বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস আজ -এ রোগের কারণে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্য ক্ষমতা হারায়

আপডেট: নভেম্বর ১৩, ২০১৭, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

আব্দুস সাত্তার


আজ ১৪ই নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। বিশ্বব্যাপী এ দিনটিকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হলো বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিশ্বময় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি ক্যাম্পেইন; যা প্রতিবছর ১৪ই নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায়, বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ১৯৯১সাল-এ ১৪ নভেম্বরকে ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।[ এদিন বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেনটিং জন্ম নিয়েছিলেন এবং তিনি বিজ্ঞানী চার্লস বেস্টের সঙ্গে একত্রে ইনসুলিন আবিষ্কার করেছিলেন। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে থাকে।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ‘নারী ও ডায়াবেটিস : সুন্দর আগামীর অধিকার’। ২০০৬খ্রিস্টাব্দের ২০ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ-এর ৬১/২২৫ নম্বর ঘোষণায় ডায়াবেটিসকে দীর্ঘমেয়াদি, অবক্ষয়ী ও ব্যয়বহুল ব্যাধি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ রোগ মানবদেহে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
ডায়াবেটিস একটি বহুমূত্র রোগ বা ডায়াবেটিস মেলিটাস(ইংরেজি: উরধনবঃবং সবষষরঃঁং) একটি হরমোন সংশ্লিষ্ট রোগ। দেহযন্ত্র অগ্ন্যাশয় যদি যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করতে না পারে অথবা শরীর যদি উৎপন্ন ইনসুলিন ব্যবহারে ব্যর্থ হয়, তাহলে যে রোগ হয় তা হলো ‘ডায়াবেটিস’ বা ‘বহুমূত্র রোগ’। তখন রক্তে চিনি বা শকর্রার উপস্থিতিজনিত অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। ইনসুলিনের ঘাটতিই হল এ রোগের মূল কথা। অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিন, যার সহায়তায় দেহের কোষগুলো রক্ত থেকে গ্লুকোজকে নিতে সামর্থ হয় এবং একে শক্তির জন্য ব্যবহার করতে পারে। ইনসুলিন উৎপাদন বা ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা-এর যেকোনো একটি বা দুটোই যদি না হয়, তাহলে রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে থাকে। আর একে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে ঘটে নানা রকম জটিলতা, দেহের টিস্যু ও যন্ত্র বিকল হতে থাকে।
ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উরধনবঃবং ঋবফধৎধঃরড়হ (ওউঋ) এর প্রাপ্ত এক তথ্যে জানা যায়, বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪৪কোটি ২০লক্ষ এবং ২০৩০সালে এ সংখ্যা ৫০কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্বে প্রতি ১০জনে ১জন টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভুগছে। মোট ডায়াবেটিস রোগীর কমপক্ষে ১৬.২শতাংশ শুধু গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এ হার মোট ডায়াবেটিস রোগীর ২৩.৬শতাংশ। বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশিও হতে পারে। বিশ্বে প্রায় ১৯৯মিলিয়ন নারী ২০১৬সালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। অন্য দিকে প্রতি ৫জন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মহিলা প্রজনন সময়কালের মধ্যে আছেন। যা প্রায় ৬০মিলিয়ন। প্রতিবছর ২.১মিলিয়ন (২১লাখ) মহিলা শুধু ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যু বরণ করেন। যেসব মহিলার ডায়াবেটিস আছে তাদের হার্ট অ্যাটাক ও এ ধরনের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি, যাদের ডায়াবেটিস নেই তাদের তুলনায় ১০গুণ বেশি। আর যাদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস আছে তাদের গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। প্রতি ৭টি প্রসবের মধ্যে ১টি মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দ্বারা আক্রান্ত। এর অর্ধেকেরই বেশি ৩০বছরের কম বয়সী প্রসূতিদের ক্ষেত্রে ঘটে। যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে পরবর্তী ৫বছরের মধ্যে এদের অর্ধেকেরও বেশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত হবেন, অধিকাংশ গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মহিলার বসবাস অনুন্নত দেশগুলোতে। আইডিএফ’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী আশির দশকে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের প্রবণতা ছিল মাত্র ২শতাংশের মতো। সেখানে আজ তা ঢাকা শহরেই প্রায় ১০শতাংশ ছুঁয়েছে এবং প্রি-ডায়াবেটিসের হার আরো প্রায় ১০শতাংশ। এ রোগের কারণে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্য ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইলিউর, অন্ধ হয়ে যাওয়া, পায়ে পচন, এমনকি পা কেটে ফেলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. নওশাদ আহমেদ খানের মতে, ডায়াবেটিস একটি বিপাক জনিত রোগ। আমাদের শরীরে ইনসুলিন নামের হরমোন-জনিত কারণে এ রোগ হয়। হরমোনের সম্পূর্ণ বা আপেক্ষিক ঘাটতির কারণে বিপাকজনিত গোলযোগ সৃষ্টি হয় রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে এক সময় প্র¯্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। ডায়বেটিস ছোঁয়াচে বা সংক্রামক কোন রোগ নয়। তিনি বলেন, বর্তমানে ডায়াবেটিস গ্যাংগ্রিন এর হার আগের তুলনায় অনেকাংশে বাড়ছে। ১০শতাংশ ডায়াবটিস রোগী এই অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। শরীরের রক্তনালী যখন বন্ধ হয়, তখন যে অংশের বন্ধ হয় সে অংশের হাড় পর্যন্ত পচন ধরে। তখন ওই অংশ কেটে ফেলার প্রয়োজনও পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশি বেশি ও ভাল ভাল খাবার সুস্থতা নিশ্চিত করে না; এই স্বাস্থ্য সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধে দরকার জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা এবং সময়মতো ইন্টারভেনশন (খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিবর্তন)। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটার দ্বারা প্রায় ৫০শতাংশ পর্যন্ত ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্ভব। কাজেই চিকিৎসা গ্রহণের পাশপাশি নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, খাদ্য গ্রহণে সচেতনতা এবং অসুখ সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় ধারণার মধ্য দিয়ে সুস্বাস্থ্যসমাজ গঠনে আমাদেরকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালন স্বার্থক হবে।