বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ ক্রিকেট যোদ্ধা

আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০১৯, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


৬ষ্ঠ বারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাবে বাংলাদেশ। ১৯৯৯ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলা বাংলাদেশ প্রতি বিশ্বকাপেই নতুন নতুন চমক দিয়েছে। সেই তুলনায় এবার দলে তেমন কোন চমকের আধিক্য নেই। তাসকিন-শফিউলকে পেছনে ফেলে আবু জায়েদ রাহীকে সুযোগ দেয়া হয়েছে এবারের বিশ্বকাপ দলে। দেখে নেয়া যাক বাংলাদেশের ১৫ ক্রিকেট যোদ্ধার পারফরম্যান্স কেমন।
মাশরাফি বিন মুর্তজা (অধিনায়ক) : ইনজুরির কারণে ২০১১ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলা হয়নি মাশরাফি বিন মুর্তজার। ২০০০ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর ওই একবারই বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। ২০১৫ সালের পর এবারো তার নেতৃত্বেই মাঠের লড়াইয়ে নামবে বাংলাদেশ। মাশরাফির নেতৃত্বে ২০১৫ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ওয়ানডে ফরম্যাটে উন্নতির শিখরে পৌঁছে বাংলাদেশ।
তেমন ধারায় মাশরাফির শেষ বিশ্বকাপটি স্মরনীয় হবে, এমন প্রত্যাশা ক্রিকেট ভক্ত সবার। বিশ্বকাপে নতুন বলে মাশরাফির শুরুটা ভালো হলেই ম্যাচে অনেকখানি এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। ৩৫ বছর বয়সী এই পেসার ২০৫টি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলেছেন। এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও কোন পেসার বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন না। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের হয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন তিনি।
সাকিব আল হাসান (সহঅধিনায়ক) : ২০১১ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে খেলেছিলেন। গত বিশ্বকাপের মতো এবারের বিশ্বকাপেও মাশরাফির ডেপুটি হিসেবে দেখা যাবে সাকিব আল হাসানকে। ২০০৬ সালে ওয়ানডে অভিষেকের পর বাংলাদেশের হয়ে একটি বিশ্বকাপও মিস করেননি। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডার বিশ্বের তামাম ক্রিকেট বোদ্ধাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন। যদিও ইনজুরির কারণে নিউজিল্যান্ড সিরিজ মিস করে খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। তবুও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বলেই তার ওপর ভরসা রাখতে দ্বিধা থাকার কথা নয় কারো। ১৯৫টি ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা সাকিব যে ব্যাট ও বল হাতে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ যোদ্ধা হবেন, এ নিয়ে বিতর্ক নেই কোনও।
তামিম ইকবাল : ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে নিজের অভিষেক বিশ্বকাপেই নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন তামিম। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যান তিনি। ২০০৭ সালের পর ২০১১ ও ২০১৫ বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা আছে বাংলাদেশের সেরা এই ওপেনারের। ইংল্যান্ডে সবশেষ খেলা কন্ডিশন জয় করে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ইংলিশদের বিপক্ষে ১২৮ রানের ইনিংসের ঠিক পরের ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলেছেন ৯৫ রানের ইনিংস। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ব্যাটিংয়ে দারুণ সূচনার জন্য তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশ।
সাব্বির রহমান : সাব্বির রহমানকে বিশ্বকাপ দলে রাখতে ৬ মাসের শাস্তি কমিয়ে নিউজিল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল। ৬/৭ নম্বরে থেকে স্কোরবোর্ডে দ্রুত রান তুলতে সাব্বিরকে বিশ্বকাপ দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাত্র কয়েকটি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০১৫ বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলেন তিনি।
ওই বিশ্বকাপে মাঝারি মানের বেশ কিছু ইনিংস খেলে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি লেগ স্পিন করেতে পারদর্শী সাব্বির বল হাতেও কিছু অবদান রাখতে পারবেন। শুধু ব্যাটিং কিংবা বোলিংয়েই নয় ফিল্ডিং বিবেচনায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ফিল্ডার হয়ে উঠতে পারেন তিনি।
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ : তিনি কখনওই বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটার নন। আর তারকা তিনি কখনও ছিলেনও না। তবে একটা ব্যাপার কোন সন্দেহ ছাড়াই বলে দেওয়া যায় যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে কার্যকর ক্রিকেটারদের একজন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। দলের প্রয়োজনে সব সময়ই তাকে ভূমিকা রাখতে দেখা যায়-সেটা ব্যাটিংয়ে হোক কিংবা বোলিংয়ে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব আছে কেবল মাহমুদউল্লাহর। ইংল্যান্ডের সঙ্গে ১০৩ রানের ইনিংসের পর হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আছে অপরাজিত ১২৮ রানের ইনিংস। যা তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে পেস নির্ভর একাদশে সাকিবের সঙ্গে মাহমুদউল্লাহর বোলিং জুটি নিশ্চিতভাবেই দলকে সহায়তা করবে।
মুশফিকুর রহিম (উইকেট রক্ষক) : উইকেটের পিছনে ওয়ানডে ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ব্যক্তিত্ব তিনি। ব্যাট হাতেও বাংলাদেশের নির্ভরতার প্রতীক। চাপের মাঝে ভেঙে পড়তে থাকা ব্যাটিংয়ের মধ্যে প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে যেতে জুড়ি নেই তার। ২০০৭ সালের পর অনুষ্ঠিত তিনটি বিশ্বকাপেই অপরিহার্য অংশ হয়ে দলে ছিলেন। ম্যাচ ফিনিশিংয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে তার মত আর ক্রিকেটার খুব কমই আছে। মিডল অর্ডারের ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে বেশি তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে টিম ম্যানেজমেন্ট।
রুবেল হোসেন : ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে রুবেলের জীবনের ওপর দিয়ে রীতিমত ঝড়ই গেছে। মামলায় মোকদ্দমায় জড়িয়ে জেল পর্যন্ত যেতে হয়েছে। তবে ২০১৫ বিশ্বকাপ সব সমস্যার বেড়াজাল ছিন্ন করে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছেন কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাডিলেডে রুবেলের করা ড্রিম ডেলিভারিই হারিয়ে দেয় ইংল্যান্ডকে। তাতে বাংলাদেশও সুযোগ পায় কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার। যার বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা আছে ২০১১ ও ২০১৫ সালে। মাশরাফি-মোস্তাফিজের পর তৃতীয় পেসার হিসেবে রুবেলই হচ্ছেন আস্থার প্রতীক।
মোহাম্মদ মিঠুন : প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েছেন মোহাম্মদ মিঠুন। ২৮ বছর বয়সী এই ডানহাতি ব্যাটসম্যানের সংগ্রামটা এতো সহজ ছিল না। ২০১৪ সালে অভিষেক হলেও থিতু হতে পারছিলেন না। তবে তিন বছর পর ২০১৮ সালে ফের জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
গত নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের অন্য ব্যাটসম্যানরা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলেও নিয়মিত রান করেছেন মিঠুন। মিডল অর্ডার কিংবা টপ অর্ডার যে কোন পজিশনেই খেলতে পারদর্শী তিনি। এছাড়া তাকে মুশফিকের বিকল্প উইকেটকিপার হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে মাশরাফির বাজির ঘোড়া মোহাম্মদ মিঠুন।
সৌম্য সরকার : গত অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে সৌম্যকে দলে নেয়ার কারণ ছিল ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তার মিডিয়াম পেস বোলিং। কিন্তু এবার তাকে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে নেওয়া। গত বিশ্বকাপে একটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বকাপ দলে তাকে সুযোগ দেওয়ায় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন নির্বাচকরা। এবারও ফর্মহীন সৌম্যকে বিশ্বকাপ দলে সুযোগ দিয়ে আবারও বিতর্কের জন্ম দিলেন তারা! অবশ্য ইংল্যান্ডের পেস ও বাউন্সি নির্ভর কন্ডিশনের কথা বিবেচনা করেই সৌম্যকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সৌম্যর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে- যে কোন পজিশনে খেলতে পারেন।

লিটন দাস : আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লিটন দাসের ব্যাট হাসা মানেই প্রতিপক্ষে বোলারদের নাভিশ্বাস ওঠা। কিন্তু কিছু দিন ধরে জ্বলে ওঠার আগে দপ করে নিভে যাচ্ছেন। তবে যেদিন নিজের খেলাটা খেলতে পারেন, সেদিন প্রতিপক্ষ বোলারদের কিছুই করার থাকে না। সর্বশেষ এশিয়া কাপেই আছে এর প্রমাণ। এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে ১২১ রানের ইনিংসটি দেখলেই লিটনের ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। বিশ্বকাপে কোন ম্যাচে যদি এমন ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা অনেকখানিই বেড়ে যাবে।
মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন : পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে বিশ্বকাপ দলে অটোমেটিক চয়েজ হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন সাইফউদ্দিন। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ব্যাট-বলে ধারাবাহিক পারফর্ম করা সাইফ নিউজিল্যান্ড সফরেও ছিলেন দারুণ ক্ষুরধার। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে তিনি কেমন করেই সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মেহেদী হাসান মিরাজ : ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকের পর থেকে বাংলাদেশ দলের নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছেন অফস্পিনিং অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে ইংল্যান্ডের মতো কন্ডিশনে মেহেদী হাসান মিরাজের একাদশে থাকা নিয়ে সন্দেহ আছে যথেষ্ট। তবু প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার রোমাঞ্চে হয়তো দারুণ কিছু করে দেখাবেন তিনি।
মোসাদ্দেক হোসেন : ব্যাট হাতে রান খরা যাচ্ছিলো মোসাদ্দেকের। তাই তাকে বাদ দিয়ে চমক হিসেবে ইয়াসির আলী রাব্বির নাম শোনা যাচ্ছিলো গত কয়েকদিন ধরে। হঠাৎ করে মোসাদ্দেক রানে ফেরায় এবং অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারি হওয়ায় বিশ্বকাপ স্কোয়াডে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকেই রেখেছেন নির্বাচকরা। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তার অফস্পিনিংও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে বলে বিশ্বাস টিম ম্যানেজমেন্টের। চলমান প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর জার্সিতে ১২ ম্যাচে এক সেঞ্চুরি ও ২ হাফসেঞ্চুরিতে তার রান ৪২৫।
মোস্তাফিজুর রহমান : অভিষেকে পর থেকেই বল হাতে একের পর এক কীর্তি গড়ে যাচ্ছেন মোস্তাফিজ। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর তার বোলিংয়েই ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে জিতেছে বাংলাদেশ। অবশ্য ইনজুরির কারণে বোলিংয়ের সেই ধারটা আর নেই মোস্তাফিজের। তারপরও বিশ্বকাপে মাশরাফির প্রধান অস্ত্র হিসেবে মোস্তাফিজকেই দেখা যাবে।
আবু জায়েদ রাহী : ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা না থেকেও বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেয়েছেন আবু জায়েদ রাহী। পেস নির্ভর উইকেটে আউটসুইং করার সামর্থ্য আছে তার। আর এই সামর্থ্যই তাকে বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাঁচটি টেস্ট ছাড়া তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলার অভিজ্ঞতা আছে রাহীর। যদিও লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট দীর্ঘদিন ধরে খেলছেন। চলমান প্রিমিয়ার লিগে তার বোলিংয়ে আছে দুর্দান্ত প্রতাপ। প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে ৯ ম্যাচে ১২ উইকেট নিয়ে ভালোই বোলিং করছেন। হয়তো বিশ্বমঞ্চেই নিজেকে নতুন করে চেনাবেন সিলেট থেকে উঠে আসা ডানহাতি এই পেসার।-বাংলা ট্রিবিউন