বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য বারবার মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কেন?

আপডেট: জুন ৩, ২০১৮, ১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা অন্য কোনো নৃশংসতার তুল্য হতে পারে না। যারা এ ধরনের তুলনা করেন বা করতে চায় তারা মূলত পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতাকে গৌন করে দেখানোর চেষ্টা করে। যারা সমাজকে নেতৃত্ব দেয়, অন্যকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে, তারা যখন মুাক্তযুদ্ধের নৃশংসতার সাথে অন্য নৃশংসতার তুলনা করে- সেটাকে কোনোভাবে অজ্ঞানতা বলা যায় না, বরং তা উদ্দেশ্যমূলক।
এই প্রবণতা দেশের কিছু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এ দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা মাঝে মধ্যেই এমন বিতর্কিত বক্তব্যের অবতারণা করেন। এ পর্যায়ে দলটির মহাসচিত মীর্জা ফকরুল ইসলাম একই ধরনের বক্তব্য দিলেন। অবশ্য তার এই বক্তব্য অস্বাভাবিক কিছু নয়Ñ বরং তাদের নেতারা মাঝেমধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ নানাভাবে প্রশ্ববিদ্ধ করে থাকেন। এই তালিকায় দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র সহসভাপতি তারেক রহমানও রয়েছেন। এর আগে বেগম জিয়া মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয় নি, সংখ্যাটি অতিরিক্ত। পাকিস্তানিরা যেটি বলে তাদের অপরাধ ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করে। বিএনপিও সেই একই ধরনের চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করা হয়।
শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনের ভাসানী ভবনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্যের গানের সিডি উদ্বোধন করতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘একনায়ক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে, এরশাদের বিরুদ্ধে ৯ বছর লড়াই করেছি। কিন্তু এত খারাপ সময় আমরা কখনও পার করিনি। পাকিস্তানের সঙ্গে ৯ মাস যুদ্ধের সময় ভয়াবহ অবস্থা ছিল। কিন্তু তার আগে পাকিস্তানিরা এভাবে উলঙ্গভাবে মানুষ হত্যা করেনি, আজ আওয়ামী লীগ যেভাবে করছে।’ এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতার সাথে বর্তমানের পরিস্থিতি তুলনা করা যায়? মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর বাহিনী বাঙালি জাতিসত্তাকে নির্মূল করার প্রয়াস চালিয়েছে এবং তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েই। ৯ মাসে ৩০ লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়েছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়েছে, নারীদের সম্ভ্রমহানী করেছে, বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করেছে এবং এক কোটি লোককে স্বদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। এরসাথে অন্যকোনো ভয়াবহতা, নৃসংতার তুলনা করা যায়? এটা কেবল স্বাধীনতা বিরোধীরাই করতে পারে। বিএনপি দাবি করে তাদের দলে সবচেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেনÑ তা হলে তারা কেন মুক্তিযুদ্ধে চালানো বর্বরতার সাথে অন্য বর্বরতাকে এক করে দেখবে?
বিএনপি দেশের অনতম একটি বড় রাজনৈতিক দল। তারা সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোল-সংগ্রাম করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে কেনÑ সব আন্দোলনের সত্যসত্যা বিচার ও বিশ্লেষণ করা এবং তদানুয়ায়ী সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটি দেশের মানুষই করে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলো সে ভাবেই দেশের মানুষকে তাদের নানা গ্রহণযোগ্য কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রভাবিত করবে। এর মধ্য দিয়েই একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সাধারণ মানুষের আস্থা ও নৈতিক ঐক্য গড়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি নেতৃত্বের অসারতা বারবার প্রমাণ হচ্ছে। এটা গণতন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকারক। বাঙালির শেকড়ের জায়গাটিকেই বারবার ক্ষত-বিক্ষত করার প্রবণতা অসহিষ্ণুতা বা অস্থির মানসিকতারই প্রতিফলন। এ ধরনের অপরিণামদর্শি মানসিকতা সমাজে অস্থিরতা ও মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তিরই জন্ম দিবেÑ যা সার্বিকভাবে সবার জন্যই ক্ষতিকর।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