বিতর্ক যুদ্ধে চ্যাম্পিয়ন পিএন স্কুল

আপডেট: আগস্ট ১১, ২০১৮, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


বিতর্ক প্রতিযোগীতায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের, বিশিষ্ট সমাজসেবী শাহীন আক্তার রেণীসহ অতিথিবৃন্দ-সোনার দেশ

ঘড়ির কাটায় তখন সকাল নয়টা। সোনালী রোদে ঝলমলে আকাশ। একঝাঁক নবীন উদীয়মান বিতার্কিক রাজশাহী কলেজের আঙ্গিনায়। তাদের ঝলমলে আলোয় যেনো মেঘের নিচে হারাতে থাকে সূর্য। দিন শেষে মাত্র এক পয়েন্টে নির্ধারণ হয় বিভাগের চ্যাম্পিয়ন দল। শুক্রবার সকালে রাজশাহী বিভাগের সাত জেলার চ্যাম্পিয়নরা অংশ নেয় বিতর্ক যুদ্ধে। একে একে ছয় জেলাকে পেছনে ফেলে নিজেদের সেরা প্রমাণ করে রাজশাহী সরকারি পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। মাত্র এক পয়েন্ট কম পেয়ে রানার্সআপ হয় নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’ স্লোগানে বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন ও সমকালের আয়োজনে এই বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদের। সমকাল সুহৃদ সমাবেশের রাজশাহী কলেজ শাখার সভাপতি ও রাজশাহী কলেজ অধ্যক্ষ হবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সমাজসেবী শাহীন আক্তার রেনী, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারি কমিশনার সুশান্ত সাহা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ সুহৃদ সমাবেশের যুগ্ম সম্পাদক সাকিলা আক্তারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমকালের রাজশাহী ব্যুরো প্রধান সৌরভ হাবিব।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদের বলেন, ‘বিতর্ক মানে তর্ক নয় যুক্তি। যুক্তি শুধুমাত্র বিতর্ক করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে এমন নয়। বিতর্ক করার মাধ্যমে একজন বক্তার বাচন ভঙ্গি সম্পের্ক ধারণা পাওয়া যায়। বিতর্কের ক্ষেত্রে শব্দ চয়ন একটি বড় বিষয়। একজন বক্তা বিতর্ক প্রতিযোগিতার নিয়মাবলি সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা তথ্য প্রযুক্তির যুগে বসবাস করি বলে শুধুমাত্র বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দিবো এমন নয়। আমাদের যে একটা ইতিহাস আছে সে সম্পের্কেও জানতে হবে। কেননা একসময় শিক্ষার্থীরাই দেশকে নেতৃত্ব দিবে। তাদের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে ডিজিটাল বাংলাদেশ। যুক্তি তর্কের জ্ঞান দিয়ে তোমাদেরই বিশ্ব জয় করতে হবে। তাই তোমাদের দিকে তাকাইয়ে আছে দেশ। তোমরা সবাই শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাও। কিন্তু শুধু তা হলেই চলবে না, একজন ভাল মানুষও হতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা দেয়ার জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করি। বিতর্ক প্রতিযোগিতা জ্ঞান অর্জনের অন্যতম একটি মাধ্যম। যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, মননশীলতা, বাচনভঙ্গি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে সমকাল যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষার্থীদের বিতর্কে উৎসাহিত করার জন্য সমকাল দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি সমাজসেবী শাহীন আক্তার রেইনী বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন। এই দেশের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় চার নেতা আত্মাহুতি দিয়েছেন। তারা একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলেন। তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নতুন শিশুদের নেতৃত্ব দেবে। আজকের বিতার্কিকরাই আগামী দিনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখতে গিয়ে সমকালের রাজশাহী ব্যুরো প্রধান সৌরভ হাবিব অসুস্থ সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের রোগমুক্তির জন্য সবার কাছে দোয়া চান। বিতর্কের ফাইনাল রাউন্ডে নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রাজশাহীর সরকারি পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। সরকারি পিএন বালিকা বিদ্যালয় ৩১৪ পয়েন্ট পেয়ে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন এবং নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৩১৩ পয়েন্ট পেয়ে রানার্স আপ হয়। ফাইনালে বিতর্কের বিষয় নির্ধারিত ছিলো ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথার্থ ব্যবহার বাংলাদেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।’ রাজশাহী সরকারি পিএন উচ্চ বিদ্যালয় বিষয়টির পক্ষে অবস্থান নেয়। সেরা বক্তা নির্বাচিত হয়েছেন বিজয়ী দলের দলনেতা ফাইরুজ চৌধুরী ওয়েভ। ফাইনাল রাউন্ডের মডারেটর ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আজম শান্তনু। এর আগে দুই পর্বে সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেমিফাইনালে পিএন সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে পরাজিত হয় নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বিষয় ছিলো ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ধনী-দরিদ্র বৈষম্য বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।’ এই বিষয়ের ওপর পক্ষে বিতর্ক করে পিএন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও বিপক্ষে নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এতে বিজয়ী হয় পিএন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। সেরা বক্তা হয় বিপক্ষ দলনেতা মুহতাদী ফারজানা। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে পরাজিত করে নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এতে বিজয়ী হয় নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সেরা বক্তা নির্বাচিত হন বিপক্ষ দলের দলনেতা জেরিন। এই পর্বে তাদের বিষয় ছিলো ‘প্রযুক্তি নির্ভরতা আমাদের মানবিক মূল্যবোধ হ্রাস করছে।’ প্রথম রাউন্ড হয় তিনটি ভাগে। এতে রাজশাাহী পিএন উচ্চ বিদ্যালয় সিরাজগঞ্জের সবুজ কানন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে পরাজিত করে। বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরাজিত করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়কে। পাবনা জেলা স্কুলকে পরাজিত করে নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। তবে বিভাগের আট জেলার চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে শুধু জয়পুরহাট জেলা বিতর্কে অংশ নেয়নি। একারণে তাদের প্রতিপক্ষ নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সেমিফাইনালে উঠে যায়। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আজম শান্তনু প্রধান অতিথি ছিলেন। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হাতের কাছে পেয়েছি, তবে এগুলোর যথাযথ ব্যবহার আমরা করি না। প্রযুক্তি যদি আইন সিদ্ধ না হয় ও নৈতিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা না হয় তাহলে প্রযুক্তি দিয়ে লাভ নাই। কেননা এতে হিতে বিপরীত হয়ে যায়। তাই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এজন্য দরকার হবে যোগ্য নেতৃত্ব যা তোমাদের মতো তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে। তোমাদের মেধাকে আরো সৃজনশীল করার জন্যই এই ধরণের বিতর্ক প্রতিযোগিতা। এই তরুণ বির্তাকিকদের মধ্যে সমৃদ্ধির বাংলাদেশ দেখতে পাই।’ এধরণের আয়োজন করার জন্য তিনি সমকালকে ধন্যবাদ দেন।
বিতর্ক প্রতিযোগীতার বিভিন্ন পর্বে বিচারক হিসেবে আরো ছিলেন রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদের সহসভাপতি মনিরা রহমান মিঠি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম কনক, সাকিলা আক্তার, তানজিমা জিনাত, আব্দুল হালিম, সোহরাব হোসেন, আব্দুল বারী, রাসিবুল ইসলাম নাহিদ, আব্দুল কুদ্দুস, শামসুজ্জামান, মাসুদ রানা। সুহৃদদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মনু মোহন বাপ্পা, ফাহমিদা আফরোজ, মিফতাহুল জান্নাত রিফাত, ফাতিমা আহমদ, এম জেড মম প্রমূখ।