বাল্যবিবাহ

আপডেট: নভেম্বর ১৬, ২০১৯, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


বাল্যবিবাহ নিয়ে ইদানীং মিডিয়াতে খুৃব বেশি লেখালেখি হচ্ছে এবং আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে। প্রত্যেকদিনই কোনো না কোনো পত্রিকায় এই বাল্যবিবাহের সংবাদ থাকবেই। ইউএনও সাহেবের হস্তক্ষেপে বাল্যবিবাহ বন্ধ হলো, গ্রামের মোড়ল মাতাব্বর, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, কিছু সমাজ সচেতন যুবক, এমন কী পাত্রীর ঘোর বিরোধিতার ফলে কিছু নাবালক, নাবালিকা এই বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেলে এ ধরনের খবর প্রত্যেকদিনই আমাদের নজরে আসছে, মিডিয়ার বদৌলতে। বাল্যবিবাহের ইতিহাস দীর্ঘ। আমি ব্রিটিশ আমল থেকেই বাল্যবিবাহের প্রচলন দেখে আসছি। ব্রিটিশ আমলে দেখেছি প্রায় শতকরা একশত ভাগই বিয়ে হতো বাল্যকালে, এতে কেউ কোনো প্রশ্নও তুলতো না। সেই ১৯২৯ সালের কথা। ব্রিটিশ সরকার এই মহাদেশের যুবক-যুবতীদের বিয়ের বয়স নির্ধারণের জন্য একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। তা ছিল নির্দিষ্ট বয়সের কম বয়সী কোনো ছেলে বা মেয়ের বিবাহ দেয়া চলবে না। কিন্তু তা আইনে পরিণত হয়নি। বর্তমানে অবশ্য বাংলাদেশে আইন আছে কোনো মেয়ের ১৮ বছরের কম এবং ছেলের ২১ বছরের কম হলে বিবাহ দেয়া চলবে না এবং এটি আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু ব্রিটিশের সেই সিদ্ধান্ত কার্যকরি হওয়ার পূর্বেই বিয়ের ব্যাপারে এতদঅঞ্চলে মানুষেরা তৎপর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাড়ির মুরুব্বিরা এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। যেহেতু তাঁরা ছিলেন পরিবারের প্রধান, কাজেই তাঁদের হুকুম ছিলো শিরোধার্য। সেকালে বেশির ভাগই ছিলো যৌথ পরিবার। ফলে নেতা যা বলবেন, তার কোনো ব্যতিক্রম হবে না। বয়স্ক মুরুব্বিদের চিন্তাভাবনা ছিল, তারা বেঁচে থাকতেই নাতি-নাতনিদের বিয়ে শাদি দিয়ে তাঁদের কর্তব্য শেষ করে যেতে চান। একারণেই পাঁচবছর বয়স থেকে আরম্ভ করে বারো বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে-মেয়ের বিবাহাদি সম্পন্ন করতে কোনো কার্পণ্য করেন নি। বাল্যবিবাহের হিড়িক পড়ে গেলো। ফলে হয়ে গেল, গণ-বাল্যবিবাহ। পরের বেশ কয়েক বছর বিয়ে দেয়ার মতো আর কোনো পাত্র-পাত্রী খুঁজে পাওয়া যায়নি। একেই বলা হতো “হুড়ের” বিয়ের বছর। আমার দাদী ও আব্বার কাছে এই সব ঘটনা শোনা। কারও বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই ‘হুড়ের’ বিয়ের বছরের রেফারেন্স এসে যেতো। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করতো, “তোমার মেয়ের বয়স কত?” উত্তরে বলা হতো” হামি কেমন করে কহবো বেটা যে হাঁর বেটির বয়স কত? হামি কী লেখা পড়া জানি। তবে হুড়ের বিয়ের বছর ও হামার প্যাটে ছিল”। এই ভাবেই হুড়ের বিয়ের বছরটা হিসাবে আসতো। যা হোক, আমাদের দেশে বয়স নির্ধারণ করা এক দুরূহ ব্যাপার। আমাদের কারও জন্ম তারিখ কি ঠিক আছে? যদিও ইদানীং জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কার কথা কে শোনে। বর্তমানে জন্ম নিবন্ধন কাগজটিও হরদম পরিবর্তিত হচ্ছে। কাজেই আমাদের দেশে কার বয়স ১৮, আর কার বয়সইবা ২১, তার হিসাব রাখা ততো সহজ ব্যাপার নয়। ফলে বাল্যবিবাহের বিষয়টিও নানাদিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ, কেননা আমাদের জন্ম তারিখ কারও সঠিক আছে বলে আমার মনে হয় না। জন্ম তারিখ যথাযথভাবে জানতে না পারলে বাল্যবিবাহের আইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করবেন কী করে?
