বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০১৯ : ‘নবাগত শিক্ষক; পেশার ভবিষ্যৎ’

আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০১৯, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

শফিকুর রহমান বাদশা


শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি, বেতন কাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ সহ সর্বোপরি শিক্ষক সমাজের মর্যাদার বিষয় নিয়ে ইউসেফ, আইএলও, বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষাবিদদের এক সম্মেলনে ১৯৬৬ সালে কতিপয় সুপারিশমালা প্রণয়ন করেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার উক্ত সুপারিশমালায় স্বাক্ষর করেন। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিবছর নতুন নতুন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০১৮ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘ শিক্ষকের স্বাধীনতা; শিক্ষণের স্বাধীনতা’। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও বিশ্ব শিক্ষক দিবস আগামী ৭ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে ইউসেফ, ইউএনডিপি, আইএলও – এর সহযোগিতায় ‘নবাগত শিক্ষক; পেশার ভবিষ্যৎ ’Ñ এ বিষয়কে প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্বাচন করে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। আমি এই আয়োজনের সফলতা কামনা করছি। এ পর্যায়ে আমি প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও উচ্চ শিক্ষার অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই।
শিক্ষকতা পেশায় নবাগত যারা বুঝে বা না বুঝে বা একান্ত বাধ্য হয়ে এসেছেন বিশ^ শিক্ষক দিবসে তাদের প্রতি আমার অভিনন্দন ও শুভ কামনা। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আপনার কাঁধে এসে পড়েছে। এক সময় ভারতবর্ষে সমাজের মানুষ তাদের প্রয়োজনে নিজেরাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। এ সকল প্রতিষ্ঠানের অর্থ সংকুলান করতেন সমাজের হিতৈষী ব্যক্তিবর্গ। এখন অবশ্য আমাদের রাষ্ট্র শিক্ষার দায়িত্ব অধিক পরিমাণ গ্রহণ করেছেন। আমাদের দেশে এখন প্রায় ৮০ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর মধ্যে বেসকারি কিছু সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সরকার শতভাগ বেতন প্রদান করেন। অবশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান থেকে নাম মাত্র বেতন পেয়ে বা না পেয়ে বছরের পর বছর চাকরি করে যাচ্ছেন। এছাড়া এখনও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। এ ব্যস্থার পরিবর্তন করতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থ্যা জাতীয়করণের কোনো বিকল্প আছে বলে আমার মনে হয় না। আমাদের পণ্ডিতজনেরা এমনকি শিক্ষানীতি ২০১০-এ আমরা বলেছি যে আমরা এমন একজন নাগরিক চাই, যে হবে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্ক, দেশ প্রেমিক, মানবিক, মানুষ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল, যে হবে জীবনমুখি ও উচ্চ নৈতিকতা মানের অধিকারী। ছাত্র-ছাত্রীরা যে ধারার শিক্ষা অর্জন করুক না কেন তাদের সকলকে উক্ত একই চেতনায় গড়ে উঠতে হবে। এ কাজটি করার প্রয়োজনীয় দায়িত্বটা শিক্ষককেই নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাকেও হতে হবে সৃজনশীল আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন, মানবিক ও উচ্চ নৈতিকতা সম্পন্ন এবং তাকে প্রতিনিয়ত নিষ্ঠার সাথে জ্ঞানের র্চ্চার নবায়ন করতে হবে- তবেই সে একজন সফল শিক্ষক হতে পারবে বলে আমার বিশ^াস। একই সাথে রাষ্ট্র যাতে ছাত্র ছাত্রীরা উক্ত চেতনায় বেড়ে উঠতে পারে সে ক্ষেত্রে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক চাহিদা কে বিবেচনা নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকিকরণ, যুগোপযোগী করতে হবে এবং শিক্ষার সার্বিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
এবার আমি বর্তমান শিক্ষকতা পেশার সাথে দীর্ঘদিন থেকে নিয়োজিত আছেন বা যারা সবে মাত্র এই পেশায় নিজেকে সংযুক্ত করেছেন তাদের অবস্থা পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলতে চাই। এ পেশায় ঝরে পড়ার হার কিছুদিন আগেও অনেক বেশি ছিল। অনেকেই বিনা বেতনে বা নামমাত্র বেতনে চাকরি করতে হতো। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হওয়ার কারণে বর্তমানে অনেক মেধাবী এ পেশায় আসছেন কিন্তু শিক্ষাকতা পেশায় স্বতন্ত্র মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা না থাকার কারণে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। বর্তমানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একজন শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী বলেই আমি মনে করি। বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান, বছরের শুরুতে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে মিড ডে মিল প্রচলনের প্রচেষ্টা, শিক্ষকদের শতভাগ বেতন প্রদান, বৈশাখী ভাতা, খণ্ডিত হলেও শিক্ষকদের ২৫% এবং কর্মচারীদের ৫০% এবং উৎসবভাতা, বাড়ি ভাড়া ১০০ টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা প্রদান করেছেন এবং শিক্ষকদের মান উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি না হলেও স্বল্প মেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন এবং নতুন প্রায় ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান এমপিও ভুক্ত করার প্রক্রিয়া করেছেন। যদিও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক এমপিও বঞ্চিত থাকবেন। এখনও সম্মান শ্রেণিতে ডিগ্রি স্তরে তৃতীয় শিক্ষকের বেতন পাওয়া অনিশ্চিত অবস্থায় ঝুলছে। সম্মান শ্রেণিতে নিয়োজিত শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা আমরা এখনও জানি না। তাদেরকে প্রতিষ্ঠান থেকে নামমাত্র বেতন নিয়ে চলতে হচ্ছে। এসকল কারণে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা যারা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় তারা হতাশাগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়ে বর্তমান সরকার খুবই আন্তরিক। বর্তমানে অনেক মেধাবী ছাত্র এ পেশার সাথে যুক্ত হয়েছেন। তবে এই পেশাকে আকর্ষণীয় করতে হলে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো করতে হবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কারিগরি শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পৃথক মন্ত্রণালয়, পৃথক ডিজি অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারি পলিটেকনিকের সংখ্যা দেশে ৪৯টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করতে হলে নতুন নিয়োগ সহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।
জাতীয় শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬ হাজার ৮৬৫। এতে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৪। কারিগরি শিক্ষাবোর্ড এই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি শর্ট কোর্সের ট্রেনিঙের জন্য ২ হাজার ৬০০ ট্রেনিং সেন্টারের শিক্ষার্থীদেরও মূল কারিগরি শিক্ষার সাথে যোগ করেছে। এসব ট্রেনিং সেন্টারের শিক্ষার্থী সংখ্যা ২ লাখ ৮০ হাজার ৩০১। সেই হিসাবে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৭৬৫। দেশে সরকারি-সরকারি কলেজের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। অন্যদিকে সরকারি পলিটেকনিকের ইনস্টিটিউটের সংখ্যা মাত্র ৪৯। আর ৪৬১ টি বেসরকারি পলিটেনিক ইনস্টিটিউট থাকলেও ভালো মানের রয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ টি (সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ, ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ )।
পলিটেকনিক থেকে যারা পরীক্ষায় পাশ করেন তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য একটি মাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার্থীর হার ১৬.০৪ শতাংশ (সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ, ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)। বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষাকে আরো উন্নত করার দাবি রাখে। কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণে আমাদের আশেপাশের দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চিন, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া আজ উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে স্কুলগুলোতে পৃথক কারিগরি শাখা খোলা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এ পেশায় নিয়োজিত শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিঙের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসাথে পেশায় নিযুক্ত শিক্ষকের পেশার প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্য নানামুখি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে । মাদ্রাসা শিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষকরা যাতে মূলধারার শিক্ষার সাথে সংযুক্ত হতে পারে সেজন্য তাদের পর্যাপ্ত ট্রেনিঙের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেজন্য গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ প্রদান করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কেন্দ্র না হয়ে দাঁড়ায় সেদিকে নজরদারি করতে হবে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দক্ষ ও সৃজনশীল শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। বেতন আকর্ষণীয় করতে হবে। তাহলে মেধাবী ছাত্ররা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবে।
২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো গঠন, শিক্ষকদের পদোন্নতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও আমরা সেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি। একারণে শিক্ষকতা পেশায় বিশেষতঃ নবাগত শিক্ষকরা আস্তে আস্তে পেশায় থাকার অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলছেন। দ্রুতই এ ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধিত হলে শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়ন হবে এবং নবাগতরা শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে উৎসাহ পাবে। তাহলেই এই বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়ের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।
লেখক : শিক্ষাকর্মী