বোকা ভূত ও চালাক রবিন

আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০১৮, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

মোনোয়ার হোসেন


রবিন এসেছে গ্রামে। মামার বাড়ি। মামাতো বোনোর বিয়ে। বিয়ে খেতে এসেছে ও । রিফাত আর তুহিনও এসেছে। তারা দুজনই রবিনের খালাতো ভাই। তাদের আরো একজন মামাতো ভাই আছে। নাম সাগর। তারা মোট চারজন। সবাই সমবয়সি না হলেও গলায় গলায় ভাব তাদের। সবার ছোট রবিন। বয়স দশ বছর। ক্লাস ফাইভে পড়ে। বাবা মায়ের সাথে শহরে থাকে সে।
বিয়ে বাড়ির রাত। কারো চোখে ঘুম নেই। সবাই আনন্দ করছে। হৈ হুল্লোড় করছে। গান শুনছে। গল্প গুজব করছে।
বহুদিন পর রিফাত, তুহিন, রবিন আর সাগর এক সঙ্গে হয়েছে বলে বিয়ের পুরো আনন্দটাই এখন যেন তাদের। বসে একটা জব্বেস আড্ডা দিচ্ছে সবাই। এই গল্প সেই গল্পের মাঝে চলে এল ভূতের গল্প।
সাগর বলল, তোমরা কী ভূত দেখেছ?
সবাই বলল, না তো !
আমি কিন্তু দেখেছি।
কোথায়?
আমাদের ওই পুকুরপাড়ে। পুকুরপাড়ে যে তেঁতুলগাছটা আছে, সেই তেঁতুলগাছটার নিচে। প্রতি পূর্ণিমার রাতে তেঁতুলগাছের নিচে ভূত আসে। পুকুরের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করে।
রবিন বলল, আমিও ভূত দেখবো সাগর ভাইয়া।
তার সঙ্গে সঙ্গে তুহিন আর রিফাতও ফোঁস করে বলে দিলো আমরাও দেখবো।
সাগর বলল, দেখতে চাইলেই তো আর ভূত দেখা যাবে না।
কেন?
ভূত তো দেবতা। তাকে তুষ্ট করতে হবে। তবেই না সে দেখা দেবে।
ঠিক আছে আমরা তাকে তুষ্ট করবো। এবার বলো কিভাবে ভূতকে তুষ্ট করতে হয় ?
ভূত ভোজন প্রিয়সী, বুঝলে ? ভূত হলো ভোজন প্রিয়সী। ভোজনে তাকে তুষ্ট করতে হয়।
কিভাবে?
দুধ, কলা, দই, মিষ্টি আর চমচমে ভূত তুষ্ট হয়। পূর্ণিমার রাতে এই খাবারগুলো তেঁতুলগাছের নিচে রেখে আসতে হবে। আর বলতে হবে, হে ভূত বন্ধু, তুমি এগুলো খেয়ে তুষ্ট হও, আর আমাদেরকে দেখা দাও। আমরা তোমাকে দেখতে চাই। এই বলে তোমাকে সেখান থেকে চলে আসতে হবে। ভূত যদি তোমার ভোজনে তুষ্ট হয়, তবেই সে তোমাদের দেখা দেবে। ঘরের জানালা দিয়ে তোমরা তাকে দেখতে পারবে।
আচ্ছা পূর্ণিমার রাতেই আমরা ভূতকে তুষ্ট করবো। কিন্তু পূর্ণিমার রাতটা আসবে কবে ?
সাগরের বাবার একটা বর্ষপুঞ্জিকা আছে। নাম লোকনাথ পুঞ্জিকা। সাগর দৌড়ে ঘর যায়। ঘর থেকে লোকনাথ পুঞ্জিকা বের করে নিয়ে আসে। চন্দ্রমাস দেখে বলে, আর তিনদিন পরেই পূর্ণিমা।
আর মাত্র তিন দিন !
সবাই উত্তেজিত। তিন দিন পরেই যে তারা ভূত দেখবে!
তিনদিন পর।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। রবিন, তুহিন আর রিফাত ভূতকে তুষ্ট করার জন্য দুধ, কলা, দই মিষ্টি, আর চমচম নিয়ে গাছের নিচে যায়। সাগর ভাইয়ার কথা মতো রবিন এগুলো গাছের নিচে রেখে বলল, হে ভূত বন্ধু, আমরা তোমাকে তুষ্ট করতে এসেছি। তুমি আমাদের খাবারগুলো খেয়ে তুষ্ট হও। আমাদেরকে দেখা দাও। আমরা তোমাকে দেখতে চাই ।
ভূতের ব্যাপারে রবিনের আবার খুব আগ্রহ। তাই সে কাছ থেকে ভূতকে দেখতে চায়। তুহিন আর রিফাতকে বলল, চলো আমরা বাসায় না গিয়ে বরং কোনো ঝুপড়ির নিচে গিয়ে লুকিয়ে পড়ি। তাহলে কাছ থেকে ভূতকে ভালো করে দেখতে পাবো।
রিফাত বলল, কাছে থাকলে ভূত যদি দেখা না দেয়?
ভূত দেখা দিলে দূরে কাছে সবখানেই দেখা দেবে।
ঠিক আছে।
সবাই ঝুপড়ির নিচে লুকিয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ হলো কিন্তু ভূত বাবাজির কোনো হদিস নেই। এদিকে মশাও কামরাচ্ছে খুব। রবিন বলল, সাগর ভাইয়া, আমাদেরকে বোকা বানানোর জন্য এমন নাটক করেছে। আসলে ভূত বলে কিছুই নেই। চলো। খামখা মশার কামড় খেয়ে লাভ নেই।
রিফাত বলল, আমরা কাছাকাছি আছি বলেই হয়তো ভূত দেখা দিচ্ছে না।
রবিন বলল, দেখা না দিক, কিন্তু খাবারগুলো তো খাবে। সেগুলোও তো পড়ে আছে।
রিফাত দেখলো সত্যিই সব খাবার গাছের নিচে পড়ে আছে। তাহলে আর একটু দেখি।
হঠাৎ তুহিন ডান হাতের তর্জনী আঙুল তুলে পুকুরের পুব পাড়ের দিকে দেখিয়ে বলল, ওই তো আসছে।
রবিন আর রিফাত তাকালো সে দিকে। সত্যিই কালো আল্লাখেলা পড়া কিছু একটা ছায়ামূর্তি এদিকে আসছে। তেঁতুলগাছটার দিকে এগিয়ে আসছে। চাঁদের আলোয় তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। যতই কাছে এগিয়ে আসছে ছায়া মূর্তিটা ততই স্পষ্ট হচ্ছে।
তুহিন একটু ভীতু টাইপের ছেলে। ছায়া মূর্তি দেখে তার শরীর একেবারে ফ্রিজ হয়ে গেল। বলল,আমার খুব ভয় করছে। চলো আমরা পালাই।
আরে বোকা, এখন পালানো যাবে না। বলল রবিন। এখন পালালে ভূতটা পিছন থেকে ধরে ফেলবে। ঘাড় মটকিয়ে রক্ত শুষে খাবে।
ওরে বাবারে! এক লাফে রবিনের পিছনে এসে দাঁড়ায় তুহিন। জাপটে ধরে তাকে। থরথর করে কাঁপে।
ভূতটা ধীরে ধীরে কাছে চলে আসে। তাদেরকে অতিক্রম করে গাছের দিকে এগিয়ে যায়। ভূতটা তাদেরকে অতিক্রম করার সময় রবিন স্পষ্ট তাকে দেখতে পেল।
ভূতটাকে দেখে তার খুব সন্দেহ হলো। কারণ ভূত সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে সে। ভূতের বই পড়ে সব জেনেছে ও । এই যেমন ভূতের পা পিছনের দিকে উল্টানো। চোখ দুটো কপালের উপর। ভূতের কোনো ছায়া নেই। কিন্তু এগুলো একটাও দেখতে পেলো না সে এই ভূতের মাঝে। এই ভূতের পা দুটি মানুষের পায়ের মতো। চোখ দুটো কপালের নিচে। তাদেরকে অতিক্রম করার সময় দিব্বি ছায়া পড়ল। ভূত যখন গাছের নিচে গিয়ে খাওয়া শুরু করলো, তখন তার সন্দেহটা আরো দ্বিগুন বেড়ে গেল। কারণ ভূতটা ডান হাত দিয়ে খাচ্ছে!
অথচ ভূতেরা কখনো ডান হাত দিয়ে খায় না। তারা বাম হাত দিয়ে খায়।
না তাকে এই ভূতের রহস্য খুলতেই হবে। মনে মনে ভাবে রবিন।
তারপর কাউকে না বলে আসার সময় যে লাঠিটা লুকিয়ে নিয়ে এসেছিল সেটা নিয়ে পা টিপে টিপে ধীরে ধীরে সে যায় গাছের কাছে। তারপর পটাশ ! করে একটা ঘা বসিয়ে দেয় ভূতের পিঠে।
পটাশ খেয়ে ও মারে, ও বাবারে মরে গেলাম রে! বলে চিৎকার করে আর্তনাদ করে উঠে ভূত। ভূতের গলা শুনে দৌড়ে আসে রিফাত আর তুহিন। তিনজনে ভূতকে ধরে মুখোশ খুলে ফেলে।
এবার তো সবাই অবাক। কিসের ভূত! এ যে আমাদের সাগর ভাইয়া!
সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ভাইয়া তুমি?
ফিক করে হেসে দিলো সাগর। হুম আমি।
তুমি পারো বটে!
পারলাম আর কই? মিষ্টিগুলো তো আর খেতে দিলে না।
রবিন বলল, খাবে কিভাবে? তুমি যে বোকা ভূত।
তার কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল ।