বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এর জীবন ও কর্ম

আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০১৮, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

ইলিয়াস উদ্দীন বিশ্বাস


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
দেশে-বিদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ায় বিচারপতি হাবিবুর রহমান অত্যন্ত মর্মাহত হতেন। বিশেষ করে আমাদের দেশে মানুষ নিজ অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্যের অধিকার হরণ করতে সামান্যতম চিন্তা করে না। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর ‘মানবাধিকার ও সহিষ্ণুতা’ প্রবন্ধে লিখেছেনÑ
‘আমরা আমাদের অধিকার ষোল-আনা আদায় করতে চাই, বিনিময়ে আমরা কর্তব্যের কথা বেমালুম ভুলে যাই। নিজের অধিকার নিয়ে বাড়াবাড়ি করি, অপরের অধিকারের ওপর চড়াও হই। অতি-অধিকার-চেতনা আমাদের অতি-স্বার্থপর ও অসহনশীল করে তুলেছে।’
দেশের সাধারণ মানুষ বিচারপতি হাবিবুর রহমান এর এই উপলব্ধিকে সহজেই অনুধাবন করতে পারছে। গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের নামে এক শ্রেণির অসহিষ্ণু মানুষ খেটে খাওয়া সাধারণ নিরীহ মানুষের ওপর পেট্রোলবোমা ছুড়ে তাদেরকে হত্যা করেছে। নিজের অধিকার আদায় করতে নিরীহ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে। পেট্রোলবোমা ছুঁড়ে নিরপরাধ মানুষ হত্যা তো গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের কোনো পন্থা হতে পারে না।
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন সর্বদা সোচ্চার। দুর্নীতি প্রসঙ্গে ‘মানবাধিকার ও দুর্নীতি’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন Ñ
‘ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারই হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতিপরায়ণ সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণত গদি ছাড়ার স্লোগান দেয়া হয়। একজন গদি ছাড়লে সেই গদি যিনি পরে দখল করবেন তিনিও যদি দুর্নীতিপরায়ণ হন তবে দুর্নীতি কমবে কেমন করে। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতালিপ্সুর মধ্যে যে দুর্নীতিবিষয়ক বাহাস হয় তাতে দুর্নীতির কেশ স্পর্শ করাও সম্ভব নয়। দুর্নীতিবাজকে কাঠগড়ায় নিয়ে বিচার করার কাজটা এতই কঠিন বলে রাজনীতিকদের কাছে মনে হয় যে, তারা বিচার না চেয়ে এবং সুযোগ পেয়েও বিচার না করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিপক্ষকে কেবল গদি ছাড়ার কথা বলেই হুমকি দেয়।’
বিচারপতি হাবিবুর রহমান ছিলেন আইনের মানুষ তাঁর দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা থেকেই উপর্যুক্ত কথাগুলো বলেছেন। আমরা সাধারণ মানুষ বড়ো বড়ো আমলা ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কথা শুনতে পাই কিন্তু এর জন্য বিচারের মাধ্যমে কারো শাস্তি হয়েছে বলে শুনতে পাই না। ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে বিপক্ষ দলের দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু বছরের পর বছর তা ঝুলে থাকে। সরকারের পক্ষে নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। এভাবেই কেটে যায় সরকারের সময়। তারপর আসে নতুন সরকার অর্থাৎ আগের সেই দুর্নীতিবাজ নেতানেত্রী। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এতদিনের বিচারাধীন মামলা যাঁচাই-বাছাইয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। দলের দুর্নীতিবাজ নেতাদের মামলাকে রাজনৈতিক মামলা বলেই তা প্রত্যাহার করে নেয়। এভাবেই দুর্নীতিবাজেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। গত বিশ বছরে আমরা এটাই লক্ষ করছি। তিনি আরো বলেছেন Ñ
‘মানবদেহ যেমন রোগশূন্য নয়, তেমনি মানবসমাজ দুর্নীতি-রোগ মুক্ত নয়। দেহের স্বাস্থ্যরক্ষার ক্ষেত্রে যেমন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তেমনি অনুক্ষণ সজাগ থাকতে হবে।’
যে কোনো প্রতিষ্ঠানই মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যদি যথাযথভাবে কাজ না করে তবে তা শেষে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেনÑ
‘আমরা দাতাগোষ্ঠীর চাপে এমন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করলাম, যা জন্মলগ্ন থেকে পঙ্গু। যাঁরা এই সংস্থার জন্মদাতা তাঁরাই আবার সরকারের মেয়াদ শেষ হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে আরও অকার্যকর করার জন্য মামলা করলেন। এটা অতীব দুঃখের বিষয়।’
বিচারপতি হাবিবুর রহমান যেমন ছিলেন ধার্মিক, তেমনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করতেন। তিনি কোরানের প্রকৃত মর্মবাণী অনুধাবন করেছেন। কোরানের বিভিন্ন সুরার কথা উল্লেখ করে তিনি সাম্প্রদায়িকতা লালনকারীদের সাবধান থাকার কথা উচ্চারণ করেছেন। তিনি ‘সবার জন্য মানবাধিকার’ গ্রন্থে লিখেছেন Ñ
‘আমার ধর্ম ইসলাম, কোরানের একাধিক সুরায় জোরজুলুম, অপর ধর্মকে গালাগাল ও বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে সাবধান করে দেয়া হয়েছে।’
বিচারপতি হাবিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সকলের’ প্রবন্ধে লিখেছেনÑ
‘বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের কারণে দেশে দেশে পার্থক্য এবং যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বলতে হবে, ধর্ম যার যার রাষ্ট সকলের। রাষ্ট্র সকলের না হলে, যারা রাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করতে পারবে না তাদের আনুগত্যও রাষ্ট্র আশা করতে পারবে না।’
তাঁর এ বক্তব্য থেকেই এটা স্পষ্টই বুঝা যায় যে, রাষ্ট্রীয় মূল নীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে। যিনি সাম্প্রদায়িকতাকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করেছেন তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে থাকবেন সেটাই তো স্বাভাবিক।
বিচারপতি হাবিবুর রহমান রবীন্দ্রনাথ অনুরাগী ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল কাজ নিয়ে বহু গবেষণা করেছেন। তিনি সভ্যতার সংকট ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে লিখেছেনÑ
‘রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সাম্যন্য কিছু সম্পর্ক থাকলেও রবীন্দ্রনাথের প্রথম পরিচয়, তিনি কবি। সমাজের নানান সমস্যা সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেছেন এবং মনোগ্রাহী মন্তব্য রেখে গেছেন তাঁর বিভিন্ন লেখায়। তাঁর বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা ও সমসাময়িকতা আজও আমাদের আকৃষ্ট করে, আমরা অভিভুত হই। ছাত্রদের ভালো-মন্দ আত্মোৎসর্গ ও উচ্ছৃঙ্খলতা ইত্যাদি বিবিধ বিষয় সম্পর্কে কবি যে কথা বলে গেছেন তা এখনও আমাদের কিছু পথের হদিস দিতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী থেকে আইনি বিষয়ে তাঁর জ্ঞান সম্পর্কে জেনে বিচারপতি হাবিবুর রহমান অভিভুত হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি রবীন্দ্র-রচনায় আইনি ভাবনা’ গ্রন্থে লিখেছেনÑ
‘রবীন্দ্রনাথের লেখায় আইনি কথার বিস্তার ও তাৎপর্য এমন সাবলীলভাবে এসেছে যে তা আমাকে বিস্মিত করেছে। বছর পনেরো আগে মনে মনে এই বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের মুসাবিদা করি। অবসর নেওয়ার পর অবরে-সবরে কিছু কিছু বিষয় নির্দিষ্ট করে লেখা শুরু করি। বিভিন্ন রচনায় আইন প্রসঙ্গে কবি যে-সব মন্তব্য করেন তার মধ্যে এবং যে-সব উক্তি আমার কাছে আকর্ষণীয় ও ভাবব্যঞ্জনাময় মনে হয়েছে তাই নিয়ে এই গ্রন্থনা। আমি রবীন্দ্র-রচনা থেকে কোনো আইনি তত্ত্ব উদ্ধার বা আবিষ্কার করার প্রয়াস পায়নি। রবীন্দ্রনাথ আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা যেমন জানতেন, তেমনি জানতেন এর ব্যবহার, অপব্যবহার ও অসম্পূর্ণতা এবং অকার্যকরতার কথা। সহজ কথায় তাঁর রচনায় আইনি ভাবনার যে আকস্মিকতা ও অভাবনীয়তা লক্ষ করা যায় তা আমার কাছে বড়ই আনন্দদায়ক মনে হয়েছে।’
বিচারপতি হাবিবুর রহমান একবিংশ শতকের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি সভ্যতাতার সংকট ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে লিখেছেনÑ
আমাদের দেশে, নজরুল-সুকান্তের বাণী বহু তরুণকে অনুপ্রাণিত করে। বায়ান্নো, ঊনসত্তর ও একাত্তরের আন্দোলনে রাজনীতিকদের তুলনায় ছাত্ররাই অগ্রণী ও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। স্বাধীনতার পর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সেই ছাত্ররাই এগিয়ে আসে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গত তিন দশকে ছাত্রদের নৈতিকতায় একটা বড় ধরনের ধস নেমেছে। বহু ছাত্র এবং বেশ কিছু শিক্ষক ছাত্রের হাতে নিহত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রের হাতে আজ জব্দ। রাজনীতিকরা ছাত্রদের প্রতি এত নির্ভরশীল যে অছাত্রকেও ছাত্র প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে অধিষ্ঠিত করতে তাঁদের কোনো সংকোচ নেই। ছাত্রদের কাছে রাজনীতি আজ বেশ একটা লাভজনক বৃত্তি। যে তালবে-এলিম ছাত্রদের জন্য আমাদের দেশে এক সময় সাধারণ গৃহস্থ পরিবারেও জায়গির থাকার জন্য দরজা উন্মুক্ত থাকত আজ সেই ছাত্র নামে ঠিকাদার, টিকেট কালেক্টর, বাস কন্ডাক্টর থেকে চায়ের সামান্য দোকানদার পর্যন্ত সকলে চাঁদার দাবিতে এবং অথবা মারের ভয়ে সন্ত্রস্ত।’
কবি নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তাঁর কবিতা আমাদের দেশের সমর-সঙ্গীত। তাঁকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমান তাঁর ‘উন্নত মম শির’ গ্রন্থে লিখেছেনÑ
‘দক্ষিণ এশিয়ায় নজরুলই প্রথম সাহিত্যিক, যিনি দ্বিধাহীনকণ্ঠে স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন এবং ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রকাশ্য ডাক দিয়েছিলেন। ইংরেজ সরকার তাঁর সাত সাতখানা গ্রন্থ বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, প্রলয়শিখা, চন্দ্রবিন্দু, যুগবাণী, দুর্দিনের যাত্রী ও রুদ্রমঙ্গল বাজেয়াফ্ত করে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।’
জাতীয় পর্যায়ে কবির ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেনÑ
‘একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, অনুবাদক, ভাষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, আজ যে স্কুল পালানো ছেলেটার ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করছি তা আমাদের হৃদয় হতে উৎসারিত। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান সকল দেশপ্রেমিককে উৎসাহ যুগিয়েছে। আমরা তাঁর কাছে আমাদের সমর-সঙ্গীতের জন্য ঋণী। তিনি আমাদের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। আমরা তাঁকে জাতীয় কবি হিসাবে অভিহিত করে ধন্য হয়েছি। ধন্য কাজী নজরুল ইসলামের নাম।’
মানুষ দিন দিন সর্বদা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। কিন্তু প্রকৃত মানুষ এটা করতে পারে না। মানুষকে নিজের কথা যেমন ভাবতে হয়, তেমনি সমাজ ও দেশ নিয়েও ভাবতে হয়। সমাজ ও দেশের জন্য নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করা প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে বিচারপতি হাবিবুর রহমান তাঁর ‘নাগরিকদের জানা ভালো’ গ্রন্থে লিখেছেন Ñ
‘নাগরিক হিসেবে আমাদের যেমন কিছু অধিকার আছে, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজ, এমনকি পরস্পরের প্রতি কর্তব্যও আছে। এই অধিকার ও কর্তব্য সমন্ধে সচেতনতা উন্নত সমাজের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট। এমনিতে একজন নাগরিক তাঁর পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সময় বিক্ষিপ্তভাবে নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্বন্ধে ধারণা বা জ্ঞান লাভ করেন। তবে তা অনেক সময় নাগরিকের মনে স্থিতি পায় না। আমাদের বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্বে অবহেলার শাস্তির বিধানাবলি উল্লেখিত আছে দণ্ডবিধিতে।’ (চলবে)