বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯, ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস অর্থ ৮ই সেপ্টেম্বর মানুষকে মনে করিয়ে দেয় শিক্ষার মর্যাদা এবং মানুষের শিক্ষার অধিকারের কথা। ১৯৬৬ সালের ১৪তম সাধারণ সভায় ইউনেস্কো ৮ই সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষণা করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও পালিত হয় এ দিবসটি, এবারের সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, “বহু ভাষার সাক্ষরতা, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার বেড়েছে অনেক। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশ্ন থেকে জানা যায় বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার হার ৭৩.৯ শতাংশ। এ তথ্য অনুযায়ী বলা যায় ২৬ শতাংশের বেশি মানুষ এখনও নিরক্ষর। আমরা জানি বাংলাদেশ সরকার অঙ্গীকার করেছিল ২০১৪ সালের ভেতর বাংলাদেশের শতভাগ মানুষ সাক্ষর হবে। এ ঘোষণার তোড়জোড় বেশ ভালোভাবে দৃশ্যমান হয় ২০১২ সাল পর্যন্ত। তখন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ওয়েব সাইট খুললেই চোখে পড়ত একটা লেখা-‘উই আর কমিটেড টু এনশিওর হানড্রেড পার্সেন্ট লিটারেসি বাই টোয়েন্টিফোরাটিন।’
২০১২ সালে সরকার দু’টো প্রকল্প হাতে নেয়- ১) ৬১টি জেলায় নিরক্ষরদের সাক্ষর করা
২) ৩টি পার্বত্য জেলায় সাক্ষরতা প্রদান
কিন্তু সরকার সে সময় অর্থ সংকটের কারণ দেখিয়ে প্রকল্প দু’টির বাস্তবায়নের কাজ বন্ধ রাখে। দুঃখের বিষয় প্রকল্প দু’টো আর আলোর মুখ দেখেনি। একই সাথে শেষের পথে চলে যায় শতভাগ শিক্ষা প্রকল্প।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সব শিশুদের জন্য ফ্রি ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনও সব শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অর্থাৎ ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় নি। দারিদ্রই একমাত্র কারণ নয়। হাওর বাওর এলাকার প্রচলিত স্কুলের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয় ফলে তারা নির্ধারিত বয়সে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় না। এখানে একমাত্র নৌকা স্কুলিং- এর মাধ্যমে তাদের শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে- যে চিন্তাটি যথা সময়ে করা হয় নি। ব্র্যাক বোটিং স্কুলের ব্যবস্থা করে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের সূচনা করে। পরিকল্পনা করা হচ্ছে প্রায় ৮০০ বোট দ্বারা এ স্কুলিং পরিচালনা করা হবে এবং এ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে নিরক্ষরতার হার অনেক কমে আসবে।
বাংলাদেশ সরকার শিক্ষাকে শিশুদের দারিদ্র্য বিমোচন এবং উন্নত জীবন মান নিশ্চিতকরণের উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তায় ‘সবার জন্য শিক্ষা’ লক্ষ্য মাত্রা পূরণের ক্ষেত্রে শিশুদের শিক্ষার অধিকার আদায়ে পজিটিভ স্টেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। এটা বাংলাদেশের একটা গর্বিত অর্জন। ফলে বাংলাদেশ স্কুলে লিঙ্গ সমতা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই এতদসত্ত্বেও সব শিশুদের স্কুলের প্রতি আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়নি। স্কুলগুলো সুসজ্জিত বা শিশুবান্ধব নয়। তাছাড়া শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই যাতে তারা শ্রেণিকক্ষকে আকর্ষণীয় বা শিশুবান্ধব করে তুলতে পারেন। এছাড়া এমন অনেক শিশু আছে যারা সকলের খাবার পায় না। সুতরাং, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য যদি স্কুলে সকাল, দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে অনেক শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করা যাবে। ভৌগোলিক অবস্থানও শিশুদের স্কুলে না আসার একটা কারণ। অনেকে দুর্গম পথ কিংবা স্কুলের দূরত্বের কারণেও স্কুলে যায় না। দুর্গম এলাকাগুলোতে বোট স্কুলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এ ব্যাপারে সরকার এখনও কোনো পদক্ষেপ। গ্রহণ করেনি। স্কুলে স্কুলে খাবার ব্যবস্থা করা একটা কার্যকর পদক্ষেপ এবং শিক্ষা প্রকল্পে এটি অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ। বিভিন্ন এনজিওর সাথে যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে তাহলে দেশ অতি দ্রুত নিরক্ষতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে। পত্র-পত্রিকা কিংবা সংবাদ মাধ্যমে একটা দেশের সাক্ষরতার পুরো চিত্র তুলে ধরতে পারে না।
সরকার কিংবা এনজিও নয়, আমাদেরও দায়িত্ব আছে নিরক্ষরতা দূরীকরণে। আমরা যারা শিক্ষিত অর্থাৎ যারা লিখতে, পড়তে পারি, সুন্দরভাবে যোগাযোগ করতে এবং যোগাযোগ রক্ষা করতে পারি-আমাদেরও দায়িত্ব আছে। যারা নিরক্ষর তারা চোখ থাকতেও অন্ধ। আমাদের উচিৎ মানুষকে সাক্ষর করে তাদের অন্ধত্ব দূর করা। সরকারের পাশাপাশি আমরাও যদি দায়িত্ব নেই নিরক্ষরতা দূরীকরণের- তাহলে সরকার গৃহীত পদক্ষেপ দ্রুততার সাথে কার্যকর হবে। তবে এক্ষেত্রে সবার আগে সরকারকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্বল্প মেয়াদে অঞ্চলভিত্তিক এ সাক্ষরতা অভিযান চালালে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের চেয়ে অধিকতর দ্রুত এটি কার্যকর করা যাবে।
সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে যা সুষ্ঠুভাবে ব্যয়িত হয় না। সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, বর্তমান মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছে অনিবন্ধিত এনজিও, যাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আছে। বিগত দশ বছরে শিক্ষাখাতে সরকারের অর্জন কম নয়। প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী স্কুলে যায় এটি আমাদের বড় অর্জন। কিন্তু এখনও ঝরে পড়াটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের মিড ডে মিল চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক। এটি চালু করা গেলে ঝরে পড়াটা অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব হবে। এছাড়াও ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্তটিও ইতিবাচক। ২০২১ সাল থেকে এটি চালু হবার কথা আছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। এ অগ্রগতিকে ধরে রাখার জন্য নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এগুলো যদি স্বচ্ছ হয়, প্রকল্পগুলোর অর্থ যদি যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় তাহলে বাংলাদেশ দ্রুততার সাথে তার শতভাগ অর্জন নিশ্চিত করতে পারবে।