আমি দীর্ঘ জীবন পেয়েছি। ব্রিটিশ আমলে কাটিয়েছি ১৭ বছর, পাকিস্তান আমলে ২৩ বছর, বাকী জীবন কাটছে বাংলাদেশি হয়ে। কাজেই আমি ব্রিটিশ আমলের বাল্যবিবাহ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করছি। ১৯৪০ সালে আমি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলাম পোলাডাগো মাইনর স্কুলে (তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি)। ১৯৪১ সালে চতুর্থ শ্রেণিতে এবং ১৯৪২ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে। পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেই আমার সহপাঠীর কয়েকজনের বিবাহ হয়ে গেল। ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই দেখলাম আরও কয়েকজনের বিয়ে হয়ে গেল। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার। যাদের এই বাল্যবিবাহ হলো তাদের আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভাল ছিল, যাকে বলে মধ্যবিত্ত। কেউ কেউ আবার ছিলো উচ্চমধ্যবিত্তের সন্তান। মহাজনের ছেলের সঙ্গে, মহাজনের মেয়ের বিয়ে। এতো আনন্দের কথা। ফলে সহপাঠীরাই নয়- আমাদের পাড়ার বেশ কয়েকজন ছেলে মেয়ের বিয়ে হলে গেলো, আমাদের চোখের সামনে। আমরা মজা করে উপভোগ করলাম। আমাদের আনন্দ ওই টুকুই যে আমরা কয়েক বেলা ভাল ভাল খাওয়া খেয়ে আনন্দফূর্তি করলাম। এই বাল্যবিবাহের কয়েক বছরের মধ্যেই আবার ডাইভোর্সও হয়ে যেতো। আমার এক প্রতিবেশী সহপাঠী লেখাপড়ায় ততো ভাল ছিলো না। কিন্তু বাড়ির অবস্থা বেশ ভাল। ফলে বাল্যবিবাহ হয়ে গেলো। স্যারেরা সবই জানতেন। ক্লাসে অংক কষতে দিয়েছেন, অঙ্কের স্যার। বন্ধুটি কেন যেন অঙ্কটি ঠিক মতো করতে পারেনি, ফলে স্যার টিপ্পনি কাটালেন এবং মন্তব্য করলেন, “বাপ ধনী, শ্বশুর ধনী, অঙ্ক করবার কিইবা জানি” অর্থাৎ তার অঙ্ক করারও দরকার নেই এবং লেখাপড়া শেখারও দরকার নেই। এই বন্ধুর বাবাকে আমার দাদা ডাকতাম। তিনি আবার আমাকে খুবই স্নেহ করতেন এবং লেখাপড়ার ব্যাপারে ছিলেন দারুন উৎসাহী। অথচ নিজের সন্তানদের ব্যাপারে ছিলেন উদাসীন।
১৯৪৪ সালে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম নবাবগঞ্জ হরিমোহন হাই স্কুলে। শ্রেণি সপ্তম থেকে-দশম পর্যন্ত)। সেখানেও দেখলাম, একের পর এক বিবাহ হচ্ছে। সবই কিন্তু শখের বিবাহ। আমাদের গ্রামেও দেখলাম, বিয়ে হতেই আছে। এমনকি আমাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও। আমার মামাতো ভাই, মামাতো বোনের বিয়ে হলো একই সঙ্গে, আমি তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের বাড়ির আশেপাশেই দেখতাম বিয়ের হিড়িক পড়ে গেছে। এমন কী আমাকেও অনেকে পছন্দ করে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। আমি ততো বোকা ছিলাম না, যে মাথায় টুপি দিয়ে নাকে রুমাল দিয়ে বর সেজে বিয়ের আসরে বসবো। একদিন আমার আব্বাকে বললাম, “বাপুজি ওই জামাইটা নাকে রুমাল দিয়ে বসে আছে কেন? ওকে কিসের গন্ধ যোগাচ্ছে”। নারে, না। ‘শরম লাগছে। বিয়ের সময় আবালবৃদ্ধবণিতা সকলেই শরম ঢাকার জন্যই রুমালটা কাজে লাগায়।” আমার বাবার উত্তর। আমার আব্বাও ছিলেন প্রগতিশীল আধুনিক চিন্তা-ধারার একজন মানুষ। আমি লেখাপড়াতে ভাল ছিলাম। ফলে আমার আব্বার সাফ কথা লেখাপড়া শেষ না করা পর্যন্ত বিয়ে-শাদীর কোনো প্রশ্ন আসেনা। আমার দাদীও এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য করেন নি। আমি পূর্বেই বলছি, এই বাল্যবিবাহের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুরুব্বিরাই দায়ী। তাঁদের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আত্মীয়তা করার ব্যাপারে তারা অস্থির হয়ে উঠেন। তাঁদের সাফ কথা, “আমি আর বেশিদিন বাঁচবো নারে। আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যেতে চাই” মুরুব্বিদের সঙ্গে কে কথা বলবে। এ ব্যাপারে দাদা-দাদীরা, নানা-নানী ও মোড়ল-মাতাব্বরেরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন এবং তারাই এই বাল্য বিবাহের জন্য দায়ী।
১৯৪৪ সালে আমার ছোট ফুফুর দ্বিতীয় বিবাহ হয়েছিল। তিনিও হয়েছিলেন বাল্যবিবাহের শিকার। ফলে তিনি শ্বশুর বাড়ি যাননি এবং তাদের ভাতও গলধকরণ করেন নি। ফলে আপোস মীমাংসায় তালাক হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিয়ের সময় দেখা গেলো হবু ফুফার প্রথম তরফের ছেলের বিবাহও হয়েছে এবং সে এক সন্তানের জনক। তখন সে পড়তো দশম শ্রেণিতে. আর আমি পড়তাম সপ্তম শ্রেণিতে। তরতরে যুকক হঠাৎ করেই আক্রান্ত হলো টাইফয়েডে এবং তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে গেলো বড় অসময়ে, অকালে, যা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। স্ত্রী হলো বিধবা, সন্তান হলো এতিম, পিতৃহারা। আমার মনে এখনও প্রশ্ন জাগে তখনকার মানুষ এতো অবুঝ ছিলো কেন? বাল্যবিবাহের বিষয়টি কোনো ধর্মেই অনুমতি দেয় বলে মনে হয় না, যদিও হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের ও সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বাল্যবিবাহের প্রথা ছিল অনেক বেশি। স্কুল থেকে ১৯৪৮ ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে হলাম রাজশাহী কলেজের ছাত্র। উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, সেখানেও আমাদের কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব হয়েছেন এই বাল্যবিবাহের শিকার। আমি ভর্তি হলাম আইএসসি ক্লাসে, আর আমার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু ভর্তি হলো আইএ ক্লাসে। এই বন্ধুর সূত্র ধরে আমাদের এক ক্লাস উপরে পড়ুয়া দু’জনের সঙ্গে আমার আলাপ হলো। একজন ইতোমধ্যেই বিবাহিত এবং পরে জানলাম তিনি এক সন্তানের জনক। দ্বিতীয়জন মঞ্জুর ভাই (১৯৭১ সালের যুদ্ধে শহিদ) কলেজে ভর্তি হয়ে বিয়ে করল রাজশাহী পিএন গার্লস স্কুলের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে। প্রথমজন হোদা ভাই ও দ্বিতীয়জন মঞ্জুর দু’জনই ছিলেন তরতরে যুবক এবং সুঠাম দেহের অধিকারী। রমজান মাসে রোজার ছুটি ছিলো প্রায় পাঁচ সপ্তাহ। ছুটি শেষে কলেজে ফিরে এসে মঞ্জুর ভাই হঠাৎ করেই বললেন “এলতাস, মনটা খুবই খারাপ। কেন মঞ্জুর ভাই, কী হলো? আমার প্রশ্ন। উত্তরে তিনি বললেন, “বন্ধু-বান্ধব সব মরতে আরম্ভ করলো। হোদা মারা গেছে”। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। একজন সুপুরুষ, সুঠাম দেহের অধিকারী, “কী হলো যে এতো কম বয়সে বিদায় নিলেন”। তিনি বললেন, “টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে ছুটির মধ্যেই মারা গেছে” কষ্ট পেলাম, ব্যথিত হলাম। তাঁর স্ত্রী হলো বিধবা, আর পুত্র সন্তান পিতৃহীন। কি মর্মান্তিক! এ সবই কিন্তু বাল্যবিবাহের কুফল। কলেজে ছাত্র থাকার সময় বেশ কয়েকজন বিবাহিত বন্ধু-বান্ধব ছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু কে কে বিবাহিত এ সংবাদ পাওয়া ততো সহজ ছিল না। বিএসসি ক্লাসে পড়ার সময় আমার দু’জন সহপাঠী ছিল। তারা আবার ছিলো মালদার বাসিন্দা, অর্থাৎ ভারতীয় নাগরিক। তারা স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে রাজশাহী কলেজে পড়তো। তারা দু’জনই ছিল বিবাহিত এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান।
কলেজ পাস করে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি পড়তে। সেখানেও ততো বেশি বিবাহিত বন্ধু পাইনি। তবে ছাত্রাবস্থায় বেশ কয়েকজনের বিবাহ হয়েছিল। সম্ভবত তারা শ্বশুর বাড়ির পক্ষ থেকে লেখা পড়ার জন্য কিছু আর্থিক সহায়তাও পেয়েছিল। হলের বেশ কয়েকজন বন্ধুকে পেয়েছিলাম, যারা এই বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছিলো। ষাটের দশকে অবশ্য বাল্যবিবাহের প্রথাটা কিছুটা হলেও কমেছিলো, তবে একবারে শেষ হয়নি। আমি তার প্রত্যক্ষদর্শী। এমন কী আমার এক ছোট ভাইও এই বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছিল। পাত্র-পাত্রী নাবালক ও নাবালিকা হলে তারা বিয়ের আসরে বসে কবুল করতে পারে না। কেননা বিয়ে কী, তারা বুঝে না এবং এটি যে প্রেম, ভালবাসা, মায়া-মমতার এক চিরস্থায়ী বন্ধন সে জ্ঞান তখন তাদের হয় না। ফলে, পাত্রের পক্ষে তার অভিভাবক, যেমন, দাদা, নানা, বড় ভাই, এরাই তার পক্ষে কবুল কথাটা উচ্চারণ করে। এমন কী ষাটের দশকে আমাদের অঞ্চলে ছেলের বিয়েতে সাধারণত ছেলের বাবা এবং মা কেহই তার পুত্রের বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে অন্তত বিয়ের দিন যেতো না। তারা যেতো বিয়ের একদিন বা দু’দিন পরে বেয়াই জিয়াফতে। সেটা ছিল বেয়াই বেয়ানদের দিন। এই দিনটা তারা বেশ উপভোগ করতো। আমার ছোট ভাইয়ের পক্ষে আমাকেই কবুল করতে হয়েছিলো। কোনো কিছুতে সে বেসামাল হয়ে গেলো। সেই খোঁটা আমাকে জীবনভর খেতে হয়েছে। আমার ছোট ভাইয়ের সাফকথা” আপনি কবুল করেছেন, আপনি সামাল দেন, আমি কিছুই জানিনা।” আমার আব্বা অসুস্থ হওয়ার ফলে তিনি জিদ ধরলেন আমি “আমার ছোট ছেলের বিবাহ সুসম্পন্ন করে যেতে চাই। ভাল পাত্রী পাওয়া গেছে, একে হাত ছাড়া করা যাবে না।” ফলে আমরা এই বিয়ের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। ষাটের দশকে বাল্যবিবাহের সংখ্যা কিছুটা কমে গেলেও একেবারে বন্ধ হয়নি।
