বিশ্ব কাঁপানো ইউটিউবারের গল্প

আপডেট: আগস্ট ২৯, ২০১৯, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ইউটিউবার কে? সবাই এক শব্দে উত্তর দেবে ‘পিউডাইপাই’। সম্প্রতি ইউটিউবে তার সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১০০ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে! ইউটিউবের ইতিহাসে সর্বপ্রথম একক ব্যক্তি হিসেবে তিনি এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তবে তার এই বিশাল সাফল্য ‘পিউডাইপাই’ ফ্যানবেজের বাইরের লোকদের এখনো বিভ্রান্ত করে।
নিয়মিত পত্রিকার হেডলাইনের শিরোনাম হওয়া এই বিশ্ববিখ্যাত ইউটিউবার বিভিন্ন সময়ে নানান বিতর্কে জড়িয়েছেন। ইহুদিবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদের মতো ঘোরতর অভিযোগও উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। তবে গত মার্চ মাসে নিউজিল্যাল্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলাকারী উগ্রপন্থি তার নাম নেওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমালোচনায় আসেন তিনি। ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলাকারী ব্রেন্টন টারান্ট হত্যাকা-ের উদ্দেশ্যে গুলি শুরু করার আগে ‘সাবস্ক্রাইব টু পিউডাইপাই’ অর্থাৎ ‘পিউডাইপাই সাবস্ক্রাইব করুন’ বলে জোরে চিৎকার করেছিল।
‘পিউডাইপাই’ আসলে কে এবং তিনি কি করেন? : ইউটিউবে ‘পিউডাইপাই’ হিসেবে পরিচিত মানুষটির আসল নাম ফিলিক্স কেইলবার্গ। তিনি সুইডেনের নাগরিক। ২৯ বছর বয়সী এই তরুণ ‘পিউডাইপাই’ ছদ্মনামে ইউটিউব চ্যানেল চালান। ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া তার এই অদ্ভুত নামটির ব্যাখ্যা করেছেন তিনি এভাবে- একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দুক থেকে গুলি বের হলে যে শব্দ হয় তা শুনতে অনেকটা এরকম ‘পিউ’, তারপর পৃথিবী মরে যায় মানে ‘ডাই’ এবং সবশেষে ভালো বুঝাতে ব্যবহার করেছেন ‘পাই’।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশুনা একেবারেই বাদ দিয়ে ২৯ এপ্রিল, ২০১০ সালে তিনি ইউটিউবে গেমিং চ্যানেল খুলেন এবং ভিডিও গেম খেলে তা আপলোড দেয়া শুরু করেন। সন্তানের এমন সিদ্ধান্তে তার কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ বাবা-মা তার উপর অনেক বিরক্ত ছিলেন।
সত্যি কথা বলতে কেইলবার্গ অল্পসময়েই ইউটিউবার হিসেবে একজন সফল ব্যক্তি হয়ে গিয়েছিলেন এবং অনেক টাকাও কামিয়েছেন। ইউটিউবে তিনি মূলত বিভিন্ন ভিডিও গেমস খেলে তা রেকর্ড করে আপলোড করতেন, অন্যদের গেইমপ্লে নিয়ে মজার মজার সব রিঅ্যাকশন ভিডিও তৈরি করতেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ক্যাজুয়াল কন্টেন্ট, কমেন্ট্রি এবং ব্যাঙ্গ করেও অনেক ভিডিও তৈরি করতেন। উল্লেখ্য যে, শুরুর দিকে অনেক ছোটোখাটো গেমস কোম্পানির বানানো গেমস খেলে সেসব ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করেও তিনি প্রচুর টাকা আয় করেছেন।
২০১৩ সালের আগস্ট মাসে তিনি ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি সাবস্ক্রাইব হওয়া ব্যক্তি ছিলেন এবং ২০১০ সালে ইউটিউবের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ব্যক্তি হয়ে যান যার ভিডিও ১০ বিলিয়নবার দেখা হয়েছে। সবশেষ ২০১৯ সালে সর্বপ্রথম ইউটিউবে তার চ্যানেল ১০০ মিলিয়ন মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
কেইলবার্গের সব উদ্ভট ভিডিও কন্টেন্টের ভিড়ে তার একটি কথা এখনও সত্য হয়েই আছে। আর তা হলো- ‘আমার সাধারণ হাতে অনলাইন স্টাইল আমোদপ্রমোদ এবং আপত্তিকরের মধ্যকার রেখাটি ঝাপসা করে দেয়।’
কেইলবার্গ একজন মজার এবং মনোমুগ্ধকর মানুষ। তিনি জানেন কখন কিভাবে নিজেকে গড়তে হয়। তিনি গেমিংকে উপভোগ্য বিনোদন হিসেবে অন্যতম এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। সাউথ পার্কের নির্মাতা ট্রে পার্কার ২০১৪ সালে তার একটি কার্টুনের গল্পে তাকে ফিচার করে লিখেছিলেন- ‘সময়, ২০১৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির মধ্যে একজন ইউটিউবারকে বরণ করে নিয়েছে।’
১০০ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার থাকার মানে আসলে কী? : সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যায় ‘পিউডাইপাই’ পৃথিবীর সব বাঘা বাঘা সেলিব্রিটিকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ইউটিউবে জাস্টিন বিবার (৪৬ মিলিয়ন), এড শেরেন (৪১ মিলিয়ন) এবং আরিয়ানা গ্রান্ডের (৩৭ মিলিয়ন) মতো বিশ্ববিখ্যাত সেলিব্রিটিদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা তার অর্ধেকেরও কম।
সাবস্ক্রাইবার যেখানে আছে, সেখানে তো ডলারের ছড়াছড়ি থাকবেই। বিশ্ববিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, ইউটিউব থেকে কেইলবার্গের গতবছরের মোট আয় ছিল ১৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া স্পনসর্ড ভিডিওর বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে পেয়েছেন আরো প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মার্কিন ডলার। ফোর্বস ম্যাগাজিনে আরো উল্লেখ করা হয়, তার ভিডিও প্রতি ১ হাজার দর্শক দেখলে তিনি আয় করেন প্রায় ৫ মার্কিন ডলার।
কার জন্য তার কাজ? : কেইলবার্গের বেশিরভাগ দর্শকই তরুণ প্রজন্মের। ‘পিউডাইপাই’ চ্যানেল বিশ্লেষণ করে পাওয়া তথ্যমতে, দর্শকদের ৪৪ শতাংশই ১৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী এবং ২৮ শতাংশ ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী। তার দর্শকদের মাত্র ১ শতাংশ ৫৫ বা তার বেশি বয়সের। অর্থাৎ তিনি মূলত তরুণ প্রজন্মের জন্যই কন্টেন্ট তৈরি করেন।
অন্যান্য বাবা-মায়েদের মতো কেইলবার্গের নিজের মাও তার ছেলের ভিডিওগুলোর প্রতি খুব একটা আগ্রহ দেখান না। ‘আমি আমার ছেলের চ্যানেলে যাই, ভিডিওগুলো দেখি, কমেন্ট পড়ি কিন্তু হাস্যরসাত্মক তেমন কিছুই চোখে পড়ে না আমার।’- ২০১২ সালে এক সুইডিশ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেছিলেন।
কিভাবে তিনি ১০০ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার পেলেন? : শীর্ষ ইউটিউবার হওয়া স্বত্ত্বেও ‘পিউডাইপাই’ ২০১৮ সালের শেষের দিকে ভারতীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এবং মিউজিক কোম্পানি ‘টি-সিরিজ’ এর বিপরীতে একটা প্রচারণা চালায়। এই প্রচারণার শিরোনাম ছিল এরকম ‘সাবস্ক্রাইব টু পিউডাইপাই’।
২০১০ সাল থেকে ইউটিউবে আসার পর থেকে ‘টি-সিরিজ’ নিয়মিত কন্টেন্ট আপলোড করা শুরু করে এবং খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। খুব দ্রুত সাবস্ক্রাইবার বাড়তে থাকায় ইউটিউবে ‘টি-সিরিজ’ এবং ‘পিউডাইপাই’ এর মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে যায়। এদিকে ইউটিউবের টপ পজিশনকে কর্পোরেটমুক্ত রাখতে তার নেতৃত্বে আরো অনেক ইউটিবার ‘সাবস্ক্রাইব টু পিউডাইপাই’ প্রচারণা শুরু করে। ‘টি-সিরিজ’ কে হেয় করে একটি র‌্যাপ গানও প্রকাশ করা হয়।
‘সাবস্ক্রাইব টু পিউডাইপাই’ প্রচারণাটি খুব দ্রুতই বিশ্রী রূপ ধারণ করে। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক, ম্যালওয়্যার অ্যাটাক ইত্যাদি অভিযোগ উঠতে শুরু করায় কেইলবার্গ তার সমর্থক এবং ভিউয়ারদের ব্যাপারটি এখানেই থামিয়ে দিতে বলেন। কিন্তু ততক্ষণে তার অসংখ্য সাবস্ক্রাইবার বেড়ে গিয়েছিল। ২০১৮ সালে ওই প্রচারণা চলাকালীন কয়েকমাসে ‘পিউডাইপাই’ যে পরিমাণ সাবস্ক্রাইবার পেয়েছিল গোটা ২০১৭ সালেও সে পরিমাণ নতুন সাবস্ক্রাইবার পায়নি সে।
‘পিউডাইপাই’ চ্যানেলের নামে বিভিন্ন নেতিবাচক আলোচনা-সমালোচনার জন্য গত কয়েকমাস ধরে তিনি তার কন্টেন্টের বিষয়বস্তুর উপর উদার হয়েছেন। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি মাইনক্রাফট গেমপ্লে নিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করছেন, যা তাকে শুরু দিকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। এতে ‘পিউডাইপাই’ শিকড়ে ফিরেছে বলেও অনেকে মন্তব্য করেছে।
গত সপ্তাহে যখন ‘পিউডাইপাই’ দীর্ঘদিনের প্রেমিকা মারজিয়া বিসগনিনের সঙ্গে তার বিয়ের একটি ভিডিও পোস্ট করে, ইউটিউব তখন তাকে ১০০ মিলিয়ন ল্যান্ডমার্ক ছোঁয়ার জন্য অভিবাদন জানায়। এর প্রতিক্রিয়ায় গতকাল ২৭ আগস্ট তিনি নিজের স্টাইলে তার ফলোয়ারদের জানান, ‘আমরা এটি করেছি, কি অবাস্তব এক কৃতিত্ব! আমি নিজেকে যোগ্য মনে করছি না কিন্তু আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। কথা দিচ্ছি হানিমুন থেকে ফিরে এসেই লাইভস্ট্রিম করব।’ তথ্যসূত্র : দ্য সানডে মর্নিং হেরাল্ড