বিভক্ত বাংলা : খণ্ডিত ঈদ

আপডেট: জুন ৪, ২০১৯, ১:১৪ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


‘হাঁরঘে বাড়ি নবগঞ্জ’। কী অবলীলায় আমরা একদা আত্মপরিচয় ঘোষণা করেছি। ধীরে ধীরে পঞ্চাশ/ষাট বছরে পরিচয়ের এই সহজ বোধটি জটিল হতে থাকে। কে জানে, ভাষা প্রবাহের তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে? না কি আমরা দিন দিন অতি অভিজাত হয়ে উঠছি, সে কারণে!
পাকিস্তানি শাসন শুরু হলে ভিন্ন সংস্কৃতির জজবায় বলা শুরু করলাম নওয়াবগঞ্জ ইংরেজি বানানে এখনো লেখা হয়। কিছুদিন বলার পর নবাবগঞ্জ বলা হলো। আদিতে নবাবগঞ্জই ছিলো- একটি ছোট্ট ফাঁড়ি থানা। এতে আমাদের মন ভরলো না। যুক্তি দেখালাম, ঢাকা এবং দিনাজপুরেও নবাবগঞ্জ নামের স্থান আছে। তাই পরিবর্তন চাই। নওগাঁ নামের জনবসতি ভিন্ন উচ্চারণে ভারতেও আছে। তাই বলে তো কেউ তার সংস্কারে নামেনি।
দিন দিন অতিসংক্ষেপে মানুষ আত্মপরিচয়ের বর্ণনা দিচ্ছে। আমরা সেদিকে না গিয়ে নবাবগঞ্জ না বলে নামের পরিধি বাড়িয়ে নামকরণ করলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ। নবাবগঞ্জ রেলস্টেশন এবং পোস্ট অফিসের নাম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। শহরের অদূরে চাঁপাই নামের একটি প্রাচীন জনপদ এখনো বিদ্যমান। যেখানে নবাবী শাসন আমলের একটি মসজিদও আছে।
যাই হোক, আমরা সেই নবগঞ্জের ৬০/৭০ বছর আগের মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন-সংস্কৃতির প্রধান উৎসব ঈদের সন্ধান করবো। যদিও তখন ঈদ পার্বণে উৎসবের ছোঁয়া লাগেনি। আর পাঁচটি দিনের মতো সাদা-মাঠা হলেও ব্যতিক্রমি হিসেবে দিনটি অনায়াসেই চেনা যেত।
শৈশব-কৈশোরের সন্ধিক্ষণ পার হইনি। দেশভাগ হয়ে গেল। নবাবগঞ্জ থানা শহর হিন্দু প্রধান হওয়ায় শহুরে ঈদ আমরা দেখিনি। আমাদের বাড়ি শহর সংলগ্ন পোল্লাডাংগা, মূল বাজার থেকে কয়েকটি ছোট ছোট আম বাগানের দূরত্বে। ফলে আমরা না শহরের না গ্রামের। তবুও গ্রাম্য সংস্কৃতিতে আমরা লালিত।
আমার আব্বা, দুই ফুফু রেখে একেবারে তরুণ বয়সে আমার দাদা মকসুদ আলী বিশ্বাস মারা যান। আমার দাদির বয়স পঁচিশের কোঠা পার হয়নি। বহু কষ্টে, তবে সযতেœ সন্তানদের লালন করেছিলেন তিনি। আমার আব্বাকে ১৯১৪ সালে সদ্যপ্রতিষ্ঠিত পোল্লাডাংগা মাইনর স্কুল নামে কথিত বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। তারপর সংসারি করার প্রাণান্ত চেষ্টা চালান। দেশভাগের কথা আমার স্মরণে আছে। আমার দাদী সুস্থভাবে বেঁচেছিলেন। তখনকার দিনের আড়ম্বরহীন ঈদ দেখেছি; কিন্তু উপভোগ করার মতো তেমন উপযোগ আমাদের ছিলো না। দেখেছি কেবল সংক্ষিপ্ত আয়োজন।
নবগঞ্জ ছোট্ট শহরে হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় সেখানে কোনো ঈদগাহ ছিলো না। পোল্লাডাংগা বা শঙ্করবাটির ঈদগাহে শহরে বসবাসকারি প্রান্তিক মুসলমানগণ নামাজ পড়তে আসতেন। অনেকের জানা বর্তমানে শহরের প্রধান ইদগাহ দেশভাগের অব্যবহিত পরে তখনকার মহকুমা অফিসার আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের প্রবর্তনা। জায়গাটি ছিলো প্রভাবশালী এক হিন্দুর আমবাগান।
নবাবগঞ্জ শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমের অনেক মানুষ ধর্মাচারণের বিশ্বাসে আহলে হাদিস। বাকি সব হানাফি। এরা নিজ নিজ ঈদগাহে নামাজ আদায় করতেন। ছেলেবেলায় দেখেছি, পোল্লাডাংগার মিয়ার বাগানের ঈদগাহের ধারে-কাছের কয়েকটি পাড়া, এমনকি শহর প্রান্তের অনেকে জায়নামাজ হাতে নিয়ে সমবেত হতেন। সে দৃশ্য ছিলো আনন্দের। তবে উচ্ছ্বাসের নয়।
বৃটিশ পিরিয়ডের ঈদের দৃশ্য আমার স্মৃতিতে অস্পষ্ট চলচ্চিত্রের মতো হয়ে আছে, নতুন কাপড়-চোপড়ের সমাহার তখন ছিলো না বললেই চলে। পুরাতন কাপড় পরিষ্কার করে ব্যবহার করতেন অধিকাংশ প্রান্তিক মানুষ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেল স্টেশন সংক্ষেপে কোম্পানির ভাষায় ঈঘইঔ তার ব্যস্ততা হারায় দেশভাগের অভিশাপে। কর্মজীবী মানুষের দৈনিক কাঁচাপয়সার আয় কমে আসে। মোট বহনে ‘লইল্যা’ পাড়ার মানুষ-যার দাপুটে সর্দার ছিলেন পোড়া দফাদার এবং মালামাল বহনকারী পোল্লাডাংগার গোরুর গাড়ির মালিকরা কিছুটা সচ্ছলতা হারায়। লেখাপড়ার ব্যাপক প্রচলন না হওয়ায় আজাইপুর শঙ্করবাটির অধিকাংশ মানুষ কাঁসা-পিতলের কুটির-শিল্প থেকে প্রতিদিন যা রোজগার করতেন তা দিয়ে তারা বাবুয়ানা করেই চলতেন। গোরুর গাড়ির চাকা (স্থানীয় ভাষায় যার নাম ‘পাঁইহ্যা’) ও আনুষঙ্গিক তৈরির মিস্ত্রিরা টাকা পয়সার মুখ দেখতেন। সভ্যতার ক্রমবিকাশে তা বিলীয়মান। দেশভাগের অভিশাপে সব যেন হচপচ হয়ে গেল। সেই অভিশপ্ত সময়ে আমাদের ছেলেবেলার ঈদ ছিলো অনেকটা ¤্রয়িমাণ।
ঈদের কদিন আগে থেকে প্রস্তুতি পর্ব লক্ষ করা যেত নদী-খাল-বিল-পুকুরে মহিলাদের কাপড় কাচার ধুম। অধিকাংশ বসতবাড়ি খড়বাঁশ বা মাটির হওয়ায় ঘরদোর লেপেপুঁছে মা-বোনেরা দৃশ্যমান করে তুলতেন ঈদের দিনটি।
খাওয়া দাওয়ার রকমারি তখনো প্রান্তিক মানুষের গোচরে আসেনি। ভূস্বামীরা অনেকে পোলাও-কোর্মা-পায়েস খেতেন। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের সে সবের বিলাস মাথায় আসতো না। বড়জোর গুড়ের খির আর আন্ধাসা, বাড়িতে পালা মুরগি দিয়ে তাদের মহাভোজের আয়োজন হতো। আশ্চর্যের ব্যাপার এসব নিয়ে অদৃষ্টকে দোষারোপ করা ছাড়া ব্যাপক অভিযোগ করতো না।
আমরা বলছিলাম নতুন কাপড়চোপড়ের কথা। বিভাগ পূর্বকালে নবাবগঞ্জ অঞ্চলে কাপড়চোপড় সরবরাহ হতো কলকাতা থেকে। ধীরে ধীরে ‘তা বন্ধ হতে থাকে। এদিকে পূর্ববাংলার তেমন কাপড়ের কল গড়ে ওঠেনি। স্মাগলিং শুরু হয়। অসাধু কিছু মানুষ যারা অধিকাংশ ওপার থেকে আসা-এতে নেতৃত্ব দেয়। কারণ ওপারের পথঘাট তাদের চেনা ছিলো। এখন বেশিরভাগ নবাবগঞ্জ শহরবাসী বহিরাগত। যাইহোক সেই সমাজ পরিবর্তনের দিনগুলিতে আমাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে। আমরা ঈদের প্রকৃত আনন্দ থেকে মানবসৃষ্ট সংকটে বঞ্চিত হয়েছি।
যৌবনে এবং অদ্যাবধি সেই সংকট আমার পিছু ছাড়েনি। নবাবগঞ্জের পরিবর্তিত সামাজিক অবস্থার জন্য একদিন শেকড়চ্যুত হয়ে আসলেও জন্মস্থানের প্রতিটি ধূলিকণা আমার কাছে মধুময় হয় আছে। সেই মধুময় দিনগুলি আর ফিরে পাব না। নবাবগঞ্জে থাকতে আমার আত্মপরিচয়ের সংকট ছিলো। সবাই আমাকে চিনতো হাসু মুলবির ছেলে (শোমুদ্দীন মাওলানা) অথবা হোদার ভাই হিসেবে (প্রখ্যাত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাংবাদিক অধ্যাপক জিকেএম শামসুল হুদা)। রাজশাহীতে আধিকাংশ ছাত্রই আমাকে চেনে কবির স্যার বলে। অথচ আমার পিতৃদত্ত আসল নাম গোলাম কবির মুহ: নূরুল হুদা, লেখক হিসেবে সংক্ষিপ্ত নাম গোলাম কবির, ছদ্মনাম ইবনে হিশাম অনেকেই জানেন না। আর জানলেও বানানে ভুল করে। হোক ভুল, তবুও একদা আমি নবাবগঞ্জের মানুষ বলে যে গর্ব করতাম তা যেন এই ঈদকে সামনে রেখে অক্ষুণœ থাকে। যদিও দেশভাগ পরবর্তী বিষণœ স্মৃতিময় ঈদ আজও আমাকে ফিরে নিয়ে যায় সেই বিহ্বল দিনগুলির সেইসব দিন রাত্রি, যা ছিলো বিভক্ত বাংলার খ-িত ঈদ। আর যাই হোক, আজ বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষ ঈদের পূর্ণ আনন্দ উপভোগ করছে সাধ্যমত।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।