বিএনপিকেই তাদের ভুলের মাসুল দিতে হচ্ছে

আপডেট: January 24, 2020, 12:07 am

ফিকসন ইসলাম


বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মাত্র ৩০ বছর ৭ মাস ২৮ দিন বা সহজ কথায় সাড়ে তিন বছরের কিছুটা বেশি সময় রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলো। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের ভিতর দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়। এবং সে থেকে সুদীর্ঘ টানা ২০ বছর দশ মাস ৮ দিন ক্ষমতার বাইরে থাকে। কেউ কেউ বলে থাকেন আওয়ামী লীগ একুশ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিলো। এমন কথাও শোনা গেছিলো যে, কোনোদিনও আর এই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এমনকি নিন্দুকেরা বলেছিলো আওয়ামীলীগ একদিন মুসলিম লীগ হয়ে যাবে। কিন্তু কথায় বলে না ধর্মের কল বাতাসে নড়ে!!
ঘটনাবহুল রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে অবশেষে ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে দ্বিতীয় বারের মত ক্ষমতায় আসে এবং টানা পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। এরপরে ২০০১ সালের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সমন্বয়ে গঠিত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট এর কাছে পরাজিত হয়ে টানা সাত বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসক হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের পতন ঘটলে ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। তখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন। তাঁর নেতৃত্বেই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবং যোগবিয়োগের হিসেবে ভুলের কারণে আওয়ামী লীগকে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে হয়েছিলো। যদিও আওয়ামী লীগের অভিযোগ ছিলো ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপি হয়েছিলো। কিন্তু নেপথ্যে কারণ ছিলো ওই সময়ে আওয়ামী লীগ এবং বাকশাল এ নির্বাচনে অংশ নেই। ১৯৮৩ সালে আওয়ামী লীগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দল ত্যাগ করে ‘বাকশাল’ গঠন করে। আওয়ামী লীগ ‘নৌকা’ এবং বাকশাল’ কাস্তে প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট ৫৩টি আসনে নৌকা এবং কাস্তের প্রাপ্ত ভোট যোগ করলে ওই আসনে বিএনপির চেয়ে বেশি ভোট হয়। ফলে বাকশাল একটা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে সেবার কাজ করে। ফলে আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় পড়তে হয়েছিলো।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ৪র্থ সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়ে এককভাবে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং মন্ত্রিসভা গঠন করলে সেই মন্ত্রিসভার প্রধান নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এই সংসদে স্পিকার নিযুক্ত হন স্বনামধন্য রাজাকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস। বরিশালের আব্দুর রহমান বিশ্বাস এর আগে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাট মন্ত্রী ছিলেন। ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন খুলনার শেখ রাজ্জাক আলী। রহমান বিশ্বাস কে স্পিকার করায় দেশব্যাপি তুমুল প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিএনপি নামক দলটি যে জন্মের পর থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে সেটা আবার প্রমাণ হয়ে গেলো রাজাকারকে স্পিকার পদে নিয়োগ দেয়ায়।
সংবিধানের ধারাবাহিকতায় দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তাঁর প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যাওয়ার জন্য সংবিধানে সংশোধনী করে গণভোটের আদলে মতামত যাচাই করা হয় এবং যথারীতি নির্ধারিত সময়ে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে পুনরায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে ফিরে যান এবং রাষ্ট্রপতির শূন্যপদে বিএনপি সরকারে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে উক্ত পদে নিয়োগ প্রদান করেন স্পিকার রাজাকার আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে। সে থেকেই শুরু হলো আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে কালিমালেপন। রাজাকার রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দিয়েই বেগম খালেদা জিয়া ক্ষান্ত হননি। স্পিকারের শূন্যপদে স্পিকার করলেন তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলীকে এবং ডেপুটি স্পিকার পদে আরেক স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির প্রতিভূ টাঙ্গাইলের হুমায়ুন খান পন্নীকে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে এভাবেই ক্ষমতায় অংশীদায়িত্ব দিয়ে বেগম খালোদা জিয়া (যিনি কিনা মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এবং নিজে মুক্তিযোদ্ধা দাবী করা সাহসী যোদ্ধা জিয়াউর রহমানের স্ত্রী মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করলেন। ওই সময় দেশব্যাপি এক স্লোগান প্রচলিত ছিলো-
“রাষ্ট্রপতি রাজাকার, এই লজ্জা খালেদার।”
১৯৯২ সালের মার্চ মাসে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং মাগুড়া-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য এম আসাদুজ্জামান (বর্তমান এমপি সাবেক ছাত্রনেতা সাইফুজ্জামান শিখর এর বাবা) মারা গেলে সে আসনটি শূন্য হয়ে যায়। ওই সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি আব্দুর রৌফ। মাগুড়া-২ আসনটি মৃত্যুজনিত কারণে শূন্য ঘোষণা করা হলে সংগত কারণে ওই আসনে উপনির্বাচন এর আয়োজন করা হয়। বিএনপি এই নির্বাচনে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জিকিউ বলপয়েন্ট কলমের মালিক কাজি সলিম উদ্দিনকে মনোনয়ন দেয়।
বিএনপি সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন এটি এবং এ নির্বাচনে ব্যাপক ভোট চুরি, কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে বিএনপি প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। ওই সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় সপ্তাহিক পত্রিকা যার সম্পাদক শফিক রেহমান যিনি বর্তমানে বিএনপি ঘরাণার অন্যতম বুদ্ধিজীবী হিসেবে ব্যাপক পরিচিত, তিনি যায় যায় দিন পত্রিকার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করলেন এভাবে-মা“গুঁড়া” মানে ‘মা’কে গুঁড়া করে দেয়া হয়েছে। আরেক সংখ্যায় লিখলেন- বিচারপতি সাহাবুদ্দিন+ বিচারপতি রৌফ প্রধান নির্বাচন কমিশন)-১০০ এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দিনÑবিচারপতি রৌফ=০। যায় দিন পত্রিকার প্রচ্ছদের শিরোনাম দুটি দেখলেই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বিএনপি উক্ত আসনটি নিজেদের দখলে রেখেছিল অথচ সংসদে বিএনপি তখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ওই আসনটি রোজপূর্বক না নিলেও তাদের কোনো ক্ষতি হতোনা, তারপরেও ‘জেদ’, যেভাবেই হোক কিংবা তোরা যে যা বলিস ভাই আমার মা‘গুড়া’ আসন চাইই-চাই। মা-গুড়া উপনির্বাচনের নেতিবাচক ফলাফলই হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যে সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য বিএনপি এখন মায়াকান্না কাঁদছে। মাগুড়া উপনির্বাচনের ভোট ডাকাতি জালিয়াতি, কেন্দ্র দখলের কারণেই কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একট্টা হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের এক দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তখন খালেদা জিয়া সাফ জালিয়ে দেন-তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বুঝিনা, মানিনা, মানব না। আর এ নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে। এক পর্যায়ে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় সংসদ থেকে বিরোধী দলের সকল সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেন। এদিকে বেগম খালেদা জিয়া একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদান করে বলেন-‘পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়’- যা ওই সময়ে বিভিন্ন দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেতে থাকে।
১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যগণ পদত্যাগ করলেও তৎকালীন স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী উক্ত পদত্যাগপত্র গুলি গ্রহণ না করে সাড়ে ১৩ মাস ঝুলিয়ে রাখে ফলে আসনগুলি শূন্য আর হয়নি। এরপরে সংসদের মেয়াদপূর্তি হবার ফলে জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশব্যাপি দারুন বিক্ষোভ আর আন্দোলনসহ লাগাতার কর্মসূচির মধ্যেই বিএনপি বিরোধী দলবিহীন, ভোটারবিহীন নির্বাচন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে দেশব্যাপি অসহযোগ আন্দোলন, হরতাল অবরোধ দেশ অচল হয়ে যায়। ইতোমধ্যে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এর মেয়র প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফের নেতৃত্বে নগরীর প্রাণকেন্দ্র তোপখানা রোডে জনতার মঞ্চ স্থাপন করে ভোটরবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে জয় হওয়া বিএনপি সরকারকে উৎখ্যাত না করে ঘরে না ফেরার শপথ গ্রহণ করা হয়। অতপর প্রায় ২৮ দিন সংগ্রাম-আন্দোলনের পর এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপে খালেদা জিয়া নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং ৩০ মার্চ রাতে নবগঠিত সরকার পদত্যাগের মাধ্যমে সে আন্দোলনে সফলতা লাভ করে। ৩০ মার্চ ’৯৬ তারিখেই জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ হলে সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিচারপতি হাবিবুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হন এবং দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। ওই সময়ে দেশের রাষ্ট্রপতি রাজাকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস নানা ধরনের ষড়যন্ত্র মেতে ওঠে। এক পর্যায়ে সেনা বাহিনীকেও রাস্তায় নামতে হয় এবং সত্যি বলতে কী বিচারপতি হাবিবুর রহমানের কৌশল ও দূরদর্শিতায় সেবারে বাংলাদেশ বেঁচে যায়।
প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ওই বছরের ২৩ জুন তারিখে সরকার গঠন করে। ক্ষমতা হারানোর পরে প্রায় ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতার মসনদে আবির্ভুত হয়েছিলো।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা এবং সংশোধিত সংবিধানের আলোকে আওয়ামী লীগ সরকার নির্ধারিত সময়ের দুইদিন আগে ২১ জুলাই ২০০১ তারিখে সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের নিকট সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এবং লতিফুর সরকার ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর নির্বাচন পরিচালনা করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট তথা বিএনপি-জামায়াত জোট নিরঙ্কুশ বিজয় পেলে তারা সরকার গঠন করে। যুদ্ধাপরাধী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির সংগঠকদের এই সরকারের অংশীদারিত্ব প্রদান করে এং স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে, গাড়িতে ও বাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়। শুধু তাই নয়, ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই নানা কূটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকে যে অপকৌশল এবং ষড়যন্ত্র দেশ ও জাতির কাছে ধরা পড়ে যায়।
যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা এবং নীতিমালা অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন বা হতে পারেন তার নির্ধারিত করাই ছিলো কাজ। যেমন মোট ৫টি শর্ত আরোপ করা ছিলো। যার প্রথমেই ছিলো সুপ্রিম কোর্টের সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘প্রধান উপদেষ্টা’ হবেন, তিনি রাজি না হলে এর আগের জনÑ এভাবে ক্রমান্বয়ে একটা তালিকা করা ছিলো। ফলে বিএনপির কূটকৌশল নেতারা ৫ বছর আগেই ঠিক করতে পেরেছিলো যে, ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে চার দলীয় জোট এর মেয়াদ যখন শেষ হয়ে যাবে তখন যেন তাদের পছন্দের বিচারপতিকেই প্রধান উপদেষ্টা করা যায়, এমন একটা ‘ছক’ প্রস্তুত করে। এবং এজন্য হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট এর বিচারপতিদের চাকরির বয়স বৃদ্ধি করতে অবসরের সীমা দুই বছর বাড়িয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ মাননীয় বিচারপতিগণের অবসরের সীমা হবে ৬৭ বছর। আর এটি করা হয়েছিলো বিচারপতি কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করার জন্য। কারণ তাদের বয়সবৃদ্ধি না করা হলে কেএম হাসান উক্তপদে মনোনয়ন পাবেন না। আর এখানেও বিএনপি সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করে আরেকটি ভুল করে ফেললো। সংবিধানে আছে প্রজাতন্ত্রের কর্র্মে নিয়োজিত বা সকল প্রকার সমান সুযোগ লাভের অধিকারী। সে ক্ষেত্রে সাধারণ কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা যেখানে ৫৭ বছর (ওই সময়ে তাই ছিলো) সেখানে বিচারপতিতের অবসর কেন ৬৭ বছর হবে। বিএনপির এই কূটচাল ও ষড়যন্ত্রের কথা সংসদে বিরোধীদল জেনে ফেললে কে এম হাসানকে ওই পদে যাতে নিয়োগ না পাই সে জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে। ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর চার দলীয় জোট এর সময়সীমা শেষ হলে কার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে সে নিয়ে দেশব্যাপি নানা বিতর্ক ও আন্দোলন শুরু হয়। আওয়ামী লীগ বৈঠা-লগি নিয়ে রাজপথ দখল করে। ফলে পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে দেশ পুনরায় অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হতে থাকে। এই কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে না নেবার পেছনে আওয়ামী লীগসহ সমমনা দলগুলোর একটা সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কারণ ছিলো যা হলো কেএম হাসান বিএনপির নেতা এবং কুমিল্লা জেলা বিএনপির সহসভাপতিও ছিলেন। ফলে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন নিয়ে যখন সরাদেশব্যাপি ব্যাপক অরাজক পরিস্থিতি তখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজুদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করে নেপথ্যে থাকা খালেদা জিয়ার নির্দেশ মত সকল প্রকার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ২০০৭ সালে আরেকটি বিতর্কিত, ভোটারবিহীন এবং জনসমর্থনহীন নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। নির্বাচনের তারিখ নির্বাচন করা হয় ২২ জানুয়ারি। আর সকল বিরোধীদল তখন আন্দোলনে রাস্তায় নেমে গেছে। প্রতিদিন দেশব্যাপি কোথাও না কোথাও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। একটা অরাজকতাপূর্ণ অবস্থার মধ্যেই চলে আসে ১১ জানুয়ারি। যাকে বলা হয় ওয়ান ইলেভেন। প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে প্রফেসর ইয়াজ উদ্দিনকে অপসারণ করে সেনাবাহিনী পরোক্ষাভাবে ক্ষমতা বদলে এগিয়ে আসে। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মইন উ উদ্দিন আহমেদ এন আশির্বাদপুষ্ট হয়ে ড. ফখরুদ্দিন দেশের শাসনভার গ্রহণ করলে পরিবেশ পরিস্থিতি শান্ত হয়। দুইবছর দেশ পরিচালনার পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে অদ্যবধি আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করছে। এর মধ্যে বিগত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না করায় আরেকটি ভুল এর জন্ম দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছে।
সুতরাং ভুলের মাসুল আজ অক্ষরে অক্ষরে বিএনপিকে দিতে হচ্ছে। কি এমন ক্ষতি হতো মাগুড়া-২ এর আসনটি নিজেদের মধ্যে না নিলেÑ তাহলে তো আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটি সামনে আসতো না। কি এমন ক্ষতি হতো যদি বিচারপতিদের বয়স না বাড়িয়ে কে এম হাসান কে প্রধান উপদেষ্টা বানানোর কূটকৌশল না নিলে। আসলে প্রকৃতি আপন গতিতেই চলতে থাকে এবং এক সময় মধুর প্রতিশোধ নেয়। বিএনপি টানা ১৩ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে আছে। কোনো দৈব-দুর্বিপাক না হলে আরো চার বছর এই সরকার ক্ষমতায় থাকবে। ততদিনে ক্ষমতা হারানোর বয়স হবে বিএনপির ১৭ বছর। ফলে আমরা কেহই অতীত থেকে শিক্ষা নিতে চাই না! এখনও সময় আছে শোধরাবার ।
লেখক: প্রকৌশলী