বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এর জীবন ও কর্ম

আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০১৮, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

ইলিয়াস উদ্দীন বিশ্বাস


মৃত্যু চিরন্তন সত্য। এই চিরন্তন সত্যেকে মেনে নিয়েই মানুষকে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিতে হয়। তবে লোকান্তরিত হয়েও কিছু কৃতী মানুষ স্বীয় কর্মগুণে বেঁচে থাকেন তাঁর উত্তরসূরিদের মাঝে। ভাবী সমাজ তাঁদের মহান আদর্শ ধারণ করে এগিয়ে যায়। ঠিক এমনি একজন মানুষ ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী প্রখ্যাত আইনবিদ বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। তিনি ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নামেন। বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। শত প্রতিকুলতার মাঝেও তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দেন। ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। এই মহান ব্যক্তির মৃত্যুতে দেশের মানুষ হয়ে পড়ে শোকে মুহ্যমান। বিচারপতি হাবিবুর রহমান ছিলেন প্রজ্ঞাবান, মনস্বী ও বিনয়ী ব্যক্তি। তাঁর সৃজনশীল ও মননশীলতার ছোঁয়া বাঙালি কখনো ভুলতে পারবে না। এই মহান ব্যক্তি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন চিরকাল।
জন্ম ও পরিচিতি
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৩০ সালের ১ মে ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমার দয়ারামপুর নামক গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আট ভাইবোনের মধ্যে হাবিবুর রহমান শেলী ছিলেন দ্বিতীয় আর তিন ভাইয়ের মধ্যে প্রথম। তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। মুর্শিদাবাদে রাজনীতিবিদ হিসেবে জহির উদ্দিন বিশ্বাসের সুনাম ও সুখ্যাতি ছিল প্রচুর। তিনি হিন্দু-মুসলমান সকলের অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মায়ের নাম গুল হাবিবা। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হওয়ায় হাবিবুর রহমান শেলী ছেলেবেলায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সংস্পর্শে আসেন। ফলে তখন থেকেই তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে ওঠে। তবে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে কখনো যুক্ত হননি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কবল থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো বটে তবে সেই স্বাধীনতায় অনেক পরিবার ভিটেমাটি ছাড়া হলো। ব্রিটিশদের কূটকৌশল ও ১৯৪৬ সালে সংঘঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে তা দ্বিখ-িত হয়ে পড়ল। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ থাকল স্বাধীন ভারতের মধ্যে আর মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ যুক্ত হলো পাকিস্তান নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে। ফলে পাকিস্তানে হিন্দুরা হলো সংখ্যালঘু আর ভারতে মুসলমানেরা হলো সংখ্যালঘু। এভাবে ভারত ভাগের ফলে সংখ্যালঘুদের অবস্থা কী দাঁড়াবে তা তৎকালীন কোনো নেতাই ভেবে দেখেননি বা ভেবে দেখার সময় পাননি। উভয় দেশের সংখ্যালঘুদের মনে এক ধরনের উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হলো। হিন্দুদের দেশ হিন্দুস্তানে মুসলমানের বসবাস আর মুসলমানদের দেশ পাকিস্তানে হিন্দুর বসবাস নিয়ে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বিপন্ন বোধ করতে লাগল। এ যেন নিজ বাসগৃহে পরবাসী। তখন ভারতও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয়নীতি হিসেবে গ্রহণ করেনি। ভারত ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়নীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণ করার পর। তবে উভয় দেশের নেতৃবৃন্দ ঘোষণা দিল, সকল সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ জন্মস্থানে স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু এ ঘোষণায় সংখ্যালঘুদের উৎকণ্ঠা কাটলো না। বাপদাদার ভিটেমাটি ছেড়ে হাজার হাজার হিন্দু পরিবার চোখের জল ফেলতে ফেলতে এপার বাংলা থেকে ওপার বাংলায় গেল আর একইভাবে মুসলিম পরিবার ওপার বাংলা, বিহার ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে এপার বাংলায় এলো। উল্লেখ্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও মুর্শিদাবাদ জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে ভারতের মধ্যে থেকে গেল। মুসলিম লীগ নেতা জহির উদ্দিন বিশ্বাস পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময় কল্পনাও করতে পারেননি যে, মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রথমে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে দু‘দিন পাকিস্তানের পতাকাও উড়েছিল। পরে র‌্যাডক্লিফ কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সেটি আবার ভারতের মধ্যে পড়ে। সিলেটের মতো গণভোট হলেও সেটা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতো সেটা প্রায় নিশ্চিত। মুর্শিদাবাদ জেলাটি এখনো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুসলিম লীগের পশ্চিমাঞ্চলের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান ও অন্যান্য অবাঙালি নেতাদের চাতুর্যপূর্ণ রাজনীতির কারণেই এমনটি ঘটে। তাঁরা কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চেষ্টা করেন। প্রান্তিক জেলা মুর্শিদাবাদের মুসলমানদের নিয়ে তাঁদের আদৌ মাথাব্যথা ছিল না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র একটি মন্তব্য থেকে তা স্পষ্টই বুঝা যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘‘মুসলিম জগতের স্বার্থে পশ্চিম পাকিস্তানে দশ মাইল পেলে পূর্ব বাংলায় বিশ মাইল ছাড় দিতেও তিনি প্রস্তুত।” হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম অবিভক্ত বাংলাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র করার চেষ্টা করেছিলেন। মুর্শিদাবাদের বিষয়ে তাঁরা আলাদাভাবে কোনো চিন্তা করেননি। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন মনোভাবে জহির উদ্দিন বিশ্বাস হতাশায় পড়েন। এ নিয়ে তিনি বেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে গ্রেফতার করে এবং বহরমপুর জেলে আটকে রাখে। কিছুদিন পরেই তিনি জেল থেকে মুক্তি পান, তবে তাঁর মন একেবারেই ভেঙ্গে পড়ে।
শিক্ষাজীবন ও ভাষাআন্দোলন
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের পড়াশোনা শুরু হয় তাঁর বাবার তত্ত্ব¡াবধানে। এলাকার প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষা লাভ করে মেধাবী ছাত্র মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ভর্তি হন মহকুমা সদরের জঙ্গীপুর হাইস্কুলে। তিনি ১৯৪৫ সালে জঙ্গীপুর হাইস্কুলে থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। কলকাতায় ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষ অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার চরম অবস্থা দেখার দুর্ভাগ্য তখনো আমাদের রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের হয়নি। কিন্তু ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টে কলকাতায় সাম্প্রদায়িকতার চরম রূপটি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রত্যক্ষ করেন। তিনি সাধ্যমত সাম্প্রদায়িকতায় ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। আর তখনই তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করতে শিখেন। সেই থেকে তিনি আজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন-
‘ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলাম আইএ পড়ার জন্য। তখন পার্কে, ময়দানে ও ইনস্টিটিউটের উল্লেখযোগ্য প্রতিটি সভায় উপস্থিত থাকার চেষ্টা করতাম। লেখাপড়ার জন্য সময় পেতাম কম। জিন্নাহ, নেহরু, আবুল হাশিম, বঙ্কিম মুখার্জী, সত্যেন মজুমদার, হীরেন মুখার্জী প্রমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গের বক্তৃতা শুনতাম অবাক বিস্ময়ে। সৌধপুর আশ্রমে একবার গান্ধীকে দেখতে গেলাম। সেদিন ছিলো তাঁর মৌনব্রতের দিন। গান্ধীর বক্তৃতা আমার আর শোনা হলো না। রশিদ আলী দিবসে আহতদের জন্য কলকাতা মেডিকেল কলেজে রক্তদান করতে গেলাম। তখন আমার ওজন ছিল ৮০ পাউন্ড। ডাক্তার আমাকে দেখে হাসলেন, আমি লজ্জা পেলাম। শেষ পর্যন্ত আমার কয়েক সিসি রক্ত গ্রহণ করায় আমি বিব্রত অবস্থা থেকে উদ্ধার পেলাম। সে সময় আমাকে সবচেয়ে আকর্ষণ করত আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের আদর্শ। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পেই পাকিস্তানের আন্দোলনÑ সেই যুক্তি সেদিন যেমন ছিলো চিত্তাকর্ষক, তেমনি গ্রহণযোগ্য। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের পর সবচেয়ে ঘৃণা করতে শিখলাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে। কোন কালে কোন অবস্থায় মানুষকে আমি এতো অসহায় হতে দেখিনি।’
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। মুর্শিদাবাদ ও রাজশাহী দু’টি পাশাপাশি জেলা। ভারত ভাগের সময় জেলা দু’টি পড়ে দুই দেশে। অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন বিশ্বাস তখন বেশ চিন্তায় পড়েন। ভারতেই থাকবেন, না বাপদাদার ভিটেমাটি ছেড়ে রিফিউজি হয়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমাবেন। এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যেই প্রথমে সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে রাজশাহী কলেজে ভর্তি করার। ফলে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে রাজশাহী কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। তাঁর বাবা জহির উদ্দিন বিশ্বাস ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে রাজশাহীতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রাজশাহী শহরের যে বাড়ি থেকে ভারতে চলে গেলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক ও মহাস্বেতা দেবীর পরিবার প্রথমে সেই বাড়িতে এসে উঠল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের পরিবার। সে সময়ে রাজশাহী কলেজে পড়–য়া ঋত্বিক ঘটক পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন এবং তাঁর ভ্রাতৃকন্যা মহাস্বেতা দেবী বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন। যে রাজনীতির কারণে বাপদাদার ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছে জহির উদ্দিন বিশ্বাসকে, রাজশাহীতে এসে তিনি সেই রাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্ক ত্যাগ করেন। এপার বাংলায় এসে ইতিহাসের ছাত্র মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান নিজেই যে এদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবেন তা কী তিনি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন? মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান কলেজে ভর্তি হবার কিছুদিন পরই তাঁর মনে মাতৃভূমি মুর্শিদাবাদ ছেড়ে আসার দুঃখবোধের সঙ্গে আরো নতুন করে যুক্ত হলো এক অপ্রত্যাশিত আঘাত। সে আঘাত মাতৃভাষার প্রতি পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর চরম অবমাননা। পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর উর্দুভাষী মুহম্মদ আলী জিন্নাহ্ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা দেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এ ঘোষণা শোনার পর থেকেই মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান যুক্ত হন ভাষা আন্দোলনে এবং সক্রিয় ছিলেন ভাষা-আন্দোলনের শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি রাজনৈতিক কোনো অভিলাষ থেকে নয়, মাতৃভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকেই ভাষা আন্দোলন করেছেন। ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমীর স্মৃতিচারণ গ্রন্থে তিনি লিখেছেনÑ
‘রাজশাহী কলেজের ফিজিক্স বিল্ডিং এর নিচে দাঁড়িয়ে রেডিও সম্প্রচার থেকে জিন্নাহ্্ সাহেবের সেই ভাষণ আমি শুনি, যখন তিনি একতরফাভাবে ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ সেদিন আমি মনে খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। সর্বজন সম্মানিত দেশনায়কের হাতে আমার প্রিয় আদর্শ আত্মনিয়ন্ত্রণের এমন অবমাননা আমি আশা করিনি। তখন আমার মনের গহনে (হয়ত সমমনা অনেকের অন্তরেও) একটা বিশিষ্টতাবোধ অগোচরে সঞ্চারিত হয়ে গেল। এরপর বাংলাভাষা বিরোধী প্রতিটি উক্তি ও আচরণ সেই বিশিষ্টবোধকে পুষ্টিদান করতে থাকে। সেই স্বাতন্ত্র্যবোধ কখন ঋদ্ধিলাভ করে আত্মআবিষ্কারে ব্যাপৃত হয় তা আমার খেয়াল নেই। শুধু দেখলাম, রাজহংসের শুভ্র পালকে যেমন কালিমা লেপন সম্ভব হয় না, তেমনি সেই বিশিষ্টতাবোধের বিরুেেদ্ধ কোনো প্রচার বা প্রয়াস সফলকাম হল না। রাজশাহী কলেজে ১৯৪৮ সালের ১১ ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বানে ধর্মঘট পালিত হয়। সেই ধর্মঘটকে সাফল্যম-িত করার জন্য বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সেদিন আমরা পিকেটিং করি। বাংলা ভাষার দাবীর প্রশ্নে সাধারণ মানুষ ত দূরের কথা শিক্ষিত জনসমাজেও তেমন কোন বিশেষ আগ্রহ সেদিন পরিলক্ষিত হয়নি। যাঁরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশেষভাবে চর্চা করতেন এবং পরে বাংলা ভাষা সাহিত্যের অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তাঁদের অনেকের মধ্যে কোনো উৎসাহ সেদিন দেখিনি। দু-একজনকে কোনো মতেই সেই ধর্মঘটে যোগদান করাতে আমরা সক্ষম হলাম না। সে সময় মুহম্মদ সুলতান, গোলাম রহমান ও একরামুল হক ছাত্ররাজনীতিতে অত্যন্ত তৎপর ছিলেন। ’
ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেও মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন সমান তালে। তিনি ১৯৪৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে ইতিহাসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তখনো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তারপর তিনি এমএ পড়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মুহম্মদ সুলতান ছিলেন রাজশাহী কলেজে পড়াকালে তাঁর সহপাঠী বন্ধু। মেধাবী ছাত্র মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বন্ধুদের ডাকে ছাত্রসমাজের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাড়া দিতেন। ফলে কোনো ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজে তাঁর একটা প্রভাব ছিল। বিশেষ করে তাঁর এই প্রভাবের সৃষ্টি হয় হল ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তিনি ১৯৫১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী (পরে বিশিষ্ট লেখক, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ) নির্বাচিত হন সাধারণ সম্পাদক। তিনি ২৬ ফেব্রুয়ারি হল ইউনিয়নের অভিষেক অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের উপস্থিতিতে বক্তব্য রাখেন। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছাত্র জীবনেই প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার অধিকারী ছিলেন। তিনি বন্ধুদের সঙ্গে রাজশাহীতে সাহিত্য চর্চার জন্য ১৯৫১ সালে ‘দিশারী সাহিত্য মজলিশ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। সেই সংগঠন থেকে তাঁর সম্পাদনায় ‘দিশারী’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এই পত্রিকাটি রাজশাহীর তরুণ সমাজের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লে পত্রিকাটির সম্পাদনার ভার পড়ে একরামুল হকের ওপর (ভাষাসৈনিক একরামুল হক হলেন ভাস্কর মৃনাল হকের বাবা, তিনি প্রথমে ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, পরে জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হন)। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বানে হরতাল পালনের সময় ছাত্রদের ওপর চলে পুলিশি নির্যাতন। সেই দিনটিকে ছাত্রসমাজ রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালন করত। রাষ্ট্রভাষা দিবসে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১৯৫১ সালের ১১ মার্চে এক সভায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। তিনি ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফিসে রাষ্ট্রভাষা কর্মপ্রক্রিয়া কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন। সে সভায় ইস্ট বেঙ্গলের এমসিএ এবং এমএলএদের কাছে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সংবলিত খসড়া স্মারকলিপি অনুমোদিত হয়। সেই বছরই তিনি ইতিহাসে প্রথম শ্রেণি পেয়ে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন তখন এটা প্রায় নিশ্চিত। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আবার শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। রাজনৈতিক নেতারা যখন ভাষা আন্দোলন নিয়ে লাভ-ক্ষতির হিসেব কষছিলেন, তখন ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির দিকে না তাকিয়ে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। পরদিনই ছাত্রসমাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিল্ডিং এর আমতলায় তড়িঘড়ি একটা সভা করে সেই ঘোষণার নিন্দা করে। সেদিনের সভায় তিনি বলেছিলেন Ñ
‘শুনেছি ফ্যাসিষ্ট ইতালিতে স্লোগান দেওয়া হতোÑ মুসোলিনি কোনোদিন ভুল করে না। এখন দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে অনুরূপভাবে আমাদের ওপর একটা সবক চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, জিন্নাহর কথাই অভ্রান্ত। তার নড়চড় হবে না।’
সেদিন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বক্তব্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর নামের আগে কায়েদে আযম উল্লেখ না করায় তাঁর অনুসারী কয়েকজন ছাত্র মারমুখো হয়ে প্রতিবাদ করে ওঠে। সাধারণত মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান পিতা-মাতা প্রদত্ত নাম ছাড়া কারো নামের আগে বা পরে কোনো পদবি উচ্চারণ করতেন না। তাঁর নিজের ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। তিনি ব্যারিস্টার-এট-ল ডিগ্রিধারী একজন ব্যক্তি হলেও তা অধিকাংশ মানুষই জানে না। কেননা তিনি তাঁর নামের আগে বা পরে সেটা লিখতেন না। এমনকি তাঁর নামের আগে বিচারপতি যুক্ত করাটাকেও তিনি পছন্দ করতেন না। আসলে তিনি ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মানুষ।
(চলবে)
লেখক : অধ্যাপক, গণিত বিভাগ ও কোষাধ্যক্ষ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট