বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও কিছু কথা

আপডেট: জুন ২০, ২০১৯, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

আব্দুল হামিদ খান


দূষণ শব্দটি এখন আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত আমরা শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও পানি দূষণ ও মাটি দূষণের শিকার হচ্ছি। শব্দদূষণ তো বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে এখন বিভাগ ছাড়িয়ে জেলা পর্যায়েও শব্দ দূষণের মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে। যার ফলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যাথা, বমি বমি ভাব এমন রোগীর সংখ্যা। এছাড়া শব্দ দূষণের ফলে শ্রবন শক্তি হ্রাস পাওয়া, বধির হয়ে যাওয়া, হৃদযন্ত্রে আক্রান্ত হওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া ও ঘুমের ব্যাঘাত হবার মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বায়ুদূষণ রোধ করি, বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ি।’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইপিএর ২০১৮ সালের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী পৃথিবীতে ১৮০টি দূষিত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। পিলে চমকানোর মত খবরই বটে! দূষণ আর মরণ যেন কাছাকাছি হয়ে গেছে। আমরা কত দ্রুত খারাপ পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছি তা এ পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে। কারণ ২০১৬ সালেও বায়ু দূষণের ক্ষেত্রে বিশ্বের মধ্যে ১২৫তম ছিলাম আমরা।
নানা কারণে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। জমিতে দেয়া হচ্ছে অতিমাত্রায় সার-কীটনাশক। এতে উৎপাদিত খাদ্য তো ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে সেইসাথে জমিতে দেয়া রাসায়নিক বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে নদী, খাল-বিলের পানিতে। ফলে দূষিত পানির কারণে মরছে জলজ সব প্রাণ, সেসবও দূষণ ছড়াচ্ছে পরিবেশে। এমনিভাবে দেখা যাচ্ছে পরিবেশের সব উপাদানই দূষিত হয়ে পড়ছে। ৫ জুন ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সারা বিশ্বে যথাযথ ভাবেই দিবসটি পালিত হয়েছে। পবিত্র ঈদ উৎসবের কারণে আমাদের দেশে দিবসটি যথাসময়ে পালিত হয়নি। পরিবেশ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে দূষণের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা আরও ভয়াবহ । সেখানে বলা হয়েছে বিশ্বে প্রতি চারজনে একজন দূষণের কারণে মারা যাচ্ছে। এখনই এর বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ালে এটি আরও ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে। এ গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরিতে ছয় বছর ধরে কাজ করেছেন ৭০টি দেশের ২৫০ জন গবেষক। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয় ‘বিশ্বে যত রোগ ও মৃত্যু তার প্রায় ২৫ ভাগের কারণ পরিবেশের দুরবস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে উপরে আছে বায়ুদূষণ। এতে প্রতি বছর ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর পানি দূষণ ও সুপেয় পানির অভাবে ডায়রিয়া ও অন্যান্য রোগে মারা যায় আরও ১৪ লাখ। তাদের হিসাব অনুযায়ী শুধু ২০১৫ সালেই ৯০ লাখ মানুষ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মারা গেছে। গবেষণায় বলা হয় জরুরি পদক্ষেপ না নেয়া হলে ২০৫০ সালের মধ্যে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার আরও অসংখ্য মানুষ মারা যাবে এ দূষণে। এতে বেশি ভুক্তভোগী হবে গরিব দেশগুলো।
আমরা যদি আমাদের শহর পাবনার কথাই চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাবো আমাদের অপরিকল্পিত ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তই আমাদের শহরকে ভয়ানক দূষণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শহরের অলিগলি রাস্তাঘাটে সর্বত্রই যাচ্ছেতাই ভাবে ময়লা আর্বজনা স্তুপ করে রাখা হয়। এ যেন ময়লা আবর্জনার ভাগাড়। পাবনা-পাকশি সড়কের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে পৌরসভা ময়লা ফেলার পাকা স্থাপনা করে দিয়েছে। এখানে ময়লা জমা করে পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করা হয়। এটি যে কত অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট মহলের বিবেচনা প্রসূত ভাবনাই তা বলে দেবে। অত্যন্ত ব্যস্ততম সড়ক সংলগ্ন স্থানে এভাবে ময়লা-আবর্জনা জমা রাখার ফলে ২৪ ঘণ্টা জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একদিকে অফিসার্স কোয়ার্টার, জেলা নির্বাচন অফিস, কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, স্টেডিয়াম, সার্কিট হাউজ; অন্যপাশে রয়েছে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (যেখানে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা অবিরত গবেষণা করে যাচ্ছেন), রয়েছে আবাসিক এলাকসহ একটি জামে মসজিদ। পাবনা মানসিক হাসপাতাল ও বিসিক শিল্পনগরীর শত শত কর্মচারী/শ্রমিকরা সকাল থেকেই এ রাস্তায়ই চলাচল করে। হেমায়েতপুর, শানিরদিয়াড়, আওতাপাড়া, দাপুনিয়া, মাধপুর হয়ে পাকশি পর্যন্ত প্রতিদিন বিরতিহীনভাবে জনগণ এ রাস্তায়ই চলাচল করে। ময়লা আবর্জনার পচা দুর্গন্ধে যারপরনাই দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষদের, বিশেষ করে কালেক্টরেট স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীদের এ মোড়েই এসে নামতে হয়। তারা নাক ধরে নিঃশ্বাস বন্ধ করে চলতে চলতে অনেক সময় বমি করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এটি এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনতি বিলম্বে জনস্বার্থে পৌরসভার উচিত এ ময়লা-আবর্জনাস্থলটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া। এটি শহরের বাতাসকে বিষাক্ত করছে প্রতিনিয়ত। শহরের অলিগলি বিভিন্ন জায়গায় যত্রতত্র ময়লা ফেলছে দায়িত্বহীন পৌর নাগরিকগণও। এ ব্যাপারে তারা একেবারেই উদাসীন। অনেকেই আবার ময়লা পলিথিনে বেঁধে ড্রেনে ফেলছে। এতে করে ড্রেনগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। একটু বৃষ্টি হলেই ড্রেন উপচে ময়লা পানি রাস্তায় চলে আসে। এব্যাপারে পৌর কর্তৃপক্ষের জনগণকে সচেতন করা সহ কার্যকরী ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন।
পাবনা শহরের প্রবেশদ্বার অর্থাৎ টার্মিনাল থেকে যে রাস্তাটি শহরে ঢুকেছে, রাস্তাটির যখন বেহাল অবস্থা ছিল তখনও রাস্তার ডিভাইডারটি ছিল সৌন্দর্যম-িত। নানারঙের বাহারি ফুলে ভরা থাকতো রাস্তার ডিভাইডারটি। এসব নয়নাভিরাম ফুলে চোখ জুড়িয়ে যেত পথচলা মানুষদের। এই ডিভাইডারের মাঝে বেড়ে উঠেছিল কিছু ছায়াদানকারী বৃক্ষও। কিন্তু নবনির্মিত রাস্তাটিতে ডিভাইডার দেয়া হয়েছে কংক্রিটের। ফলে সেই মনোমুগ্ধকর নানান জাতের বাহারি ফুলের গাছ আর এখানে শোভা পাবে না। থাকবে না ছায়াদানকারী বৃক্ষও। ফলে শহরটিকে রস-কষহীন কাঠখোট্টা বিরান মরুভূমির মতো মনে হচ্ছে। সারা দেশে যেখানে সবুজায়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে এমনকি ছাদ কৃষিকে উৎসাহিত করতে নানা আয়োজন চলছে ঠিক সেই সময় পাবনা সড়ক বিভাগের অদূরদর্শী ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত পাবনাবাসীকে হতবাক করেছে। আমাদের পাশের জেলা রাজশাহী শহরের রাস্তাগুলোয় ডিভাইডারে এমনকি দুপাশে যে ভাবে সবুজায়ন করা হয়েছে এটি সত্যিই প্রশংসারযোগ্য। আর এ প্রশংসা পেয়েও আসছেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন সাহেব। আর শহরকে সৌন্দর্যম-িত করার জন্য তিনি আরো জনপ্রিয় হয়েছেন এটা অস্বীকার করার উপায় বিরোধী দলগুলোরও নেই। পাশের শহর থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি না। শহরের প্রবেশমুখে ডিভাইডারটি বাহারি ফুলে সৌন্দর্যম-িত থাকলে, সবুজায়নে দৃষ্টিনন্দন হলে কতই না ভালো লাগতো। পাবনা শহর সম্পর্কে বহিরাগতদের ধারণা হয়তো খারাপ হতো না পাবনার মানুষ রুচির দিক দিয়ে উন্নত, তারা সৌন্দর্য প্রিয় এ কথাই প্রতিফলিত হতো। কেন যে এই কংক্রিটের ডিভাইডার দিয়ে পাবনা শহরটাকে শ্রীহীন করা হলো, কে দেবে এর জবাব! কে দেখবে এসব! এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী সমরণ বাবুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, উত্তরে তিনি যা বললেন মোটেই তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বললেন, রাস্তায় জায়গা কম, তাছাড়া মজবুতের জন্য কংক্রিটের ডিভাইডার করা হয়েছে। দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন দায়িত্বহীন ও খোঁড়া যুক্তি কি আশা করা যায় ? আমি বললাম, টার্মিনাল থেকে শহরের রাস্তার জায়গা যতটুকুই থাকুক এখন ডিভাইডার রাখতে হবে পরিবেশবান্ধব। সেখানে শোভা পাবে নানান বাহারি রঙের ফুলের গাছ, থাকবে সবুজের সমারোহ। এ ছাড়া রাস্তার উভয়পাশে ১০/১২ ফুট জায়গা এখনও সড়ক ও জনপথের। কার স্বার্থে এ জায়গা উদ্ধার করা হচ্ছে না। আসলে সরকারি-বেসরকারি যাই বলি না কেন আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই, দেশকে আমরা এখনও ভালবাসতে পারি না মনে প্রাণে। তাইতো “সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল্” এমন নীতির বাস্তবায়ন এখনও চলছে নির্বিকারে। গুঞ্জন রয়েছে যতটাকা বরাদ্দ হয়েছে এই পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়কের জন্য অনেকেই বলছেন তার অর্ধেক টাকা খরচ হলে এ রাস্তাটি অনেক বেশি সুন্দর ও টেকসই হতো। হতো দৃষ্টিনন্দন। যাহোক, দেশটা আমাদের। এ দেশ আমাদের হয়েছে বহু ত্যাগের বিনিময়ে। এমনি এমনি তা আসেনি। বঙ্গবন্ধুর মতো একজন লৌহমানবকে তাঁর ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ১৪ বছর হানাদারদের অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছে। ৩০ লক্ষ মানুষকে জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে, আড়াই লক্ষ মা-বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু দেশদ্রোহী ছাড়া গোটা বাংলার মানুষকে কতই না জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। এসব আমরা ভুলে গিয়ে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসালে চলবে কেন? আসুন দেশটাকে আমরা মনে প্রাণে ভালবাসি। এদেশ আমাদের করে ভাবি। আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় এদেশের পরিবেশ উন্নত হবে, দেশ হবে সমৃদ্ধশালী।
লেখক – সাংবাদিক, কলামিস্ট।