বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এর জীবন ও কর্ম

আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০১৮, ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ

ইলিয়াস উদ্দীন বিশ্বাস


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
১৯৫২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে এক সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিলে সরকার বিচলিত হয়ে সেদিন থেকে ঢাকা শহরে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক জরুরি সভা ২০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় নেতারা ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু ছাত্রনেতারা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। ফলে সেদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের মাঝে পুকুর পাড়ে বসে যে ১১ জন ছাত্রনেতা পরের দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সেখানে মুহাম্মদ সুলতান, আব্দুল মোমিন, জিল্লর রহমান (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি), কামরুদ্দিন শহুদ, গাজীউল হক, আনোয়ারুল হক খান, এম আর আখতার মুকুল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশে দশজন দশজন করে ছাত্রদের রাস্তায় বের হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবটি প্রথম করেছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ (প্রয়াত পররাষ্ট্রমন্ত্রী)। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী দশজন ছাত্রের প্রথম দলের নেতৃত্বে ছিলেন। মিছিল থেকে তাঁকেসহ আরো কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তুলে তেজগাঁও পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়। তারপর ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে নেয়া হয়। পরে খুনের চেষ্টা, মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র সহকারে দাঙ্গা, কর্তব্যরত সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে হামলা ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। বিচারাধীন কয়েদি হিসেবে তাঁর পরিচিতি নম্বর ছিল ৪৭৭। জেলখানায় অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন Ñ
‘জেলে আমাদের কোনো ক্লাস দেওয়া হয়নি। একটা লম্বা ঘরে ২৭/২৮ জন মিলে আমরা রাত কাটাতাম। আমাদের প্রত্যেককে দুটো করে কম্বল দেওয়া হয়। আমার এক পার্শ্বে থাকতেন এস এ বারি এ টি আর এক পাশে নেয়ামুল বসির। ইকবালের একটা কবিতার বই থেকে নেয়ামুল বসির কবিতা পড়ে শোনাতেন। দু-একবার আলোচনা চক্রের চেষ্টা করা হলেও সে আবহাওয়ায় তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। জেলের মধ্যে নানা ধরনের স্লোগান দেওয়া হতো। ‘নুরুল আমিনÑ গদি ছাড়’ এই স্লোগানটা তখন আমরা তেমন পছন্দ করতাম না। আমাদের কেমন একটা আশঙ্কা হতো যে, ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে কেউ আবার বাংলা ভাষার আন্দোলনকে বিপথে চালিত না করে। পুলিশের ভয়ে লোক এতো অতিষ্ঠ ছিল যে, বন্ধু-বান্ধব কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারেননি। রাজশাহী থেকে আব্বা এসেছিলেন দেখা করার জন্য। জেলখানার কম্বল গায়ে দিয়ে দাড়িভরা মুখ নিয়ে যখন তার সামনে গারদের পাশে দাঁড়ালাম তখন দেখি তার চোখ ছল ছল করছে। আমি অত্যন্ত বিব্রতবোধ করলাম। পিতা-পুত্রের মধ্যে প্রায় কোনো কথাই হলো না। ‘কারাবরণ’ কথাটার মধ্যে একটা ব্রত উদ্যাপনের ভাব আছে, আত্মনিগ্রহ ব্রতের।’
পরে অবশ্য অল্পদিনের মধ্যেই মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পান। ১৯৫২ সালে ১ জুলাই রাজশাহী শহরে ‘রাজশাহী জেলা রাষ্ট্রভাষা সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। তিনি এই সম্মেলন সফল করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
কর্মজীবন
বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কর্মজীবনও বেশ বৈচিত্রময়। তিনি যেমন সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পদ ডিনের দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৫২ সালের ১ মে তাঁর প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু কর্মজীবনের শুরুতেই বিপত্তি দেখা দেয়। বিপত্তির কারণ ভাষা আন্দোলনে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে কয়েকজন ছাত্রকে বিভিন্ন মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু ছাত্রদের তীব্র আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলনের সময় মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ছাত্রত্ব ছিল না, তার কয়েক মাস আগেই তিনি পাশ করে গেছেন। তাছাড়া তিনি কোনো ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীও ছিলেন না। ফলে ভাষা আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কিছুটা অগোচরেই থেকে যায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পরপরই ভাষা আন্দোলন করার কারণে তাঁর স্বল্প সময়ের কারাবাস বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর সরকারের খড়গ নেমে আসে। এতে তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুল হালিম বিব্রত হন। তাঁকে কেন্দ্র করে তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে বিব্রত হতে দেখে হাবিবুর রহমান শেলী মাত্র চার দিন শিক্ষকতা করার পরই ৪ মে প্রভাষক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুততার সঙ্গে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে। স্বপদে থেকেই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছাত্রদের ব্যবহার করতে পারতেন। ছাত্রদের মাঝে তাঁর সেই ধরনের প্রভাবও ছিল, কিন্তু সেপথে তিনি যাননি। কেননা তিনি ভেবেছেন একজন শিক্ষকের এপথ হতে পারে না। তারপর তিনি সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করতে থাকেন। সেন্ট্রাল সুপারিওর সার্ভিস পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েও পুলিশ রিপোর্টের কারণে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগদান করতে পারেননি। এখানেও তাঁর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরে তিনি নিজ গলায় ট্রে ঝুলিয়ে এতে সিগারেট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বিক্রির মাধ্যমে এক অভিনব পন্থায় সরকারের অনুগত বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কর্ম কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিব্রত হয়। এখানেই হাবিুরর রহমান শেলীর চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রমাণ মিলে। পরে তিনি সিরাজগঞ্জ কলেজ, জগন্নাথ কলেজ ও রাজশাহী কলেজে ইতিহাস বিভাগে শিক্ষকতা করেন। আইন পেশার সঙ্গে জড়িত বাবা অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন বিশ্বাসের পরামর্শে তিনি ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর ১৯৫৬ সালে কমনওলেথ স্কলারশিপ পেয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। তিনি ১৯৫৮ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক ইতিহাসে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি ও পরের বছর লন্ডনের লিঙ্কন্্স-ইন থেকে প্রফেশনাল ডিগ্রি ব্যারিস্টার-এট-ল অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। তিনি ১৯৬১ সালে রিডার (সহযোগী অধ্যাপক পদের সমপর্যায়ের পদ) পদে পদোন্নতি পান। তিনি ১৯৬১ সালের ১ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত আইন অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে তাঁর বাবার ইচ্ছাপুরণে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে স্বাধীন পেশা হিসেবে আইন পেশায় যুক্ত হন। আইন পেশায় তাঁর খ্যাতি ও সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ১৯৭২ সালে ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন এর সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৬ এ উচ্চ আদালতে বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৫ সালে আপিল বিভাগে বিচারপতি নিযুক্ত হন। ১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৯৫ সালে ১ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে যোগদান করে সেই বছরেই তিনি অবসরে যান। তাঁর অসামান্য পা-িত্য ও চারিত্রিক দৃঢ়তা মানুষকে মুগ্ধ করেছে। বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন একেবারে আইনের মানদ-ে। আইনের মানদ-ে যা সঠিক তা-ই তিনি গ্রহণ করেছেন, ভাবাবেগকে কখনো প্রশ্রয় দেননি।
পেশাগত দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য বিচারপতি হাবিবুর রহমান দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি ১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে অনুষ্ঠিত আইনজীবী ও বিচারকদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত আইনজীবী ও বিচারকদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ হয়। তিনি ১৯৯২ সালে নাইজেরিয়ার আবুজায় চতুর্থ কমনওয়েলথ প্রধান বিচারপতি সম্মেলনে যোগদান করেন। সার্ক দেশসমূহের প্রধান বিচারপতিদের প্রথম সম্মেলন ১৯৯৫ সালে নেপালের রাজধানী কাঠমু-তে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিনি যোগদান করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলন-সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য ব্রাজিল, মালেয়েশিয়া, আমেরিকা, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ভারত প্রভৃতি দেশ সফর করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা
বিচারপতি হাবিবুর রহমান ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ হতে ২৩ জুন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতা ছাড়ার আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়।’ জয়বাংলা আর জিন্দাবাদ স্লোগান নিয়ে যখন দেশের মানুষ বিভক্ত তখন তিনি নিরপেক্ষ সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হউক’ স্লোগান দিয়ে তাঁর নিরপেক্ষতার প্রথম প্রমাণ দিলেন। তিনি সরকারের প্রধান হলেও সেনাবাহিনী ছিল রাষ্ট্রপতির অধীনে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের সময় সেনাবাহিনীকে সরকার প্রধানের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির অধীনে ন্যস্ত করা হয়। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিএনপি কর্তৃক নির্বাচিত বিচারপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস। এমতাবস্থায়, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা ছিল তাঁর জন্য বড় ধরনের এক চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নির্বাচন ভ-ুল করার চেষ্টা হয়েছিল এবং রক্তপাতের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। সে-সময় দেশের মানুষ ছিল বেশ উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠায়। বেতার ও টিভির খবরে জানানো হলো প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে বেতার ও টিভিতে ভাষণ দিবেন। দেশের উৎকণ্ঠিত মানুষ তাঁর ভাষণ শোনার অধীর আগ্রহ নিয়ে বেতার-টিভির সামনে গিয়ে বসল। তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণ শুনে দেশবাসী মুগ্ধ আর আশ্বস্ত হলো। তিনি সমগ্র জাতিকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানালেন। সে সময়ে তৎকালীন সেনাপতি জেনারেল নাসিম ও আরো কয়েকজন সেনাকর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। তারপর সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান তাঁর প্রজ্ঞা ও দক্ষতার মাধ্যমে সব ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে জাতিকে নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেন। তিনি রাজনীতিবিদ না হলেও তাঁর স্বল্প সময়ের শাসনকাল থেকে রাজনীতির দীক্ষা গ্রহণ করার মতো অনেক কিছুই পাওয়া যায়। বিচারপতি হাবিবুর রহমান রাজনীতি সচেতন ছিলেন, তবে তাঁর কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল না। তিনি আইনজীবী হিসেবে হাইকোর্টে কাটিয়েছেন এক যুগ। আমাদের দেশে যাঁরা আইন পেশায় জড়িত তাঁরা প্রায় সবাই রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত। ব্যতিক্রম শুধু মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ক্ষেত্রে। সরাসরি রাজনীতি করা তো দূরের কথা কোনো রাজনৈতিক নেতার উপদেষ্টাও ছিলেন না। তিনি সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণের দায়িত্ব নিয়ে চার বছর শিক্ষকতা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন শেষে নিমগ্ন হন আবারো জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণের কাজে। তবে এবার শিক্ষকতা নয়, গবেষণালব্ধ ও অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে জ্ঞান নিয়ে পুস্তক রচনা করে তা পাঠকের হাতে তুলে দিয়ে। তিনি যেমন ছিলেন একজন জ্ঞানী শিক্ষক, ন্যায়পরায়ণ বিচারক ও দক্ষ প্রশাসক, তেমনি ছিলেন মননশীল লেখক ও সত্যিকারের একজন গবেষক।
গ্রন্থাবলি
সৃজনশীল ও মননশীল লেখক হিসেবে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের আগ্রহ ছিল বিচিত্র বিষয়ে। তাঁর কোরানসূত্র ও কোরানশরীফ সরল বঙ্গানুবাদ বই দুু’টি আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল কোরান সম্পর্কে। তিনি বলেছেন, মানুষের কাছে যাবার জন্য ও তার কাছে ধর্মের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট বাহন হচ্ছে মাতৃভাষা। আর এই কারণেই তিনি বই দু’টি লিখেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমাদের যে বাংলাদেশ, আদিতে সেটার পরিচিতি ছিল গঙ্গাঋদ্ধি নামে যা গ্রিক বর্ণনাতে পাওয়া যায়। আর সে থেকেই বাংলাদেশের ইতিহাস সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় এই বইটিতে। আইন ও বিচার নিয়ে লিখেছেন ‘আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’। তিনি ইতিহাস ও আইন এর ছাত্র তবে ইতিহাস ও আইন ছাড়াও গবেষণা করেছেন সাহিত্য নিয়ে বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে তিনি একাধিক বই লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে তাঁর বইগুলো হলো: রবীন্দ্রপ্রবন্ধে সংজ্ঞা ও পার্থক্য বিচার, মাতৃভাষার স্বপক্ষে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্ররচনার রবীন্দ্রব্যাখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ও সভ্যতার সংকট, রবীন্দ্রবাক্যে আর্ট, সঙ্গীত ও সাহিত্য ইত্যাদি। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে লিখেছেন ‘উন্নত মম শির’। তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান বইটি হচ্ছে ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত যথাশব্দ। বাংলা ভাষার একই ভাবধারার কিছু শব্দ নিয়ে অভিধান ধরনের এই বইটি উভয় বাংলার গুণিজনদের কছে বেশ সমাদৃত হয়। তত্তাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ভার’। মোটকথা, বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার অধিকারী বিচারপতি হাবিবুর রহমান তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে অনেক বই লিখে সমৃদ্ধ করেছেন বাঙালির জ্ঞানভা-ার। সেদিক থেকে তিনি অদ্বিতীয় আর অতুলনীয়। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আশিটির অধিক। তাঁর বাকি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো: বচন ও প্রবচন (১৯৮৫), আমরা কি যাবো না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে (১৯৯৬), বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক (১৯৯৬), তেরই ভাদ্র শীতের জন্ম (১৯৯৬), কলম এখন নাগালের বাইরে (১৯৯৬), বাংলাদেশে সংবিধানের শব্দ ও খ-বাক্য (১৯৯৬), বাংলাদেশের তারিখ (১৯৯৮), মনের আগাছা পুড়িয়ে (১৯৯৮), বং বঙ্গ বাঙ্গালা বাংলাদেশ (১৯৯৯), সরকার সংবিধান ও অধিকার (১৯৯৯), কবি তুমি নহ গুরুদেব (১৯৯৯), মৌসুমি ভাবনা (১৯৯৯), মিত্রাক্ষর (২০০০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০০০), চাওয়া-পাওয়া ও না-পাওয়ার হিসেব (২০০১), স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন ও বোবার স্বপ্ন (২০০২), রবীন্দ্ররচনায় আইনি ভাবনা, বিষণœ বিষয় ও বাংলাদেশ (২০০৩), প্রথমে মাতৃভাষা পরভাষা পরে (২০০৪), সাফদেলের মহড়া (২০০৪), এক ভারতীয় বাঙালির আত্মসমালোচনা (২০০৫), দায়মুক্তি (২০০৫), কতভাগ্যে বাংলাদেশ, কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ (২০০৬)।
জীবনাবসান
২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি শনিবার রাতে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তাঁকে নেয়া হয়। রাত ৯টা ৫৩ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তিনি স্ত্রী ইসলামা রহমান ও তিন মেয়ে রুবাবা রহমান, নুসরাত হাবিব, রওনাক শিরিন এবং আত্মীয়স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর বাসায় যান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে তাঁর মরদেহ নেয়া হয়। দেশের সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানায়। ভাষাসৈনিক, শিক্ষক, আইনজ্ঞ, ইতিহাসবিদ, গবেষক প্রভৃতি পরিচয়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমান অমর হয়ে থাকবেন চিরকাল।
জীবনভাবনা
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেশ ও দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান লিখেন Ñ
‘বস্তুত বঙ্গ প্রদেশের ভোটেই পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব নিলেন পশ্চিমা মুসলমান নেতৃবৃন্দ এবং দেশপ্রেমের একমাত্র দাবিদার সাজলেন অধিকারীর বেশে। রাষ্ট্রের মঙ্গল কামনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার সৃষ্টিকর্তা যেন তাদের হাতে সঁপে দিয়েছেন। বিত্তবান ও প্রভাবশালী পশ্চিমা নেতৃত্বকে কেমন যেন সহজে মেনে নিলো পূর্বাঞ্চলের মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ। এমনিতেই এদেশে সে পশ্চিমা ব্রাহ্মণই হোক বা মওলানাই হোক, তার কদর বেশি। পশ্চিমা নেতৃবৃন্দের মুরব্বিয়ানার সামনে পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দের হীনমন্যতায় তরুণ ছাত্রসমাজ হলো অত্যন্ত মর্মাহত। পশ্চিমা নেতৃবৃন্দ কথা-বার্তায় ও আচরণে এমন ভাব প্রকাশ করতেন, ‘এদেশের মুসলমান সত্যিকারের মুসলমান নয়, এখানকার মানুষ কোনোদিন স্বাধীন ছিলো না, এরা হিন্দু দেবদেবী পূজা করে, হিন্দুদের কাছে থেকে সবক নেয় এবং তাদের কথায় ওঠে-বসে। পূর্ব বাংলার মানুষদের বিরুদ্ধে এক নিরবচ্ছিন্ন চরিত্রহনন চলতে থাকল। কাজে-কর্মে মুসলিম সৌভ্রাতৃত্বের কথা ফাঁকা ও অসার শোনালো। এক সময় এ দেশের একজন গভর্নর মালিক ফিরোজ খান নুন এক চরম অসৌজন্যমূলক উক্তি করে বললেন, ‘এ দেশের মুসলমানদের নাম হিন্দুর মতো, এ দেশের মুসলমানরা মুসলমানি করে না।’ পূর্ববাংলার তরুণ সমাজের সবচেয়ে খারাপও লাগলো, যখন দেখা গেলো নেতৃস্থানীয় কোনো নেতা পশ্চিমা মুরুব্বিয়ানার তেমন কোনো প্রতিবাদ করলেন না। আমাদের নেতৃবৃন্দ জানলেন না, কখন তাঁরা হারিয়ে ফেলেছেন এদেশের যুব সমাজের আস্থা। রাজনৈতিক উৎপীড়ন বা অর্থনৈতিক শোষণের তাৎপর্য মানুষকে বোঝাতে হয়। সময় লাগে তাকে উদ্বুদ্ধ করতে। কিন্তু মানুষের আত্মমর্যাদা যখন আহত হয়, তখন সে বিক্ষুব্ধ হয় সহজেই। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা মর্যাদা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এ দেশের যুব সমাজের আত্মমার্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক নিদারুণ আঘাত হিসেবে দেখা দেয়। ক্ষোভ, আবেগ, বুদ্ধি ও যুক্তির একত্র সমাবেশে দুর্বার হলো সেই আন্দোলন। একটা ঔপনিবেশিক নিপীড়নের অবস্থা সৃষ্টি হলো। বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দিলে আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে যাব এবং চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অন্যদের কাছে হেরে যাব, সে ধরণের ঠা-া মাথায় যুক্তি তখন আমরা তুলতাম না। সুইজারল্যান্ড, কানাডা, বেলজিয়াম ইত্যাদি বহু রাষ্ট্রভাষাভাষী রাষ্ট্রের কথা আমাদের আলোচনায় উল্লেখ পেত বটে, তবে বেশির ভাগ সময় বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কোনো যুক্তি প্রদর্শন তখন তরুণ মনে বাহুল্য মনে হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনকার এক বিদেশী অধ্যাপক পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের জনসংখ্যার হিসাব করে ভাষা আন্দোলনের ওপর মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইট ইজ সিম্পল ম্যাথমেটিক্স’। বাংলা ভাষার দাবির পেছনে এমন একটা সহজ ও বোধগম্য যুক্তি ছিলো যে, কোনো অপপ্রচার দ্বারাই তা খ-ন করা সম্ভব হলো না। আবেগে, বিক্ষোভে ও যুক্তি-প্রমাণে সেই আন্দোলন এমনই দুর্বার হয়ে দাঁড়ালো যে, আইনের কোনো বাধা তা মানার কথা নয়। তাই চার বছর পরেই রাষ্ট্রভাষার দাবি দেশের সংবিধানে স্বীকৃতি পেল। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েই শেষ হয়ে গেল না। জাতির প্রতিটি প্রশ্ন, আশা ও আকাক্সক্ষা এর পরও আবর্তিত হতে থাকল একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি অনেক সময় বহুবাচনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে একটা বিরোধের সৃষ্টি করে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে অবশ্য সে ধরনের কোনো বিরোধের প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। তবু ‘শিশু’ রাষ্ট্রের সংহতির দোহাই যাঁরা দিতেন তাঁদের মধ্যে একট আশঙ্কা দেখা দিল। সেদিন ভিন্ন কণ্ঠে একটি ক্ষীণ আওয়াজ শোনা যেত ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, রাষ্ট্র ভাসানো বাংলা চাই না।’ এই আশঙ্কায় আরবি হরফে বাংলা চালু করার এবং বাংলা ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার একটা চেষ্টা মাঝে মাঝে দেখা দিত। কিন্তু সকল প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা বা গুরুত্ব লাভ করতে পারল না। সবই হলো প-শ্রম। অবশেষে, যে রাষ্ট্র নিয়ে হিতৈষীদের এতো দুর্ভাবনা, ইতিহাসের ঘটনাক্রমে দু’দশকের মধ্যে কালস্রোতে ভেসে গেলো সেই রাষ্ট্র।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বিচারপতি হাবিবুর রহমান লিখেছেন Ñ
‘আজ বংশরাজনীতি যেভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছেয়ে গেছে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তেমন অবস্থা বাংলাদেশে ছিল না। দাবি-দাওয়ার প্রস্তাব এবং তা আদায় করার প্রচেষ্টায় শেখ মুজিব সেই কৈশোর ও ছাত্র অবস্থা থেকেই এক ধরনের পারঙ্গমতা অর্জন করেন। সভা-সমিতি এবং শোভাযাত্রা-হরতাল সংঘটনের অভিযোগে ১৯৪৮ এর মার্চ ও সেপ্টেম্বরে দু’বার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধস্তন কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়। ভবিষ্যতে সৎ আচরণের মুচলেকা দিলে কয়েকজন আন্দোলনকারীর বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। শেখ মুজিব কোনো মুচলেকা না দেওয়ায় তাঁর বহিস্কারাদেশ বহাল থাকে। কর্মী থেকে আঞ্চলিক নেতা এবং আঞ্চলিক বা গোষ্ঠী নেতা থেকে সারা দেশের অবিসংবাদিত নেতা হতে শেখ মুজিবকে নিরলস রাজনেতিক কর্মকা- চালিয়ে যেতে হয়েছে। তার জন্য সরকারের রুজু করা একাধিক মামলায় তাঁকে আসামী হতে হয়েছে এবং কারাবরণ করতে হয়েছে। শেখ মুজিব একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। বংশ-কৌলন্য, বিদ্যার প্রাখর্য ও বিত্তের আনুকূল্যে তিনি বড় হননি। তাঁর কর্মোদ্যম, সাহস ও কণ্ঠস্বর ছিল তাঁর বড় সহায়। কঠোর পরিশ্রমে সহকর্মীদের বিশ্বাস অর্জন করে তিনি বড় হয়েছেন। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে তিনি দেশের মানুষকে আশা-আকাক্সক্ষার কথা শুনিয়েছেন এক অনুকরণীয় এবং অতুলনীয় ভঙ্গিতে। তিনি যেমন দুর্দশার বর্ণনা করেন, তেমনি দেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তাঁর দুর্দশা বর্ণনায় মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাঁর আশার কথায় মানুষ উদ্দীপ্ত ও আশ্বস্ত হয়। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের রাজনৈতিক তৎপরতার কোনো বিরতি বা ছেদ ছিল না।’
বাঙালির মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগের ফসল একুশে ফেব্রুয়ারি। রক্ত¯œাত একুশে ফেব্রুয়াারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়। একুশের চেতনা মাতৃভাষাকে ভালোবাসা অর্থাৎ একুশ মানুষকে নিজের মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে শেখায়। মানুষ শিশুকালে মায়ের মুখ থেকে যে ভাষা শিখে মনের ভাব প্রকাশ করে সেটাই তার মাতৃভাষা। এ কারণে আদিবাসীদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ হলেও বাংলা ভাষাকে তাদের মাতৃভাষা বলা যায় না। আমাদের দেশের প্রধান প্রধান আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হয়ে ওঠেছে এবং কিছু উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের ভাষা-কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি-সংস্কৃতির সংমিশ্রণের ফলেই আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক আবহ রূপ পেয়েছে ভিন্নতায়। বিচারপতি হাবিবুর রহমান এটা ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই আদিবাসীদেরকে তাদের ভাষা-কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। তিনি নিজের মাতৃভাষাকে যেমন জীবনভর ভালোবেসেছেন, তেমনি অন্যের ভাষার প্রতিও ছিল তাঁর বিশেষ অনুরাগ। তিনি একুশের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন সকল ভাষাভাষির মানুষের মধ্যে। আর সেটা করতে গিয়ে তিনি বই লিখেছেন। বইয়ের নাম দিয়েছেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সকল ভাষার কথা কয়।’
বিচারপতি হাবিবুর রহমান কেতাবি জ্ঞানের চেয়ে সরজমিনে গিয়ে অর্জিত জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাই নানান ভাষাভাষি মানুষের সংস্পর্শে এসে তাদের ভাষা-কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন উৎসব পালন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়েছেন। সাঁওতালদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি জানার জন্যে যেমন সাঁওতাল পল্লীতে গেছেন, তেমনি আবার মনিপুরিদের ভাষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার জন্যে সিলেটের মনিপুরিদের সঙ্গেও মিশেছেন। তিনি যখন যে সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গিয়েছেন তখন তাদের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী খাবার খেতেও চেষ্টা করেছেন। সিলেটে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘বিচারপতি হাবিুরর রহমান স্মরণসভা’য় এমন কথাই বলেন বাংলাদেশ মণিপুরি সাহিত্য সংসদ এর এক সংগঠক ও সিলেট প্রেস ক্লাবের সদস্য।
বিচারপতি হাবিবুর রহমান তাঁর ‘সাঁওতাল পল্লীতে উৎসব হবে’ শিরোনামের প্রবন্ধে বলেছেন Ñ
‘আমাদের সাহিত্যে, চিত্রশিল্পে ও স্থাপত্যে সাঁওতালেরা একটা উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে। তাদের ঝুমুর নৃত্য ও গানের সুরে আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গন সমৃদ্ধ ও ধন্য হয়েছে।’ ( চলবে)
লেখক : অধ্যাপক, গণিত বিভাগ ও কোষাধ্যক্ষ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট