বিএবির সিদ্ধান্ত ঋণে ৯ ও আমানতে ৬ শতাংশের বেশি সুদ নয়

আপডেট: জুন ২৫, ২০১৮, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। আর তিন মাস মেয়াদি আমানতের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ শতাংশ। আগামী ১ জুলাই থেকে সংগঠনটির সদস্যভুক্ত সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে নতুন এ সুদহার কার্যকর হবে।
ক্রমঊর্ধ্বমুখী ঋণের সুদহারে লাগাম টানতে গতকাল রাজধানীর গুলশানের জব্বার টাওয়ারে বিএবির কার্যালয়ে বৈঠক করে সংগঠনটি। ওই বৈঠকেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে বেশি সুদ দিয়ে অন্য ব্যাংকের আমানত ভাগিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেন বিএবি চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে বেঁধে দেয়া সুদের বেশি দিয়ে আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানান তিনি।
বেসরকারি ব্যাংকের মতোই ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংকও। গতকাল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ডেপুটি গভর্নরসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) অংশ নেন।
গতকাল বেলা ১১টায় বিএবি কার্যালয়ের বোর্ড রুমে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার। সভায় ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. নাজমুল হাসান, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজাম চৌধুরী, ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক আজিম উদ্দিন আহমেদ, ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান এ রউফ চৌধুরী, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান তমাল এসএম পারভেজ, ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী, এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নূরুন নেওয়াজ সেলিমসহ বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ব্যাংক থেকে ১৩-১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী তা ফেরত দিতে পারবেন না। মামলা-মোকদ্দমা করে কারো কাছ থেকে টাকা আদায় করা যায় না। এটা সম্ভব নয়। এতে ব্যাংক অচল হয়ে যাবে।
ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার পক্ষে যুক্তি হিসেবে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে এখন এমন কোনো ব্যবসা নেই, যেখানে ১৫-১৬ শতাংশ মুনাফা হয়। ঋণের সুদই যদি ১৩-১৪ শতাংশ হয়, তাহলে মূল ঋণ তো আছেই। একটি ব্যবসায় কত মুনাফা করলে গ্রাহকরা ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারবে? এটি করতে হলে ব্যবসায়ীদের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ মুনাফা করতে হবে। বাংলাদেশে এমন কোনো ব্যবসা কি আছে, যেখানে ২০-২৫ শতাংশ মুনাফা করা যাবে? আমি বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতের একজন বড় রফতানিকারক। মাসে আমার রফতানি হয় কয়েকশ কোটি টাকার পণ্য। শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে আমি ৩-৪ শতাংশের বেশি মুনাফা করতে পারি না। তাহলে আমি ব্যাংকের সুদ কোথা থেকে দেব? মূল ঋণ তো আছেই।

দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, ব্যাংকের স্বার্থে এবং উন্নয়নের স্বার্থে ঋণের সুদহার কমাতে হবে জানিয়ে মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, এটি করতে আমরা বাধ্য। এটি যুগের ডাক, সময়ের ডাক। এ পরিবেশে ব্যাংকঋণের ১২-১৪ শতাংশ সুদ দিয়ে কোনো শিল্প খাত দাঁড়াতে পারবে না। এজন্যই আমরা দেখেছি, দু-তিনটি ব্যাংক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছেপে সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েই তারা এটি করেছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছেন, ঋণের সুদের হার যেকোনোভাবেই হোক সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে। ১০ কখনো সিঙ্গেল ডিজিট নয়। আর ডিপোজিট রেট মূল্যস্ফীতির নিচে নামিয়ে আনা যায় না। বর্তমানে আমাদের মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। আমি কিছুক্ষণ আগে গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। কাজেই আমরা ১ জুলাই থেকে ডিপোজিট রেট ৬ শতাংশ নির্ধারণ করে দেব। সব ব্যাংক একসঙ্গে এটি কমাবে।
লিজিংসহ অন্যান্য কোম্পানিকেও আমানতের সুদহার কমাতে হবে জানিয়ে বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, তারা গ্রাহকদের ১২-১৩ শতাংশ সুদে আমানত রাখার প্রস্তাব দিয়ে মোবাইলে এসএমএস দেয়। এটি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে ব্যাংকের আমানত ওইসব প্রতিষ্ঠানে চলে যাবে।
ঋণের সুদের হার এক অংকে নামিয়ে আনার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করেন বিএবি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের অনুরোধ ও নির্দেশনা দিয়েছেন, যেকোনোভাবে ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনতে। তিনি বলেছেন, আপনাদের দাবি আমি মানব এবং মেনেও আসছি। তিনি তা প্রমাণও করেছেন।
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন বিষয়ে মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ছেলে-মেয়ে আলাদা ব্যবসা করেন। তাদের টিআইএন আলাদা। রাজনৈতিকভাবে বাবা করে বিএনপির নির্বাচন, ছেলে আওয়ামী লীগের। তাহলে নিজেদের মধ্যে মিলমিশ কোথায় হলো? কিন্তু পরিবারের সংজ্ঞার মধ্যে ফেলে দিয়ে বলা হচ্ছে, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না। অথচ তারা কিন্তু যুদ্ধংদেহী, মুখোমুখি। তাহলে তারা কেন একই ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না?
বেসরকারি খাতের উন্নয়নে ব্যাংকের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমেই সারা পৃথিবীর উন্নয়ন হয়েছে। আমি যখন মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলাম, তখন দেশে কোনো বেসরকারি ব্যাংক ছিল না। দেশে প্রথম বেসরকারি ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সাতটি ব্যাংক তিনি অনুমোদন দিয়েছিলেন। আজকের দিনে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি ব্যাংকের জন্য যা যা করেছেন, তা অভূতপূর্ব। আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছি। তবে চাঁদা তুলে খাই না, ব্যবসা করে খাই। এজন্যই বলি, বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান হবে না। সুদের হার বেশি হলে ব্যবসায় মুনাফা করা সম্ভব নয়।
সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে হয়েছে বলে জানান সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক আজিম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আজ আমরা শাঁখের করাতে পড়েছি। ব্যাংক রক্ষা করব নাকি ব্যবসা? ঋণের সুদের হার কমানোর ব্যাপারে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। তবে কমানোর ক্ষেত্রে স্প্রেডের বিষয়টি আমাদের খেয়াল রাখা দরকার। কারণ এ বিষয়ে দ্বিতীয়বার এখানে বসা সম্ভব হবে না।
ব্যাংকিং খাতে সরকারের অবদানের কথা উল্লেখ করে ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান এ রউফ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকের করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এটিকে আমরা অ্যাপ্রিশিয়েট করি। তবে সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে স্প্রেডের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। ব্যাংকের জন্য মন্দ ঋণ বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ব্যাংক থেকে একেকজন ৪০০-৫০০ কোটি টাকা বের করে নিয়ে গেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করে, এলসি খুলে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করেছে। এটি শুধু একটি ব্যাংকে হয়নি। এগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা দরকার। আমরা সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করব। তবে অবশ্যই সরকারের সহযোগিতায় খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়ের জন্য ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিষয়টি উদ্ধৃত করে মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ফারমার্স ব্যাংক বিপদে পড়েছে। সরকার এটিকে উদ্ধার করেছে। সময়ের প্রয়োজনেই সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে। বিপদে পড়ে ফারমার্স ব্যাংক ধ্বংস হয়ে গেলে আমাদের ওপর কালিমা পড়ে যেত। তিনি বলেন, এখনো কেউ কেউ বলেছেন, কোনো ব্যাংক বেশি সুদে আমানত নিয়ে নিতে পারে। আমি বলতে চাই, এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে বলে আমরা এমডিদের ওয়াচ করব। কোনো ব্যাংক ১ শতাংশ বেশি সুদ দিয়ে আমানত নিতে পারবে না। যদি এটি হয়, তাহলে বিএবির কোনো প্রয়োজন থাকে না।
এক ব্যাংকের আমানত অন্য ব্যাংকে বেশি সুদে যেতে পারবে না বলেও জানান বিএবি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, তিন মাস মেয়াদি আমানতের সর্বনিম্ন সুদহার হবে ৬ শতাংশ। অন্য আমানতের ক্ষেত্রে ব্যাংক নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। এ সময় এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান তমাল এসএম পারভেজ জানতে চান, কোনো ব্যাংক বিএবির সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে? জবাবে বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, এমডিরা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী। তাদের এটি দেখতে হবে। আগামী কয়েক সপ্তাহ নিয়মিতভাবে আমরা এখানে বসব। ব্যাংকের টাকা কোথায় যাচ্ছে, সেটি পর্যালোচনা করা হবে। কোনো এমডি অন্য ব্যাংকের আমানত বেশি সুদে নিলে, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিএবি কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়। আপনিও চেয়ারম্যান, আমিও চেয়ারম্যান। সরকার বিষয়টি মনিটর করবে। কোনোভাবেই বেশি সুদ দিয়ে আমানত বাগিয়ে নেয়া যাবে না। এক্সিম ব্যাংকের এমডিও যদি নির্দেশ লঙ্ঘন করেন, তাহলে আমাকে জানাবেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। লিজিং কোম্পানি আমাদের বাইরে যেতে পারবে না। এটি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারের প্রত্যেকটি বিভাগ কাজ করবে।
বৈঠকে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর বিষয়ে কথা তোলেন এক ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এ সময় বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, সঞ্চয়পত্রে টাকার পরিমাণ খুব বেশি নয়। এর সুদহার নিয়ে আমাদের আপাতত কোনো কথা নেই। তার পরও সরকারের কাছে বিষয়টি আমরা তুলব।
তিন মাসের নোটিস ছাড়া গ্রাহকদের সুদহার বাড়ানো যাবে নাÍ বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএবি মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, এটি তো আইনের কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি আমরা সমাধান করব।
এদিকে ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, সম্ভাবনাসহ খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা