বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিশেষ আইনে প্রকল্পের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহে বিশেষ আইন করা হয় ২০১০ সালে। উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তিনবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আইনটির। এর আওতায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নতুন নতুন প্রকল্পও। অনেক বড় প্রকল্পও রয়েছে এর মধ্যে। এসব প্রকল্পের অধিকাংশই নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হয়নি। এতে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়। তার পরও বিশেষ আইনে প্রকল্প অনুমোদন পাচ্ছে। ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে বিশেষ এ আইনের অধীনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রকল্পের সংখ্যা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০ সালের ২ অক্টোবর জাতীয় সংসদে দুই বছরের জন্য পাস হয়। ওই বছরের ১২ অক্টোবর এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আইনটি সংশোধন করে আরো দুই বছর বাড়ানো হয়। এরপর ২০১৪ সালে দ্বিতীয় দফায় আরো চার বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। চলতি বছর এর মেয়াদ আরো তিন বছর বাড়িয়ে জাতীয় সংসদে বিল পাস করা হয়। অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত এ আইনের আওতায় যেকোনো প্রকল্প বরাদ্দ দিতে পারবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ।
আইনে বলা হয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাক না কেন, এ আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে। এ আইনের অধীন কৃত বা কৃত বলে বিবেচিত কোনো কাজ, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, বিশেষ আইনের আওতায় গত নয় বছরে নতুন ৯৬টি ছোট-বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা সম্ভব হয়েছে। ২০০৯ সালে দেশে ২৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৩টিতে। কয়লাভিত্তিক ২০টিসহ ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক আরো অর্ধশতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। আইনটির আওতায় দীর্ঘমেয়াদি কয়লাভিত্তিক কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, অল্প সময়ের কাজের জন্য বিশেষ আইন ঠিক আছে। কিন্তু যে প্রকল্পটা তিন থেকে পাঁচ বছরের, সেটার জন্য কেন উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে না? বিশেষ আইন আছে বলে সব প্রকল্প দায়মুক্তি পদ্ধতিতে কেন করতে হবে?
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়াই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে নতুন এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত বছরের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক তিনটি কেন্দ্রের সঙ্গে বাস্তবায়ন ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। মোট ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩০০ মেগাওয়াটই আসবে কুইক রেন্টাল থেকে। তিনটি কেন্দ্রের মধ্যে দুটি স্থাপন করবে বাংলাট্র্যাক ও একটি অ্যাকর্ন গ্রুপ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাট্র্যাকের বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির একটি স্থাপিত হবে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে, অন্যটি যশোরের নওয়াপাড়ায়। ২০০ ও ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র দুটি থেকে বিপিডিবি বিদ্যুৎ কিনবে প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক ৪১ সেন্ট বা ১৯ টাকা ৯৯ পয়সায়।
গত বছরের আগস্টে অনুমোদন দেয়া হয় ডিজেলভিত্তিক আরো দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুটি কেন্দ্রই পাঁচ বছর মেয়াদি। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে হাই স্পিড ডিজেলভিত্তিক (এইচএসডি) ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন পেয়েছে এপিআর এনার্জি। কেন্দ্রটির উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য হবে প্রতি ইউনিট ১৯ টাকা ৯৯ পয়সা। কেরানীগঞ্জে এইচএসডিভিত্তিক মোট ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে অ্যাগ্রেকো ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস। এ কেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৯ টাকা ৬৭ পয়সায় কিনবে বিপিডিবি।
ডিজেলের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও গত বছর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর একটি অ্যাকর্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিস লিমিটেডের ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। চট্টগ্রামের জুলদায় এ কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ২৬ পয়সায় কেনার চুক্তি করেছে বিপিডিবি। ১৫ বছর মেয়াদি কেন্দ্রটির চলতি বছরের মে মাসে উৎপাদনে আসার কথা ছিল।
বিশেষ আইনে গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিককে (জিই) কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজিভিত্তিক মোট ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি ইউনিট তথা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ দেয়া হয়েছে। তিন বছরের সময়সীমা নিয়ে জিইর সঙ্গে এ চুক্তি করেছে বিপিডিবি। সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সৈয়দপুরে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সির (ইসিএ) মাধ্যমে নীলফামারীর সৈয়দপুরে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এইচএসডিভিত্তিক সিম্পল সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে বিপিডিবি। এটি নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে চীনের ডংফেং ইলেকট্রিক করপোরেশন।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানি বিভাগেও বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে বিশেষ আইনে। এর মধ্যে গত বছর গভীর সমুদ্রের ১২ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য কোরীয় কোম্পানি পোসকো দাইয়ু করপোরেশনের সঙ্গে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) অনুস্বাক্ষর করে পেট্রোবাংলা। এ কোম্পানিকে অনুসন্ধানের জন্য পাঁচ বছর সময় দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২০১২ সালের এপ্রিলে রুশ কোম্পানি গ্যাজপ্রমকে বিশেষ আইনের মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয় ১০টি গ্যাসকূপ।
গ্যাস সংকট সমাধানে ২০১০ সালে বিশেষ আইনের আওতায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০১২ সালেই আসার কথা ছিল এলএনজি। পরে ২০১৬ সালে সমুদ্রে ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণে আমেরিকার প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জিকে দুই বছরের সময় দিয়ে নতুন করে চুক্তি হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করে দেশের সঞ্চালন গ্রিডে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা প্রায় চার মাস পিছিয়ে গত ১৮ আগস্ট থেকে যোগ হয়।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, বিশেষ আইনে বড় যেসব প্রকল্প দেয়া হয়েছে, সেগুলো যৌথ মালিকানার, যেখানে মূল্য নির্ধারণ করা আছে সেগুলোয় বিশেষ আইন ছাড়া দেয়া সম্ভবও ছিল না। পাবলিক সেক্টরে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র দেয়া হয়েছে, সেগুলোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। তবে সব যে নির্ধারিত সময়ে শতভাগ বাস্তবায়ন হবে, তা নয়। প্রাইভেট সেক্টরে যেগুলো নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে আসতে পারছে না, সেগুলোর জন্য আমরা ওভারপ্ল্যানিং করছি।