এবার দেখা যাক স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের বাল্যবিবাহের অবস্থা। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ নিজের বৈশিষ্ট্য ও সত্তা নিয়ে টিকে আছে এবং কেবল তাই না, সার্বিকভাবে বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষায়-দীক্ষায়, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার ও নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ যেন একটি রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে আমাদের আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। তবে দেশের মধ্যে যে, দুর্নীতি ও সমাজ বিরোধী কার্যকলাপ বাসা বেধেছে, তা দেখলে তিনি ব্যথিত হতেন, সন্দেহ নেই। কেননা তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন সোনার মানুষ। সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েরা এক যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে দারুণভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়িয়া অঞ্চলে মেয়েরা স্কুল ড্রেস পরে, লাইন ধরে স্কুলে যাচ্ছে। এমনকি সাইকেলে করেও তারা এখন স্কুলে যায় এবং পাঠে তালিম নিচ্ছে। এ সব দেখে আমি মাঝেমধ্যে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি। আমি অত্যন্ত আশাবাদী। কেননা বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হলে নারী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে বাল্যবিবাহ অনেক কমে গেছে, তার মূল কারণ নারীশিক্ষার অগ্রগতি। এখন তারা নিজেরাই প্রতিবাদ করতে শিখেছে। তারা আরও একটু সমাজ সচেতন হলে এবং লেখাপড়া ও কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে এ বাল্যবিবাহ অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে।
বাল্যবিবাহের কারণ কী?
বাল্যবিবাহ নিয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বললাম মাত্র। কেবল আমি কেন, অনেকেই এ ব্যাপারে সোচ্চার। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, বাল্যবিবাহ নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন, আলোচনা করছেন, উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, কিন্তু বাল্যবিবাহ কেন হচ্ছে, এ ব্যাপারে কেউ কিছু বলছেন না। কোনো একটি বিষয়ের কারণ খুঁজে বের করতে না পারলে, এ সমস্যার সমাধান হকে কী ভাবে? ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা যথাযথভাবে হচ্ছে না এর মূল কারণ, এ রোগ কেন হয়, এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো উপায় আছে কি না, না জানলে এর চিকিৎসা হবে কিভাবে। সিগারেট খেলে নাকি ফুসফুসে ক্যান্সার হয় কথাটা মিথ্যা না। কিন্তু নারীদের মধ্যেই দেখছি ফুসফুসে ক্যান্সারের রোগী অগণিত যারা কোনোদিনই সিগারেট কী জানে না। তা হলে এর ব্যাখ্যা কিভাবে দেবেন। সেজন্যই আমি এই বাল্যবিবাহের কিছু কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।
এই বাল্যবিবাহের প্রথম কারণ হলো দারিদ্র
বাংলাদেশের প্রায় এক চতুর্থাংশ মানুষ এখনও দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে। অন্যদিকে আবার এক চতুর্থাংশ লোক সাক্ষরতার হিসেবে আসছে না, অর্থাৎ বর্তমানে আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার ৭৩ শতংশের কিছু বেশি। এই দুদিক থেকেই বাংলাদেশের অবস্থান আশাব্যঞ্জক নয়। এদেশের মানুষ যারা দরিদ্র, তাদের পরিবারের লোক সংখ্যাও কেন যেন বেশি। এক হতদরিদ্র মানুষ, ধরুন শ্রমিক। আয়-রোজগার তেমন নেই। কিন্তু সন্তানাদি তিনটি বা চারটি। তার মধ্যে দুটো বা তিনটি যদি মেয়ে হয় সেই শ্রমিকের পক্ষে কি তাদের লালন-পালন করা সম্ভব? আমি অসংখ্য পরিবার দেখেছি তাদের দৈন্য দুর্দশাও দেখেছি। যেদিন সেই শ্রমিক কাজ না পায় হতাশ হয়ে ফিরে আসে। তাদের মুখের দিকে চাওয়া যায় না। ছেলে-মেয়েদের মুখে কী তুলে দিবে। এই সব মানুষের সন্তানরা স্কুলে যাবে কিভাবে? আমি এমনও দেখেছি মেয়েগুলো লেখাপড়াতে বেশ ভাল এবং তারা স্কুলে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। তখন তাদের মা হাত থেকে বই কেড়ে নিয়ে সংসারে কাজে লাগিয়ে দেয় বিশেষ করে ছোট-ছোট সন্তানদের দেখাশোনার জন্য। ঘরে খাওয়া নেই, গায়ে দেয়ার মতো কাপড় নেই। লেখাপড়া, সেতো তাদের জন্য বিলাসিতা। ঘরের মধ্যেই বন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে হয়। তাদের মন আছে, প্রাণ আছে, কিন্তু কী করবে। তারা অসহায়। খেলা-ধুলার বয়সে তাদের ঘরে বসে জীবনটাকে নিঃশেষ করে ফেলে। আস্তে আস্তে বড় হয়। আসে বয়ঃসন্ধিকাল। দেহের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। দেখতে সুন্দর হয়। দেহ হয় আকর্ষণীয়, আর তখনই নজর পড়ে বখাটে সন্তান, হায়নার দলের। আরম্ভ হয় মেয়েদের উপর বিভিন্ন ধরনের মানসিক নির্যাতন। একি সহ্য করা যায়। প্রতিমুহূর্তে মেয়েদের জ্বালাতন করে। এই বখাটের ভয়ে তারা তাদের কুঁড়ে ঘর থেকে বের হতে পারে না। তাদের সাহায্য করার কেউ থাকে না। এমনকি গ্রামের মানুষজনও না। ফলে বাধ্য হয়েই তারা আত্মহননের পথ বেছে নেয়। যা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। অসহায়, দরিদ্র বাবা-মা কী করবে? এরাই বাল্যবিবাহের শিকার হয় বেশি। মেয়েদের উপর অন্যায়, অত্যাচার যতই হোক না কেন, অন্যেরা সব নীরর দর্শক। কেউ কিছু বলেও না, করেও না, কোনো প্রতিবাদ করতে কেউ সাহস পায় না। কেননা তাদেরও তো মন-সম্মানের ভয় আছে, জীবনেরও ভয় আছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, “The World is a dangerous  place- not because of those who do evil, but because of those who look on and do nothing” অর্থাৎ যারা অন্যায় বা খারাপ কাজ করে তাদের জন্য পৃথিবীর বিপজ্জনক জায়গা নয়, যারা অন্যায়,অত্যাচার-খারাপ কাজ করছে, তাদের দিকে যারা তাকিয়ে থাকে এবং দেখে কিছুই করে না বা বলে না, তাদের জন্য বিপজ্জনক”, আমাদের দেশে ঘটছে তাই। আমরা সব নীরব দর্শক। সব কিছু মুখ বুঝে সহ্য করছি, মুখ খুলছি না, কোনো কিছু বলছি না বা করছিও না। আমাদের জন্যই পৃথিবীটা বিপজ্জনক জায়গা।
(চলবে)