বুলবুলির বড় হওয়া

আপডেট: জুন ৮, ২০১৯, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

রীনা নন্দী


বুলবুলির একেবারে লিখতে ইচ্ছে করে না। কী যে সব হিজিবিজি লিখতে হয় খাতায়। ওরা সমানে কানের কাছে বলে যাবে এটা লেখো, ওটা লেখো। শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলো। বাক্যরচনা কর। কান মাথা ভোঁ ভোঁ করে তার।
বুলবুলির এই কান মাথা ভোঁ ভোঁ করানো ‘ওরা’ গুলো হলো বাবা, পিসি, ঠাকুমা, মা, ইস্কুলের মিসেরা। সব সময়ে ওদের এই এক বুলি শুনতে শুনতে বুলবুলি জেরবার।
বুলবুলির বয়স চার বছর দশ মাস। এখনকার যুগে ফোর প্লাস মানে যথেষ্ট বড়। মোটেই বালখিল্য নয়। রীতিমত বড় হওয়ার সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিতে চললো। পাঁচ বছর হয়ে গেলেই বড় স্কুলে ভর্তি হওয়ার দৌড়ে নেমে পড়তে হবে।
সেই দৌড়ের প্রতিযোগিতায় নামার জন্যই বাড়িতে, নার্সারি স্কুলে বুলবুলির ট্রেনিং চলছে এখনই। যখন সে স্কুলে যায়, পিঠে তার এত্ত বড় ব্যাগ। বাবার সঙ্গে স্কুল থেকে ফেরবার পথে তার কাঁধ ব্যথা করে ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসতে।
বাবা বলে, ‘বুলবুলি পাখি ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে দে। অত বড় ব্যাগ সারাটা রাস্তা নিয়ে যেতে পারবি না।’ বুলবুলি সত্যিই পারে না নিয়ে যেতে। সে বাবাকে দিয়ে দেয়। মাঝে পা ব্যথা করলে বলে, ‘বাবা একটু কোলে করবে ?’
বুলবুলির ক্লান্ত করুণ মুখটা দেখে তার বাবা এক হাতে ব্যাগ নিয়ে অন্য হাতে কোলে নিয়ে নেন মেয়েকে।
স্কুলে যাওয়া আসার পথে বাবা বুলবুলিকে বলে, ‘বুলবুলি পাখি স্কুলে মিস যেসব জি.কে. জিজ্ঞাসা করবেন, সবকটার উত্তর দেবে। চুপ করে বসে থাকবে না। জি.কে. গুলো মুখস্ত করে নিতে পারলে তবেই তো বড় স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে সহজে।’
বুলবুলি বাবার কথায় বড় করে ঘাড় নাড়ে। কিন্তু ক্লাসে গিয়ে জানা প্রশ্নেরও উত্তর দেয় না। জানলা দিয়ে সামনের মাঠটার দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে এক ঝাঁক পায়রা কেমন দল বেঁধে একবার এদিকে যাচ্ছে আর একবার ওদিকে যাচ্ছে। কী সুন্দর! অবাক হয়ে যায় সে মনে মনে। একদিন ইংলিশ হ্যান্ডরাইটিং-এর ক্লাস চলছে। সকলকে লিখতে দিয়েছেন রণিতা মিস্। ওমা ! বুলবুলির সেদিকে মন নেই, আকাশে পায়রার ঝাঁক দেখে সে হাততালি দিয়ে ওঠে। পাশে বসা বন্ধু মোনালিসাকে বলে, ‘দেখ্ দেখ্ কী সুন্দর দেখাচ্ছে।’ মোনালিসাও অবাক হয়ে দেখে আকাশে উড়ে বেড়ানো পায়রাদের !
রণিতা মিস্ কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই ভাল চোখে দেখেন না। ধমকে উঠে জিজ্ঞাসা করেন, ‘বুলবুলি, মোনালিসা, হ্যান্ডরাইটিং না করে কী করছো জানলার দিকে তাকিয়ে ?’
দুজনেই চমকে উঠে মিসের দিকে তাকায়। বুলবুলি ভ্যাবাচাকা গলায় বলে ওঠে, ‘কিছু করিনি মিস্। শুধু ঐ পায়রা গুলোকে দেখছি। কী সুন্দর করে উড়ছে।’
-‘তোমরা ক্লাসের কাজ না করে পায়রা দেখছো, আকাশ দেখছো। হ্যান্ড রাইটিংটা হয়েছে ?’
মোনালিসা ভয় ভয় গলায় বলে, ‘আমি তো লিখছিলাম মিস্, বুলবুলিই তো আমায় ডাকলো পায়রা দেখার জন্য।’ দুজনের খাতাতেই অল্প দু’চার লাইন লেখা হয়েছে, বেশিরভাগটাই ফাঁকা দেখে রণিতা মিসের রাগ বেড়ে যায়। বুলবুলিই মোনালিসাকে ডাকছিলো-দেখেছেন মিস্। সুতরাং বুলবুলির উপরই যত রাগ গিয়ে পড়ে তার। সোজা বলে দেন, ‘বুলবুলি কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকো।’
বুলবুলি আর কী করে। মিসের কথা মত কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। শাস্তি পেলে তার যে খুব একটা লজ্জা করে কিংবা খুবই দুঃখিত হয়ে পড়ে-তা নয়। শাস্তির ব্যাপারটা ঠিক যেন বোধগম্যই হয় না তার। তবে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে না। বন্ধুরা ক্লাসে বসে পড়া করছে; সেটা করতে না পারলে খারাপ লাগে। তবে আজকের শাস্তিটা পেয়ে তার ভালই লাগছিলো। সারা হ্যান্ডরাইটিং ক্লাসটাই সে আড়চোখে তাকিয়ে রইলো আকাশের দিকে। পায়রাগুলো যে সমানে ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলেছে।
ক্লাসটা শেষ হতে রণিতা মিস বসতে বলেন। সেই সঙ্গে এও বলেন, ‘গার্জেন কল্ হবে বুলবুলি তোমার। এইভাবে অমনোযোগী হলে ভালো রেজাল্ট করতে পারবে না। ভালো স্কুলে চান্স পাবে কী করে ?’
বুলবুলি চুপ করে শোনে। তাকে দেখে বোঝা যায় না রেজাল্ট নিয়ে তার খুব একটা মাথা ব্যথা আছে। তবে সে এটা বোঝে বাবাকে মিস্ এই কথাগুলো বললে বাবা বকবেন খুব। তখন বাবা বলবেন, কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবো না তোকে।-সেটা খুব বিচ্ছিরি হবে। বাবার সঙ্গে এখানে ওখানে ঘুরতে যেতে তার খুব ভালো লাগে। সে বাবার সঙ্গে পার্কে যায়, মাছের বাজারে মাছ কিনতে যায়, পাশের মন্দিরে ঢোল কাঁসর বাজে যখন তখনও যায়। ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজিয়ে দেয় বুলবুলি দড়ি টেনে টেনে। সে ছোট্ট হাত দিয়ে সামলাতে না পারলে, বাবা তার হাতটা ধরে বাজিয়ে দেয়।
সেদিন ছুটি হতে মিস্ কিছু বলেন না বাবাকে। বুলবুলি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মিস্ তাহলে তাকে ভয় দেখিয়েছেন। আজ তো বাবাকে বললেন না। অবশ্য কালকেও হেড মিস্কে দিয়ে বলাতে পারেন। যাকগে বাবা আজকে তো বলেননি। আজকের মত খুশি খুশি মুখে স্কুল থেকে বেরোয় বুলবুলি বাবার সঙ্গে।
রাস্তায় বাবা বুলবুলির ব্যাগটা চায়। তখনি বাবার হাতটা ধরে সে। দেখে হাতের চেটোটা কী গরম !
সে জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবা, তোমার হাতটা এত গরম কেন ?’
বাবা বলেন, ‘আমার জ্বর এসেছেরে মা। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠেই মাথাটা ভার ভার লাগছিলো। এখন আবার গা গরম হয়ে উঠেছে বেশ। মাথাটাও যন্ত্রণা করছে।’
বুলবুলির বাবার জন্য বেশ মন খারাপ হয়ে যায়। বাবার শরীর খারাপ। বাবার কষ্ট হচ্ছে। তবুও বাবা তার ব্যাগটা নিয়ে নিয়েছেন বুলবুলির ভারী লাগবে বলে।
সে বাবার হাতটা ধরে টানে। বুলবুলির বাবা দাঁড়িয়ে যান। জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী রে মা কী হয়েছে?’ ভাবেন, মেয়ে বুঝি কোলে চড়তে চাইছে। তাই দুঃখিত স্বরে বলে ওঠেন, ‘আজ আর কোলে নিতে পারবো না রে বুলবুলি, জ্বর এসেছে তো।’
বুলবুলি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ‘না না বাবা কোলে চড়তে চাইছিনা। আমি হেঁটে যেতে পারবো। আমি আমার ব্যাগটা চাইছি। ব্যাগটা আমিই নিয়ে যাচ্ছি। তোমার জ্বর হয়েছে, ভারি ব্যাগ নিয়ে যেতে তোমার কষ্ট হবে। আমিই নিয়ে যেতে পারবো আমার ব্যাগ, আমি তো বড় হয়ে গেছি।’
বুলবুলির বাবা মেয়ের কথা শুনে হাসেন। ব্যাগটা মেয়ের পিঠে ঠিক করে পরিয়ে দেন। বুলবুলির দিকে তাকিয়ে ভাবেন, মেয়েটা তার বড় হয়ে গেল! কেমন বাবার কষ্ট হচ্ছে বুঝে নিজের ব্যাগ নিজে বইছে !
বুলবুলির বাবা নীচু হয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হামি খান গালে । বলেন, ‘ছোট্ট বুলবুলিটা কেমন বুঝতে শিখে গেছে। কত বড় হয়ে গেলো মেয়েটা আমার !’ বুলবুলি বাবার কথা শুনে লজ্জা পেয়ে যায়। বলে, ‘ধ্যাৎ ! কী যে করনা বাবা।’