধামাচাপা পড়ে গেল।
রাজাকার পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে আমার ও অন্য শহিদ পরিবারের সামনে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমাদেরকেই কটূকথা শোনাচ্ছে। আর আমরা শহিদ পরিবারের সন্তানেরা কিছু বলতে পারি না। স্বাধীন বাংলাদেশে আমার বাবা ও অন্য শহিদদের অবদান কি এভাবেই অবমূল্যায়িত হতে থাকবে? আমি আমার বাবাসহ অন্য শহিদদের ঘাতকদের যথাযথ বিচার চাই। মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে পুনরায় মামলা শুরু করার নির্দেশ দানের জন্য স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
লেখক : শহিদ পরিবারের সন্তান